ফিরে দেখা: দ্বিজাতিতত্ত্ব, দাঙ্গা আর দেশভাগ ১

‘৪২ সালে নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে বাংলায় গঠিত হয় মুসলিম লীগ সরকার । বাংলায় খোলাখুলি হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা সেই সময় থেকে শুরু । গ্রামে গ্রামে সহিংসতার ঢেউ আছড়ে পরতে শুরু করেছিল । হিন্দুদের উপর পরিকল্পিত আক্রমন সংগঠিত হলেও ব্রিটিশ শাসন থাকার কারণে বাড়াবাড়ি তেমন আকার ধারণ করেনি , কেননা থানাগুলোতে হিন্দু পুলিশের সংখ্যা নেহাত কম ছিল না । এর আগে গ্রাম্য জীবনে হিন্দু-মুসলমান আপাত শান্তিতে বাস করলেও তাদের মধ্যে কাজিয়া-ঝগড়া লেগেই থাকতো , তবে তা গ্রামের স্থানীয় নেতৃত্ব মিটিয়ে দিত । পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়ানো নমঃশুদ্র নেতা যোগেন মন্ডল , দেশভাগের সময়ে ইসলামী সহিংসতা দেখে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে কলকাতা আসতে বাধ্য হয়েছিলেন, একথা নিশ্চই পাঠকদের মনে করিয়ে দিতে হবেনা আশা করি । আচ্ছা এই যোগেন মন্ডলের ব্যাকগ্রাউন্ড কি, জানেন ? আসুন একটু জেনে নি:
সুভাষচন্দ্র বসুর প্রিয়ভাজন ছিলেন এই যোগেন মন্ডল । সেই আমলে কলকাতা কর্পোরেশনের কাউন্সিলার নির্বাচিত হন, এমনকি ইংরেজ আমলে নমঃশুদ্র সমাজ থেকে প্রথম ও শেষ নির্বাচিত কাউন্সিলর এই যোগেন মন্ডল । সুভাষচন্দ্র বসুর সহায়তায় বরিশালের সাধারণ নির্বাচনে বিখ্যাত কংগ্রেসী নেতার অশ্বিনীকুমার দত্তের ভাইপো, সরল দত্তকে হারিয়ে ইলেকশনে জয়ী হয়েছিলেন সাধারণ সিটে(সংরক্ষিত নয়), ১৯৩৭ এ । পুরোটাই সম্ভব হয়েছিল সুভাষচন্দ্র বসুর সহায়তায় । শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি-ফজলুল হক কোয়ালিশনের বিধায়ক ভাঙিয়ে মুসলিম লীগেও এনেছিলেন এই যোগেন মন্ডল । এর ফলে গভর্নর ফজলুল হককে বরখাস্ত করে । মঞ্চে আসে নাজিমুদ্দিন । আম্বেদকর আর যোগেন মন্ডল অবশ্য বর্ণ-হিন্দুদের বিপক্ষে সব সময়েই সরব ছিল ।

পাকিস্তান কায়েম করতে হলে হিন্দুদের মধ্যে ফাটল তৈরী করা দরকার, এটা যেমন ইংরেজ সরকার বুঝেছিল, ঠিক তেমনি বুঝেছিল মুসলিম লীগ । শ্রেণীতে বিভক্ত হিন্দু সমাজের একাংশের সমর্থন পাকিস্তান আদায়ের জন্য সফল হাতিয়ার । হিন্দু সমাজকে একত্রিত করার প্রয়াসে সকল জেলায় একসঙ্গে পংক্তি ভোজনের মত প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিল যোগেন মন্ডল আর আম্বেদকার । তাদের বক্তব্যের মধ্যে একটি প্রচলিত প্রপাগ্রান্ডা ছিল তফশিলিরা হিন্দু নয়, তারা পৃথক জাতি এবং অবশ্যই তাদের ‘পাকিস্তান’ গঠন সমর্থন করা উচিত । সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ালো বাতাসে আর এর পূর্ন সুযোগ নিল মুসলমান জনগোষ্ঠি । কমুনিস্টরাও বহুজাতি তত্ত্বে সুর মেলালো আর মুসলিম লীগ এই লজিক স্বাদরে লুফে নিল ! ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা পার্টি মুসলমানদের জন্য সকল সিটের মধ্যে পেল মাত্র ৫ টা সিট বাকি পেল মুসলিম লীগ । দেশ তখন ভাগ না হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানের ভোট গেল সর্বাত্বক মুসলিম লীগের পক্ষে । যোগেন মন্ডল সিডিউল কাস্ট ফেডারেশনের হয়ে সিট জিতলেও আম্বেদকার হেরে গেলেন । সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তি জয়ী হলেও ইংরেজ রাজশক্তির টালমাটাল অবস্থা ছিল, তাই ভারত থেকে ঔপেনিবেশিকতার হাত তুলে নেওয়া ছিল অবশ্যম্ভাবী ।

ভারতে ক্যাবিনেট মিশন এসে পৌঁছালো ক্ষমতা হস্তান্তরের আলোচনা করতে, কিন্তু ক্যাবিনেটের প্রস্তাবে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ কেউই একমত হলনা । গণ-পরিষদের ভোট ডাকা হলো, এবং লম্পট নেহেরু হলো অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী । ১৯৪৬ এর ১৬ই অগাস্ট বাংলার মুসলিম লীগ সরকার সুরাবর্দির নেতৃত্বে প্রতিবাদ ডাকলো, যা প্রকারভেদে ‘ডাইরেক্ট একশন ডে’ হয়ে উঠলো । স্লোগান উঠলো চারিদিকে :’হাতমে বিড়ি, মু মে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ ! বাংলা দেখল নৃশংস হত্যালীলা ! হত্যা, ধর্ষণ আর লুন্ঠনে জর্জরিত হলো বাংলা ! অগণিত হিন্দুর রক্তপাতে শুরুর দিকে বাংলার হিন্দু সমাজ হকচকিয়ে পরলো । প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠে শুরু হলো হিন্দু-শিখদের পাল্টা দেওয়া । এর প্রতিফলনে নোয়াখালীতে হলো হিন্দু হত্যাযজ্ঞের ভয়ঙ্কর ধ্বংসলীলা, সাথে চলল অবাধে নারী ধর্ষণ, ধর্মান্তকরণ । নোয়াখালীর পাল্টা হলো বিহারে, আর সারা ভারত জুড়ে দাঙ্গার দাবানল লেলিহাহীন আগুন ছড়িয়ে দিল ! জিন্নাহ প্রমাদ গুনলো । এতটা বোধহয় স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি জিন্নাহ ! অতএব সিধান্ত বদল এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় যোগদানের সম্মতি । অন্তর্বর্তী সরকারে জিন্ন্হার কলকাঠিতে তফশিলি প্রতিনিধি হিসেবে বাদ পরলো আম্বেদকার আর কৌশলে মুসলিম লীগের কোটায় চলে এলো যোগেন মন্ডল ।

(চলবে…………………….)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

25 + = 35