“মানবতা রক্ষা করতে গিয়ে যেন মানবতা লংঘিত না হয়”

ছবি: সংগৃহীত

ত্রিপিটকে পড়েছিলাম বৌদ্ধদর্শনে অহিংসা পরম ধর্ম। কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপটে বৌদ্ধ অনুসারী মানব সভ্যতায় এর চুল পরিমাণ উপলব্ধি, অনুকরন, অনুসরণ কোনটাই দেখা যায়না। আর যা দেখিনাই সেটা বিশ্বাস ও মেনে চলাও আমার পক্ষে সম্ভবপর হয়ে উঠেনা। এবং এটা একান্তই আমার ব্যক্তি অভিমত ও আমার বিশ্বাস। তাই আমি কখনো বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী না, আমি গৌতম বুদ্ধের দর্শন এবং ত্যাগে বিশ্বাসী। তাই আমি মনেকরি ধর্ম মানেই সব এক, সেটা বৌদ্ধ-ইসলাম-হিন্দু-খ্রিস্টান-সনাতন-ইহুদি যাই বলেন। কেউ গৌতম বুদ্ধের দর্শনে বিশ্বাসী তাই বৌদ্ধধর্মের অনুসারী, কেউ হযরত মোহাম্মদ(স:) দর্শনে বিশ্বাসী তাই ইসলামের অনুসারী, আবার কেউ নাজারেথের যিশু দর্শনে বিশ্বাসী তাই খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী। এবং এদের প্রত্যেকেই জীবিত অবস্থায় কেউ ব্যক্তি মানবের উর্ধে ছিলনা। যেমনটা ছিলেন এরিস্টটল, জাবির ইবনে হাইয়্যান, আইজ্যাক নিউটন, অগাষ্ট কোৎ, লুকাপ্যাসিওলি, সক্রেটিস, আর্কিমিডিস, থ্যালাসেমিয়া, চার্লস ডারউইনসহ আরো অনেক জনক যারা মানব সভ্যতার জীবনযাপনকে সহজ থেকে আরো সহজ করে দিয়েছে। তারা আজ মানব সভ্যতার উর্ধে কারন তাদের একেকজনের একেক মতবাদ, দর্শন, ত্যাগ মানব সভ্যতার চিন্তা-চেতনা-বিশ্বাসে মগজে জায়গা করে নিয়েছে। আর মানবকুল তাদের সেই মতবাদকে বানিয়েছে কোরান-ত্রিপিটক-গীতা-বাইবেল। আর ব্যক্তি-রাজনীতি-রাষ্ট্রীয় স্বার্থসিদ্ধি লাভে এই মানব সভ্যতার মনুষ্যজাতিই তাদের দর্শনকে খুব সুক্ষ ও চৌকুষ ব্যবহারে উপস্থাপিত হচ্ছে ধর্মীয় বাণী হিসেবে।

ত্রিপিটকে যেমন বলা আছে “অহিংসা পরম ধর্ম” একিভাবে যারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী তারাও নিশ্চয় জানেন কোরান শরীফে উল্লেখ আছে এবং বিশ্বাস করেন “ইসলাম শান্তির ধর্ম”। এবং ঠিক একিভাবে গীতা, বাইবেল এও নিশ্চয় কোন অশান্তির ধর্মের কথা উল্লেখ নেই। কিন্তু তারপরও মানুষ ধর্মের, ধর্মীয় স্বজাতির উপর অন্যায়-নিপীড়ন-নির্যাতনের নামে দাংগা-হাংঙ্গামা সহিংসতা সৃষ্টি করছে। দালাই লামা ঠিকি বলেছেন “পৃথিবীতে যদি গৌতম বুদ্ধ পুনরায় আবির্ভাব হতেন তাহলে রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতেন”, আর হযরত মোহাম্মদ (স:) যদি এখনো থাকতেন তাহলে হয়তো মাহফিলের আয়োজন করে কতিপয় ইমামদের মত বলতেন না “উপজাতির গালে জুতা মারো তালে তালে”। মায়ানমারে চলমান রোহিঙ্গা ট্রাজেডি একটি রাজনৈতিক ও জাতিগত সংঘাত। আর সেই পররাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকট ও সংঘাতকে যদি নিজ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে ভাবা হয় এবং সে দেশে আমার জাতভাইকে মারা হচ্ছে তাই আমি এই দেশে সেই ধর্মাবলম্বীদের মারবো এই মতবাদে কলুষিত থাকি তাহলে সেই মায়ানমার রাষ্ট্রের মত এই রাষ্ট্রেও সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও আরেক মায়ানমার রাষ্ট্রের সৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই হবেনা। মায়ানমারে রোহিঙ্গারা যেমন সেনানির্যাতনের শিকার ঠিক একিভাবে এই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৫৪১ জন আদিবাসী প্রতিনিয়ত দমন-পীড়ন নির্যাতনের শিকার। তাই বলে কি অন্য রাষ্ট্রীয় দেশগুলোতে মুসলমান নিধন করা হচ্ছে ? তার চাইতে বরং বৌদ্ধধর্মাবলম্বী প্রধান দেশ জাপানের জাইকা তাদের সর্বশেষ তথ্যঅনুযায়ী গত ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের উন্নয়নখাতে অনুদানসহ দিয়েছে ৪৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইয়েন(৪৭৯ মিলিয়ন ডলার)। সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ তথ্যানুযায়ী যেখানে বিভিন্ন দাতাসংস্থা দেশ হতে প্রতিবছর প্রায় ২৩০ কোটি ডলারের অর্থ সহায়তা পেয়ে থাকে বাংলাদেশ। তারপরও কি আপনারা বলবেন মায়ানমারে ইসলাম অনুসারী রোহিঙ্গাদের মারছে তাই বাংলাদেশেও বৌদ্ধদের কাতিল করতে হবে। ধর্ম থাকে মনের বিশ্বাসে, শরীরের চামড়ার উপরে না। তাই ধর্মীয়নুভূতি নিয়ে সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা-উস্কানি পরিহার করা উচিত। আর মায়ানমারে জাতিগত নিপীড়ন বন্ধে এবং মানবতার লংঘন প্রতিরোধে সবার সোচ্চার অবস্থান ও প্রতিবাদ কর্মসূচী গ্রহণ করা উচিত। পররাষ্ট্রের জন্য মানবতা রক্ষা করতে গিয়ে যেন নিজ দেশের মানবতা লংঘিত না হয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

31 − 30 =