অঞ্চলভিত্তিক আচরণবিন্যাস


বছরের দীর্ঘ সময় দেশের দক্ষিণাঞ্চলে থাকতে হয় বিধায় কাছে-দূরের বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে দক্ষিনাঞ্চলের স্তবগান শুনতে হয় । আগে দেশকে যেসব বৃহত্তর অংশগুলোতে ভাগ করা সেই সকল এলাকা বিভিন্ন সময়ে ভ্রমণ করতে করতে এক সময় বোধগম্য হতে শুরু করে দেশের বিভিন্ন বৃহত্তর অঞ্চলগুলোর অধিবাসীদের আচরণের প্যাটার্নটা ।

১৯৮২ সালে এরশাদ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের মহকুমাগুলোকে জেলায় উন্নীত করা হয় । দেশের তৎকালীন ম্যাপগুলো সামনে নিয়ে বসতে বোঝা গেল দেশের অঞ্চলগুলো ভাগ করার অঘোষিত বিভাজক ছিল দেশের বড় এবং মাঝারি নদীগুলো । সাধারণত বড় বা মাঝারি ( বর্তমানে যেগুলো মৃত ) কোন নদীর এপার-ওপারে ছিল বৃহত্তর দুই অঞ্চলের মানুষের আবাস ।

আসলে বিবর্তনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া আকৃতি দিয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের আচরণগত বৈশিষ্ট্যগুলোকে । বিবর্তনের অন্যতম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক এখানে কার্যরত- ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা । বিবর্তন এক-দুই বছরে ঘটে যায় এমন কোন সিধাসাধা প্রক্রিয়া না । এখানে “ভৌগলিক বিচ্ছিনতা” খুবই হাস্যকর শোনা গেলেও তলিয়ে দেখলে এর গুরুত্ব প্রতিভাত হবে । দাদা-নানাদের মুখে শুনেছি মাত্র যুগ তিনেক আগেও যোগাযোগ সড়কব্যবস্থা উন্নত না হওয়ায়; সবচেয়ে বড় কথা মোটরযানের দুষ্প্রাপ্যতা ছিল ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতার বড় একটা কারণ যে জন্য স্বল্প-দীর্ঘ সব দূরত্বই পায়ে হেটে পাড়ি দিতে হত । কিন্তু বিবর্তনের ধারায় এত সহজে ও অল্প সময়ে আচরণকে গড়ে-পিটে নেওয়ার মতবাদ প্রদান স্রেফ প্রলাপ । চলে যেতে হবে আরও কয়েক হাজার বছর পেছনে । এবার হয়তো হালে পানি পাওয়া যাবে । ৪০ বছর আগেই যেখানে মাঝারি দূরত্ব পাড়ি দিতেই দিনকে দিন লেগে যেত সেখানে কয়েক হাজার পূর্বে হয়তো পায়ে চলা পথটাও ঠিক খুজে পাওয়া যেত না ।

প্রাচীন ম্যাপ ঘাঁটলে তৎকালীন নদীপথ ও বর্তমান নদীপথের কাঁধে-পিঠে পার্থক্য পাওয়া যাবে বটেক কিন্তু পা-মাথা টাইপের ভিন্নতা পাওয়া যাবে না ; তথাপি বর্তমানের মত সেগুলোও দেশকে ( যদিও তখন “দেশ” বলে কিছু ছিল না ) আরও সূক্ষ্মভাবে বৃহৎ ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চলকে বিছিন্ন অনেকগুলো অঞ্চলে বিভক্ত রেখেছিল । বিচ্ছিন্নতা, সুপেয় ও সেচযোগ্য পানির প্রাপ্যতা-দুষ্প্রাপ্যতা, ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, আবহাওয়া বিভিন্ন ব্যাপার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছিল । ক্লাসিক উদাহরণ হতে পারে এদেশের অপরাধবিজ্ঞানী আবুল হাসনাত গবেষণা । দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে অপরাধের প্রকৃতি, প্রবণতা ও প্রকোপ নিয়ে গবেষণা করে দেখেছিলেন চরাঞ্চল বা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলোতে অপরাধ প্রবণতা এবং অপরাধের পরিমাণ বেশি । দীর্ঘকাল মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং নদী ভাঙ্গনসহ চরম ভাবাপন্ন প্রকৃতির কারণে ঐ অঞ্চলের মানুষদের স্বভাবতই সুপেয় পানি এবং চাষযোগ্য আবাদী জমি নিয়ে কাড়াকাড়ি-হানহানিতে প্রায় সারা বছরই ব্যস্ত থাকতে হত । বিবর্তনের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী হিংস্র ও বেপরোয়া স্বভাবের সদস্যদের এই পরিস্থিতিতে টিকে যাওয়ার চান্স বেশি ।

তৎকালীন ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা আরেকটি বড় বিষয়কে প্রভাবিত করেছিল তা হল বৈবাহিক সূত্রতাকে একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক পরিমণ্ডলে আটকে দেওয়া । একারণে যে মহাগুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ঘটে গিয়েছিল তা হল জিনপুলের বৈচিত্র্য হ্রাস । প্রজনন একটি নির্দিষ্ট স্থলভাগে আটকে যাওয়ায় জিনপুলের বৈচিত্র্য হ্রাস পেয়ে একই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এক্সটেন্ডেড ফিনোটাইপ হিসেবে ক্রমানুসারিক জেনারেশনে প্রকাশ হতে থাকে । মোদ্দাকথা বিবর্তনের এই একটি প্রভাবক আরও দশটি বিষয়কে উস্কে দেয় যা আঞ্চলিক ভিত্তিতে নানাভাবে বিন্যাস্ত করে দেয় আচরণকে ।

তো প্রথমে ফিরে যাই । কথিত আচরণের সাথে দক্ষিনবঙ্গের মানুষের আচরণকে কোনভাবেই মেলাতে পারছিলাম না । আমি গত দীর্ঘ সময় ধরে যা দেখে আসছি তা হল দক্ষিনবঙ্গের মানুষের ব্যবহার অতি মোলায়েম । ওদিকে কর্মসূত্রে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছুতেই দেখি ঐ এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ব্যবহারে তুলনামূলক বেশি হিংস্রতা ।

ঘটনা আর কিছুই না । যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন নব্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যকার বৈবাহিক সূত্রের বিস্তৃতির কারণে জিনপুলে ধীরে ধীরে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ ঘটছে । পাশাপাশি উন্নত শিক্ষায় প্রভাবিত হচ্ছে বাহ্যিক আচরণ তথা এক্সটেন্ডেড ফিনোটাইপ । অন্যদিকে শিক্ষায় অনগ্রসরতা পৈতৃক ভিটে মাটিতে গ্যাঁট হয়ে গোঁ ধরে বসে থাকার কারণে তাদের আচরণে আসেনি ( একেবারে আসে নি এটা বলা যাবে না ) আধুনিকতমদের মত নম্রতা ও নমনীয়তা ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 3