ভ্যাকসিন


আমরা ফেসবুকে প্রায় প্রতিদিনই নানান ধরণের স্টেটাস দিয়ে থাকি। যার মাধ্যমে কেউ তার সুখানুভূতি আবার কেউ বেদনাভরা কিছু বিষয় সকলের সাথে শেয়ার করে থাকি। তবে নিজের বাচার অকুতি জানিয়ে কোন স্টেটাস হয়তো লক্ষ্য করা যায় না। ঠিক এমনিই এক ব্যাতিক্রমী স্টেটাস চোখের সামনে এসেছিলো সেদিন।

সেদিন ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন যে, “টাঙ্গাইল এ সাপের ভ্যাকসিন কোথায় পাওয়া যায়?’’ কিন্তু তার ওই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারেনি। মৃত্যুর আগে তার নিজের ফেইসবুক আইডিতে দেয়া ওই স্ট্যাটাসে একের পর এক কমেন্ট, লাইক শেয়ার হয়েছে কিন্তু কেউ কোন সমাধান দিতে পারেননি। দেওয়ার ছিল কেবল সমবেদনাই।

বলছিলাম, টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার কাঞ্চনপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামের নুরু মিয়ার মেয়ে আয়েশা আক্তার শিমুর(২৭) কথা । স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকাও ছিলেন তিনি। ৩৬তম বিসিএস ভাইভা দিয়েছেন, এমনকি ৩৭তম লিখিত পরীক্ষা দিয়েছেন তিনি। ওই পরীক্ষায় ফলাফলের অপেক্ষায় ছিলেন। হয়তো আর কদিন বাদেই তিনি বিসিএস ক্যাডার হতেন, যোগ দিতেন দেশ সেবার কাজে। বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল সেটাই। নিজেও সেই স্বপ্নের জাল বুনেছিলেন। পরিবারের আশার আলো ওই মেধাবী ছাত্রীটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। মেধাবী ছাত্রী শিমুর জীবনের গল্পটি এখানেই শেষ। সামনে এগুনোর আগেই তার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

বুধবার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে শিমু তার বাড়িতে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলেন। এসময় তার চিৎকারে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসলে শিমু জানান, তাকে সাপে কামড় দিয়েছে।পরে স্বজনরা এসে তাকে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে মির্জাপুর কুমুদিনী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান তাদের কাছে কোনো সাপে কাটার ভ্যাকসিন নেই। পরে রাত একটার দিকে ঢাকার বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে সাপের বিষে নীলাভ শিমুকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভ্যাকসিন তখন আর কোনো কাজে আসেনি। বিষাক্ত এই দুনিয়াকে বিদায় জানিয়ে ততক্ষণে মৃত্যুপথে পা বাড়িয়েছেন তিনি।

এখানেই শেষ নয়,পরদিন বৃহস্পতিবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল ৭টায় বাড়িতে আনা হয়। অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারছিলেন না তার পরিবার। সাপে কাটা মানুষ নাকি কয়েকদিন বেঁচে থাকে এমন খবরে ওইদিনই বৃহস্পতিবার (২১ সেপ্টেম্বর) আবার শিমুকে দুইটার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেও কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষনা করে।

শিমুর মৃত্যুর পরে মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে সাপে কাটা ভ্যাকসিন আছে কি না সে ব্যাপারে কর্তব্যরত চিকিৎসকের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। এ ব্যাপারে কোন বক্তব্য দিতেও রাজি হননি তিনি। আর, টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. পুতুল রায় বলেন, ‘সাপের কাটার ভ্যাকসিন সিভিল সার্জনের তত্ত্বাবধানে থাকে। চাহিদা দেওয়া মাত্রই ভ্যাকসিন পাওয়া যায়। প্রথমে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে আনা হলে হয়তো সাপে কাটা রোগিকে বাঁচানো সম্ভব হতো।’-এখানে একজন জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের নিকট হতে এ ধরণের বক্তব্য কিভাবে আশা করা যায়। যেহেতু সরকার উপজেলা হাসপাতাল গুলোতে সব ধরণের চিকিৎসা সুবিধা দিচ্ছে তাহলে তো তার সেখানেই আগে যাওয়ার কথা। আর তার বাড়ী থেকেও কুমুদিনী হাসপাতালের দুরত্ব খুব একটা বেশি নয়। তবে ভ্যাকসিন না থাকলে একজন রোগীকে ৪০ কিলোমিটার দূর থেকে আসা ভ্যাকসিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে নাকি বাচার বদলে মৃত্যুর প্রহর গুণতে হবে । চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে মাঝে মধ্যেই চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন ছাঁপা ও প্রকাশিত হয়। যা রীতিমত শিউরে উঠার মতো। একের পর এক ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু, অঙ্গহানী, চিকিৎসা খরচের নামে সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়া, লাশ আটকে রেখে টাকা আদায়সহ নানা অভিযোগ রয়েছে দেশের তথাকথিত অভিজাত হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধেও। কিন্তু সব অভিযোগই ধামাচাপা পড়ে যায়।

অস্বীকার করার উপায় নেই, সাধারণ মানুষ এভাবেই হয়রানি ও অবিচারের শিকার হচ্ছে। কিন্তু প্রতিকার মিলছে না। অবহেলা আর অনিয়মের ব্যাধি ক্যানসারের মতো সমাজে বাসা বেঁধেছে।

শিমুর মৃত্যুর পর ফেইসবুকে আরেকদফা ঝড় উঠে। তবে এবার কিন্তু শিমু আর কোন রিপ্লাই দিতে পারেননি। কারণটা সবার জানা। না ফেরার দেশ থেকে কখনো সাড়া দেয়া যায় না ! তবে, সাড়া দিতে হবে আমাদেরকে।

এই অত্যাধুনিক যুগে এসেও তিনি সঠিক চিকিৎসা ও উপযুক্ত সময়ে ভ্যাকসিনের অভাবে বিষের যন্ত্রণায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। হয়তো বিষয়টি সকলের নিকট একেবারেই মামুলি হতে পারে। তবে এভাবেই অবহেলা কিংবা অনিয়মের কারণে প্রতিদিনই প্রাণ দিতে হচ্ছে সমাজের নিম্নবিত্ত এসব মানুষকে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যথাযথ তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী কর্মপদ্ধতির অভাব দারুণভাবেই অনুভূত হচ্ছে। প্রয়োজন শুধু দুর্নীতি আর অনিয়মের জগদ্দল পাথরকে ধ্বংস করে দেশপ্রেমের আলোকে জাতিকে উজ্জীবিত করে সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ়প্রত্যয়ে আপসহীন পথচলা। তাই, জ্ঞানবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি ও অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সঠিক ও সুন্দর পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সবাইকেই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 43 = 48