লাবণ্য দাশের ‘মানুষ জীবনানন্দ’ নিয়ে দুএক কথা

রবীন্দ্রনাথের কবিতা যত না পড়েছি, তার চেয়ে বেশি পড়েছি রবীন্দ্র-আলোচনা-গবেষণা। আমার এক স্যার তো বলেই দিয়েছিলেন, “রবীন্দ্রনাথ পুনর্জন্ম নিলে, নিজেকে বোঝার জন্য তাঁকেও থিসিস পড়তে হবে”
জীবনানন্দের বেলায়ও হয়েছে তাই। তাঁর রচনার চেয়ে ‘তাঁকে নিয়ে অন্যের রচনা’ পড়া হয়েছে বেশি। জীবনানন্দ কেমন ছিলেন মানুষ আর স্বামী হিসেবে, সে নিয়ে আগ্রহ আমাদের কম ছিল না কোনদিন। আমারও কম নেই। কয়েক কাঠি বেশিই আছে। তাই এবারে বই মেলায়, এক্কেবারে জীবনানন্দের স্ত্রী’র লেখা বই কিনে ফেলেছি। লাবণ্য দাশের ‘মানুষ জীবনানন্দ’। ভাষাচিত্র প্রকাশনের।

এতোদিন যাদের লেখা পড়তাম জীবনানন্দকে নিয়ে, তাদের সবাই তাঁকে দেখেছেন দূর থেকে। বুদ্ধদেব বসু তাঁর কবিত্বের প্রথম আবিষ্কারক হতে পারেন, কিন্তু ব্যক্তি জীবনানন্দকে খুব বেশি জানতেন, এটা বলা যায় না। অন্তত লাবণ্য দাশের চেয়ে বেশি জানতেন না নিশ্চয়ই।

বইটা মাত্র ৬৫ পৃষ্ঠার। তার মধ্যে ভূমিকাই ১৮ পৃষ্ঠা জুড়ে। বইটার কলেবর বাড়ানোর জন্যই হয়তো এমন অভিধান সাইজের ভূমিকা লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। ভূমিকার লেখক, ফারুক মঈনউদ্দীন, প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন, ‘মাল্যবান’কে জীবনানন্দের আত্মজৈবনিক উপন্যাস হিসেবে প্রমাণ করতে। মাল্যবানের উৎপলার সাথে লাবণ্যের মিল খুঁজে, লাবণ্যকে ভিলেন বানানোর একটা প্রচেষ্টা হয়তো তার ছিল। ব্যাপারটা খারাপ লেগেছে খুব।
বইটার প্রথম লাইন পড়েই আমার মনে হয়েছিল, জীবনানন্দ আত্মহত্যাই করেছেন! কারণ, প্রথম লাইনেই লেখা, “পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে আমি তখন সবেমাত্র ইডেন কলেজে ভর্তি হয়েছি।“ লাবণ্য দাশ ইডেন কলেজের ছাত্রী না হয়ে অন্য কোন কলেজের ছাত্রী হলে, এমনটা মনে হতো না হয়তো। আমি এযুগের ছেলে- ইডেন সম্পর্কে ভাল ধারণা থাকার কথা আমার নয়।

যাক গে। বইটায় জীবনানন্দ সম্পর্কে খুব নতুন কিছু জানা যায় না। জীবনানন্দ যে মাঝে মাঝে ‘বরিশাইল্লা’ বলতেন- এটুকুই শুধু নতুন। বন্ধুবান্ধবদের সামনের জীবনানন্দ শুদ্ধভাষী। ও হ্যাঁ, তাদের বাসররাতের কথাও জানা যায় অল্পসল্প।

লাবণ্য দাশের গদ্য একেবারে সাদামাটা। তিনি জীবনানন্দের চেয়ে শ্বশুরবাড়ি নিয়েই বেশি শব্দ খরচ করেছেন। তাঁর কবিতা সম্পর্কেও ছিলেন উদাসীন, বেশ বোঝা যায় লেখায়। একসময় তো মনে হচ্ছিল, লাবণ্য দাশ নামের কোন ছাত্রী হয়তো “My Family” শিরোনামে কম্পজিশন লিখেছে পরীক্ষার খাতায়!

এখন, পড়া শেষ করে, মনে হচ্ছে, খুব বেশি অন্যায় করা হয়েছে লাবণ্য দাশের উপর। জীবনানন্দেরই অনেক পরিচিতের লেখা পড়লে লাবণ্যকে ভিলেন ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। তাই এই ভিলেনত্বপ্রাপ্তি কতটা যৌক্তিক, সেটা আরেকবার ভেবে দেখা উচিৎ।

লাবণ্য খুব সাধারণ ছিলেন। তার যুগের আর দশজনের মতই। তিনি আর সবার মত স্বাভাবিক একজনকেই চেয়েছিলেন স্বামী হিসেবে। সমস্যাটা জীবনানন্দেরই। তিনি যে ছিলেন অসাধারণ- তাই অস্বাভাবিকও। আর লাবণ্য দাশের জীবনানন্দকে ‘না বোঝা’টা ছিল তার অযোগ্যতা। অযোগ্যতার সাজা এতো বেশি হওয়া উচিৎ নয়।

“জীবনানন্দ কবি। তাই তিনি মানুষ হিসেবে, স্বামী হিসেবে কেমন ছিলেন- এটা কোন বড় ব্যাপার নয়। তিনি যদি খুব ভালো মানুষ আর অতুলনীয় স্বামীও হতেন, অনন্য এক কবি না হয়ে, তাহলে অন্তত আজ তাঁকে নিয়ে লিখতাম না। ওমন ভাল স্বামী, ভাল মানুষ কোটি কোটি আছে। কিন্তু জীবনানন্দ তো একজনই! ঠিক করেছি, এখন থেকে শুধু তাঁর কবিতাই পড়বো। কোন আলোচনা সমালোচনা আর নয়। তাকে যতটুকু বোঝার বুঝে নেব তাঁর রচনায় ডুবে।”- একথাটা আগে বুঝলে ‘মানুষ জীবনানন্দ’ কিনে ১১০ টাকা নষ্ট করতাম না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =