বই: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’

?_nc_cat=0&oh=4be9a7ad5198a31dc1e99e59b68390ed&oe=5BC2A91D” width=”500″ />

এক সময় বাংলা লোকসঙ্গীতের অন্যতম একটি ধারা ছিলো কবিগান। গ্রাম-বাংলার মানুষের বিনোদনের বড় একটা উৎস ছিলো কবিগান। তাই বাংলার পথে-প্রান্তরে কবিগানের আসর বসতো। এ গানের কবিদের বলা হতো ‘কবিয়াল’, যিনি মুখে মুখে পদ রচনা করতেন। আর তার সহকারীদের বলা হতো ‘দোহার’। আর কবিতে-কবিতে হতো গানের লড়াই। কবিগানের এই গায়কেরা অনেকেই ছিলেন সমাজের নিচুতলার মানুষ। আর এমনই এক নিচুতলার কবিয়ালের দেখা মিলবে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসে।

কাহিনীটা খুব সংক্ষেপে বলি। কবি উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র নিতাইচরণ। ডোম বংশের ছেলে। পরিবারের সবাই চুরি-ডাকাতি করে জীবীকা নির্বাহ করে। এই নিতাই একদিন গ্রামের ঐতিহ্যবাহী এক মেলায় কবিগানের আসরে ঘটনাক্রমে গান গাইবার সুযোগ পায়। আর কণ্ঠ, সুর ও গানের কথায় সে তাক লাগিয়ে দেয় উপস্থিত দর্শকদের।

নিতাই তার কবি প্রতিভা ও অল্প-বিস্তর কিছু বিদ্যার জোরে পারিবারিক পেশাকে প্রত্যাখান করলো। কুলির কাজ করে জীবন চলতো তার, কবি হবার পর সেটাও ছাড়ল নিতাই। নিতাইয়ের জীবনে প্রেম এলো, কিন্তু সেই প্রেম সমাজের চোখে গর্হিত অপরাধ। বন্ধুর শ্যালিকার প্রেমে পড়েছিলো নিতাই, যাকে সে ডাকতো ঠাকুরঝি। ঠাকুরঝি বিবাহিত ছিল, যদিও নিতাইয়ের এ প্রেমে কোনো কদর্যতা ছিলো না। নিতাই তার কালোবরণ ঠাকুরঝিকে নিয়ে গান বেঁধেছিলো-
“কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কাঁদ কেনে?
কালো কেশে রাঙা কুসুম হেরেছ কি নয়নে? ”

মান-অভিমানের কোনো এক পর্বে নিতাই ঠাকুরঝিকে নিয়ে গান বেঁধেছিলো-
“আমি ভালবেসে এই বুঝেছি মুখের সার সে চোখের জলে রে।
তুমি হাস আমি কাঁদি বাঁশী বাজুক কদমতলে রে।”

কিন্তু এক সময় এই প্রেম প্রকাশিত হওয়ায় বদনামের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে এক ঝুমুর দলের সাথে চলে যায় নিতাই। ঠাকুরঝিকে আকাশের ‘চাঁদ’ আখ্যা দিয়ে নিতাই দূরে চলে যায়-
“চাঁদ তুমি আকাশে থাক—আমি তোমায় দেখবো খালি।
ছুঁতে তোমায় চাইনাকো হে—তোমার সোনার অঙ্গে লাগবে কালি।”

ঝুমুর দলেই নিতাইয়ের আসল কবিয়াল জীবনের শুরু। এই দলের সাথে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়ায় কবিয়াল নিতাই।ঝুমুর দলের মেয়েরা কবিগানের সাথে নাচে ও অশ্লীল দেহভঙ্গি করে দর্শক আকৃষ্ট করে। আর রাতে দেহ ব্যবসা করে অর্থোপার্জন করে।

এই দলেই রূপসী ও বুদ্ধিমতী এক তরুণী বসন্ত, যার সাথে প্রেম হয় নিতাইয়ের। নিতাই তার সাথে গাঁটছড়া বাঁধে। কিন্তু বসন্তের মরণব্যধি একসময় তাকে কেড়ে নেয়।
“এই খেদ আমার মনে—
ভালবেসে মিটল না সাধ, কুলাল না এ জীবনে।
হায়-জীবন এত ছোট কেনে?
এ ভুবনে?”

বসন্তকে হারিয়ে নিতাই সন্ন্যাস হয়ে চলে যায় হিমালয় পর্বতের দিকে। সেখানে ভিন্ন ভাষার মানুষের কাছে তার গান গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। আর তখন সে নিজের দেশের গুরুত্ব বুঝতে পারে। গ্রামে ফিরে এসে নিতাই জানতে পারে, তার শোকে পাগল হয়ে ঠাকুরঝি মরে গেছে। ঠাকুরঝি-বসন্ত দুজনই নিতাইকে ছেড়ে চলে গেলেও তারা বেঁচে রইলো নিতাইয়ের মনে। মৃত্যুর মাঝেই নিতাই বার বার জীবনের সুর খুঁজে নিয়ে পথ চলবে। তবু রিক্ত নিতাই শুধু একটা প্রশ্নই করে- ‘জীবন এত ছোট কেনে?’

এই ছিলো ‘কবি’ উপন্যাসের কাহিনী।এই উপন্যাসের কয়েকটি দিক নিয়ে সামান্য আলোচনা করতে চাই। উপন্যাসের কাহিনীর ভেতর দিয়ে কিছু বিষয় লক্ষ করার মতো। ওই সময়টাতে গ্রামে-গঞ্জে যে সামান্য শিক্ষার প্রসার ঘটেছিলো, তারই প্রভাব পড়ে নিতাইয়ের মনে। সমাজের গৎবাধা নিয়মগুলোকে অমান্য করে একজন নিম্নশ্রেণির নিতাইয়ের ‘ব্যক্তি’ হয়ে ওঠা পুরনো সামন্তীয় সমাজের ভাঙ্গনেরই একটা সুর। এটা ঠিক, নিতাই এক লাফে সমস্ত বাধাকে ডিঙ্গাতে পারেনি, সে জ্ঞান আর সুযোগও তার ছিলো না। তবে এই সামান্য পরিবর্তনও অনেককিছুর ইঙ্গিত বহন করে। বই পড়বার সুবাদে নিতাই তার পারিবারিক পেশাকেও উপেক্ষা করতে পেরেছিলো। পরিবারের সাথে তার এই দূরত্ব একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কবিগানে খিস্তি-খেউড় যেখানে দর্শকদের আকৃষ্ট করার অন্যতম হাতিয়াড়, সেখানে নিতাই তা-ও এড়িয়ে যেতে চাইতো। বাংলা গানের বিবর্তনে হয়তো নিতাইদের মতো কবিয়ালদের প্রভাব আছে। নিতাইয়ের চিন্তার পরিবর্তন, অনুভূতিগুলোর উপলব্ধি, প্রেম সম্পর্কিত ধারণাও ওই সমাজ বাস্তবতায় আলাদারকম।

উপন্যাসে লেখক একদিকে ঝুমুর দলের অস্পৃশ্য দেহাপজীবিনী নারীদের দেখাচ্ছেন লেখক, অন্যদিকে অত্যন্ত মানবিকভাবে দেখাচ্ছেন এই নারীদের জীবন যন্ত্রণা। অশ্লীল গান-নাচ করে এদের জীবন কাটে, রাতে চলে দেহ ব্যবসায়, কিন্তু তারা আর দশটা মানুষের মতোই মানুষ। তাদের জীবনে আনন্দ-বেদনা, প্রেম-ভালোবাসা, মানবিক অনুভূতি আছে। এ পথে তারা নানা দুর্ঘটনায় এসেছে হয়তো, আর যেদিন তাদের রূপ-যৌবন যাবে, সেদিন হয়তো দলে আর তাদের রাখা হবে না। কাউকে কাউকে হয়তো বসন্তর মতো খারাপ কোনো রোগে ভুগে মরতে হবে। এই নারীদের জীবনটা পাঠকের সামনে অন্যরকম মানবিক অনুভূতিতে উপলব্ধি করতে পারবেন।

কবিগান, কবিয়ালদের জীবন সম্পর্কে পাঠক কিছু ধারণা পেতে পড়তে পারেন তারাশঙ্করের এই উপন্যাস।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

40 − = 35