সিটিজেন জার্নালিজমের কল্যাণকর পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকারের করনীয়

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয় যাতে আপত্তিকর বিষয়গুলো দেখা না যায় তা নিশ্চিতে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করবে সরকার। রোববার তথ্য মন্ত্রনালয়ের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু দাবি করেন, এ প্রযুক্তি চালুর পর ফেইসবুকের আপত্তিকর বিষয় বাদ দেয়া সহজ হবে। ফলে এ ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করার প্রয়োজন হবে না।

রামুকাণ্ডে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি সম্প্রতি আদালতে দেয়া তাদের প্রতিবেদনে ফেইসবুক-টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটের উপর নিয়ন্ত্রণ চালানোর সুপারিশ করে। এর পরই এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানালেন তথ্যমন্ত্রী। এক প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী জানান, আগামী দুই মাসের মধ্যে আপত্তিকর বিষয়গুলো আটকানোর প্রযুক্তিগত কাজ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশে বন্ধ রাখা ইউটিউব খুলে দেয়া হবে। ইসলাম ও হযরত মোহাম্মদকে (সঃ) অবমাননা করে নির্মিত একটি চলচ্চিত্রের ভিডিও ফুটেজ সরিয়ে নিতে চিঠি দেয়ার পরও কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে ইউটিউবে প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় বিটিআরসি।

সরকার আসলেই যদি এমন কোন প্রযুক্তির ব্যবহার করে তবে তা হবে সত্যিই একটা স্বস্থির ব্যাপার বিশেষ করে অনলাইন আক্টিভিস্ট আর ফেসবুকের মূল ব্যবহারকারীদের জন্যে। আমার এই সাথে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখানো এই সরকারকে কিছু পরামর্শ দিব যা করলে আমাদের মুক্ত সংবাদ মাধ্যমও মূলধারার মত শক্তিশালী, গ্রহণযোগ্য, গঠনমূলক আর জনপ্রিয় হতে পারে।

ডিজিটাল বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর ডিজিটাল সন্ত্রাসের নমুনা দেখুনঃ
১) রামুতে উত্তম বড়ুয়া কর্তৃক পবিত্র কোরআনের উপর পা দিয়ে তোলা Edited ছবি Facebook-এ প্রকাশ ফলাফল রামু ট্র্যাজেডি।
২) মাদ্রাসা আক্রমণ করতে আসছে আওয়ামী সন্ত্রাসী যার কারণে মানিকগঞ্জ হল রণক্ষেত্র।
৩) ভেজাল পলিও টিকা খেয়ে অনেক শিশুর মৃত্যু ফলাফল টিকাদান কর্মসূচীতে সর্বব্যাপী বিশৃঙ্খলা আর জনদুর্ভোগ।
৪) যুদ্ধাপরাধী সাইদিকে চাঁদে দেখা গেছে ফলাফল বগুরাসহ জেলায় জেলায় নারকীয় তাণ্ডব।
৫) ফটিকছড়িতে আওয়ামীলীগের মিছিল থেকে মাদ্রাসায় হামলা করার গুজব ছড়িয়ে আওয়ামীলীগের কর্মীদের মধ্যযুগীয় বর্বরতায় খুন।
৬) এছাড়াও সরকার প্রধান, বিরোধীদলীয় নেত্রী বা অন্যান্য রাজনীতিবিদদের অবমাননা করে ব্যঙ্গচিত্র বা হুমকি দেয়া বা বিদ্বেষ ছড়ানো হয় মুক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার বা ব্লগে।

আমি এমন উদাহরন দিয়ে লিখা দীর্ঘায়িত করব না। আমরা যারা অনলাইনে আছি তারা সবাই এর কমবেশি খারাপ দিক দেখেছি জেনেছি অনেক সময় নিজেরাও ভুগান্তির স্বীকার হয়েছি। আমরা কিন্তু এইখানে অতি সচেতনভাবে বা অবচেতন মনেই হোক একটা ব্যাপার ভুলে বসে আছি তা হল মোবাইল বা মুঠোফোনের যথেচ্ছাচার বা অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। আমার প্রস্থাবের বা পরামর্শের আমূলেই আছে এই মুঠোফোন এবং তার ব্যবহারের নিয়ন্ত্রন। আমরা একটু লক্ষ্য করলেই দেখতে ও বুঝতে পারব উপরে বর্ণীত সকল অপরাধের জন্যেই মোবাইল বা মুঠোফোনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সমানভাবে দায়ী। সরকারকে এই ডিজিটাল সন্ত্রাস আর অপব্যবহার রোধে আরও সুদূরপ্রসারী হতে হবে সকল তথ্যপ্রযুক্তি সামগ্রীর নিয়ন্ত্রিত বা যথার্থ ব্যাবহারে। আমরা বছর খানেক বা দুয়েক আগে এমন একটি পদক্ষেপ নিতেও দেখেছিলাম সরকারকে আর তাহলো বিটিআরসি সকল টেলিফোন অপারেটরদের বলেছিল সকল সিম কার্ড রেজিস্ট্রেশান করার জন্যে, পরে এই উদ্যোগ কবে কীভাবে নিঃশেষ হয়ে পড়ল তা বুঝা গেল না। আজ সকল ধরনের অপকর্ম এমনকি হেফাজতের ষড়যন্ত্রেও মুঠোফোনের অপব্যাবহার প্রমাণিত। অথচ সরকার বা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুই ধরতে পারছে না, বুঝতেই পারছে না। কেন? কারণ যেইসব সিম ব্যাবহার করে এইসব করা হয়েছে ঐসবের একটারও রেজিস্ট্রেশান নেই। সরকার ট্রাক করলেও কাউকে সনাক্ত করতে পারবে না। কেননা অতি সল্পদামে সিম কিনে তারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের পর সিমটি নষ্ট করে ফেলে। তাই এখনই অতি জরুরী ভিত্তিতে সিম এর রেজিস্ট্রেশানবিহীন ব্যাবহার রোধ করতে হবে। মোবাইল অপারেটরদের এই ব্যাপারে বাধ্য করতে হবে। এই জন্যে সরকার সিম রেজিস্ট্রেশানের একটা নীতিমালা করে দিতে পারে যেখানে এইরকম কিছু বাধ্যবাধকতা থাকবেঃ
১) ক্রয়কৃত সিম নুন্যতম ৬ মাস ব্যাবহার করতে হবে, এই জন্যে সাথে টকটাইম ক্রয় বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
২) একজন ব্যাক্তি বা একটি ন্যাশনাল আইডি কার্ড দিয়ে দুইটি বা তিনটির বেশী সিম রেজিস্ট্রেশান করা যাবে না।
৩) ২ অথবা ৩ মাসের বেশী বন্ধ থাকা সিম আজীবনের জন্যে বন্ধ করে দেয়া হবে।
৪) সকল অপারেটরের কল রেটের সামাঞ্জতা রেখে সাধারণের একাধিক সিম ব্যাবহারকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।

সরকারের বিশেষজ্ঞ প্যানেল বা আইটি এক্সপার্টরা আরও বেশী পরামর্শ দিবে আশা করি। এখন আমি ব্যাখ্যা করব কীভাবে মোবাইল ফোন নাম্বার রেজিস্ট্রেশান সর্বব্যাপী ডিজিটাল সন্ত্রাস বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মুকাবিলা করবে। আমার আইডিয়াটা আসল আমার ক্ষুদ্র একটি বিশ্লেষণ থেকে। আমরা ফেসবুক ব্যাবহারকারীরা সবাই এখন একটা বিষয় জানি তা হল আমাদের সোশ্যাল সিকিউরিটি স্ট্রং করতে মোবাইল ফোন নাম্বার চাই ফেসবুক। একমাত্র এই একটা ব্যাপারকে বাংলদেশের ডোমেইন বা আইপি তে ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করতে হবে। তাহলে অতি সহজে সরকার জানবে কোন ফোন নাম্বার এইসব ফেইক ফেসবুক বা টুইটার আইডি ব্যাবহার করেছে। তারপর ফোন নাম্বারের রেজিস্ট্রেশান ডকুমেন্ট থেকে ন্যাশনাল আইডি নাম্বার সহ ব্যবহারকারীর সম্পূর্ণ ঠিকানা বের করা সম্ভব।সরকারের আইটি এক্সপার্টদেড় আমাদের রামু ঘটনা থেকে সকল সহিংসতায় ফেসবুকীয় গুজবের প্রভাব বিশ্লেষণ করে এইব্যাপারে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে করে বাংলাদেশ জোনে বা ডোমেইনে ফেসবুক ব্যাবহারে ফোন নাম্বার সিকিউরিটি ব্যাবহার বাধ্যতামূলক থাকবে। এই একটা বাধ্যবাধকতায় আমাদের সকল অশ্লীল পেজ, ফেইক আইডি, নারী অবমাননা বা ধর্ম অবমাননা মুলক পেজ, এমনকি সরকারের বা বিরোধীদলের রাজনীতিকদের সম্মানহানিমুলক অপপ্রচার ও বন্ধ করার সুযোগ হবে।

আমাদের এই ব্যাপারে দ্বিমত হওয়ার কোন সুযোগ নাই যে আজ ১০০% মোবাইল ইউজার ও ফেসবুক আর টুইটার ইউজার ফেইক না হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুব সহজেই এইসব সাইবার অপরাধের জন্যে সহজেই ব্যবস্থা নিতে পারে। যেহেতু ফেইক আইডি আমাদের সমাজে সর্বব্যাপী সহিংসতা করছে তাই একমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ার ছদ্ধ ব্যবহারকারীদের ব্যান করাই পারে বর্তমান পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে। আমরা যারা ব্লগ সংস্কৃতির সাথে পরিচিত তারা খুব সহজেই বর্তমানের অসুস্থ সোশ্যাল মিডিয়ার কার্যকলাপ দেখতে পারছি। একমাত্র অজ্ঞানতায় পারে মানুষকে এতটা বিবেকহীন করতে।

আশা করি সরকারের কর্তাব্যাক্তিরা এই ব্যাপারে অতিদ্রুততার সাথে সিদ্ধান্ত নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া আর সিটিজেন জার্নালিজমের কল্যাণকর পরিবেশ সৃষ্টি করবে। যা সাভারের রানা প্লাজা বা মহাসেনের মত দুর্যোগের সময় সমাজে ও রাষ্ট্রের ও মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসবে।

বিবেক ও মানুষত্বের জয় হোক…
সিটিজেন জার্নালিজমের কল্যাণকর পরিবেশ মুক্তি পাক…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “সিটিজেন জার্নালিজমের কল্যাণকর পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকারের করনীয়

  1. প্রস্তাবনাগুলো বিবেচনা করে
    প্রস্তাবনাগুলো বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে। যেহেতু অনলাইন জগত এখন আর নিছক টাইম পাসের জায়গায় নেই। জীবনের একটা বিরাট অংশ এটার সাথে জড়িত। তাই অনলাইনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এর সিকিউরিটি বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে সরকারের উচিৎ যারা সত্যিকার অর্থেই আইটি এক্সপার্ট তাদের নিয়োগ দেওয়া। ছাগল দিয়ে হাল চাষের চেষ্টা করলে আপলোড স্পিড কমানোর মতো ছাগলামি মার্কা সিদ্ধান্তই আসবে।

    1. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সকল
      বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সকল আবিষ্কারকেই দুষ্কৃতিকারীরা বা সস্বার্থান্বেষী মহল অপব্যবহার করেছে তাদের হীন ব্যাক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের নিমিত্তে। কোল্টের রিভলবার বা আইনস্টাইনের E=mc2 থেকে হালের আবিষ্কার ইন্টারনেট বা ফেসবুক সব কিছুরই অপব্যবহার হয়েছে দুনিয়া জুড়ে। একমাত্র মানবিক আইন আর তার যথার্থ প্রয়োগ পারে বিজ্ঞান ও প্রজুক্তির অমানবিক ব্যবহার রোধ করে শুধুমাত্র কল্যাণকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে। আশা করি সরকারের সংশ্লিষ্ট আর সম্পৃক্ত কর্তৃপক্ষ এইব্যাপারে জনকল্যাণে পদক্ষেপ নিবে…
      আমার লিখাটা পরে একটা ভাল রিভিউ করার জন্যে ধন্যবাদ ডঃ সাব। :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 4 =