অন্তর্দহন

টিউশনী থেকে ফিরছে মতিউর। আজ পড়ানো হয়নি কিছুই। সারাক্ষণ ফেসবুকে মতিউরের ফেইক আইডিটি নিয়ে কথা হয়েছে। খালেদ যে কথা শুনিয়েছে তা বেশ ভয়ংকর। একটা মহল ফেইক আইডিটিকে পুজি করে মতিউরকে নিয়ে শহরে দাঙ্গা লাগাতে চায়। তারা এই অভিযোগ করবে যে, মতিউর জামাত নেতার ছেলে হয়ে হিন্দু আইডি দিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে চায়, অথচ মতিউর জানে যে সে নাস্তিক। নাস্তিকতা চর্চার জন্য বছর তিনেক আগে এই ফেইক আইডি খুলেছিল। এদেশে মুসলমান হয়ে মুক্তচিন্তা করাটা কেউ মেনে নেয় না, রীতিমত ভয়ংকর কাজ।

যন্ত্রনাটা মতিউরকে কুড়ে কুড়ে খায়। তার বাবা একাত্তরের রাজাকার। তখন ইসলাম রক্ষার জন্য দেশের মানুষদের বিরুদ্ধে লড়েছেন। তাদের স্বপ্ন ছিলো বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সাথে যুক্ত রাখা। এর জন্য পাকিস্তানী আর্মিকে সাহায্য করেছেন। সাহায্য করার নামে দেশে চালিয়াছেন লূটপাট। কাফির নিধনের নাম করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছেন অকপটে, ইসলামের সৈনিকদের খেদমতের নামে জানোয়ারদের হাতে তুলে দিয়েছেন এদেশের মা-বোনদের। মতিউর যখন এসব নিয়ে ভাবতে যায় তখন বাবার সাথে সাইকেলে চড়ে স্কুলে যাবার ছবিটা চোখের সামনে চলে আসে, চলে আসে রাগ করে বাড়ি পালানোর পর বাবার ছল ছল চোখখানি। এই বাবাকে রাজাকারের ভূমিকায় মেনে নিতে পারে না মতিউর। কিন্তু , এটাই রূঢ় বাস্তবতা। এক সময়ের কুখ্যাত রাজাকার তার বাবা, বর্তমানে জামাতের একজন বড় মাপের নেতা, দেশে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠায় লিপ্ত।

জামাত শব্দটার সাথে মতিউরের পরিচয় ঘটে ক্লাশ ফোর কিংবা থ্রীতে পড়ার সময়। তখন সে মসজিদে পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো, দেখতো মসজিদে একদল মানুষ কোথা থেকে যেন আসে আর দু তিন দিন থেকে আবার কোথায় যেন চলে যায়। লোকে তাদের খুব যত্ন-আত্তি করতো, আর বলতো মসজিদে জামাত আসছে, জামাত আসছে। তেমনি একদিন, একটি জামাতকে তাদের মসজিদে আসতে দেখে দৌড়ে বাড়িতে বাবার কাছে গিয়ে বলে, বাবা, বাবা জামাত আসছে, জামাত আসছে। বাবা বাড়ির বাইরে এসে তাবলীগের লোকগুলোকে দেখে বলেছিলেন এরা প্রকৃত জামাত না, এরা ইসলামের ক্ষতি করছে। আসল জামাত হলো জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। জামায়াতে ইসলাম দেশে ইসলামী শাসন কায়েম করবে। মতিউর বাবার কথা অকপটে মেনে নিতো। কারণ, কোরান শিক্ষার জন্য মসজিদের মক্তবে যাওয়ার কিছুদিন পরই তাকে বাড়িতে নিজে কোরান শিক্ষা দিতেন, বলতেন মক্তবের হুজুরেরা সঠিকভাবে কোরান শিক্ষা দিতে পারে না, তাদের উচ্চারণ ভূল হয়। পরে অন্যান্য লোকের কাছে তার কোরান তেলাওয়াত খুব প্রসংশিত হওয়ায় বাবার প্রতি মতিউরের এই আস্থা তৈরী হয়।

বাবার স্বপ্ন ছিলো মতিউর একসময় এদেশে জামাতের একজন বড় মাপের নেতা হবে, তাই তার নাম মতিউর রহমান নিজামীর নামে নামে রেখেছেন। ভবিষ্যত পৃথিবীর বিজ্ঞানে ইসলামের শ্রেষ্টত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য মতিউরকে মাদ্রাসায় ভর্তি না করে করেছেন স্কুলে। মতিউরও সেভাবেই বড় হতে যাচ্ছিল। কিন্তু বাধ সাধে স্কুলের বিজ্ঞাণ আর ধর্ম বই নিয়ে। তখন ক্লাশ থ্রীতে পরে মতিউর। তাদের ধর্ম বইয়ে বৃষ্টির কারণ হিসেবে লিখেছে মিকাইল(আঃ) ফেরেশতার কথা, আবার বিজ্ঞান বইয়ে বৃষ্টির কারন বুঝানোর জন্য পানিচক্র ব্যাখ্যা করেছে, একবারবো মিকাইল (আঃ) এর কথা লিখেনি। এটা নিয়ে বাবার সাথে কথা বললে, বাবা বলেছিলেন, ফেরেশতাকে দেখা যায় না, তাই বিজ্ঞাণও দেখতে পায় নি, বড় হলে আরো জানতে পারবে। দুদোল্যমান অবস্থায় বিজ্ঞানকেই বাস্তব মনে হয়েছিল তখন। এই প্রশ্নের মাধ্যমে মূলত তার জীবনে অনুসন্ধানের শুরু হয়, ধর্ম নিয়ে কিছু জানতে চাইলে লোকে জিহবায় কামড় দিয়ে বলতো, এসব বলে না, পাপ হয়, আরো বড় হও, বুঝতা পারবে। বয়সটা তখন খুব কম ছিল বলে রক্ষা, এখন বুঝতে পারে এসব প্রশ্ন করলে কি শাস্তি লোকে কি দিবে।

বাবার স্বপ্নকে মিথ্যে করে দিয়ে আজ মতিউর নাস্তিক, ধর্ম কর্মের ধার ধারে না। বাবা তাকে শিবির করার জন্য বলতেন। বলতেন শিবির করার মাধ্যমে জীবন গড়া যায়, শিবিরের ছেলেরা চারিত্রিক দিক দিয়ে সমাজের আর দশটা ছেলের থেকে হাজারগুন ভাল, মানুষ হতে গেলে শিবির করা ছাড়া কোন উপায় নেই। কিন্তু শিবির করতে গিয়ে প্রথম যে বিপত্তিতে পরে তা হলো সমকামিতা। এক এক করে তিনজন দ্বায়ত্বশীল বড় ভাইয়ের দ্বারা সমকামীতার শিকার হয়, তখন অষ্টম শ্রেনীতে পড়তো সে। তার স্পষ্ট মনে আছে সব্বেদারী নামে একটা প্রোগ্রাম সারারাত চলতো। এমন একটা প্রোগ্রামে গিয়ে তার ঘুম পেয়ে গেলে একজন বড়ভাইয়ের সাথে ঘুমাতে যায়, এখানে জীবনে দ্বীতিয়বার সমকামীতার শিকার হয়। প্রথমবার এই অভিজ্ঞতা হয় ক্লাশ ফাইভে পড়ার সময়। তখনই মূলতঃ ইসলাম ধর্মের প্রতি বিরুপ ধারনা শুরু হয়। সেদিন দুপুরবেলা তাদের পাশের বাড়ির হুজুরের সাথে গল্প করতে গিয়েছিল মতিউর, তিনি তাদের গ্রামের মসজিদে ইমামতি করেন । গল্পে গল্পে এক সময় হুজুর তাকে বিছানায় আরাম করে শুয়ার জন্য ডাকেন, মতিউরও শুয়েছিল। ততদিনে মতিউর অবশ্য বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে সেক্স সম্পর্কে ধারনা পেয়ে গেছে, তখনই সে জানতো পুরুষ আর নারী কেন তৈরী হয়েছে। নারী যে পুরুষের চরিত্র গঠনে প্রধান বাধা, তা সে শুনেছে। কিন্তু কোনভাবেই হুজুরের বিষয়টা সে মেলাতে পারেনি সেদিন, একজন হুজুর কিভাবে এই কাজ করতে পারেন? না কি ইসলাম মানুষকে ভাল রাখতে পারে না? এভাবে শিবিরের তিনজন বড়ভাইয়ের সাথে মতিউরের সমকামিতা হয়ে যাওয়ায় শিবিরের প্রতি চরম ঘৃনা জন্ম নেয়। কিন্তু পারিবারিক কারণে শিবির ছাড়তে পারে নি তখন, তবে শিবিরে তার পদোন্নতি হয় নি কোনদিন। অনেকদিন চেয়েছে বাবাকে শিবির ছেড়ে দেয়ার কথা বলবে, কিন্তু বাবার পাহাড়সম ব্যক্তিত্বের কাছে কোনদিন প্রকাশ করতে পারে নি।

প্রশ্নভারে জর্জরিত মতিউর স্রষ্টা, ধর্ম নিয়ে অনেক পড়াশোনা করে। যতই পড়ে ততই ধর্মের প্রতি ভক্তি কমে যায়, নিজে নিজেই উপলব্ধি করে আসলে স্রষ্টা বলতে কিছুই নেই। কোটি বছরের পৃথিবীতে, লক্ষ বছরের মানুষের ইতিহাসে ধর্ম একটা সাংস্কৃতিক উপাদান ছাড়া কিছুই নয়। স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্পর্কে বুঝার পর পরে যায় আরেক ধন্ধে। যদি স্রষ্টা না থাকে তাহলে জীবনের উদ্দেশ্য কী? বড় জটিলতায় আবদ্ধ হয়ে যায় জীবন, ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী তো একটা লক্ষ থাকে বেহেস্ত বা স্বর্গ প্রাপ্তির। কিন্তু, নাস্তিক মতিউরের জীবনের উদ্দেশ্য কি হতে পারে? খুজতে খুজতে এক সময় দেখে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পৃথিবীটা আরো সহজ করে যাওয়াই জীবনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, আর দেশের উন্নতির মাধ্যমেই তা করা সম্ভব। তারপর থেকে দেশের ইতিহাস নিয়ে আরো পড়াশোনা করে সে। তখন তার কাছে মুক্তিযুদ্ধই হয়ে উঠে প্রেরনার আসল শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জামাত নামের একটা দগদগে ঘাকে দেখে তাদের প্রতি ঘৃনায় কুকড়ে যায়। জামাতের প্রতি জন্ম নেয় মারাত্নক ঘৃনার।

কিন্তু বাবার সামনে গেলে সে কিছুই মেলাতে পারেনা। তার বাবাকে এখন পর্যন্ত কোন খারাপ কাজ কিংবা দুর্নীতিতে জড়াতে দেখেনি। কিন্তু এটা তো সত্য, জামাতিরা বাংলাদেশকে ভালবাসে না, সেও কি ক্রিকেট খেলায় এক সময় পাকিস্তানকে সাপোর্ট করতো না? তার পরিবারের সবাই এখনো পাকিস্তানকে সাপোর্ট করে। দেশকে জানার পর তার এক সময় খুব কান্না পেত, এ কোন পরিবারে জন্ম হলো আমার? দিনগুলো তাকে এখনো পীড়া দেয়, একবার বাংলাদেশ পাকিস্তান খেলায় তাদের পরিবার পাকিস্তানের পক্ষে ছিলো। পাকিস্তান হেরে যাওয়ায় তাদের সে কি মন খারাপ !! মতিউর সেদিনের জন্য বাংলদেশের কাছে প্রতিনিয়ত ক্ষমা চায়। জানে দেশ প্রানী নয়, অনুভবের ক্ষমতা দেশের নেই, তবুও ক্ষমা চায়।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ায় কার কেমন লেগেছিল তা জানে না, কিন্তু মতিউর খুশি হয়েছিল এটা বলতে পারে। সাইদী রাজাকারকে গ্রেফতারের পর একা একা মিষ্টি খেয়ে পুলক না পেলেও, খুশিতে তার আর কিই বা করার ছিল? মজার বিষয় হলো সেদিন বিকেলে শহরের এক রাস্তা থেকে সেও গ্রেফতার হয়ে শিবির কর্মী হিসেবে, কিন্তু সে নাস্তিক। পরদিন জামিনে ছাড়া পেলেও জামাত নেতার ছেলে হিসেবে সে ততক্ষনে পরিচিতি পেয়ে গেছে, ফলে কেউ তাকে আর মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মানুষ হিসেবে বিশ্বাস করে না। লোকে না করুক, সে তো আর লোক দেখানোর জন্য দেশকে ভালবাসে নি! বাচ্চু রাজাকারের রায়ের পর আবারো নিভৃতে মিষ্টি খাওয়া ছাড়া তার মনে অন্য কিছু আসেনি।

৫ই ফেব্রুয়ারী সকাল থেকেই অপেক্ষায় থাকে মতিউর, কখন কাদের মোল্লার ফাসির রায়টা শুনবে। কিন্তু চরমভাবে হতাশ হয় যাবজ্জীবন রায় শুনে। এতটাই হতাশ হয় যে নাওয়া খাওয়া ভুলে যায়, শুরু হয় ফেসবুকে স্ট্যটাসের পর স্ট্যাটাস। তর্ক বিতর্কের মাঝে গনজাগরনের বিস্ফোরণ তাকেও আন্দোলিত করে, আশা দেখায় কলংকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার। নিজেদের এলাকার জন্য ফেইক আইডি থেকে ফেসবুকে অনলাইন ইভেন্ট খুলে যখন ঘুমাতে যায়, তখন রাত তিনটা, খেয়াল হয় দুপুর থেকে খাওয়া হয়নি কিছুই। পরদিন এলাকার গনজাগরন মঞ্চে অংশ নেয় সবার অগোচরে, কেউ তখনো জানে না ফেইক আইডিটা সম্পর্কে। ধীরে ধীরে গনজাগরন রুপ নেয় গনবিস্ফোরনে।

ফেইক আইডিটা খুলা হয়েছিল মুলত মুক্তচিন্তার চর্চার জন্য। এর মাধ্যমে ঢাকার অনেক মুক্তমনা বন্ধুর সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠে, তাদের সাথে দেখাও হয় কয়েকবার। এখন গনজাগরনের কারনে এলাকার কিছু মানুষও তার এই আইডিটার ব্যপারে জেনে যায়। মতিউরের কাছে ভালই লাগছিল, পরিচিত মানুষজনেরা তার চিন্তাভাবনা সম্পর্কে জানছে, তাদের কাছে তার নিজের ধারনাগুলো প্রকাশ পাচ্ছে। মতিউরের নাস্তিকতাও এর সাথে সাথে প্রকাশ পায়। কিন্তু এটি যে এতটা চিন্তার কারণ হবে তা আগে বুঝতে পারেনি সে।

টিউশনির ছাত্রটি ফেইক আইডির ব্যপারে যে কথা বললো তা যদি সত্যি হয়,বেশ একটা খারাপ অবস্থায় পড়তে হবে তাকে। একদিকে ধর্মান্ধ মানুষগুলো তার পেছনে লেগে যেতে পারে, অন্যদিকে বাবার সামনে যাবে কিভাবে? তার বাবা যদি বলে বসেন ” তুমি নাস্তিক হইছো? রাজাকারের ফাসি চাও? রাজাকারের ফাসির জন্য রাজপথে যাওয়ার দরকার কি? ঘরেই তো আছে, ঘর থেকেই শুরু কর।” তখন কি বলবে সে? এতদিন গনজাগরনের সাথে ছিল সাংবাদিকতার দোহাই দিয়ে। এখন কি বলবে? বাবার মুখোমুখি হয়ে তো কনদিন কথা বলতে পারেনি!! আবার তার ফেইসবুক আইডিও বন্ধ করতে পারবে না। আইডিটিতে অনেক পুরনো বন্ধু, বিজ্ঞান, সমাজ, ধর্ম নিয়ে অনেক মূল্যবান নোট, কথা, কবিতাগুলোর কি হবে? কি হবে দেশের সমস্যাগুলো নিয়ে লিখা শব্দমালার? তবে কি মতিউর চুপ করে যাবে, ফেইক একাউন্ট ডিএকটিভ করে দেবে? এ কোন অন্তর্দহনে পরে গেলো মতিউর?

পৃথু স্যান্যাল (২৪/০৫/১৩)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “অন্তর্দহন

  1. অসাধারণ লাগল। ব্যক্তি মানুষের
    অসাধারণ লাগল। ব্যক্তি মানুষের বিচার ব্যাক্তি মানুষকে দিয়েই করা উচিত, এই বোধটা আবার অনুভব করলাম।
    ধন্যবাদ সুন্দর লেখাটির জন্য।

  2. লেখক উত্তম পুরুষে, নাকি মতিউর
    লেখক উত্তম পুরুষে, নাকি মতিউর দ্বিধায় ভুগছে। প্রথমটা হলে সহজাত ব্যাক্তিক অনুভুতি হিসেবে আরোপিত হওয়াটাকে নাহয় এক্সকিউজ করা যায়। দ্বিতিয়টা হলে …….

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 15 = 17