বোতলসেবী-বাংলিশদের থার্টি ফার্স্ট নাইট

তোমাদের কখনও বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখে আর বৈশাখীমেলায় দেখি নাই! তোমাদের কখনও রমনা-বটমূলে দেখি নাই! তোমাদের কখনও রবীন্দ্রসরোবরে ছায়ানটের অনুষ্ঠানেও দেখি নাই! তোমরা আসলে কারা? আর কী চাও আমাদের এই রক্তভেজা সোনার বাংলায়?


বোতলসেবী-বাংলিশদের থার্টি ফার্স্ট নাইট
সাইয়িদ রফিকুল হক

তোমাদের কখনও বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখে আর বৈশাখীমেলায় দেখি নাই! তোমাদের কখনও রমনা-বটমূলে দেখি নাই! তোমাদের কখনও রবীন্দ্রসরোবরে ছায়ানটের অনুষ্ঠানেও দেখি নাই! তোমরা আসলে কারা? আর কী চাও আমাদের এই রক্তভেজা সোনার বাংলায়?
তোমাদের সঙ্গে আমাদের শ্বাশ্বত স্বভাব-চরিত্রের কোনো মিল নাই। আমাদের বাঙালিয়ানা চিরসুন্দর সমাজব্যবস্থারও কোনো মিল নাই। তোমাদের আদিনিবাস কোথায়?

তোমরা নর্থসাউথে পড়, তোমরা ইস্ট ওয়েস্টে পড়, তোমরা শান্ত মারিয়ামে পড়, তোমরা ব্রাকে পড়…! তোমাদের বাংলা-নববর্ষ ভালো লাগে না! আর পছন্দও হয় না! তোমরা নিজেদের সবসময় মডারেট-মুসলমান ভাবো! আবার জঙ্গিপনাও করো! আবার বাংলা-নববর্ষ ভুলে ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ কায়েম করার চেষ্টা করো!
তোমরা থাকো বাংলাদেশে। কিন্তু বাংলাদেশের কোনোকিছু তোমাদের ভালো লাগে না। তোমরা, আমাদের দেশের নতুন এক প্রজাতি। তোমাদের এই প্রজাতির আদর্শ-পিতা হলো—ড. তুহিন মালিক, ড. আসিফ নজরুল, মরহুম ড. পিয়াস করিম ইত্যাদি। আর এরা সবাই চিন্তাচেতনায়, মননে, বিশ্বাসে আর আদর্শে সবসময় সাম্প্রদায়িকপশুদের পথিকৃৎগং ও শয়তানের পালিতপুত্র। এদের কাছে বাংলা-নববর্ষ ‘হিন্দুয়ানী’ মনে হয়! আর ইংরেজি নতুন বছর পালন খুব জায়েজ! আর থার্টি ফার্স্টের নাচানাচি খুব হালাল!
তোমরা মডারেট-মুসলমান। তাই, সবসময় তোমাদের ঈমানরক্ষার জন্য এতো আন্দোলনসংগ্রাম! তোমাদের বাঙালিয়ানা ভালো লাগে না। বাংলা-গান ভালো লাগে না, বাংলা-সংস্কৃতি ভালো লাগে না! কিন্তু ইংরেজি-নববর্ষ বড় ভালো লাগে! থার্টি ফার্স্ট নাইট আরও ভালো লাগে! ফাইভস্টার হোটেলে নাচানাচি তোমাদের খুব ভালো লাগে!

তোমাদের এখনও বাঙালির সাধারণ পোশাক ভালো লাগে না। তোমাদের কাছে শাড়ি, ফতুয়া, পায়জামা-পাঞ্জাবি ভালো লাগে না। তোমাদের ভালো লাগে শুধু টি-শার্ট আর জিন্সপ্যান্ট!
তোমরা মডারেট-মুসলমান! তোমাদের কাছে বাঙালির চিরায়ত পোশাকআশাক শাড়ি-লুঙ্গি-ফতুয়া হারাম মনে হয়! কিন্তু সামান্য টি-শার্ট বড় ভালো লাগে! আর ছেলেমেয়েদের একসঙ্গে টি-শার্ট ও জিন্স পরে অর্ধনগ্ন-নৃত্য আরও ভালো লাগে! তোমরা খুব ভালো মডারেট-মুসলমান!

থার্টি ফার্স্ট নাইটে ছেলেমেয়ে একসঙ্গে জড়াজড়ি করা তোমাদের বড় ভালো লাগে! তোমরা টি-শার্ট ও জিন্সের উপর আবার হিজাব পরতেও খুব পছন্দ কর! তোমরা দেখি খুব খান্দানি-মুসলমান! আর খুব ভালো তোমাদের ধর্মজ্ঞান! কিন্তু তোমাদের এখনও আমাদের রবীন্দ্রসঙ্গীত ভালো লাগে না! রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলে তোমাদের নাকি ঈমান চলে যাবে! তোমাদের ঈমান আবার কচুপাতার পানি! তাই, খুব সাবধানে ধরে রাখতে হয়। আমাদের জাতীয় দিবসে প্রভাতফেরি তোমাদের কখনও ভালো লাগে না! রাষ্ট্রীয় শহীদবেদীতে ফুল দেওয়া তোমাদের কাছে ‘বিদআত ও হারাম’ মনে হয়! কিন্তু থার্টি ফার্স্ট নাইটে স্বল্পপোশাকে মদের বোতল নিয়ে বন্ধুবান্ধবীদের সঙ্গে রাতভর ‘মাস্তি’ করতে খুব জায়েজ আর একেবারে হালাল মনে হয়! তোমরা আবার খান্দানি-মুসলমান! তোমাদের ইসলাম তো আবার তোমাদেরই পিতৃভূমি-পাকিস্তান থেকে আগত। তাই, তোমরা যা করবে, শুধু তোমাদের জন্য তা-ই জায়েজ! তোমাদের স্বর্গীয় পিতাগণ মোহাম্মদ আলী জিন্না, জেনারেল আইয়ুব খান, জেনারেল ইয়াহিয়া খান, জেনারেল টিক্কা খান ইত্যাদিও মদ খুব পছন্দ করতো। আর তারাও তো থার্টি ফার্স্টে খুব মৌজ-মাস্তি করতো। কিন্তু তারা বাংলা-মুলুকে রবীন্দ্রসঙ্গীত, রবীন্দ্রসাহিত্য, পহেলা বৈশাখ বা বাংলা-নববর্ষ ও বাংলা-গানকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলো! তোমরাও, তোমাদের পিতার মতো খুব আদর্শবান হয়েছো! তাই, তোমাদের বাংলা-নববর্ষে কোথাও খুঁজে পাই না! কিন্তু এখন থার্টি ফার্স্ট নাইটে তোমরা খুব উজ্জীবিত। আর একবোতল মদ হাতে যাচ্ছো বুঝি কোনো বন্ধুর বাড়িতে কিংবা পার্টিতে!
তোমাদের লজ্জা করে না এসব করতে? তোমরা না হাজীসাহেবের ছেলে-মেয়ে! তোমাদের মডারেট-হাজী মুসলমান বাবারা বলেছে, “বাংলা-নববর্ষ হিন্দুদের!” তোমরা তা-ই মেনে নিয়েছো। কিন্তু এখন আবার ইংরেজি-নববর্ষ কেন? পাকিস্তানীদের মতো ইংরেজরাও বুঝি তোমাদের বাবা হয়? আর তাই, একবোতল মদ হাতে যাচ্ছো বুঝি বন্ধুর বাড়িতে কিংবা পার্টিতে?

আমাদের বাংলা-নববর্ষে কী সুন্দর শালীনতার মধ্যে এতো-এতো আয়োজন! তবুও তোমাদের এসব ভালো লাগে না। বাংলা-নববর্ষ দেখলে তোমাদের কলজে জ্বলে! হিন্দুসম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ হোলি-উৎসব দেখলেও তোমাদের কলজে পুড়ে একেবারে খাক হয়ে যায়! আর ‘থার্টি ফার্স্ট নাইটে’র নামে উদ্দাম-নৃত্য এবং যাবতীয় বেলেল্লেপনা খুব ভালো লাগে! ধর্মগ্রন্থ তোমাদের হাতের মুঠোয়! তাই, তোমাদের স্বার্থে এসব জায়েজ ও হালাল!

বোতলসেবী-বাংলিশদের এই ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ আসলে আমাদের বাঙালি-জাতিসত্তার প্রতি অশ্রদ্ধারই শামিল। আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যে রয়েছে পহেলা বৈশাখের মতো ইতিহাসসমৃদ্ধ সংস্কৃতি। তা সত্ত্বেও, এসব উপেক্ষা করে (স্বদেশীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে) একটি শ্রেণী আজ ‘থার্টি ফার্স্ট নাইটে’র মতো অপসংস্কৃতিকে ৩০লক্ষ শহীদের বাংলাদেশে বাস্তবায়নের অপচেষ্টা করছে। আর আমাদের সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাতেরও অপচেষ্টা করছে। কিন্তু এরা কখনও সফল হতে পারবে না। ধিক্ এদের, ধিক্।

হে পাকিস্তানীবংশের ধারক-বাহক, তোমরা আর পশু হয়ে থেকো না। তোমরা এবার মানুষ হও। বাংলাদেশে বসবাস করে এবার বাঙালি হও।

(সাধারণ যেকোনো মানুষ ইংরেজি নতুন বছরে যে-কাউকে শুভেচ্ছা জানাতে পারে। নীরবে তারা একে অপরকে ইংরেজি নতুন বছরে অভিনন্দনজ্ঞাপন করতে পারে। কিন্তু যারা বাঙালি-সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ নামে অপসংস্কৃতি চালু করেছে—আমরা তার বিরুদ্ধে। সবাইকে ইংরেজি নতুন বছরের শুভেচ্ছা।)

সাইয়িদ রফিকুল হক
৩১/১২/২০১৭

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

52 − = 50