ল্যাংটো ৫৭ ধারা।

৫৭ ধারা মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারে। একজন মানুষের চিন্তাশক্তির প্রকাশে যদি কারোর অনুভূতিতে আঘাত লাগে, তবে অনুভূতিতে আঘাত লাগা মানুষটি আজকাল খুব সহজেই সেই চিন্তাশক্তির প্রকাশক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা করে দিচ্ছে। জীবনকে অসহ্য করে তুলছে।

লেখক তসলিমা নাসরিনের অন্যান্য অনেক লেখার মতোই “কাঠুয়া আর উন্নাওয়ের ধর্ষণ” শিরোনামের লেখাটি বিতর্কের ঝড় তুলেছে। লেখকের অন্যান্য লেখার মতোই এটিও খুব বাস্তববাদী একটি লেখা, শিক্ষণীয় এবং বুদ্ধিদীপ্ত একটি লেখা। কিছুদিন আগেই “বাংলা ট্রিবিউন” লেখাটি প্রকাশ করার পর, অত্যন্ত লজ্জাজনকভাবে মৌলবাদীদের কাছে ভুল স্বীকার করে লেখাটি প্রত্যাহার করেছিলো। বাংলা ট্রিবিউনের এমন অভাবনীয় মৌলবাদের সামনে মাথা নত করা, দুঃখ প্রকাশ করা এবং লেখাটি প্রত্যাহার করা, সত্যের চোখে তীব্র লজ্জার, তীব্র নিন্দার। বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদকের এমন কর্মের প্রতিবাদে উইমেন চ্যাপ্টার এবং নারী ডট নিউজ লেখক তসলিমা নাসরিনের ওই লেখাটি নিজেদের ব্লগে প্রকাশ করে। লেখাটি বারংবার শেয়ার করে প্রতিবাদ জানায় সাধারণ মানুষ। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় প্রতিবাদ হিসেবে অন্যান্য লেখকেরাও নিজেদের মত প্রকাশ করে বাংলা ট্রিবিউনের তীব্র নিন্দা করে।

এরই মধ্যে ৫৭ ধারায় মামলা রজ্জু হলো লেখক তসলিমা নাসরিন, উইমেন চ্যাপ্টারের সম্পাদক সুপ্রীতি ধর, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সুচিষ্মিতা সিমন্তি ও উপদেষ্টা সম্পাদক লীনা হকের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারী অভিযোগ করেন লেখক তসলিমা নাসরিন তাঁর “কাঠুয়া এবং উন্নাওয়ের ধর্ষণ” শিরোনামের নিবন্ধটিতে “পয়গম্বরও আরব দেশে ইহুদী পুরুষদের মেরে ওদের মেয়েদের নিজের সঙ্গীদের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন” বাক্যটি লিখে তার এবং ইসলাম মান্যকারীদের অনুভূতিতে আঘাত করেছেন। এবং সেই লেখাটি উইমেন চ্যাপ্টারে যেহেতু প্রকাশিত হয়েছে, তাই লেখক এবং উইমেন চ্যাপ্টারের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা করেছেন।

৫৭ ধারা কি এতটাই ল্যাংটো, উলঙ্গ একটি আইন! মানুষের বাকস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করতে, যে কেউ এসে কোনো নির্দিষ্ট দলিল, প্রমাণ ছাড়াই অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে বলে মামলা করে দিতে পারে! মানুষের স্বাধীনতাকে খর্ব করতে, মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ করাতেই কি তবে এই ৫৭ ধারা!

লেখক তসলিমা নাসরিনের এই বিতর্কিত লেখাটির ওই উল্লেখিত মন্তব্য, যেটির জন্য ৫৭ ধারায় মামলা রজ্জু হয়েছে, সেই মন্তব্যটি তো কোনো অংশেই মিথ্যা নয়। হাদিস নাম্বার ৩৪৭৭ এ’ই উল্লেখ আছে –
“ইসতিবরার পর যুদ্ধ বন্দিনীর সাথে সঙ্গম করা জায়েজ। এবং তার স্বামী বর্তমান থাকলে সে বিবাহ বাতিল।”
৩৪৭৭। উবাজুদুল্লাহ ইবনু উমর ইবনু মায়সাবা কাওজারীরী (রহঃ) … আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনায়নের যুদ্ধের সময় আওতাসের দিকে একটি বাহিনী পাঠান। তারা শত্রুদলের মুখোমুখি হয় এবং যুদ্ধে জয়লাভ করে। অনেক কয়েদী তাদের হস্তগত হয়। এদের মধ্যে থেকে দাসীদের সাথে সহবাস করা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কয়েকজন সাহাবী যেন নাজায়িজ মনে করলেন, তাদের স্বামী বর্তমান থাকার কারণে। আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন – “এবং নারীর মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত সকল সধবা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ” অর্থাৎ তারা তোমাদের জন্য হালাল, যখন তারা তাদের ইদ্দত পূর্ণ করে নিবে।

– তবে কিসের ভিত্তিতে এই ৫৭ ধারা রজ্জু হলো!
– বাকস্বাধীনতা কোথায়!
– ভুলটা লেখক তসলিমা নাসরিন করলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখে?
– ভুলটা কি উইমেন চ্যাপ্টার বা নারী ডট নিউজ করলো লেখাটিকে প্রকাশ করে “বাংলা ট্রিবিউনের অন্যায়ভাবে দুঃখ প্রকাশ করে লেখাটি প্রত্যাহার করা” এর প্রতিবাদ করে?
– নাকি অন্যায়টা করলো সেই ব্যক্তি, যিনি ধর্মের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে বলে সোজা ৫৭ ধারায় মামলা করলেন?

না, ভুল বা অন্যায় এরা করে নি। সংবিধানের কালো ধারা মানুষকে সুযোগ করে দিয়েছে, বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে গিয়ে জোর জুলুম করার। যে দেশের সংবিধান ধর্ম নিরপেক্ষ হতে পারে না, সে দেশে আবার বাকস্বাধীনতা! যে দেশে ৫৭ ধারার মতো আইন আছে, সেই দেশে মৌলবাদীরা নিজেদের মৌল মিথ্যাতে আঘাত লাগলে তো এই ৫৭ ধারার মতো আইনের অপব্যবহার নিশ্চয় করবে।

বলতে কোনো দ্বিধা নেই, বাংলাদেশে পচন ধরেছে। যে দেশের সংবিধানে এই ৫৭ ধারার মতো উলঙ্গ, ল্যাংটো আইন আছে, সেই দেশের সমাজ আর যাই হোক, কখনো শিক্ষিত হতে পারে না। পারবে না।

** লেখক – সৌম্যজিৎ দত্ত। ( ব্লগার এবং গবেষণারত ছাত্র – ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউট )

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ল্যাংটো ৫৭ ধারা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

48 − 43 =