‘গুম-ফেরত’ খেলায় কার কত লাভ-ক্ষতি

রনি রেজা:

গুম-অপহরণ শব্দগুলো এখন যেন ডাল ভাতের মত। প্রতিদিন খবর কাগজে চোখ বোলালেই পাওয়া যায় সংবাদ।আমাদের মন-মগজ যেন ধাতস্ত হয়ে গেছে শব্দ দুটোর সঙ্গে।সময়ের সঙ্গে গুম-অপহরণে এসেছে নতুনত্ব। আগে মুক্তিপণ দিলেই মুক্তি মিলত। অপহরণকারীদের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট; অর্থনেতিক লাভ। এছাড়া বিদ্বেষমূলক অপহরণের পর হত্যা করা হতো। অথবা খোঁজ পাওয়া যেত না তাঁদের। এখন অধিকাংশই ফেরত আসছেন। নিখোঁজের তালিকাও ছোট নয়।
অবাক করা খবর, যাঁরা ফেরত আসছেন তাঁদের কোনো মুক্তিপণ দিতে হচ্ছে না। লাগছে না কোনো টাকা পয়সা। কিছুদিন পর ফিরে আসছেন নিখোঁজ ব্যক্তি। কিন্তু ফিরে আসা কেউই তেমন কোনো ভালো খবর দিতে পারছেন না। আসার সময় সঙ্গে বয়ে আনছেন কিছু আতঙ্ক। কিছু বলছেন না। যতটুকু বলছেন তাতে রহস্যই বাড়ছে। বাড়ছে প্রশ্নও।

হংকংভিত্তিক এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন (এএইচআরসি) ও দেশীয় একটি মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট বছর নয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৩৯৫ জন নিখোঁজ হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের মধ্য থেকে ৫২ জনের লাশ পাওয়া গেছে। ফিরে এসেছেন প্রায় ২০০ জন। বাকীদের খোঁজ কেউ জানেনা। সম্প্রতি ফিরে এসেছেন কয়েকজন নিখোঁজ ব্যক্তি। সাংবাদিক উৎপল দাস, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান সিজার, ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ কুমার রায় ও গিয়াস উদ্দিন।

তাদের নিখোঁজ হওয়া ও ফেরার ধরন প্রায় অভিন্ন। অবরুদ্ধ থাকার বর্ণনাও কাছাকাছি। কীভাবে অপহরণ হয়ে কোথায় অবরুদ্ধ ছিলেন তারা, সেসব প্রশ্নের জবাব মিলছে না। গত বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে বনশ্রীর বাসায় ফিরেছেন মোবাশ্বার হাসান সিজার। তিনি বলছেন, টাকার জন্য তাঁকে অপহরণ করা হয়েছিল। কিন্তু অপহরণের পর পরিবার বা আত্মীয় স্বজনের কাছে কোনো মুক্তিপণ দাবি করেনি কেউ! টাকা পাওয়ার চেষ্টাও করেনি। তাহলে অপহরণকারীদের লাভটা কোথায়? এই যে ৪৪ দিন তাঁকে রাখা হলো। খাওয়ানো হলো এটা কোথা থেকে আসল? অপহরণকারীরা কি এ ব্যবসায় এতটাই অপরিপক্ক? লোকসান হবে যেনেও বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ালেন? বা এই যে মোবাশ্বার হাসান ফিরলেন এতে কার কতটা লাভ বা ক্ষতি হলো? গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী এখনও স্বাভাবিক হতে পারেননি সিজার। তিনি আতঙ্কগ্রস্ত। কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবেন তাও কেউ বলতে পারছেন না। বা বলতে পারবে না। আদৌ আর স্বাভাবিক হবেন কি? আজীবনের জন্য স্বাভাবিকত্ব হারালেন সিজার। তিনি বলেছেন, বৃহস্পতিবার রাতে চোখ বেঁধে তাঁকে একটি গাড়িতে তুলেছিল অপহরণকারীরা। এরপর বিমানবন্দর সড়কের কোনো এক জায়গায় চোখ বাঁধা অবস্থায় গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়। তারা বলে, তুই চলে যা। পেছনের দিকে তাকালে মেরে ফেলব। এই মেরে ফেলার হুমকি কত সময়ের জন্য। জীবনেও কি এ হুমকি থেকে মুক্তি মেলা সম্ভব? প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষভাবে জিম্মি অবস্থায়ই কাটাতে হবে জীবন। যতদিন বাঁচেন, ততদিন এভাবেই, মুখে কুলুপ এঁটে বাঁচতে হবে। আরেক ‘গুম-ফেরত’ সাংবাদিক উৎপল দাস। ঘনিষ্ঠতা থাকায় তাঁর সম্পর্কে যতটুকু জানি; তিনি চঞ্চল প্রকৃতির। অল্পতে ন্যুয়ে পড়ার মতো নয়। সেই উৎপলও বিষণ্ন। কিছুই ঠিকমত বলছেন না। আগে যারা উৎপলকে দেখেছেন তারা সহজেই বুঝতে পারছেন আগের উৎপল আর ফিরে আসা উৎপলের পার্থক্য। যারা নিয়ে ৭০ দিন খাওয়ালেন। রাখলেন। তাদের কতটুকু লাভ হয়েছে জানা নেই। তবে উৎপল যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা সাধারণরাও কি ক্ষতির সম্মুখীন হইনি?

গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ১২টার দিকে উপজেলার আধুরিয়া শাহজালাল সিএনজি স্টেশনে উৎপল দাসকে উদ্ধার করে ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক শহীদুল ইসলাম। তাঁকে উদ্ধারের খবর পেয়ে রাত আড়াইটার দিকে ভুলতা পুলিশ ফাঁড়িতে যান পরিবারের সদস্যরা। তখন উৎপল বলেছিলেন, আমাকে চোখ বাঁধা অবস্থায় তিন-চার ঘণ্টা একটা গাড়িতে করে ঘোরানো শেষে এখানে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর বেশি কিছু আমি জানি না। আমাকে এখানে নামিয়ে দেওয়ার সময় আমার চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে তাঁরা বলেছেন ‘আমরা যখন গাড়ি টান দেবে তখন তুই চোখ খুলবি। আমি যখন সিএনজি স্টেশনে ঘোরাফেরা করছিলাম, তখন ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক শহীদুল ইসলাম গিয়ে আমাকে সিএনজি স্টেশন থেকে নিয়ে আসেন। ওই এতটুকুই। কারা, কী কারণে অপরহণ করেছেন তার স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারছেন না। অথবা দিচ্ছেন না। অজানা শঙ্কা ঘিরে রেখেছে তাঁকে। এ শঙ্কা থেকে কি আদৌ মুক্ত হতে পারবেন? আর কি কখনও লিখতে পারবেন আগের মতো করে? নিশ্চয়ই না। এটা কি দেশের জন্য, জাতির জন্য ক্ষতির নয়? এ তো গেল অপহরণকারী ও গুম হওয়াদের লাভ ক্ষতির হিসাব। এবার আসা যাক আমাদের সাধারণদের লাভ ক্ষতির হিসাবে। উৎপল নিখোঁজের সংবাদ প্রকাশের পর কি অন্য সাংবাদিকের মনে একটু হলেও ভীতি উঁকি দেয়নি? একবারের জন্যও কলম আটকেনি? সাধারণের মনে গুম আতঙ্ক বাড়েনি? সব মিলিয়ে অপহরণকারীদের লাভের হিসাব অজানা থাকলেও আমাদের ক্ষতির হিসাবটা সহজেই অনুমেয়। এ থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন ‘গুম-ফেরত’দের সহায়তা। তারা হয়ত কিছু তথ্য দিতে পারবেন। তবে এর আগে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রেরই। উৎপলকে সঠিক তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেছেন, সাংবাদিক উৎপল দাসের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে রহস্য উদঘাটনে পুলিশ পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে। আমরা জানি পুলিশ চাইলে সে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু সঠিক তথ্য পেতে উৎপলের নিরাপত্তার দায়িত্বও নিতে হবে। দূর করতে হবে তাঁর শঙ্কা। দল-মতনির্বিশেষে নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আর কোনো মানুষ নিখোঁজ হওয়ার খবর আমরা দেখতে চাই না। আর মিলাতে চাই লাভ-ক্ষতির হিসাব। এ বিশাল ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিবে বলেই আশা রাখি।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
E-mail: [email protected]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 2 =