কথা ছিল পরমত সহিষ্ণুতা শিখবো

ধর্ষকদের শিশ্ন কেটে দেবার দাবীতে অনেককেই বলতে দেখি। মনে রাখা দরকার, কারও শিশ্ন কেটে দেয়াটাও অঙ্গহানি, এটা বর্বরতা, অসভ্যতা। কারও হাত কেটে ফেলা যেমন মানবাধিকারের লংঘন, তেমনি কারও শিশ্ন কেটে দেয়াটাও মানবাধিকারের লংঘন। হ্যাঁ, ধর্ষককে অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে, সেটা তাঁর আমরণ বন্দি থাকা হতে পারে। মানবধিকার বলে, তাকে মেরে ফেলা যাবে না, তার অঙ্গহানি করা যাবে না।


কথা ছিল পরমত সহিষ্ণুতা শিখবো আমরা,
শেখব অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে কথা বলা।
কথা ছিল শুনতে যত কটুই শোনাক, অন্যের কথা শুনে যাব।

একজনের কথা যতই বাজে কিংবা অমানবিক লাগুক না কেন, বাক্তির আচরন অমানবিক হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত, তাঁর কথা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত যৌক্তিকভাবে কথার মাধ্যমেই কথার উত্তর দেয়া উচিৎ।

আমরা মুখে মানবতার কথা বলি, মানবাধিকারের কথা বলি, বাক স্বাধীনতার জন্য মুখে খৈ ফুটিয়ে ফেলি। কিন্তু কেউ যখন তাঁর মত প্রকাশ করে যেটা নিজের মতের বিরুদ্ধে যায়, তখন কথার উত্তর কথায় না দিয়ে, ব্যক্তিকে গালাগালি শুরু করি, ভার্চুয়ালি তাঁর গোষ্ঠী উদ্ধার করে ফেলি। গালাগালির তুবড়ি এমন পর্যায়ে পৌছে যে যদি সাদাকালো অক্ষরগুলো যে ভাব প্রকাশ করে সেটা সত্যি সত্যি ঘটতো তাহলে, দেশ ধর্ষণের ফলে জন্ম নেয়া শিশুতে ভরে যেত।

যারা অন্যের কথার জবাব কথার মাধ্যমে না দিয়ে, গালাগালির মাধ্যমে দেয়, তাঁদেরকে আমরা ভাল লোক হিসেবে গণ্য করি না। তাঁদেরকে প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবেই জানি, ফেলে রাখি ফ্রেন্ড লিস্টের বাইরে অথবা ব্লক লিস্টে। কিন্তু যারা মুখে মানবতার কথা বলছি, মানবাধিকারের তুবড়ির জোড়ে কাঁপিয়ে দিচ্ছি বাংলা অন্তর্জাল, তাঁরা কি করছি? সরি, তাঁরা তো খুবই ভদ্রলোক। তাঁরা বড়জোর বিরুদ্ধ মতের লোকেদেরকে “এই বাদী”, “সেই বাদী” নানান উপাধিতে ভূষিত করছি, নানান নামে ট্যাগ দিচ্ছি। কেউ কেউ বড়জোর কাউকে অপমানজনক আক্রমণের ইচ্ছা প্রকাশ করছি, সাথে অন্যদেরকেও আক্রমণের জন্য আমন্ত্রন জানাচ্ছি। বাহ! কি সুন্দর আমাদের প্রগতিশীল সমাজ! কি সুন্দর আমাদের বাক-স্বাধিনতার চর্চা!

তো একজন আপনার মতের বিরুদ্ধে বলছে, আপনার ফাঁসির দাবীতে অনলাইনসহ রাজপথ গরম করে তুলছে। মনে রাখা দরকার, এটাও ঐ ব্যক্তির বাক-স্বাধীনতা। আর কেন আপনার ফাঁসি দাবী করা অযৌক্তিক এবং যারা এ ধরণের দাবী করে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা কেন দরকার, তা তুলে ধরা আপনার দায়িত্ব। তাঁকে নিজে নিজে বন্ধি করে পুলিশের কাজে নিয়ে আসা আপনার দায়িত্ব নয়। আপনি বড়জোর পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে পারেন এ ব্যপারে।

তো একজন আপনাকে মারতে এলো, তখন একজন মানবতাবাদী হিসেবে আপনি কি করবেন? হ্যাঁ, তখন মানবাধিকার বলে, আপনার আত্মরক্ষার জন্য আক্রমণের অধিকার আছে। আর যদি খুনই করে বসে? হ্যাঁ, তখন মানবাধিকারের কারণে খুনিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া সম্ভব নয়। কারণ জন্ম মাত্রই পৃথিবীতে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার আছে, সে আপনার খুনি হলেও।

কারণ, মানবাধিকারের প্রশ্নে মানুষের প্রথম অধিকারটিই হলো তাঁর বেঁচে থাকার অধিকার। মানুষ জন্ম মাত্র যে অধকারটি অর্জন করে সেটা হলো তাঁর বেচে থাকা। মানুষ বেঁচে না থাকলে তাঁর মানবাধিকারই বা কি, আর অমানবাধিকারই বা কি! এমনকি চরম মানবাধিকারের প্রশ্নে একটি মানুষ খুন-হত্যা ধর্ষণ করার পরও তাঁর বেঁচে থাকার অধিকার আছে। পৃথিবীর সভ্য দেশগুলোতে এখন মৃত্যুদন্ড বিরুধী আন্দোলন চলছে এর প্রেক্ষাপটেই।

যদি কেউ খুনি কিংবা ধর্ষকদের মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাঁদের উপর দেয়া শাস্তির অমানবিক দিক তুলে ধরে তাহলে, খুনি-ধর্ষকদের পক্ষে বলাটাও বাক-স্বাধীনতা। মানবিক বিশ্বে মানুষকে অত্যাচার করে, তাঁর অঙ্গহানি করে শাস্তি দেবার কোন বিধান নেই। আমরা এ কারণেই মধ্যযুগীয় আইন কিংবা প্রথাগুলোকে বর্বর বলছি। ইসলামে হাত কাটার বিধানকে আমরা অমানবিক বলছি এ কারণেই।

ধর্ষকদের শিশ্ন কেটে দেবার দাবীতে অনেককেই বলতে দেখি। মনে রাখা দরকার, কারও শিশ্ন কেটে দেয়াটাও অঙ্গহানি, এটা বর্বরতা, অসভ্যতা। কারও হাত কেটে ফেলা যেমন মানবাধিকারের লংঘন, তেমনি কারও শিশ্ন কেটে দেয়াটাও মানবাধিকারের লংঘন। হ্যাঁ, ধর্ষককে অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে, সেটা তাঁর আমরণ বন্দি থাকা হতে পারে। মানবধিকার বলে, তাকে মেরে ফেলা যাবে না, তার অঙ্গহানি করা যাবে না।

রে রে করে তেড়ে আসবেন না। আমাকে পুরুষতন্ত্রের পুরুষ বলে দু ঘা লাগিয়ে দিতে আসবেন না। আমি আপনার চেয়ে এক লাইন কম নারীবাদী। আপনি নারী কিংবা পুরুষ হয়ে নারীবাদী, আর আমি স্রেফ মানুষ হয়ে নারীবাদি। জ্বি-না, আমি ভাওতাবাজি মার্কা মানববাদীও না। আমি চাই, হাজার বছর ধরে পুরুষের নির্যাতনের শিকার নারীরা প্রয়োজেন পুরষদেরকে এবার বন্দি করুক গৃহে। বর্তমানে নারীরা যতটুকু অধিকার পায়, ততটুকু অধিকার পুরুষদেরকে দেবার মধ্য দিয়ে শোধবোধ করুক। প্রয়োজনে সমতা নয়, নারীরা করুক কর্তৃত্ব।

আর হ্যাঁ, নিজেকে পুরুষই মনে করি না এবং এটাও জানিয়ে রাখি শরীরে পুরুষ হবার চিহ্ন শিশ্নখানাও আমি ত্যাগ করতে চাই যদি কোন জটিলতা না হয়। এটা রাখার আর কোন প্রয়োজন বোধ করছি না এখন। জীব মাত্রই প্রজননের মাধ্যমে প্রজন্মের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকতে চায়, সেটা আমার হয়ে গেছে। দুই দুইটা শিশুর জনক আমি। এই পুরুষচিহ্ন বহনকারী অংগটির সত্যিই আমার আর কোন প্রয়োজন নাই। আরেকটা গোপন কথা জানিয়ে রাখি, যদি কোনদিন সম্ভব হয় আর সামর্থে কোলায়, লিঙ্গান্তর করে সত্যি সত্যি নারী’তে রূপান্তরিত হবার ইচ্ছে আছে। আর সেটা সত্যিকারে নারী হয়ে সমাজে নারীর সত্যিকারের অবস্থানটা বুঝার জন্যই।

এখন আমার এই পোস্টের কারণে কেউ যদি জুতা নিয়ে তেড়ে আসতে চায় তারপরও আমি তাঁকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারি না কারণ, সভ্যতার, ভব্যতার, শিক্ষার শিক্ষা এটাই। পরমত সহিষ্ণুতাকে ধারণ করতে না পারলে মানুষের সকল শিক্ষাই বৃথা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “কথা ছিল পরমত সহিষ্ণুতা শিখবো

  1. সবই ঠিক আছে দাদা। কিন্তু
    সবই ঠিক আছে দাদা। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের বিধান না রাখলে দেশটা খুনী, ধর্ষক, সন্ত্রাসী, জঙ্গিতে ভরে যাবে। কারণ, আমাদের দেশটা ইউরোপ নয়। ওখানে, মানুষের বিবেক কাজ করে। আর এখানে, মানুষের বিবেক কম। তাই, শাস্তির বিধান রাখলে তবুও এরা কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত থাকবে।

    শুভকামনা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

98 − = 93