এক টুকরো বিষ

(১)

গলার শুরুর অংশটা খুসখুস করছে। বুঝতে পারছি আবার কাশি শুরু হবে। দিচ্ছি না। ভাবে টান পড়বে। এই যৌগটার সাথে ‘ভাব মারা’র সম্পর্ক বহুদিনের। সেই চার বছর আগে ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে ছাদে কড়ই গাছটার তুলোর মত ছায়ার নিচে প্রথম টান দিয়েছিলাম। যতটুকু নিঃশ্বাস আছে পুরোটা টেনে নিয়েছিলাম ফুসফুসে। সাথে সাথে অদ্ভুত একটা জ্বলুনি হল গলায়। মনে হল, গলার ভেতরে কে যেন অক্সি-অ্যাসিটিলিন শিখা জ্বালিয়ে দিল। চেপে রাখতে চেয়েছিলাম। পাশে সুপম বসে আছে। কাশতে দেখলে হাসাহাসি করতে পারে। কিন্তু, পারলাম না। কাশতে শুরু করলাম প্রচণ্ডভাবে। কাশির দমকে জীবনে প্রথম সুখটানে ঠিক কী অনুভূতি হয়েছিল বুঝতে পারলাম না। যদি বুঝতে পারতাম, হয়তো তা দিয়েই একটা মহাকাব্য লিখে ফেলতে পারতাম। হল না।

দারুণ লজ্জা নিয়ে নিলয়ের দিকে তাকালাম। হাসল না। গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বলছে, ‘প্রথমবারে এতটা টান দেয়া ঠিক হয় নি।’ বুঝলাম এমনটা হতেই পারে। সেবার গলা দিয়ে রক্ত পড়েছিল কাশতে কাশতে। তবুও, তাকে ছাড়ি নি। সার্থকতা বোধ হয় তাতে ছিল খানিকটা।

আমাদের ছাদের রেলিংয়ে মসের কার্পেটে বসে যখন আমি তার দিকে ধূসর ধোয়াটা ছাড়তাম, ভাবতাম কত বড় হয়ে গেছি। বাতাসে যেন অদ্ভুত একটা আলোড়ন হত। হ্যালুসিনেশনের মত। বাতাসের ঝাপটায় তার চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়ত। সে সরিতে দিতে গেলেই আলতোভাবে হাতটা ধরতাম দুঃসহ তীব্রতায়। যেন তার হাতে সায়ানাইডের শিশি। এখুনি কোন অঘটন ঘটে যাবে। সে কিছু বলত না। বুঝত। হেসে ফেলত। আমার পাগলামিতে মুগ্ধ হয়ে। তার গালে তখন গোলাপি টোল পড়ত। আমি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতাম। যখন সেটা পুরনো হয়ে গেল, নতুন কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করলাম- একগাল বিষবাষ্প টেনে নিয়ে তার অধরকে আলিঙ্গন করা। একই বিষ ছড়িয়ে পড়ত দু’জনার মাঝে। কোনটা বেশি বিষাক্ত বুঝতে পারতাম না। তার ঠোটের তীব্রতা না’কি নিকোটিন?

দু’টো বছর এই দু’জনকে নিয়েই থেকেছি। বিষাক্ত দু’জন। আমার প্রিয়া এবং আমার নিকোটিন। দু’টো বছর ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দামে আমি ধন্যি হয়েছিলাম। চিত-চুম্বন-চোর-কম্পনে আমি অভিভূত হয়েছিলাম কুমারীর প্রথম পরশে। তারপর… কুমারীটি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তাকে বলেছিলাম, ‘ফিরে আসব।’ সে বিশ্বাস রাখতে পারে নি আমার কথায়। ২৬৪ কিলোমিটার তার কাছে অনেক বড় দূরত্ব বলে মনে হয়েছিল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম। ওয়ার্ম হোল কি ভালবাসার থেকেও শক্তিশালী কিছু? কখনও হতে পারে? জানি না। আমি তখন দেখতে পাচ্ছিলাম, সুবর্ণ এক্সপ্রেসে ইলেক্ট্রনিক ট্রেনের বেগে আমি গিয়ে হাজির হয়েছি তার সামনে। দাড়িয়ে আছি তার মুখোমুখি। পৃথিবীর আর প্রতিটা বস্তু যেন কৃষ্ণগহ্বরে লীন হয়ে গেছে। আছে শুধু অন্ধকার। মুখোমুখি বসিবার। আর… একরাশ বিষাক্ততা। কঠিন তুলতুলে গোলাপি বিষাক্ততা। এবং… বায়বীয় ধূসর ধোঁয়াশা বিষাক্ততা। বাস্তবতা তার মাঝে উহ্য। অপ্রয়োজনীয়। অনুভূতিগুলো কেমন এলোমেলো ঠেকছিল।

আমার এক প্রিয়া আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আরেকজন রয়ে গিয়েছিল। আমি বেঁচে ছিলাম তাকে আঁকড়ে ধরেই। আমার দু’জন প্রিয়াই তাদের কুমারীত্ব বিসর্জন দিয়েছিল। একজন আমারই কোন অন্তরঙ্গের বিছানায় এবং অন্যজন আমার ঠোটে। সেদিন ধূসর ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলাম পুরো ঘরটা। যন্ত্রণাগুলো একটু একটু করে হৃদয় থেকে লীন হয়ে গিয়েছিল। কীভাবে হয়েছিল, আমি জানি না। জানার কোন ইচ্ছেও নেই। কিন্তু, হয়েছিল।

(২)

ঠিক কী কারণে জানি না, ক্লাস নাইনে উঠে যখন ঢাকায় এলাম, ভাল ছাত্র হবার একটা অত্যুগ্র বাসনা আমায় পেয়ে বসল। ভাল ছাত্র হবার স্বার্থে অনেক কিছুই ছেড়ে দিয়েছিলাম। তাকেও ত্যাজ্য করেছিলাম। দেড়টি বছর যে আমায় বনলতার মত আঁকড়ে ছিল মুহূর্তের খেয়ালে তাকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দিতে আমার এতটুকু বাধে নি। কী করে এমন করেছিলাম ভাবলে আজও অবাক হয়ে যাই।

তবে, থাকতে পারি নি তাকে ছেড়ে বেশি দিন। সে আবারও আমার জীবনে ফিরে এসেছিল। কারণ, ততদিনে ভাল ছাত্র হবার বাসনাটাকে আমি নিপুণভাবে গলা টিপে হত্যা করেছি। ‘ভাল ছাত্ররা যে দেশের কয়েকটা ঘুষখোর অফিসার ছাড়া আর কিছুই তৈরি করতে পারে না’ সেই বোধটা ততদিনে হয়ে গেছে খুব ভাল ভাবেই। তাই তাকে আবারও ফিরিয়ে এনেছি আমার ঠোট দু’টোর ঠিক মাঝখানটায়। সে বিন্দুমাত্র আপত্তি করে নি। ভেবেছিলাম, অনেক রাগ করবে। আমি তার সামনে হাঁটু গেড়ে করজোড়ে ক্ষমা চাইব। কিছুই হয়নি। তার সামনে গিয়ে দাড়াতেই সে বুঝে গিয়েছিল, আমার মনের সবটুকু। তার বাষ্পীয় হাতে আমায় জড়িয়ে ধরেছিল। পরম মমতায়।

(৩)

আজকে ঠিক কতদিন পর বেনসনে টান দিলাম? উত্তরটা ঠিক জানা নেই। সেই যে যেন কত যুগান্তর আগে সারাটা দিন প্রজন্ম চত্বরে রোদে পুড়ে, শেষ বিকেলের তরল রোদে ভিজে জবজব করতে করতে ছবির হাটে একটা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলতাম… একটা কড়া লিকারের গুড়ের চায়ের সাথে দীর্ঘ একটা টান! মুখটা খোলা রেখে নিকোটিন আর অক্সিজেনটুকুকে মিলিয়ে শুষে নেয়া কোন একটা অনুভূতি। অ C¬10H14N2 এর সাথে কী অক্সিজেন বিক্রিয়ার করে? ঠিক জানি না। পড়াশোনা লাটে উঠেছে বহু আগেই। অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনটা ভাল করে পড়লে বোধ হয় পারা যেত। পড়িনি। আমি তখন আমার প্রিয়ার বিষাক্ত ধোয়ায় আচ্ছন্ন। ঠিক যেমন করে এখন।

তবে মুখ খোলা রেখে ধোয়াটুকু শুষে নিলে যে অনুভূতিটা হত, সেটা বন্ধ রাখলে হত না। ঠিক যেমন করে তার সাথে গুড়ের চায়ে যে অনুভূতিটা হয় সেটা চিনির চায়ে হয় না। প্রতিটি অনুভূতিরই ব্যক্তিভেদে ভিন্নতা থাকে। আমার কাছে তার ভিন্নতা বোধ হয়ে একটু বেশিই ছিল। সে ছিল আমার কাছে এক মুগ্ধ যন্ত্রণা। অনেকটা কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মত। যন্ত্রণা দিয়ে যন্ত্রণাদের উপড়ে ফেলা।

(৪)

তারপরেও তাকে দুরে ঠেলে দিতে হয়েছে। সেদিন বিকেল থেকেই গলাটা খুসখুস করছিল। রাত থেকে শুরু হল শুকনো কাশি। চলল টানা এক সপ্তাহ। তার বিষটুকু টেনে নিলেই গলার শুরুর অংশটায় শুরু হত অসহ্য জ্বলুনি। বাধ্য হয়ে আমি তার কাছে যাওয়া কমিয়ে দিলাম।

নিস্তার মিলল না। যেই মুহূর্তেই আমি তাকে আলিঙ্গন করতাম দু’ঠোটে তার বিষাক্ততার তীব্র যন্ত্রণা আমাকে আচ্ছন্ন করত।

বাধ্য হলাম তাকে ছেড়ে দিতে। তাকে ছেড়ে দিয়ে ধরলাম তারই আর এক বান্ধবী; ব্ল্যাক। তার মত এতটা স্যাডিস্ট আমার নতুন প্রিয়া ছিল না। কিন্তু, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, তার সাথে মিলনে যে সুখ আমি অনুভব করতাম, আমার নতুন প্রিয়া তার কিয়দংশও দিতে সমর্থ হত না। তবু, এক রকম বাধ্য হয়েই তার সাথে কালযাপন করতে হত।

মানুষ তার নিজের দুর্বলতাকে ঢাকতে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন যুক্তি তৈরি করে। আমিও করেছিলাম। আমার নতুন প্রিয়ার দেয়া অনুভূতির নাম আমি দিলাম, ‘নিকোটিনের শৈল্পিক সৌন্দর্য।’ অবশ্য নামকরণটা ভুল হয় নি। সে সত্যিই তাই ছিল। কিন্তু, প্রতি মুহূর্তে আমি মিস করতাম তার অনুভূতিগুলোকে। তার মাঝে বিশেষ কী ছিল আমার জানা নেই। তার রাসায়নিক উপাদানগুলো দেখা হয়নি। ‘৩-(১-মিথাইল পাইরলিডিন ২-আইল) পাইরিডিন’টা তো আছে সবখানেই। পার্থক্য কোথায়? খুঁজে দেখা হয়নি কখনও।

(৫)

আজকে আবার তাকে আলিঙ্গন করেছি। গলার শুরুর অংশটা খুসখুস করছে। করুক। আজকে আমায় একরাশ বিষাক্ত ধোয়া আচ্ছন্ন করেছে। করুক। আজকে আবার আমার প্রিয়া আমায় আলিঙ্গন করেছে। করুক।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৪ thoughts on “এক টুকরো বিষ

  1. বেঞ্চুন থাকিয়া ব্ল্যাক!!
    বেঞ্চুন থাকিয়া ব্ল্যাক!! ভয়াবহ পরিবর্তন… কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট:

    1. ওই দিন ছাদে বলেছিলাম না, একটা
      ওই দিন ছাদে বলেছিলাম না, একটা গল্পের আইডিয়া মাথায় এসেছে। নায়ক ছিঃ গ্রেট… এইটাই ওইটা…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 26 = 32