উৎসব নিয়ে নাস্তিকের বালখিল্যতা

আমি নিধার্মিক, ধর্ম বিরুধী নাস্তিক মানুষ। কিন্তু দেশে থাকা অবস্থায় দূর্গা পূজাই হোক আর কালী পূজাই হোক, অথবা হোক লক্ষ্মী পূজা কিংবা মহাদেবের পূজা, সবগুলো পূজাতেই ঘুরে বেড়িয়েছি অবাধে। দেখেছি, মানুষদের উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা। দুহাত ভরে নিয়েছি প্রসাদ, চরাণামৃত। কেউ আমাকে তাড়িয়ে দেয়নি নাস্তিক বলে।

পূজায় ঘুরতাম উপলব্ধি করতাম আমাদের আদিম জঙ্গুলে সভ্যতাকে, আদিম মানুষেরা যেমন করে টোটেমগুলোকে ঘিরে রাতভর নেচে গেয়ে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করত, দেখতাম এই সভ্যতার মানুষগুলোও একইভাবে নেচে গেয়ে অঞ্জলি দিয়ে দেবী কিংবা দেবতাকে সন্তুষ্ট করার প্রানান্তকর চেষ্টা চালাচ্ছে। পার্থক্য ঘটেছে শুধু আচারে অনুষ্ঠানে। ছেলেদের মধ্যে অসাম্প্রদায়িকতার বিকাশের লক্ষ্যে তাদেরকেও নিয়ে যেতাম আর বলতাম কিভাবে এই পূজার সংস্কৃতি জঙ্গল থেকে মানুষেরা বয়ে নিয়ে এসেছে এই আধুনিক সভ্যতায়।

মুসলমান ঘরে জন্ম নেয়ার সুবাধে ইসলামিক উৎসবগুলোতে অংশগ্রহন ছিল অনেকটাই বাধ্যতামূলক। কিন্তু কোন উচ্ছ্বাসের ছোয়া পেতাম না বলে যথা সম্ভব এড়িয়ে থাকতাম, সেটা যতটা না ধর্মে অবিশ্বাসের কারণে, তারচেয়ে বেশি আনন্দহীনতার জন্য। ইসলামী উৎসবগুলো আমার কাছে রীতিমত আতংকের মনে হতো কারণ, এক ঈদের খোতবায় শুনতাম রোযা কবুল না হলে ঝুলে তা থাকবে মাঝ আসমানে, আরেক ঈদে শুনতাম কোরবানি কবুল না হবার একশ একটা কারণ। এই কবুলিয়াতের আতংকে কিভাবে মানুষ আনন্দ করবে সেটাই বুঝে আসত না। ফলে, নিধার্মিকের ঈদ-উৎসবগুলো হয়ে উঠত নিতান্তই আনন্দহীন ব্যপার। তবে, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঘুরাঘুরি কিন্তু বাদ যেতো না।

এত কথা বলার কারণ হলো, যখন আমি কোথাও যাচ্ছি নিজের মনের খোরাক মেটানোর জন্য, উৎসবে যোগ দিচ্ছি আনন্দ পাবার জন্য, তখন সেই উৎসবের আচারদি নিয়ে প্রশ্ন তোলা আমার জন্য কতটুকু যৌক্তিক সেটা অনুধাবনের চেষ্টায়। আমি ভাল করেই জানি, পূজা-পার্বনের যত আনুষ্ঠানিকতা হয়, তার সবটাই বোগাস। এটা জেনেও যখন আমি আনন্দে যোগ দিতে যাচ্ছি, সেজেগুজে লোকেদের সাথে কুশল বিনিময় করছি, আড্ডা দিচ্ছি, এসব নিয়ে ফেসবুকে নতুন ছবির এলবাম খুলছি, তখন পূজা মন্ডপে গিয়ে কি পুরুতের উপরে পুরুতগিরি করতে পারি? গিয়ে কি বলতে পারি যে এই মূর্তি-টুর্তি যা গড়ে রেখেছো বাপু তার সবটাই বোগাস? অন্তত সেই মুহুর্তে? অথবা সকলের সাথে কুশল বিনিময় হবে অথবা কোলাকোলি করার মধ্য দিয়ে লোকেদের সাথে হৃদ্যতা গড়ার লোভে যখন ঈদগাহে যাচ্ছি আর কোলাকোলির সময় লোকেদের কানে কানে বলছি কিংবা ফিরে এসে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছি, মুসলমানরা যেখানে সেজদা দিচ্ছে সেখানে আল্লাহ্‌ নেই, সামান্য কিছু মাটি ছাড়া। তখন এই ধরণের কথাবার্তা কতটুকু যৌক্তিক হবে আমার জন্য? আমি তো একথা জেনেই সেখানে যাচ্ছি যে তারা যা কিছুই করছে তার সবটুকুই বোগাস।

না কি কারও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গিয়ে আচ্ছামত আনন্দ উপভোগ করে নিজেকে নাস্তিক প্রমাণের জন্য আমাকে একটা মূর্তির হাত ভেঙে দিয়ে আসতে হবে? কিংবা মূর্তি যে খেতে পারে না সেটা ঢোল পিটিয়ে জানান দিতে হবে? ভুলে কেন যাচ্ছি, মূর্তিকে ভোগ দেয়া, অঞ্জলি দেয়া ঐ পূজারই আচারের অংশ। না কি বিয়ে বাড়িতে পেট পুরে খেয়ে, খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে আমাকে প্রমান করতেই হবে যে আমি চিরাচরিত নিন্দুক বাঙালি। এ ধরণের আচরণ কি আমার বাল্যখিল্যতাকেই স্পষ্ট করে তোলে না!!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “উৎসব নিয়ে নাস্তিকের বালখিল্যতা

  1. উৎসবের আনন্দ সবার জন্য সমান
    উৎসবের আনন্দ সবার জন্য সমান হলে সমস্যা ছিলনা। কিন্তু সর্বত্র সাম্প্রদায়িকতার ছোঁয়া উৎসবকে আর উৎসব রাখে না। সেখানেই সমস্যা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

39 − = 34