সাহিত্যে সোভিয়েত:নয়া দুনিয়ার নতুন পাঠ

‘ইউরোপ ভূত দেখেছে – কমিউনিজমের ভূত! কথাটি মার্কস -এঙ্গেলস বলেছিলেন ১৮৪৮ সালে ‘ কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো ‘ রচনায়।১৬৯ বছর আগে তাদের উল্লেখিত সেই ভূত কোন অশরীরী কিংবা নিছক কাল্পনিক ছিল না। তার সাক্ষাৎ মেলে ১৮৭১ সালে প্যারী কমিউনে।এই ভূত হচ্ছে আর কিছু নয় – ইউরোপের নব উত্থিত মজদুর শ্রেণি।যার ভয়ে ভীত কম্পমান রেনেসাঁ ও ফরাসী বিপ্লবের ধ্বজাধারী বুর্জোয়া সমাজ এবং ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত ও অভিজাততন্ত্র। প্যারীতে ব্যর্থ হওয়া শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র গঠনের সেই চিন্তা কমিউন ভেঙ্গে যাওয়া মাঝেই থেমে থাকে নি।উৎপাদন যন্ত্র ও শক্তি বিকাশের প্রতিযোগিতায় ক্রমান্বয়ে পিষ্ট হওয়া নিপীড়িত মানুষের মুক্তির আকাঙ্খাই সেই স্বপ্নকে জাগিয়ে রাখে।পুঁজিবাদ যত বিকশিত ও শক্তিশালী হতে থাকে ততই সংঘবদ্ধ হতে থাকে শ্রমিকদের ধর্মঘট – আন্দোলন। প্যারীর এই শিক্ষা শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির লড়াইকে ছড়িয়ে দেয় দেশে দেশে। তারই এক পর্যায়ে ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর (পুরানো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর) বিশ্বের বুকে মাথা উচুঁ করে দাঁড়ালো সোভিয়েত রাশিয়া।কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে এই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কাঁপিয়ে দিলো পুরো দুনিয়া। বিপ্লবের ঢেউ আছড়ে পড়লো সমস্ত বিশ্বে।দেশে দেশে শোষিত নিপীড়িত মানুষের মুক্তির কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ালো সোভিয়েত ইউনিয়ন।

‘ইউরোপ ভূত দেখেছে – কমিউনিজমের ভূত! কথাটি মার্কস -এঙ্গেলস বলেছিলেন ১৮৪৮ সালে ‘ কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো ‘ রচনায়।১৬৯ বছর আগে তাদের উল্লেখিত সেই ভূত কোন অশরীরী কিংবা নিছক কাল্পনিক ছিল না। তার সাক্ষাৎ মেলে ১৮৭১ সালে প্যারী কমিউনে।এই ভূত হচ্ছে আর কিছু নয় – ইউরোপের নব উত্থিত মজদুর শ্রেণি।যার ভয়ে ভীত কম্পমান রেনেসাঁ ও ফরাসী বিপ্লবের ধ্বজাধারী বুর্জোয়া সমাজ এবং ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত ও অভিজাততন্ত্র। প্যারীতে ব্যর্থ হওয়া শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র গঠনের সেই চিন্তা কমিউন ভেঙ্গে যাওয়া মাঝেই থেমে থাকে নি।উৎপাদন যন্ত্র ও শক্তি বিকাশের প্রতিযোগিতায় ক্রমান্বয়ে পিষ্ট হওয়া নিপীড়িত মানুষের মুক্তির আকাঙ্খাই সেই স্বপ্নকে জাগিয়ে রাখে।পুঁজিবাদ যত বিকশিত ও শক্তিশালী হতে থাকে ততই সংঘবদ্ধ হতে থাকে শ্রমিকদের ধর্মঘট – আন্দোলন। প্যারীর এই শিক্ষা শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির লড়াইকে ছড়িয়ে দেয় দেশে দেশে। তারই এক পর্যায়ে ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর (পুরানো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর) বিশ্বের বুকে মাথা উচুঁ করে দাঁড়ালো সোভিয়েত রাশিয়া।কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে এই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কাঁপিয়ে দিলো পুরো দুনিয়া। বিপ্লবের ঢেউ আছড়ে পড়লো সমস্ত বিশ্বে।দেশে দেশে শোষিত নিপীড়িত মানুষের মুক্তির কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ালো সোভিয়েত ইউনিয়ন।

মার্ক্স – এঙ্গেলসের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতবাদ এই বিপ্লবের ফলে আর শুধু তত্ত্বের জায়গায় থাকেনি।তাকে পরিণত করলো সমাজ পরিবর্তনের বাস্তব নিয়মে।
‘জমি – রুটি- শান্তি ‘ এই শ্লোগানে তমসাচ্ছন্ন রাশিয়ায় প্রতিক্রিয়াশীল জার শাসনের পশ্চাৎপদতা কাটিয়ে অন্ধকার ভেঙ্গে উঠে দাঁড়ালো আধুনিক সোভিয়েত জাতি। ইশতেহারে রচিত মার্কসের সেই ভূত তৈরি করলো মানব জাতির নতুন ভবিষ্যৎ! সে কেবল বুর্জোয়াদের আতঙ্ক হয়ে থাকেনি,কেরেনস্কি সরকারের মরণ বাণ হেনে রচনা করেছিলো শ্রমিক শ্রেণির নতুন অধ্যায়।

পৃথিবীতে এর আগেও বিপ্লব হয়েছিলো।ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব, ফরাসী বিপ্লব, ক্রমওয়েল বিপ্লব ইত্যাদি। কিন্ত সোভিয়েত বিপ্লব অন্য সব বিপ্লব থেকেই ছিলো আলাদা এবং ভিন্ন জাতের।কেন?
কারণ এই বিপ্লব কেবল এক শাসকের পরিবর্তে আরেক শাসককে ক্ষমতায় আনে নি বরং তা উচ্ছেদ করেছিলো শোষণ, প্রতিষ্ঠিত করেছিলো শোষণহীন সমাজ।শ্রেণির হাতে ক্ষমতা ছিলো ঠিকই তবে তা ব্যবহৃত করেছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থে।বিপ্লবের আগের রাশিয়া আর আগের মতো থাকেনি।

আরেকটি দিকে এই বিপ্লব বিংশ শতাব্দীর অনন্য ঘটনা।তা হলো এই বিপ্লব শুধু রাষ্ট্রকে বদলায়নি। পাল্টিয়ে দিয়েছে মানুষের চিন্তার জগত। অর্থনৈতিক নির্মাণ কাজের সাথে সাথে সোভিয়েত তৈরী করেছিলো এক সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞ। শিল্প,সাহিত্য, বিজ্ঞান, নাটক,গান, সিনেমা, খেলাধুলা প্রভৃতি ক্ষেত্রেই সৃষ্টি করেছিলো নতুন অধ্যায়।

একদিন বুর্জোয়া মানবতাবাদীরা সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিয়ে এসেছিলো ব্যক্তির মুক্তি, সাম্য,মৈত্রী, স্বাধীনতার বাণী।রুশ বিপ্লব সেখানে নিয়ে এসেছে সমাজের মুক্তির মধ্যেই রয়েছে ব্যক্তির প্রকৃত স্বাধীনতার ধারণা।শ্রমজীবী মানুষের সোভিয়েত রাষ্ট্রই সম্ভব করেছিলো জাতিতে জাতিতে মৈত্রী স্থাপন। শোষক – শোষিতের সম্পর্ক পাল্টিয়ে তৈরী করেছিলো সাম্য ও মর্যাদার সম্পর্ক। মানুষের চিন্তা ও সম্পর্ক বাঁধা পড়ে থাকে নি উৎপাদন যন্ত্রের শৃঙ্খলে। সমস্ত মানুষই প্রকৃত মালিক হয়ে দাঁড়িয়েছিলো উৎপাদন ব্যবস্থার। উৎপাদিকা শক্তির এই অভূতপূর্ব মুক্তি ও বিকাশের ধারায় সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তৈরী হয় এক বিস্ময়কর আলোড়ন।এই সৃষ্টিকর্মের যুগে দেখা যায় ম্যাক্সিম গোর্কি, শলোকভ, মায়কোভস্কি, অস্ত্রভস্কি, ইয়েসনস্কি, অ্যালেস্কী টলস্টয়ের মতন মহান বিশ্ব সাহিত্যকদের। তেমনি থিয়েটারে দানচেংকো,স্তানিস্লাভস্কি, চলচ্চিত্রে আইজেনস্টাইন,পুদভকীন, ডোভজেঙ্কো,কিংবা সঙ্গীতে শস্টাকোভিচ, প্রকোভিয়েভের মতন সাংস্কৃতিক পুরোধা ব্যক্তিত্বের উন্মেষ ঘটে।সোভিয়েত রাশিয়া নির্মাণ করে সর্বহারা সাহিত্য রচনা।যার ফলশ্রুতিতে শিল্পকলায় সোশ্যালিস্ট রিয়েলিটি ও নন্দনতত্ত্বের ধারণাও বিকাশ লাভ করেছিল।

ফরাসী মানবতাবাদী চিন্তা-দর্শনঃ সাম্যবাদী দুনিয়ার প্রাথমিক পাঠ
সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে পঞ্চদশ শতকে ইতালিতে রেনেসাঁর উদ্ভব হয়। এর প্রভাব পরবর্তী দুশো বছরে ইউরোপে নিয়ে আসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ভূমিদাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া যে মুক্তশ্রম বুর্জোয়া শ্রেণীকে ক্রমশ : শক্তিশালী করে তারই ফলস্বরুপ ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানিতে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জেগে উঠে হাজার বছরের ঘুমিয়ে থাকা ইউরোপ। ফরাসী বিপ্লবের কালে রুশো, ভলতেয়ার, মন্তেস্কু, আর্ল রর্বাট জে তুর্গো,দেনিশ দিদেরো ,,দ্যালেমবার এলভেতিয়াস, দুপোঁ দ্য, নেমুর, ভ্যাঁসা দ্য গুরুনে, মার্কিস দ্য মিরাবো,দোলবাশ,জ্যাঁ মেসলিয়ের মতন মহান বুর্জোয়া দার্শনিক, সাহিত্যিক, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদদের উত্থান ঘটে এই যুগে।
ভলতেয়ারের উদারনীতিবাদ রুশোর গণতান্ত্রিক মতবাদের সাথে সাথে অংকুরিত হয় মরেলী,আবেঁ মাবলীর সমাজবাদে দর্শন।

রুশো তার বিখ্যাত ‘ সমাজ সংস্থা ‘ ও ‘এমিল ‘ রচনায় তুলে ধরেন নতুন সমাজের চিত্র। সমাজ সংস্থায়( ১৭৬১) লেখেন ‘ স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। কিন্ত তবু মানুষ মাত্রই শৃঙ্খলিত। মানুষ অন্যের উপর প্রভূত্ব দাবি করে বটে, কিন্তু সে ভুলে যায়, সেও অন্যের চেয়েও কম পরাধীন নয়।” তাঁর মতে, মানুষের মুক্তি ও নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করতে হলে প্রতিষ্ঠা করতে হবে যৌথ সমাজ এবং লোক সমাজের নিকট সমর্পন করতে হবে নিজের সব অধিকার। ‘এমিল ‘(১৭৬২) রচনায় তিনি বলেন ‘গরীবের উদরের চেয়েও ধনীর উদর তো আর কম বড় নয়, ভৃত্যের চাইতে প্রভুর বাহু দীর্ঘতর বা অধিকতর সবল নয়।বড়লোকও সাধারণ মানুষের চাইতে অধিকতর লম্বা নয়। বস্তুত সব মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজন সমরুপ এবং এ প্রয়োজন মেটাবার উপকরণ ও সমভাবে সবার নাগালে থাকতে হবে।”

অন্যদিকে ভলতেয়ার তাঁর রচনায় একের পর এক লিখতে থাকেন চার্চের বিরুদ্ধে।চার্চ বিশ্বাস ও হাজার বছরের ধর্মীয় গোঁড়ামী ও যাজকতন্ত্রের মধ্যে ছিলো মধ্যযুগের শক্তি। রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি এবং তার আদর্শ অমান্য করা পাপ ও অমার্জিত অপরাধ – এই বিশ্বাসে কুঠার হানেন ভলতেয়ার। চার্চের গোঁড়ামীপূর্ণ আচরনে যারা সমর্থন করে তাদের ও তিনি উপহাস করেন। ফলে বিপ্লবের আগে তাকে নিবার্সিত ও বাস্তিল দূর্গে অন্তরীণ করা হয়। ভলতেয়ার তাঁর রচনা ‘Sealed letters ‘য়ে বলেন ‘ঈশ্বর পাখির যেমন পালক দিয়েছেন, দিয়েছেন ভালুকের সূক্ষ্ম লোম, তেমন আমাদেরও দিয়েছেন এক সার্বজনীন আদর্শ, তাহলো যুক্তি জ্ঞান এবং এ আদর্শ এতো দীর্ঘস্থায়ী যে সমস্ত ভাবাবেগের সংঘাত সত্ত্বেও এবং কুসংস্কার মগ্ন ভণ্ডদের এ আদর্শ নিমূর্ল করার সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এটা থাকবে অটুট”। তাঁর আরো কিছু রচনা সেসময় বিপ্লবের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক প্রেরণা যোগায়। যেমন -philosophical letters,Discourses of man,Essays on moral and spirit nations ইত্যাদি।
সাম্যবাদী ভাবধারার ফরাসী দার্শনিক মাবলী রচনা করেন ‘ ভাসমান দীপপুঞ্জের ভরাডুবি ‘ উপন্যাস। এতে সাম্যবাদ ও সার্বজনীন ভালোবাসার এক সমাজ আঁকা হয়।ভাসমান দীপপুঞ্জকে ব্যক্তি মালিকানার প্রতীকরুপে ধরে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় যে – এর ভরাডুবি অনিবার্য।

ফরাসী এসব মহান সাহিত্যিক ও দার্শনিকদের সুদুর প্রসারী প্রভাব তৈরী করে পরবর্তী ইউরোপের বিভিন্ন সাহিত্যিকদের উপর।ব্যক্তিমালিকানার যে ধারণা ও চিন্তার কথা বলে বুর্জোয়াশ্রেণী সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়েছিল, মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল মুক্তির ; ক্ষমতা কব্জা করার পর তারাই টুটি চেপে ধরলো মানুষের স্বাধীনতার অধিকার। ভূমিদাস থেকে টেনে এনে নামিয়ে দেয় শ্রম দাসত্বে। রাজার রাজদন্ড পরিণত হয় বণিকের পুঁজির মানদন্ডে। মুনাফার যাঁতাকলে চাপা পড়ে থাকে রুশো – ভলতেয়ারের স্বপ্নের পৃথিবী। কিন্তু তাদের সেই চিন্তা, আদর্শ ও রচনা অনুপ্রাণিত করে পরবর্তী ইতিহাস ও সাহিত্যকে। ইংরেজি সাহিত্যের বায়রন,শেলী, কিটস,ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতন রুশ সাহিত্যেও তৈরী হয় গোগল,পুলকিন, দস্তয়েভস্কি,টলস্টয়,লেরমেন্টভ,চেখভ,
তুর্গেনিভের মতো বিশ্ব সাহিত্যের বড় বড় লেখকরা।

রুশ সাহিত্যঃ জারবিরোধী লড়াইয়ের হাতিয়ার
কোনো বিপ্লব আচমকা হয়না। চলতি উৎপাদন সম্পর্ক যখন উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের সাথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন বিপ্লবই সেই সাবেকী উৎপাদন সম্পর্ককে ভেঙ্গে নতুন সম্পর্ক কায়েম করে যাতে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের পথ খুলে যায়।কিন্তু সাবেকী সম্পর্ক থেকে লাভবান শ্রেণী সেই সম্পর্ক জিইয়ে রাখতে চায়, তৈরী করে জবরদস্তির নতুন নতুন রাস্তা।বিপ্লবপূর্ব জার শাসনে রাশিয়ায় ছিল সামন্তীয় ভূমিদাস ও মালিক সম্পর্ক। এই সম্পর্ককে কেন্দ্র করে একদিকে ছিল স্বৈরাশারী জার শাসন অন্যদিকে এরই মধ্যে রাশিয়ায় নানান ধরণের শিল্প গড়ে উঠতে থাকে। শতাব্দী শেষ হওয়ার আগেই গোটা দেশে প্রায় ২৫ হাজার কল কারখানা তৈরী হয় সেখানে কাজ করছে প্রায় ২০ লক্ষ শ্রমিক।তারা গ্রাম থেকে শহরে এসেছে।এদের বিপুল অংশ দরিদ্র, নিঃস্ব এবং জমিদার শোষণে নিপীড়িত কৃষকের দল।১৮৬১ সালে জার ভূমিদাস প্রথা অবসানের ঘোষণা দেয়। কিন্তু এতে প্রশাসনিক কিছু রদবদল ছাড়া তেমন কোন পরিবর্তন আসেনি।একেকটি কৃষক পরিবারের হাতে যে পরিমাণ জমি ছিলো তার চেয়ে ৩৩৩ গুণ বেশি জমি ছিলো বড় বড় জমিদার মালিক কুলাকদের হাতে।এই সময়ে রুশ সাহিত্যর বিভিন্ন বড় বড় সাহিত্যকদের রচনায় উঠে আসে তৎকালীন জমিদারতন্ত্রের শোষণ,উৎপীড়িত কৃষক ও ভূমিদাসদের জীবন। তার সাথে সাথে উপজীব্য হয়ে উঠে সাবেকী উৎপাদন সম্পর্কের ভাঙ্গন ও আসন্ন শ্রমিক বিদ্রোহের কাহিনী।

জমিদারী নানা উৎপীড়নে বিদ্রোহী কৃষকের জীবনের নানা চিত্র ফুটে উঠে সমকালীন রুশ সাহিত্যে।নিকোলাই গোগলের তারাল বুলভায় (১৮৩৫) আমরা পেয়ে যাই কসাক চরিত্রের চিত্রায়ন। রুশ ভাষায় লিখলেও গোগলের সাহিত্যে উঠে আসে স্ব-জাতি ইউক্রেনের ইতিহাস -ঐতিহ্য ও জীবনধারা। পোল জাতির সাথে ইউক্রেনীয় জাতিগত দ্বন্দ্বের ছবি ও কসাক নিষ্ঠুরতা নিয়ে লেখা এই উপন্যাস। তাঁর রচিত ‘ডেথ সোলস ‘ উপন্যাসকে আধুনিক রুশ উপন্যাসের পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়।১৭৩৬ সালে প্রকাশিত হয় রাশিয়ার প্রদেশগুলোতে চলমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নির্ভর গোগলের কমেডি নাটক ‘দ্য ইন্সপেক্টর ‘।তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘ইভেনিং অন এ ফার্ম নিয়ার ডিকাঙ্গ (১৮৩১-৩২), মিরগোরোদ (১৮৩৫), ‘দি ওভার কোট ‘(১৮৪২)। ছোট গল্প হলেও ওভারকোট রচনায় গোগল তৎকালীন স্বৈরাচারী সমাজের জীবন- ছবি একেঁছেন। গল্পটিতে একজন সরকারি কর্মচারীর দৈন্যতা এবং বহু পরিশ্রমে তৈরি ওভারকোট চুরি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তুলে ধরেন সমাজের নির্মম দিক যার পরিণতি ঘটে মৃত্যুতে।গোগল ও তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে আরেকজন রুশ সাহিত্যিক ফিওদর দস্তয়েভস্কি বলেন ‘আমরা সবাই গোগলের ওভারকোট থেকেই বের হয়েছি’।

রাশিয়ায় সেই সময় অনেক সাহিত্যিকদের আগমণ ঘটেছিলো সমাজের অভিজাত সম্প্রদায় থেকে। তাদের ব্যক্তিজীবনে এই শ্রেণী অবস্থান ও সংস্কৃতির প্রভাব ছিলো নানা মাত্রায়। আবার তা কাটিয়ে প্রতিবাদ মুখর পরিচয়ও ফুটে উঠে অনেকের চরিত্রে।নিজ নিজ সমাজ, অভিজাতন্ত্র,কুসংস্কার, স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে এই মহান সাহিত্যিকদের লেখনী পররর্তী রাজনৈতিক সংগ্রাম ও বিপ্লবী সাহিত্যের মৌল উপাদান হিসেবে গড়ে উঠে।আধুনিক রুশ সাহিত্যের জনক হিসেবে পরিচিত আলেকজান্ডার পুশকিন রুশ সম্রাট পিটার দ্য গ্রেটের বংশধর হলেও তিনি ছিলেন রাজতন্ত্র বিরোধী। পুশকিনের কবিতা রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রচার পত্র হিসেবে বিলি হতে থাকে।তিনি গড়ে তোলেন ‘ গ্রীন ল্যাম্প এসোসিয়েশন ‘ নামে একটা সাহিত্য সংগঠন যা পরবর্তীতে জার বিরোধী গোপন রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়।একদিকে সাহিত্য সাধনা অন্য দিকে রাজনৈতিক কার্যক্রম দুটোই চলতে থাকে সমানতালে।রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লেখালেখির কারণে পুশকিনকে বন্দী করা হয়। সেন্টপিটাসর্বুগ থেকে তাকে নির্বাসন দেয়া হয় দক্ষিণ রাশিয়ার ওডেসার একটি দূর্গম অঞ্চলে।মাত্র আটত্রিশ বছর আয়ুস্কালে তিনি রুশ ভাষা ও সাহিত্যে একাধারে আধুনিক কাব্য,গল্প, গদ্যকাহিনী,কাব্যনাট্য প্রভৃতির প্রবক্তা হিসেবে রুশ সাহিত্যে অবদান রাখেন। পুশকিন রুশ সাহিত্যে আধুনিক রুপ ও গতিময়তার স্বকীয় ভাষারীতি নির্মাণ করেন। নাটক ও কবিতায় ভানার্কুলার বাচনভঙ্গি ব্যবহার করেন। এটি গল্প বলার এমন একটি পদ্ধতি যেখানে নাটক ও রোমান্টিকতার সংমিশ্রণে বিশেষ এক অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয়।রাশিয়ান সাহিত্যে এটি ছিলো একেবারেই নতুন এবং এই পদ্ধতিটি লেসকভ, বুলগাকভ, তুে্র্গনিভ, গণচারেজ, জোশচেঙ্কো,প্লেটোনোভসহ পরবর্তী লেখকদের বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর রচিত উপন্যাস ‘ ইয়েভেজোন ওনেজিন ‘ রুশ কথা সাহিত্যের মাইলস্টোন হিসেবে খ্যাত। বাস্তব জীবনকে উপজীব্য করে এই উপন্যাস একেবারেই নতুন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সূচনা করে। শুধু রুশ নয় বিশ্ব কাব্য সাহিত্যেও পুশকিনের কবিতা আজো শক্তিশালী ও মহৎকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়।

লিখেছেন : আল কাদেরী জয়
সহসভাপতি,
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, কেন্দ্রীয় কমিটি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 2 =