রাজনৈতিক ইসলামের সাথে সেক্যুলার গণতন্ত্রের দ্বন্দ্ব!


রংপুরে সাম্প্রদায়িক হামলার ছবি ও এই ঘটনা কারা কিভাবে ঘটিয়েছে, এ সম্পর্কে প্রায় সব তথ্যই আমরা এখন জানি।

একজন “হিন্দুর” নামে ফেসবুকে “ধর্ম অবমাননার” গুজব ছড়িয়েছেন একজন মাওলানা হামিদি। কর্মী ও সমর্থকদের সমাবেশ ঘটিয়েছেন ওলামা দলের ও জামাতে ইসলামীর নেতারা। এদের একজন, জামাত নেতা ও মসজিদের ইমাম সিরাজুল ইসলাম এখন পুলিশ হেফাজতে।

সম্প্রতি আমি একটি “সহিংসতা প্রতিরোধ” বিষয়ক কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলাম। সামাজিক সহিংসতা বোঝার জন্য কি কি ধরনের বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যাবহার করা হয়ে থাকে, সে সম্পর্কে আলোচনা করতে।

যে কোন সহিংসতাই কোন না কোন দ্বন্দ্বের ফল। দ্বন্দ্ব মানে দুই বিপরীতের একত্ব ও সংগ্রাম। থিংস আর টুগেদার বাট ইন টেনশন। যে কোন প্রকাশিত সহিংসতা বুঝতে হলে আগে দেখা দরকার কার সাথে কার দ্বন্দ্ব রয়েছে। ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠান খুঁজে বার করা প্রথম কাজ।

আপাতভাবে যে দ্বন্দ্ব আমরা প্রকাশ্যে দেখি, সেটি দ্বন্দ্বের হিজাব পরা চেহারা। দ্বন্দ্বের আসল চেহারা দেখতে হলে, এই হিজাবখানা খুলতে হবে। হিজাব খুলে দেখতে হবে এই দ্বন্দ্বেযুক্ত ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের “স্বার্থ” কি রকম। এই স্বার্থ হতে পারে সম্পদের, ক্ষমতার কিংবা রাজনৈতিক মতবিশ্বাসের।

এই হিজাব খোলা সবসময় সহজ হয়না। এই কর্মশালায় আমি একটি বাস্তব কাহিনী পাই, যা আমাদের দ্বন্দ্বে যুক্ত ব্যাক্তিদের স্বার্থ বিশ্লেষণে সহায়তা করে।

ঘটনাটির শুরু একটি বেওয়ারিশ লাশ নিয়ে। লাশটির চেহারা “বাঙ্গালীর” মত, এবং এলাকাটি আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। ফলে “বাঙ্গালীদের” জাতীয়তার অনুভূতিতে লাগে, এবং তারা “আদিবাসীদের” উপর হামলার (প্রতিশোধ) আয়োজন করে। শুনতে খুব স্বাভাবিক মনে হচ্ছে, তাইনা? এটি “সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব”!

আমরা ঘটনাটিকে উন্মোচন করার চেষ্টা করি, সময় নিয়ে। কারা কারা যুক্ত? এটাকে বলে ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠান মানচিত্র তৈরি পদ্ধতি। এই মানচিত্রে আমরা পাই অনেক স্থানীয় ও জাতীয় চরিত্র। আমাদের বেশ সময় লাগে, “বাঙ্গালী” ও “আদিবাসী” সরলিকরন এবং সাধারণীকরন থেকে বেরিয়ে আসতে। বাস্তব কুশীলবদের খুঁজে বের করতে।

এর পরের ধাপে, আমরা এই ব্যাক্তিদের প্রকাশ্য “অবস্থান” ও আসল “স্বার্থ” নিয়ে বিশ্লেষণ করি। আমরা জানতে পারি, সাম্প্রদায়িক হামলা আয়োজনকারীর প্রকাশ্য অবস্থান ছিল, “আমরা এই বাঙ্গালী ভাইয়ের হত্যার বিচার চাই”। যিনি মুল আয়োজক, তিনি একজন প্রাক্তন ইউপি সদস্য। বিশ্লেষণে এটা বেরিয়ে আসে যে, তার স্বার্থ ছিল এই বেওয়ারিশ লাশ নিয়ে গনসমাবেশ করে, আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি। যদি সত্যিই সে “হত্যার বিচার” চাইতো, সে পুলিশকে জানাতে পারত।

প্রকাশ্য অবস্থান “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত” নিয়ে যারা আন্দোলন করে, তাদেরও অপ্রকাশ্য স্বার্থ রয়েছে। রংপুরের সাম্প্রদায়িক হামলার আয়োজনের কুশীলবদের স্বার্থ কি? সামাজিক প্রভাব, যা আগামী জাতীয় নির্বাচনেও কাজে লাগবে।

এই যে বিভিন্ন স্থানীয় দ্বন্দ্ব, এর একটি জাতীয় প্রেক্ষাপট রয়েছে। সেটি বুঝতে হলে আমাদের বর্তমান চীনা নেতা জনাব জী জিনপিং এর “প্রধান দ্বন্দ্ব” বা প্রিন্সিপাল কনট্রাকডিকশন ধারনাটি বুঝতে হবে। বাংলাদেশে বা মুসলিম প্রধান অধ্যুষিত দেশে দেশে, ঠাণ্ডালড়াই পরবর্তী সময়ে, প্রধান দ্বন্দ্ব “রাজনৈতিক ইসলামের” সাথে “সেক্যুলার গণতন্ত্রের”। (সমাজে মৌলিক দ্বন্দ্ব আছে, যেমন পুঁজির সাথে শ্রমের দ্বন্দ্ব, নারীর সাথে পিতৃতন্ত্রের দ্বন্দ্ব, রাষ্ট্রের সাথে সমাজের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি। এবং কোন ঐতিহাসিক কালে কোন একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব প্রধান হয়ে ওঠে।)

বাংলাদেশে “রাজনৈতিক ইসলাম” কি চায়? ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়া আইন ও মসজিদ ভিত্তিক সমাজ। সেক্যুলার গণতন্ত্রীরা কি চায়? প্রথমতঃ এরা বিভক্ত। দ্বিতীয়তঃ নানা আবোল তাবোল বিমূর্ত বিশ্লেষণ, কি কি সব শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে ……। তৃতীয়তঃ পরিবেশ আন্দোলন নিয়ে ব্যাস্ত (যেটা দরকারিও), এবং পরিশেষে কেউ কেউ এই প্রধানদ্বন্দ্ব বুঝলেও তারা সরকারী চাকুরীতে ব্যাস্ত, পাল্টা গণসমাবেশের বদলে।

তো, আমরা আরও এরকম স্থানীয় দ্বন্দ্ব ও সহিংসতা দেখব। কারণ, “রাজনৈতিক ইসলাম” পুরোপুরি বিজয়/প্রতিষ্ঠা বা এই শক্তির সেক্যুলার রূপান্তর ছাড়া, প্রধানদ্বন্দ্বের মীমাংসা হবেনা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

65 − 58 =