মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলাচিঠি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আমার শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আশা করি ভালো আছেন। আপনাকে কিছু কথা বলবো বলে অনেকদিন ধরে কথাগুলো বুকের মাঝে জমিয়ে রেখেছি। আজ সেই জমে থাকা কথাগুলো প্রকাশ করছি। এই কথাগুলো আপনার কাছে পৌঁছাবে কিনা জানি না, তবুও লিখছি।
মাননীয়া, আপনি আমাদের প্রধানমন্ত্রী। আপনি জাতির পিতার কন্যা। বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং স্বাধীনতা লাভের ক্ষেত্রে আপনার পরিবারের সমান অবদান আর কারো নেই। বর্তমান বাংলাদেশে আপনার মতো যোগ্য নেতা বিরল। আপনি বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবেন, বাংলাদেশকে সমৃদ্ধশালী করতে চান, এই নিয়ে আমার মনে কোন সন্দেহ নেই। আপনার দেশপ্রেমের কাছে আমার মতো হাজারো মানুষ তুচ্ছ। আপনি দেশের একজন যোগ্য নেতা, এই বিষয়ে দ্বিমত পোষন করার সুযোগ নেই। কিন্তু আপনি যাদের নিয়ে সরকার পরিচালনা করছেন, তাঁরা কতটুকু যোগ্যতা সম্পূর্ণ, সেই বিষয়ে শুধু আমার না, কোটি মানুষের মনে প্রশ্ন আছে। আমার বিশ্বাস আপনি নিজেও সেই বিষয়ে অবগত। আপনি অবগত বলেই অকপটে স্বীকার করেছেন, আওয়ামীলীগে আপনাকে ছাড়া আর সবাইকেই কেনা যায়! আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে, আপনি সব জেনে বুঝেও কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন? জাতির পিতাও জানতেন, তাঁর চারপাশে চাটুকারের দল, তিনি জানতেন তাঁর পাশে যারা আছে, তাদের অধিকাংশ শয়তান। সব জেনেও জাতির পিতা চুপ ছিলেন। যার ফল জাতি ভোগ করেছে। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় বাংলাদেশ তাঁর জনককে হারিয়েছে, আপনি এতিম হয়েছেন। সব জেনেও আপনি যখন চুপচাপ বসে আছেন, তখন আমার মনে ’৭৫ এর শঙ্কা জাগে। চাটুকার আর লোভীদের ষড়যন্ত্রে জাতি না আবার তাঁর যোগ্য নেতাকে হারায়।

মাননীয়া, আপনার সাথে আমার রাজনৈতিক আদর্শের মিল নেই। আমি আপনার পার্টি করিনা। অবশ্য একটা সময় আমি আপনার পার্টির বড় সমর্থক ছিলাম। যদিও সেটা উত্তারাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। আপনার রাজনীতির সাথে আমার দ্বিমত থাকলেও, আপনি আমার অন্যতম একজন পছন্দের নেতা। আপনার রাজনৈতিক চেতনার বিরোধী চেতনায় বিশ্বাস করি বলে, আপনার সরকারের বিভিন্ন ভুলনীতির সমালোচনা করি। সেই সমালোচনা অবশ্যই দেশের এবং জনগনের ভালোর জন্যই করে থাকি। আমার বিশ্বাস, সেই ভুলনীতি থেকে সরে আসলে, আপনার সরকার হবে দেশের সেরা সরকার। আপনি একজন তুখোর রাজনীতিক, আমি রাজনৈতিক মাঠের একজন কর্মী। আপনাকে কোন রাজনৈতিক কথা বলা আমার জন্য দৃষ্টতা! তবু আপনার সরকারের কিছু ভুল ধরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছি।

মাননীয়া, আপনি দূর্নীতি করেন, সেটা আমি কেন আপনার বড় কোন শত্রুও জোর গলায় বলতে পারবে না। কিন্তু আপনার আশপাশের চাটারদল তো আর দূর্ণীতিমুক্ত না। আপনি ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেই সব এমপি মন্ত্রীদের হিসেব নিয়েছিলন। যেটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা দৃষ্টান্ত ছিলো। পরে সেটা চলমান রাখতে না পারা আপনার একটা ব্যর্থতা বলেই ধরে নিতে হবে। যায় হোক, আপনার কাছে থাকা আপনার মন্ত্রী – এমপিদের ২০০৯ সালের সম্পদ বিবরণীর সাথে বর্তমান সম্পদ বিবরণী একটু মিলিয়ে দেখবেন আশা করি। তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন, এই ৮ বছরে তাঁরা কত বিশাল সম্পদের অধিকারী হয়েছে। সেই হিসেব থেকে আপনি বুঝতে পারবেন মন্ত্রী – এমপিদের দূর্ণীতির মাত্রা কোন পর্যায়ে আছে। শুধু মন্ত্রী – এমপি কেন, আপনার তৃণমূলের এমন কোন নেতা নেই, যিনি এই ৮ বছরে লাখ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হননি। তৃণমূলের নেতাদের দ্বৈরত্বে আপনার খাঁটি কর্মী – সমর্থকরা হয়েছেন নিঃস্ব!

মাননীয়া, আপনার সময়ে প্রচুর উন্নয়ন হয়েছে,এটা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু মানুষ উন্নয়ন মনে রাখে না, মনে রাখে সুশাসন। যেটা প্রদানে আপনার সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। উন্নয়ন তো আইয়ুব খানের সময়েও হয়েছিলো, এরশাদের সময়েও হয়েছিলো। কিন্তু এই দুই স্বৈরশাসক সুশাসন দিতে ব্যর্থ হয়েছিলো বলেই আজও তাঁরা ঘৃণ্য। তাছাড়া উন্নয়ন করলেই শুধু হয়না, উন্নয়নের সুফল জনগনের কাছে পৌঁছাতে হয়। উন্নয়নের বার্তা জনগনের কানে পৌঁছাতে হয়। আর সেটা কেবল মাইক বাজিয়ে প্রচার করে কিংবা শহর জুড়ে বিলবোর্ড দখল করে প্রচার করলেই হয়না, এজন্য নেতাকর্মীদের জনগনের কাছে যেতে হয়। আপনার তৃণমূলের নেতারা জনগনের কাছে যায় ঠিকই, সেটা জনগনের দুঃখ লাঘবের জন্য নয়, জনগনের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের জন্য। জনগন আপনাকে যতটা ভালোবাসে, আপনার প্রতিনিধিদের ততটাই ঘৃণা করে, আপনাকে জনগন যতটা বিশ্বাস করে, আপনার দলের নেতাদের প্রতি জনগনের ততটাই অবিশ্বাস, আপনাকে জনগন যতটা আপন ভাবে, আপনার নেতা কর্মীদের ততটা ভাবে না। জনগন আপনার নেতা কর্মীদের নাম শুনলে ভয় পায়!

’৭৫ এর আগস্ট ট্র্যাজেডিতে আপনি পুরো পরিবার হারিয়েছেন। স্বজনদের হারিয়ে শরনার্থীর মতো দেশে দেশে ঘুরেছেন। ৩৫-৪০ বছর পর হলেও আপনি স্বজন হত্যার বিচার পেয়েছেন। কিন্তু আপনার মতো স্বজন হারানো হাজারো মানুষ বিচার থেকে বঞ্চিত। আপনার দলের লোকজনের হাতে খুন হওয়ায় অনেক মানুষ আপনজন হত্যার বিচার থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশে আপনার চেয়ে তাদের বেদনা বেশি বুঝতে পারে, এমন কে আছে? অথচ আপনি তাদের হতাশ করছেন! আপনি তাদের হতাশ করলেও, তাঁরা আপনার দিকেই তাকিয়ে থাকে, আপনার উপরেই ভরসা করে। এজন্য রাষ্ট্রীয় সকল কর্মকান্ডে তাঁরা আপনার হস্তক্ষেপ চায়। আপনি যতটা ভরসা এবং আস্থা অর্জন করেছেন, আপনার দলের বা সরকারের দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি সেটা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তাইতো সবার আশা এবং ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল আপনি।

মাননীয়া, শিক্ষাখাতে আপনার সরকারের সকল পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। বিশেষ করে, বছরের প্রথমদিনে ১ম থেকে ৯ম শ্রেণীর সকল শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেয়ার কথা উল্লেখ করা যায়। বাংলাদেশে অন্য কোন বুর্জুয়া সরকার এমনটা চিন্তা করতো কিনা আমার সন্দেহ। কিন্তু এমন প্রশংসনীয় কাজও কিছু চাটুকারের কারণে কলঙ্কিত হয়েছে। পাঠ্যবই দলীয় প্রচারের মাধ্যম নয়, এটা ঐ চাটুকারদের মাথায় কি ছিলনা? তাছাড়া হেফাজতের মতো মৌলবাদী সংগঠনের প্রেসক্রিপশনে পাঠ্যবইতে পরিবর্তন আনাটা আপনার শুভ উদ্যোগকে বিতর্কিত করেছে!

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, হেফাজত আর মৌলবাদীদের সাথে আঁতাত করা কি খুবই জরুরী? ’৯৬ কিংবা ২০০৮ এর নির্বাচনের কোনটাতেই তো মৌলবাদীরা আপনার পক্ষে ছিলো না। এরপরও কি আপনি নির্বাচনী বৈতরণী পার হননি? হেফাজতি আর মৌলবাদীদের যতই তোয়াজ করেন, তাঁরা কি আপনার পক্ষে কাজ করবে বলে মনে করেন? আমার তো মনে হয় তাঁরা কখনোই আপনার পক্ষে ভোট চাইবে না। তাঁরা আপনার পক্ষে অপপ্রচার চালানো ছাড়া প্রশংসনীয় কোন কিছু বলবে না। আপনার একজন শুভাকাঙ্ষীত হিসেবে অনুরোধ মৌলবাদীদের সঙ্গ ত্যাগ করুন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বললে অনেক কথা বলা যায়। সমালোচনাও অনেক করা যায়। আপনার অনেক সমালোচনা আমি করেও থাকি। এরপরও আপনাকেই বেশি পছন্দ করি। আপনাকে বেশি পছন্দ বলেই হয়তো আপনার সমালোচনাও বেশি করা হয়। আপনার হাতে দেশের কোন ক্ষতি হোক, এটা কখনও চাইবো না। দেশের জন্য ক্ষতিকর সকল নীতি বর্জন করুন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করুন, মানুষকে ন্যায় বিচার পাওয়ার ব্যবস্থা করুন, মৌলবাদী আর সন্ত্রাসীদের ত্যাগ করুন, আপনার দলের নেতা কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করুন, আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, এগুলো পূরণ হলে, আগামী দশ বছরেও আপনার দল ক্ষমতা থেকে সরবে না, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কোন স্বৈরাচারিপন্থাও অবলম্ভন করতে হবে না।

পরিশেষ, মাননীয়া, আপনার সুস্বাস্থ্য আর দীর্ঘায়ু কামনা করি। আমৃত্যু দেশের সেবা করে যাবেন, এই প্রত্যাশা থাকলো। চাটুকার আর মোশতাকপন্থীদের থেকে সতর্ক থাকুন। বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে দেশ ২১ বছর অপশাসনের কবলে ছিলো, আপনাকে হারালে সেই সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে। চারপাশে শত্রুদের আনাগোনা, সবদিকেই চাটুকারদের ষড়যন্ত্র, সব মোকাবেলা করে আপনি জনগনের নেতা হয়ে উঠবেন, এই কামনা।

ইতি
আপনার একজন গুণগ্রাহী

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

30 − 26 =