তবুও মানুষ লিখে যায় মানুষ তৈরির তরে


লিখলে মানুষের মৃত্যু হয়, একথাটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আজ ভয়াবহ রকম সত্যে পরিণত হয়েছে। লেখার অবশ্য একটা ধরন আছে। রকম আছে। অনেকে আছেন সুবিধাবাদী গোছের, এদিকেও না ওদিওে না। যাদের ভিজেও পাঁচ সের, শুকনোও পাঁচ সের। এইসব কতিপয় সুবিধাবাদী-কপট-বেইমান লেখক যারা তারা সর্বকালেই প্রশংসিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে এইসব বসন্তের কোকিলদের লেখায় চামচামি-চাতুরতা-মিথ্যাচার আর অনাকাঙ্খিত প্রশংসায় ভরা। সত্য ইতিহাস বলতে এদের লেখায় কোনকিছু পাওয়া যায় না। তবুও এরা এই শ্রেণীর প্রজাতিরা বেঁচে আছে দাপটেই। কারো মৃত্যুই আসলে আমাদের কাম্য নয়। দেশের জন্যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী হয়ে, প্রগতির কথা বলতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ঝরে যাচ্ছে বাংলাদেশের হৃদয় হতে এদেশের সূর্যসন্তানেরা। আহ, কি যাতনা, কি মর্মবেদনা তা দেখবার কেউ নেই।

প্রকাশ্য দিবালোকে জাগৃতির প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হয়েছে। মানুষের ভিতরে ঢুকে হত্যা করে জাতশিকারী আবার বেরিয়ে গেছে বীরদর্পে জনতার ভিতর দিয়েই। একটি স্বাধীন দেশে এ এক দানবীয়-মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। দীপনের দোষ হলো কিছুদিন আগে নিহত হওয়া ব্লগার অভিজিতের ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ ও ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ গ্রন্থ প্রকাশ করা। ভেবে পাই না কি করে এটা হয়, কিভাবে এটা হয়? দেশে গত আড়াই বছরে ১০জন ব্লগার নিহত হয়েছেন। কিছুকাল আগে ২জন বিদেশী নাগরিক খুন হয়েছেন। ঢাকার হোসেনী দালানে গ্রেনেড হামলায় ঝরে গেছে ২টি তাজা প্রাণ। তবুও ঘুম ভাঙলো না প্রশাসনের। তাহলে কি মানুষ আর লিখবে না? লিখবার দিন কি তাহলে ফুরিয়ে এলো। কিন্তু বিস্ময়কর তবুও মানুষ লিখে যায়। তবও মানুষ তৈরি হয়। তবুও এখানে কতিপয় মানুষ জেগে রয়। কিন্তু কাদের জন্যে এই জাগরণ আর অকারণ মৃত্যু? মানুষের জন্যেই তো। কিন্তু কেউ তা বুঝল না। বিশেষত প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা।

মৃত্যুর খেলা বাংলাদেশে নতুন নয়, এদেশের ইতিহাসে মৃত্যু হয়ে যায় রাজনীতি। লাশের মিছিল নিয়ে চলে রাজনীতির বিভৎস খেলা, আবার তৈরি হয় নতুন লাশ। এদেশে এই লাশের রাজনীতি বন্ধ হবে কবে? মুর্খদের কাছে প্রচলিত রয়েছে যারা ব্লগে কাজ করেন, তারা নাস্তিক। সরকারও কি তাই মনে করেন কিনা? যদি তাই-ই হয় তাহলে যারা ইসলামের নামে নানা ব্লগ খুলে বিভিন্ন মিথ্যাচার চালায় তারা কি? সরকারের দৃষ্টিতে তারা কি তাহলে আস্তিক? দেখুন, নিজের ঢোল নিজে তো পেটাতে পারি না, তা উচিতও নয়। আত্মকথন পছন্দ করি না। আমরা নিজেরাও এই সরকারের ভালো চাই।

এখন আসল কথা। প্রতিনিয়ত হতাশ হচ্ছি, ভাবনায় বেলা যায়। দেশে কি কোনো প্রশাসন যন্ত্র নেই, নেই কি রাষ্ট্রযন্ত্র? এতো বাহিনির আসলে কাজ কি? নানাবিধ বাহিনির পিছনে সরকারের সবচেয়ে খরচ বেশি। অথচ তাদের ভূমিকা নগন্যই মাত্র। প্রকাশ্য দিবালোকে লোকবলসহ মানুষ খুন হয় হরহামেশা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ কি?

দেশবাসীর কাছে এখন সবচেয়ে বিতর্কিত ও ব্যর্থ হচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও এই মন্ত্রণালয়। এদের সরিয়ে দিয়ে চৌকষ-বুদ্ধিদীপ্ত-আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন-দেশপ্রেমী কোনো এক ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিলে ভালো হবে। তা না হলে দেশের প্রতি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সরকারের যে অবদান তা মানুষ আস্তে আস্তে ভুলে যাবে। অকৃতজ্ঞ বাঙালি বলেও একটা কথা আছে। তার ওপর আবার হাইব্রীডের খড়গ। দেশের জন্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের অনেক উন্নততর প্রচেষ্টার সফল কাহিনি রয়েছে। কিন্তু তা আজ ক্রমশ ম্লান হতে চলেছে। আর এটাইতো অপশক্তি-পাকি-পেতাত্মা-বৃটিশ-বেনিয়া-আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ-কুচক্রীবাহিনিরা তাই চায়। একটি বিষয় কেউ বুঝতে পারছে না, আজকে যাদেরকে অকারণ হত্যা করা হচ্ছে তারা তো প্রগতির সন্তান। ভবিষ্যত উন্নত-অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের বিপ্লবী সৈনিক। কিন্তু অকালেই এইসব মেধাবী সন্তানদের সরিয়ে দিয়ে কার্যত বাংলাদেশের মেধাবী ভবিষ্যত প্রজন্মকে ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে। আর আমরা সবাই মুখে কুলুপ এটে নাস্তিকতার দোহাই দিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষকে পৃথিবী থেকে প্রতিনিয়ত সরিয়ে দিচ্ছি।

বাংলাদেশে জঙ্গি আছে কি নেই, আইএস আছে কি নেই, এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলতে পারে। অনেকে গবেষণায় লিপ্ত অন্ধকারে। আমরাও বলতে পারি, না এখানে কোনো জঙ্গি নেই। কিন্তু এখানকার সব লোক ফেরেস্তা নয়, তাও বলতে দ্বিধা নেই। আবার এই কথা কি করে অস্বীকার করবো যে, এখানে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই! যদি নাই থাকে, তাহলে প্রগতিশীল মানুষ হত্যা হচ্ছে কেন? দেশের অভ্যন্তরে-প্রশাসনে বিষধর সাপ ঢুকেছে কিনা সেটি এখন সরকারকেই খুঁজে বের করতে হবে।

দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের ওপর একটা অজানা ঝড় প্রবাহিত হচ্ছে। তাহলো অতর্কিতে মেধাবী-প্রগতিমনা মানুষদেরকেই হত্যা করা। ভবিষ্যত প্রজন্মকে মেধা থেকে, বিজ্ঞান থেকে সরিয়ে অন্ধকার কূপের রাজ্যে বসবাসকারী হিসেবে গড়ে তোলবার এক দুর্মর অপচেষ্টা। বাংলাদেশ গভীর ষড়যন্ত্রের মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে। এর পিছনেও রয়েছে নানা কারণ। সরকারের তা অজানা নয়। সরকারকে সাহায্য করতে চায় যারা মেধা-বুদ্ধি-প্রজ্ঞা দিয়ে, তাদেরকেই নিয়ত চলে যেতে হচ্ছে স্বপ্নের বাসভূমি ছেড়ে। তাহলে প্রগতির পক্ষে কথা বলবে কারা? নাকি এইসব সত্যভাষী-সত্যবাদী-মুক্তমনা মানুষের প্রয়োজন নেই বাংলাদেশে? এগুলো বোধহয় ভেবে দেখার ও সমাধান করবার সময় দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে।

যদি এইসব বুদ্ধিজীবী-কলম সৈনিক-প্রগতিবাদীদের প্রয়োজন সরকারের না থাকে, তাহলে ঘোষণা করে দেয়া যেতে পারে লেখালেখি করে কারো মৃত্যু হলে তার জন্যে সরকার দায়ী নয়। অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশকে ভালোবেসে মানুষ মরে যাবে, আর প্রশাসনের চোখে একফোটা বেদনার অশ্রু আসবে না, তা কেমন করে হয়। অন্তত জবাবদিহিতারও তো একটা বিষয় থাকা দরকার। সবচেয়ে বড় কথা একজন যদি আওয়ামীলীগ নাও করে থাকেন, তবুও তো তার নিরাপত্তা বিধান করতে সরকার বাধ্য। বাংলাদেশের অতি প্রিয় বর্তমান সরকারকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে বাঙালিদের সাথে নিয়ে এইসব অপশক্তিদের বিরুদ্ধে, যুদ্ধ করবার মানসে। যারা এদের মূল হোতা, তাদেরকে সরকারের নতুন করে আর চেনার প্রয়োজন আছে কি? এখন সময় এসেছে পাল্টা জবাব দেবার।

প্রশাসনের তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষগুলোকে আনতে হবে। কেননা সরিষায় ভূত থাকলে, তা দিয়ে ভূত তাড়ানো যায় না। আবার ছাগল দিয়ে আর যাই হোক কখনো ধানের মলন মলা যায় না। মানুষ হত্যা করে বাংলাদেশকে মেধাশুন্য করবার প্রচেষ্টা নতুন নয়। এ ইতিহাস সুবিদিত ও পুরাতন। কেন এসব হয়েছিল অতীতে, কেন এখনো মানুষ খুন হয় দিনের আলোয় এর সঠিক কারণ সরকারের অজানা নয়। প্রশাসনকে তৎপর হয়ে আর একটি যুদ্ধ শুরু করা দরকার বাংলাদেশের অকারণ হত্যার। আমরা সর্বদাই ভুলে যাই, মানুষের মৃত্যু হলে, তবুও এখানে মানব রয়ে যায়।

খোরশেদ আলম
@M.KhurshadAlam

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “তবুও মানুষ লিখে যায় মানুষ তৈরির তরে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

87 + = 88