কল্পনা চাকমা’র অন্তর্ধানের ২২ বছর -এখনও বিচার নেই , রাষ্ট্র এই লজ্জা কোথায় ঢাকবে!


১৯৯৬ সালের ১২ জুন,ঘড়ির সময় ধর’লে ১১ জুনের মধ্যরাত এক’টার দিকে,একটি ভয়ার্ত চিৎকারের রাত। সেই চিৎকার এখনও বাজে প্রতিটি পাহাড়িদের কানে কানে । ১২ জুন ১৯৯৬, থেকে ১২ জুন ২০১৮।সময় অতিক্রম হল ২২ টি বছরের, কিন্তু দীর্ঘ ২২ বছরেও রাষ্ট্র জবাব দিতে পারল না কল্পনা চাকমা কোথায় এবং বিচারের কাঠগড়াই দাঁড়াতে পারলেন না কল্পনা চাকমা’র অপহরণকারীদের। অপরাধী লেফটেনেন্ট ফেরদৌস এবং তার দলবল’কে , ২২ বছরে কোনো শাস্তি দিতে পারে নি কেন রাষ্ট্র? এত বড় লজ্জা রাষ্ট্র কোথায় ঢাকবে ?

কল্পনা চাকমা ছিল পাহারের গর্জনের নাম,হুংকারের নাম,সংগ্রামের নাম।কল্পনা চাকমা অপহৃত হওয়ার আগ পর্যন্ত তত্‍কালীন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী অধিকার আদায়ের একমাত্র সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশন। আর কল্পনা চাকমা এ সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। হিল উইমেনস ফেডারেশনের নেত্রী কল্পনা চাকমাকে ১৯৯৬ সালের ১১ জুন মধ্যরাতে রাঙামাটির জেলার দুর্গম এলাকা বাঘাইছড়ির থানার নিউ ল্যাইল্যাঘোনা গ্রাম থেকে সেনা কর্মকর্তা লেফটেনেন্ট ফেরদৌস তার দলবল নিয়ে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করেন।অপহরণের আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন একজন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন নারী- যে কিনা তার নিজের জনগণের অধিকার আর নারীদের মুক্তির স্বপ্ন দেখেন,মূলত নারী আন্দোলনই ছিল ওর প্রাথমিক কর্মক্ষেত্র। নারী আন্দোলনে কল্পনার কাজ যে শুধু পাহাড়ি নারীদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয়; তার কাজের মধ্য প্রকাশ পেত পৃথিবীর সকল নারীজাতির মুক্তির আন্দোলনে্রও।আজ অপহরণের ২২ বছর পূর্ণ। এই ২২ বছরে বাংলাদেশে কতকিছু ঘটে গেছে,কতবার সরকার অদল বদল হয়েছে,প্রতি বছর অপহরনের বিচারের দাবী চাওয়া হয় ,এবং প্রত্যেকবারই নানাভাবে এই অপহরণের বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে রাষ্ট্রীয় সরকার,অধিকিন্তু কল্পনা চাকমার অপহরণ বিষয়ে দেশের জনগণকে কোন গ্রহণযোগ্য তদন্ত প্রতিবেদন শোষণকারী রাষ্ট্র এবং তার শাসকেরা দিতে পারে নি !

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের ১২ জুনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক সাত ঘন্টা পূর্বে নিজ বাড়ি থেকে দুই বড় ভাইসহ অপহৃত হন কল্পনা চাকমা। ভাইয়েরা পালাতে সক্ষম হলেও পারেননি কল্পনা চাকমা।জাতীয় নির্বাচনের ভোটদান অনুষ্ঠানের মাত্র সাত ঘন্টা আগে একজন নারী নেত্রী অপহৃত হলেও বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোনো পদক্ষেপ গ্রহন করেনি। কল্পনা চাকমাকে উদ্ধারের ব্যাপারেও কোনোরকম ব্যবস্থা নেয়নি। তারপর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে সরকার গঠন করেন শেখ হাসিনা। তারাও ‘ঘটনাটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঘটেছে’ অজুহাত দেখিয়ে এ ব্যাপারে গড়িমসি করতে থাকে।যা দীর্ঘ ২২ বছরেও গড়িমসি করে যাচ্ছে রাষ্ট্র সরকার ।

কল্পনা চাকমা অপহরণ নিছক নারী অপহরণ ঘটনা নয় । এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক এবং জাতিগত নিপীড়ণের কৌশল’।ঘটনার ১৫দিন পর ২৭ জুনে কল্পনা চাকমার মুক্তির দাবিতে পাহাড়ি গণপরিষদ, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন বাঘাইছড়িতে সকাল-সন্ধ্যা সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। কর্মসূচি চলাকালীন রুপন চাকমা,মনতোষ চাকমা, সমর বিজয় চাকমা এবং সুকেশ চাকমাদের সেনাবাহিনীদের লেলিয়ে দেওয়া সেটেলার বাঙালিরা রাস্তায় ধাওয়া করে কুপিয়ে মেরে ফেলে।শুধুমাত্র কল্পনা চাকমা নয়, আজ অব্দি এই চারজনের হত্যার বিচারও করতে পারেন নি।

অন্যদিকে, কল্পনা চাকমা’র অপহরণের ঘটনাটি দেশ,বিদেশে জানাজানি হয়ে যাবার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো থেকে চাপের কারণে সেনাবাহিনীরা অপহরণের ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য বিভিন্ন অপচেষ্টা চালাতে লাগল। কোন অপচেষ্টায় ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেয়ার উপায় না দেখে সেনাবাহিনীরা কল্পনা চাকমার সন্ধানকারীকে ৫০ হাজার টাকার পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে প্রচারপত্র বিলি করতে লাগল। The Hill Watch Human Rights Forum(HWHRF) মানবাধিকার সংস্থাটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠানকে নিন্দা করে ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করার জন্য। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী লেফটেনেন্ট ফেরদৌস ও তার নেতৃত্বে অপহরণকারীদের পক্ষে দাঁড়াই । চারদিক থেকে নিন্দা আর জোরালো প্রতিবাদের মুখে পড়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ঘটনাটিকে অন্যদিকে মোড় ঘোরাই ,প্রচার করতে থাকে কল্পনা চাকমা ঘটনাটি “প্রেম সম্পর্কিত” । এতেও কাজ হতে না দেখে ১৯৯৬ সালে ২৩শে জুলাই একটি স্ট্যাটমেন্ট প্রচার করল – কল্পনা চাকমার পাশপোর্ট ছিল,গোপনে সে বিদেশে পালিয়ে গেছে। আদতে,কল্পনা চাকমার কোন পাশপোর্ট ছিল না।

দেশে-বিদেশে তুমুল প্রতিবাদে অনেকটা চাপের মুখে সরকার অবশেষে ঘটনার তিন মাস পর ৭ সেপ্টেম্বরে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আব্দুল জলিলকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়। কমিটির অন্য সদস্যদ্বয় হলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. অনুপম সেন ও তত্‍কালীন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন।

কমিটি ১৯৯৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৪০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু সরকার আজও অবধি তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেনি,এবং তদন্তের কোন প্রতিবেদন পেশ করতে পারেননি জনগণের কাছে
পার্বত্য চট্টগ্রামে এই ২২ বছরের মধ্য অনেক শিশু,নারীকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে রাস্ট্রীয় মদদে, হাজার ঘরবাড়ী ভাঙচুর ,জ্বালিয়ে দিয়ে ভিটেমাটি ছাড়া করা হয়েছে হাজার হাজার পরিবারকে,আজও পর্যন্ত কোন ঘটনার বিচারের ফল দেখেননি পার্বত্য অঞ্চলের মানুষেরা। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির দেশে আদিবাসীদের বিচারের দাবীগুলোকে গলা টিপে হত্যা করা হয়, অন্যদিকে এক দেশে দু’ই আইন বলবত রেখে রাস্ট্রকে পরিচালনা করে যাচ্ছে শাসক গোষ্টীরা,হ্যাঁ দুই আইন বলছি ! কারন পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য আলাদা আইন জিইয়ে রেখে জাতিগুলোকে নির্মুল করা হচ্ছে।

এতকিছু ঘটনার বিচারহীনতার পরেও প্রতিবছরের মতন আজকেও পার্বত্য চট্টগ্রামে কল্পনার অপহরনের বিচারের দাবিতে মিশিল হবে,প্রেস কনফারেন্স হবে,৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে ,সরকারকে চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে ,আদিবাসিদের সমস্যা নিয়ে কথা হবে,এবং নিজের জাতির অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের এই গণতান্ত্রিক দাবীগুলো করতে হবে ,আমাদের অদেখা বোন কল্পনা চাকমার জন্য বিচারের দাবী করতে হবে ,নাহলে যে আমরা কল্পনার কাছে অপরাধী হয়ে যাব,সবিতা চাকমা,ইতি চাকমা ,বলি মিলে, তুমাচিং মারমাদের(আরও অনেক ভিকটিম আছে,যাদের নাম লিখে বা বলে শেষ করা যাবেনা) কাছে অপরাধী হয়ে যাব !

সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি মানুষের কানে কানে এখনও বাজে কল্পনা চাকমা চিৎকার করে বলা ” দাদা,মরে বাজা( দাদা, আমাকে বাঁচাও )” শেষ কথাটি ,তারপর গুনে গুনে ২২ বছর হয়ে গেল ,আজও জানা গেলনা কল্পনা চাকমা কোথায় ?
অন্তর্ধানের ২২ বছর -এখনও বিচার নেই , রাষ্ট্র এই লজ্জা কোথায় ঢাকবে! ২২ বছরের তদন্তের সফলতা দেখেছি শুধু অপহরণকারী লেফটেন্যান্ট ফেরদৌসের পদোন্নতি!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “কল্পনা চাকমা’র অন্তর্ধানের ২২ বছর -এখনও বিচার নেই , রাষ্ট্র এই লজ্জা কোথায় ঢাকবে!

  1. ১। খীসা, প. ব. (২০০৬). কল্পনা
    ১। খীসা, প. ব. (২০০৬). কল্পনা অপহরনঃ গোটা রাস্ট্রীয় ব্যবস্থায় এখনো একটি ‘দুষ্ট ক্ষত’. পাহাড়ের রুব্ধকন্ঠ, ১৮-২৫.
    ২। হিল উইমেন্স ফেডারেশন. (২০০৬, জুন ১০). কল্পনা অপহরনের ১০ বছর – ২৪ পদাতিক ডিভিশন সেনা সদর অভিমুখে পদযাত্রা. চট্রগ্রাম.
    ৩। ‘মায়ের স্বীকারোক্তি কল্পনা চাকমা এখন ত্রিপুরায়’- দৈনিক মিল্লাত, ৯ আগস্ট ১৯৯৬।
    ৪। ‘কল্পনা চাকমা এখন ত্রিপুরায়: মা’র সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে তার’- দৈনিক দিনকাল, ৯ আগস্ট ১৯৯৬।
    ৫। ‘কল্পনা চাকমা জীবিত এবং কোথায় আছেন তা তার মা ভালভাবেই জানেন’- দৈনিক ইনকিলাব, ৯ আগস্ট ১৯৯৬।
    ৬। ‘কল্পনা চাকমা ত্রিপুরায় আছেন, অপহরণ সাজানো নাটকঃ মানবাধিকার কমিশনের তথ্য প্রকাশ’- দৈনিক পূর্বকোণ, ৯ আগস্ট ১৯৯৬।
    ৭। ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ভাষ্য কল্পনা চাকমা ত্রিপুরায়’- দৈনিক ভোরের কাগজ, ৯ আগস্ট ১৯৯৬।
    ৮। ‘কল্পনা চাকমা ভারতে আছেন’- দৈনিক সংগ্রাম, ৯ আগস্ট ১৯৯৬।
    ৯। ‘সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, কল্পনা চাকমা ভারতের ত্রিপুরায়।। অপহরণ ঘটনার সাথে সামরিক বাহিনী জড়িত নয়’- দৈনিক আজাদী, ৯ আগস্ট ১৯৯৬।
    ১০। ‘অবশেষে রহস্য ফাঁস কল্পনা চাকমা ভারতে’- দৈনিক দেশজনতা, ৯ আগস্ট ১৯৯৬।
    ১১। ‘মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ পরিকল্পিতভাবে কল্পনা চাকমাকে নিখোঁজ রাখা হয়েছে’- দৈনিক সবুজ দেশ, ৯ আগস্ট ১৯৯৬।
    ১২। ‘সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকার কমিশন, কল্পনা চাকমা এখনো বেঁচে আছেন’- দৈনিক লাল সবুজ, ৯ আগস্ট ১৯৯৬।
    ১৩। ‘কল্পনা চাকমা ত্রিপুরার গঙ্গাছড়া এলাকায় রয়েছে।। মানবাধিকার কমিশন’- দৈনিক সকালের খবর, ৯ আগস্ট ১৯৯৬।
    ১৪। `Kalpana Chakma Traced, living in Tripura’- The New Nation, August 9, 1996.
    ১৫. ‘A Month After Abduction, Kalpana Chakma Yet to be Rescued’, The Daily Star, July 13, 1996.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

63 + = 66