একজন শ্যামলকান্তি ভক্ত


সে সময় বাংলাদেশে এক অভিনব আন্দোলন শুরু হয়েছিলো। পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যেত অনেকে তাদের কান ধরে তোলা ছবি ফেসবুকে দিয়ে নারায়ণগঞ্জ পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের কাছে ক্ষমা চাইছেন। তবে কেন ? এর উত্তরও কম-বেশি দেশের সকল পযার্য়ের লোকই জানেন।

সেদিন শ্যামল কান্তি ভক্তকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে স্থানীয় সংসদ সেলিম ওসমানের উপস্থিতিতে কান ধরে ওঠ-বস করিয়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছিল। সেই ভিডিও চিত্রে দেখা গিয়েছে সংসদ সেলিম ওসমান নিজেও শ্যামল কান্তিকে শাসাচ্ছেন বাধ্য করছেন কান ধরে ওঠ-বস করতে ।

দেশে বিচার ব্যবস্থা আছে, আইন-আদালত আছে। সেই আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার একজন সংসদ সদস্য ও তার অনুসারীদের কে দিয়েছে ? বাংলাদেশ কি এখনও অতীতের সেই অরাজক মুল্লুক?

কি অপরাধ ছিলো তার ? প্রধান অভিযোগটি ছিলো ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন শ্যামল কান্তি। তবে, শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত বলেছিলেন যে, সেদিন ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন এমন অপবাদ দিয়ে তার বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজনকে খেপিয়ে তোলা হয়েছিল। যার পেছনে ছিলো প্রভাবশালীদের ষড়যন্ত্র।

ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, শ্যামল কান্তি ভক্তের বিরুদ্ধে প্রচারিত অভিযোগগুলো সঠিক নয়, উদ্দেশ্যমূলক ভাবে বানানো, অভিযোগগুলো সঠিক হলে তার উপযুক্ত তদন্ত ও বিচার হতো। তার সম্মান ও মর্যাদায় সরাসরি আঘাত দেওয়া হতো না। এই আঘাত যে জাতির শিক্ষাব্যবস্থার মর্মমূলে ও মর্যাদায় চরম আঘাত হেনেছে একথা বোঝার মতো সামান্য সুস্থ বুদ্ধিও কি জাতীয় সংসদের একজন সদস্য এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের ছিল না ?

প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো যদি সত্য না হয়, তাহলে বুঝতে হবে এ সম্পর্কে তার অভিযোগই হয়তো সঠিক। তিনি বলেছেন, একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগগুলো পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে। কি ছিলো এই বিশেষ উদ্দেশ্য ?

সেদিনের ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের ঝড় উঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এজন মন্তব্য করেছিলেন, “এভাবে শুধু স্যারকে কান ধরায়নি আমাদের পুরো জাতিকে কান ধরিয়েছে।”
আরেকজন লিখেছিলেন, “আমরাও কানে ধরেছি, চলবে এই প্রতিবাদ।”সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল ছাত্র-ছাত্রী ক্যাম্পাসে লাইন দিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়েও এ ঘটনার প্রতিবাদ জানান।

ঘটনার পর দেশ বিদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ও টেলিভিশন সহ সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় ওঠেছিলো যে, ধর্ম অবমাননা নয় বরং স্কুলের পরিচালনা কমিটি নিয়ে বিরোধের জেরেই মূলত এই নাটক। আর শ্যামল কান্তির বিরুদ্ধে যে ছাত্রটিকে মারধরের কথা বলা হয়েছে তার ভাষ্যও হয়তো প্রায় সকলের জানা।

দেশের সাধারণ জনগণ ও শিক্ষক সমাজের আন্দোলনের মাঝে, খোদ দেশের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও বলেছিলেন, এ ঘটনার তদন্ত হবে।
শিক্ষামন্ত্রী তার কথা রেখেছেন, তদন্ত হচ্ছে জেলেও যেতে হয়েছে ! তবে, সেলিম ওসমান কিংবা ঐ দিনের ঘটনার সাথে জড়িত কাউকে এ শাস্তি ভোগ করতে হয়নি। ভুগতে হয়েছে কলুর বলদ স্বয়ং শ্যামল কান্তি ভক্তকে !

ঘটনার কিছুদিন পরেই সরকারের উচ্চপদস্থদের আশ্বাসে থেমে যায় আন্দোলন। আর তার সাথে পাল্টা মোড় নেয় শ্যামল কান্তির ভাগ্য। ক্ষমতার যাতাকল আর অন্যায়ের মুখে টিকতে পারেনি অভাগা দেশের সেই দুর্ভাগা শিক্ষক শ্যামল কান্তি ।

নাটকীয় সেই পরিবর্তন দেশবাসী তখনই বুজতে যখন একই বছরের ১৭ জুলাই ওই স্কুলের শিক্ষিকা মোর্শেদা বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ ছিলো বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত তাকে উক্ত বিদ্যালয়ে এমপিওভুক্ত করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা ঘুষ নেয়। আদালতের নির্দেশে বন্দর থানা পুলিশ ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলে শুনানি শেষে শ্যামল কান্তি ভক্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। পরে আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে আদালত নামঞ্জর করে তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। কারাভোগের পর ৩১ মে ২০১৭ শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

বর্তমানে কেমন আছেন শ্যামল কান্তি ? কি করছেন তিনি সেটা কি আমাদের জানা প্রয়োজন। নাকি কোন অজানা শঙ্কা কিংবা অবহেলা আমাদের এ থেকে দূরে রেখেছে। হয়তো বা আমাদের অপমানবোধ এখন কমে গিয়েছে। আবার একদিন তা জেগে উঠবে, যেদিন বাংলার কোন শিক্ষাগুরু হবেন লাঞ্চিত অপমানিত। তবে বাঙ্গালী কি তার অপেক্ষাই করছে ?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “একজন শ্যামলকান্তি ভক্ত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 6 = 3