“মুসলমান কে?” – সমাজবিজ্ঞানের আলোয়

বিজ্ঞান আর কল্পনার, কিংবা বিজ্ঞান আর গল্প উপন্যাসের পার্থক্য কি?
গল্প উপন্যাসের লেখক আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে, জলকন্যাকে আগুনমুখো ড্রাগনের পিঠে বসিয়ে, পাহাড়ের চুড়ায় নিয়ে যেতে পারেন, সেই পাহাড়ে সোনার মাটির ইট দিয়ে তৈরি কাঠের বাড়ি আছে, খাবার কেবল ঘোড়ার ডিম সিদ্ধ, সাথে চাঁদে চাষ করা পিং পং বলের কাবাব। গল্প উপন্যাস লেখকদের কোন দায় নেই তাঁর লেখা চরিত্র ও ঘটনার “সত্যতার” প্রমাণ দেয়ার। চাঁদে পিং পং বলের চাষ হতেই পারে।

কিন্তু, হ্যাঁ, একজন বিজ্ঞানীর এরকম কোন গবেষণাপত্র লেখার উপায় নেই। এরকম কিছু লিখলে, তাঁকে সরাসরি মানসিক হাসপাতেলে নিয়ে যাওয়া হবে। একজন বিজ্ঞানীকে প্রথমে গবেষণা করতে হয় বাস্তব জিনিষ নিয়ে, ল্যাবরেটরিতে। তারপর তাঁকে তাঁর আবিষ্কার লিখতে হয় জার্নালে। অন্য বিজ্ঞানীরা সেই আবিষ্কার পরীক্ষা করে একই ফল পেলে তা গন্য হয় “সত্য” হিসেবে। যেমন “আমি কথা বললেই বাতি জ্বলে ওঠে” বললেই কোন বিজ্ঞানী তা মেনে নেবেনা। আপনাকে প্রমাণ দিতে হবে যে, হ্যাঁ আপনি এমন একটি প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন, আপনার কণ্ঠস্বর দিয়ে তা চালানো যায়, ঘরের বাতি জ্বালাতে। প্রমাণ ছাড়া কেউ আপনাকে পাত্তা দেবেনা।

হ্যাঁ, তাহলে বিজ্ঞানের মুল বিষয় “সর্বজন গ্রাহ্য প্রমাণ”। এই “প্রমাণ” দিতে হলে আপনার এমন পদ্ধতি ও যন্ত্রপাতি লাগবে যা সবাই আপনার মতই ব্যাবহার করতে পারবে। যেমন, জ্বর মাপার পদ্ধতি থার্মোমিটার। কত ডিগ্রী জ্বর সেটা নিয়ে বিতর্ক নেই কারণ থার্মোমিটারে সবাই সেটা দেখতে পারে।

প্রকৃতিবিজ্ঞানে, জড় বস্তু নিয়ে গবেষণা ও সত্য আবিষ্কারে তুলনামূলক ঝামেলা কম, সমাজ বিজ্ঞানের তুলনায়। কারণ সমাজ বিজ্ঞানে কাজ করা হয় জীবন্ত সচেতন মানুষ নিয়ে। কিন্তু পন্থা সেই একই। সর্বজনগ্রাহ্য “প্রমাণ” দিতে হবে। সে কারণে যা বলা হল সেটা (এক) তথ্য ভিত্তিক হতে হবে, (দুই) অবজেক্টিভলি ভেরিফাইএবল ইন্ডিকেটর, অর্থাৎ বাস্তবে যাচাই করে দেখার কিছু নির্দেশক লাগবে।

মুসলমান চেনার নির্দেশক কি? বাস্তবে, কি উপায় ছিল পাকিস্তানী সৈন্যদের, ১৯৭১ সালে, মুসলমান বা হিন্দু বোঝার? প্রথমে নাম, আরবি নাম কিনা। কিন্তু কেউ তো বানিয়ে আরবি নাম চালিয়ে দিতে পারে। আর একটি ছিল, কলেমা মুখস্ত বলতে পারে কিনা। এই ক্ষেত্রে কলেমা হিন্দুরাও মুখস্ত করে নিতে পারে। তৃতীয়, মাথায় গোল টুপী আছে কিনা। এটাও বাজার থেকে কিনে নেয়া কোন ব্যাপার না। চতুর্থ এবং মোক্ষম একটি ইন্ডিকেটর, একেবারে বস্তুগত, খতনা করা আছে কিনা।

বরিশালে একটি ঘটনা শুনেছি, ১৯৭১ সালের। এক হিন্দু ক্ষৌরকার শহরে এসে পড়েছে পাকিস্তানী সৈন্যের সামনে। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, “নাম কিয়া হায়?” চালাক লোক, নাম জিজ্ঞেস করার আসল মানে সে বুঝে যায়। তাঁর হোম ওয়ার্ক করাই ছিল। সে লুঙ্গিটি উপড়ে তুলে ধরে। আর্মিরা তাঁকে ছেড়ে দেয়। ছোট বেলায় একটি রোগের কারণে তাঁর খৎনার মত একটি অপারেশন করা হয়েছিল।

তাহলে, “মুসলমান” কি জানতে হলে, কোরান হাদিস ঘাটার দরকার নেই। কোরান হাদিস পড়ে, কোন শিক্ষিত মুসলমানের সাথে আপনি বাহাস করতে পারবেন। কিন্তু যে লোকটির সাথে আপনি বাহাস করছেন, সে কেমন মুসলমান, তা বুঝতে পারবেন না। বুঝতে হলে সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান লাগবে।

সমাজবিজ্ঞানী প্রথমে একটি লক্ষ্য ঠিক করে, সে আসলে “মুসলমান” সম্পর্কে কি জানতে চায়। তাঁর জানার সুনির্দিস্ট বিষয় কি? তারপর, সে একটি হাইপোথেসিস দাড় করাবে। যেমন, রফিক জাকারিয়া তাঁর পিএইচডি থিসিসে জানতে চেয়েছে, মুসলমানদের মধ্যে ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে দ্বন্দ্বটা কি এবং কেন? এরপর সে প্রশ্নপত্র তৈরি করে সেটা নিয়ে ইন্টারভিউ নেয়। কত লোকের? নির্ভর করে অনেক কিছুর উপর। যে তথ্য সে সংগ্রহ করল। সেই তথ্যের উপর ভিত্তি করে সে বিশ্লেষণ দাড় করাবে।

আগেই বলেছি সমাজবিজ্ঞান প্রকৃতি বিজ্ঞানের মত সমরূপ নয়। একটি পার্থক্য, আপনি কাজ করছেন জড় বস্তু নিয়ে নয়, জীবন্ত সচেতন প্রাণী, মানুষ নিয়ে। সে ইন্টার্ভিউর সময় যা বলবে তা আপনার প্রশ্নের ধরনের উপর নির্ভর করবে। যার ইন্টারভিউ নিচ্ছেন, সে আপনাকে যাচাই করে দেখবে, কোনটা বললে তাঁর সুবিধা। দ্বিতীয়ত, হয়ত খুব ভাল তথ্য পেয়েছেন। কিন্তু সেই তথ্য থেকে আপনি আপনার পছন্দমত অর্ধসত্য বয়ান রচনা করতে পারেন, কারণ গবেষক নিজেও বিশ্বাস বা মূল্যবোধ “নিরপেক্ষ” নন।

তাহলে ভাল সমাজবিজ্ঞান গবেষণা কিভাবে সম্ভব? আপনাকে ক্রিটিকাল ও সেলফ-ক্রিটিকাল দুটোই হতে হবে। তথ্যের মান ও আপনার নিজের পক্ষপাতিত্ব সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। তথ্যের মান নিশ্চিত করার জন্য অনেক গবেষক, যাদের সম্পর্কে জানতে চান, তাঁদের সাথে বছরের উপড়ও থাকেন। “ঝগড়াপুর” গবেষণা গ্রন্থটি এ রকম একটি উদহারন।

মান সম্পন্ন তথ্য পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। অনেক সময় দশ দিন ঘুরে যে তথ্য না পাওয়া যায়, দুই ঘণ্টার গাড়িতে বসে খেজুরে আলাপে বা চায়ের দোকানের এক ঘণ্টার আড্ডায় তাঁর চেয়ে বেশি তথ্য পাওয়া যেতে পারে। মান সম্পন্ন তথ্য পাওয়ার অনেক উপায় আছে, সে প্রসঙ্গে যেতে চাইনা।

“মুসলমান” প্রসঙ্গে তিন ধরনের গবেষণা বা লেখালেখি নজরে এসেছে। মানে তিন ধরনের গবেষক পাওয়া যায়, যারা “মুসলমান” বিষয়টি নিয়ে লেখালেখিতে উৎসাহী।

প্রথম ধরনঃ মৌলবাদী মুসলমানদের রাজনীতি ও সহিংসতাকে বৈধতা দেয়ার, ইংরেজীতে যাকে বলে “এপলজিটিক” লেখক। এরা মনে করে, ” মুসলমানেরা পশ্চিমা শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে”, জ্বিহাদের মাধ্যমে। হিজাব হচ্ছে “ইসলামী” সংস্কৃতি রক্ষা কিংবা ব্যাক্তিস্বাধীনতার ব্যাপার। এই ঘরানার এক বাংলাদেশী লেখক বিশ্লেষণ দেয়, “হেফাজতের উত্থান হয়েছে, শাহবাগ আন্দোলনের কারণে”। এদের দাবী সর্বজনগ্রাহ্য ও প্রমাণ সাপেক্ষ নয়। ফলে এইধরনের লেখার কোন সমাজবৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি নেই। পলেমিকের ভাষায় কেউ কেউ এদের “বামাতি” বলে।

দ্বিতীয় ধরনঃ উদহারন দেই একটা। নাম চাণক্য আচার্য্য। না, ইনি ঐতিহাসিক চরিত্র নন। ২০০৬ সালে, ইনি লিখেছেন, মুসলমান ১৩ প্রকারঃ আত্মঘাতী বোমাবাজ, আত্মঘাতী সন্ত্রাসী/ জিম্মিকারি, আতঙ্কবাদী, সক্রিয় সহযোগী, সন্ত্রাসবাদ সমর্থক, চাঁদাদানকারী, মতাদর্শিক নেতা, ঘৃণা প্রচারক, প্রযুক্তি ব্যাবহারকারী হৃদয়ে জ্বিহাদী, পঞ্চম বাহিনী, বুদ্ধিজীবী যারা বলে ইসলাম মানে শান্তি, সাধারণ সমর্থক, এবং এক্স মুসলিম যারা আসলে মুসলমান নয়।

অবাক হচ্ছেন? এরা অনেকে চেহারায় “নয়ানাস্তিক”, কিন্তু চরিত্রে সাম্প্রদায়িক। এদের উদ্দেশ্য, সাম্রাজ্যবাদী “ওয়ার অন টেরর” এর রাজনীতি ও সহিংসতাকে বৈধতা দেয়া। কৌশলটি হচ্ছে, প্রমাণ করা যে সকল ধরনের মুসলমান সহিংসতার সাথে কোন না কোন ভাবে যুক্ত। তার মানে, ন্যাটো যদি দুর নিয়ন্ত্রিত বোমা হামলা করে “মানবাধিকার ও সভ্যতা” রক্ষা করার জন্য নিরাপরাধ নারী শিশু হত্যা করে, সেটা ঠিক আছে। কারণ কোন মুসলমান “সেক্যুলার” হতে পারেনা, ফলে কেউই “নিরাপরাধ” নয়, হত্যার যোগ্য। (মৌলবাদীদের “মুরতাদ” ধারনা, ক্রুসেডারদের।)

সমাজ বিজ্ঞানের একটা কাজ ক্যাটেগরাইজেশন বা শ্রেণীবদ্ধকরন। এই লোক শ্রেণীবদ্ধকরন কাজটি করেছে, ফলে এটি কি সমাজবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ হল? হলনা, কারণ সমাজবিজ্ঞানের একটি পদ্ধতি, ক্রিটিকাল ডিসকোর্স এনালিসিস করে মূল্যায়ন করলে (অবজারভিং দি অবজারভার), বোঝা যায়, এই গবেষকের একটি পূর্বানুমান আছে, সেটি সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতিত্বের। এই মতামত আত্মগত অনুমান ভিত্তিক, কোন তথ্য ভিত্তিক ও প্রমাণ সাপেক্ষ নয়।

তৃতীয় ধরনঃ এরা সাধারণত একাডেমিক গবেষক এবং কিছু পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল। এরা গবেষণার “বিষয়” ও পদ্ধতি এমন ভাবে ঠিক করে, যা অন্য গবেষকেরা “প্রমাণ” করতে পারবে। এদের গবেষণার বিষয় “বিমুর্ত” কিছু হবেনা, হবে মূর্ত নির্দিষ্ট সামাজিক মানুষ। এই ক্ষেত্রে, মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার। পদ্ধতি হচ্ছে, এই মানুষদের ধর্মবিশ্বাস এবং আচার/অনুষ্ঠানের এর তথ্য সংগ্রহ এবং তথ্য বিশ্লেষণ। অতীতের মুসলমান নিয়ে গবেষণা করতে হলে, তথ্য পেতে হবে ইতিহাসের পুস্তক বা সেকেন্ডারি সূত্র থেকে। আর যদি বর্তমানের মুসলমানদের অবস্থা বুঝতে চাওয়া হয়, তাহলে তথ্য সংগ্রহ করা হবে “মুসলমান” বলে পরিচয়ের বাস্তব লোকদের কাছ থেকে।

এরাও মুসলমানদের ক্যাটেগরাইজেসন বা বিভিন্নভাবে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন। নানা ধরনের মুসলমানদের বিশ্বাস ও ধর্মাচার সম্পর্কিত তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে।

(এক) নানা ধরনের মুসলমানঃ বিভিন্ন মাজহাব ও তরিকা
বিশ্বাস ও আচার/অনুষ্ঠানের এর ভিন্নতা অনুসারে শ্রেণীবদ্ধ করে দেখলে, আনুষ্ঠানিক ভাবে মুসলমানেরা বিভিন্ন সম্প্রদায়ে (ডিনোমিনেশন) অবস্থান করেন। “মুসলমান” একটি বিমুর্ত ধারনা মাত্র। বাস্তবে, “মুসলমান” বলে কিছু নেই। বাস্তবে, সুনির্দিষ্ট ভাবে যা আছে, তা অনেক ধরনের মুসলমানঃ ১) সুন্নি ২) শিয়া, ৩) সূফী, ৪) খারিজী, ইত্যাদি।
এখানেই শেষ নয়। সুন্নিরা বহু মাজহাবে বিভক্তঃ হানাফি, হাম্বলি, মালিকি, সাফী। এর বাইরে আছে, ব্রেলভি ও দেওবন্দি।

শিয়াদের মাজহাবঃ ইসমাইলী, জাফরী, জাইদিয়া। ইসমাইলী দের আবার নানা বিভাজনঃ জেভেনার, নিজারি, মুশতালি, কারামিতা, তাঈবী ইত্যাদি। এই তাঈবী অনুসারীদের একটি তরিকা বহোঁরা মুসলিম। এই বহোঁরা মুসলিমেরা আবার নানা ধরনের। দাউদি বহোঁরা, জাফান বহোঁরা, সুলাইমানি বহোঁরা, আলাভি বহোঁরা, ইত্যাদি। (প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, এই বহোঁরাদের একজন, আজগর আলী ইঞ্জিনিয়ার, ইসলামের লিবারেশন থিওলজি নিয়ে কাজ করেছেন।)
সূফীদের তরিকাও আছেঃ বেকতাসি, চিশতী, মৌলাভি, নকশবন্দি, কাদিরিয়া, সুরাভর্দি, তিজেনিয়া, সাধিল, মুরিদিয়া, ইত্যাদি।

এরপরে আছে, আহমদিয়া বা কাদিয়ানীরা। মৌলবাদীরা এদের “মুসলমান” বলতে নারাজ। কিন্তু এরা নিজেরা নিজেদের মুসলমান মনে করে।

সম্প্রতি, অনেক শিক্ষিত মুসলমান ঘোষণা দেয়, সে কোন মাজহাব বা তরিকায় নেই। সে কেবলমাত্র মুসলমান, কারো অনুসারী না, কেবল আল্লাহর অনুসারী। অর্থাৎ, মাজহাব বা তরিকা ছাড়াও মুসলমান আছে।

উপড়ের এই শ্রেণীবদ্ধ করন প্রমাণ সাপেক্ষ, সুতরাং সমাজ বৈজ্ঞানিক। কারণ, আপনি চাইলেই মুসলমানদের এই মাজহাব ও তরিকার প্রমাণ করতে পারেন। ইহা সার্বজনীন ভাবে প্রমাণিত স্বীকৃত সত্য।

এই যে শ্রেণীবদ্ধকরন হল, এটা থেকে কি কি এমনসব সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়, যা যৌক্তিক ভাবে সার্বজনীন বা সহমতের?

(দুই) এই বিভিন্ন মাজহাব এবং নানা তরিকার উদ্ভব ও ক্রমবৃদ্ধির মানে কি?
আমরা দেখছি, মুসলমানেরা ধর্মানুশীলনে (বিশ্বাস ও আচারের ক্ষেত্রে) নতুন নতুন ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান তৈরি করেছে। এই বাস্তবতাকে আমরা কিভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি?

প্রথমতঃ এটি মুসলমান ব্যাক্তিদের সামাজিক সম্পর্ককে দৃশ্যমান করে, যা দ্বন্দ্বমূলক। মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে ধর্মচিন্তা, ও আচার নিয়ে ভিন্নমত তৈরি হচ্ছে, এই ভিন্নমত থেকে বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে।

দ্বিতীয়তঃ ধর্মচিন্তা ও আচার/অনুষ্ঠানের বিবর্তন হচ্ছে। পুরনো চিন্তার ও আচারের বিলুপ্তি হচ্ছে, নতুন ধরনের ধর্মচিন্তা ও আচারের উদ্ভব হচ্ছে।

তৃতীয়তঃ এটা প্রমাণিত যে এমন কোন অনড়, অবিচল, স্থির, বিবর্তনবিরোধী কোন শক্তি বা বার্তা নেই, যা মুসলমানদের একটি মাজহাব বা তরিকায় আটকে রাখতে পারে।

বিভিন্ন মাজহাব ও তরিকা উদ্ভব যদি মুসলমানদের ধর্মবোধ ও ধর্মানুশীলনের দ্বন্দ্বকে নির্দেশ করে, তাহলে এই দ্বন্দ্বের কারণ কি?

(তিন) ধর্মবোধ ও ধর্মানুশীলন নিয়ে দ্বন্দ্ব ও সহিংসতা কেন?
দ্বন্দ্ব মানেই, দুই বিপরীতে ঐক্য ও সংগ্রাম। একেশ্বরবাদের প্রশ্নে এক, কিন্তু এর ব্যাখ্যা বা উপলব্দি নিয়ে পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য থেকে ভিন্নমত, ভিন্ন ধর্মানুশীলন। ভিন্ন গোষ্ঠীবদ্ধতা এবং এক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অন্য গোষ্ঠীর সহিংস হামলা, হত্যাকাণ্ড। সেই খিলাফতের আমল থেকেই।

একই টেক্সট, একই বয়ান, কিন্তু কেন মানুষ তা ভিন্ন ভাবে উপলব্দি করে? কারণ, প্রত্যেক ব্যাক্তির আলাদা আলাদা স্বকীয় চেতনাবোধ আছে। লিখিত টেক্সট বা কথ্য বক্তব্য, মানুষ তিন ভাবে বুঝে থাকে, আক্ষরিক অর্থে, প্রতীকী অর্থে এবং মর্মার্থে। এই ভিন্ন উপলব্দির কারণ ব্যাক্তির নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায়, কগনিটিভ প্রসেসে।

মাজহাব ও তরিকা একজন মুসলমানের আনুষ্ঠানিক পরিচয়। ধর্মবোধের বিচারে সকল আস্তিকদেরই (মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান) তিন ভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা যায়।

ক) সেকুলারঃ যারা মনে করে ধর্মকে প্রতীকী অর্থে গ্রহণ করতে হবে। ধর্ম পারলৌকিক বিষয়। ব্যাক্তিগত আধ্যাত্মিক বিষয়। এটিকে রাজনীতির সাথে মেলানো এর পবিত্রতা ধ্বংস করা। ঐশী বানী দিয়ে ইহজাগতিক সমস্যার সমধান হবেনা, বিজ্ঞান দিয়ে হবে। ধর্মীয় অনুশাসনকে আক্ষরিক ভাবে অনুশীলন করা, ব্যাক্তির বুদ্ধিবৃত্তির অপমান। ধর্ম এসেছে ব্যাক্তিকে নৈতিক পথে চলতে সাহায্য করার জন্য।

খ) মৌলবাদীঃ ধর্ম ইহজাগতিক ও পারলৌকিক সব জীবনের জন্য। ধর্মের অনুশাসন অক্ষরে অক্ষরে পালন করা দরকার কারণ ইহা “জীবন বিধান”। সকল জ্ঞানের উৎস ধর্ম। সকল বিজ্ঞান এসেছে ধর্ম থেকে। ধর্মের জন্য জীবন। ধর্মের জন্য মানুষ হত্যাও বৈধ। ধর্ম রাজনৈতিক।

গ) আধ্যাত্মবাদীঃ ধর্মানুশীলন একটি ঐশী আনন্দ ও অলৌকিক ভালোবাসার পথ পরিক্রমা। এই যাত্রা ব্যাক্তির নিজস্ব উপল্বদির। যেখানে বস্তুগত দেহ মিলিত হতে চায় বিশ্বচেতনার সাথে। ধর্মের মর্মবানী, মানুষের মহাসত্যকে জানার ও সেই জ্ঞানের আলোকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার। ভালোবাসা, এদের একটি প্রিয় আলোচ্য বিষয়।

স্বভাবতই, এই মৌলিক তিনটি উপলব্দি এক সাথে চলতে পারেনা। এই দ্বন্দ্ব প্রকাশিত হয়ে পরে বিভিন্ন মাজহাবের ও তরিকার মধ্যে। ব্যাক্তির আত্মগত অবস্থানের উপলব্দির এই পার্থক্য, ধর্মের দ্বন্দ্ব, বিভাজন ও সহিংসতার ভিত্তি। ধার্মিক সহিংস হয়, যখন সে মৌলবাদী। কেন তাঁর ধর্ম চেতনা, ধর্মকে আক্ষরিক অর্থে নেয়াকে উৎসাহিত করে, সেটি বুঝতে হলে, তাঁর সামাজিকায়ন, স্বার্থবোধ এবং অস্তিত্বের চাহিদাকে বুঝতে হবে।

সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ এই দ্বন্দ্বকে বিকশিত করার শর্ত। বিভিন্ন সময়ে এই দ্বন্দ্ব, বিভাজন ও সহিংসতা মানুষের জন্য দুঃসময় নিয়ে আসে। সাম্প্রতিক কালে মৌলবাদী মুসলমানের শক্তি ও ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণ খুঁজতে হবে, সমকালীন আর্থ সামাজিক ঘটনা প্রবাহের উপর। সমাজ বিজ্ঞানের আলোয় তা বিশ্লেষণ করতে হবে।

আপনি কেমন “মুসলমান”? আর আপনি কোন “মুসলমানের” কথা বলছেন? স্পষ্ট করে বলুন। জেনারালাইজ করবেন না।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.