বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শারীরিক ভাষা পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেন যেভাবে..

যদি আপনি নিজেকে কারো সামনে আকর্ষনীয় ভাবে উপস্থাপন করতে চান, চান তার মনোযোগ কাড়তে, চান তাকে আকৃষ্ট করতে, তবে আপনাকে অবশ্যই আপনার শারীরিক ভাষা বাডি ল্যাঙ্গুয়েজ সম্পর্কে জানতে হবে এবং সে অনুযায়ী সচেতন থেকে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে। বেশিরভাগ মানুষই ভাবেন শারীরিক ভাষা হচ্ছে এমন একটি বিষয় যা অধিকাংশ মানুষ নিজের অবচেতনে করে থাকেন। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই আপনি সচেতন ভাবে নিজের শারীরিক ভাষা নিয়ণ্ত্রণ করে পূর্বের তুলনায় দক্ষভাবে সময় অন্যের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেন। আপনি যদি আপনার শ্রোতার সামনে নিজেকে ইতিবাচক হিসেবে, উৎসাহ ব্যাঞ্জক হিসেবে, কর্মঠ হিসেবে, যোগ্য হিসেবে বা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, যদি চান শ্রোতার অখন্ড মনোযোগ ধরে রাখতে তবে বডি ল্যাঙ্গুয়েজের কোনো বিকল্প নেই। দুঃখের বিষয় হলো অন্যের সাথে যোগাযোগের এই গুরুত্বপূর্ণ ভাষাটি অনেকেই অবহেলা করেন। ফলে তার যথেষ্ঠ যোগ্যতা থাকা সত্বেও সে কোনো মিটিং, সভা, সেমিনার বা এমনকি আড্ডাতেও নিজেকে ঠিকমত অন্যের সামনে মেলে ধরতে পারনেনা বা অবহেলা শিকার হন। আবার মাঝে মাঝে আমরা এমন অনেক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে পড়ি যেখানে কোনো ব্যক্তিকে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করতে বা বলতে আমাদের অসস্তি হয়, আবার জানার জন্যে জিজ্ঞেস না করেও পারা যায়না। যেমন ধরুন আপনার কোনো মানুষের সঙ্গ ভালো লাগে, তার সাথে আড্ডা দিতে ভালো লাগে। কিন্তু আপনি তাকে সরাসরি বলতে পারছেন না যে আপনার তার সঙ্গ খুব ভালো লাগে। সেক্ষেত্রে বডিল্যাঙ্গুয়েজ বা শারীরিক ভাষা আপনাকে অনেক সাহায্য করতে পারে। আপনি আপনার শারীরিক ভাষার সাহায্যে আপনার মনোভাব প্রকাশ করতে পারেন এবং তার প্রতিক্রিয়া দেখে বুঝতে পারেন অপর পক্ষও আপনার মতই ভাবছেকিনা। আপনি আপনার শারীরিক ভাষার মাধ্যমেই আপনার পছন্দের কোনো ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করতে পারেন কোনো সামাজিক শিষ্টাচার ভঙ্গ না করেই। আমাদের শারীরিক ভাষাকে উন্নত করার কয়েকটি পদ্ধতি আলোচনা করতেই আজ আমার লেখা।

প্রথমত, সর্বদা একটা হালকা ভাব বজায় রাখা। আপনি যখন প্রথমবারের মত কারো সাথে দেখা করতে চলেছেন, তবে নিজের মধ্যে একটা শান্ত হালকা ভাব রাখার চেষ্টা করুন। আপনি যদি আপনার হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে গোমরা মুখে কারো সাথে প্রথমবার দেখা করতে যান তবে সে নিশ্চই আপনাকে ভালোভাবে নিবেনা। আতংকিতও হতে পারে। তাই কারো সাথে দেখা করতে গেলে হাসি মুখে তার সামনে যান। আমরা যখন আত্মসমর্পণ করি, তখন হাত দুটো মাথার উপরে তুলে ধরি এটা দেখানোর জন্যে যে আমাদের কোনো অস্ত্র নেই এবং আমরা লড়তে চাইনা। অবচেতনে এটা আমাদের মধ্যে কাজ করে। তাই কারো সাথে দেখা করতে গেল আপনার হাত দুটো সর্বদা খোলা রাখুন, পকেটের বাইরে রাখুন। এতে অপর পক্ষ বুঝবে আপনি কোনো বিপদ নন এবং আপনি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে আগ্রহী।

দ্বিতীয়ত, প্রথম পরিচয়। প্রায় সকল ক্ষেত্রেই আমরা প্রথম পরিচয়েই ওই ব্যক্তির সম্পর্কে একটা মনোভাবে চলেযাই। যা পরবর্তীতে ওই ব্যক্তির সাথে আমাদের যোগাযোগ বা সম্পর্কে প্রভাব বিস্তার করে। তাই আপনি অবশ্যই চাইবেন প্রথম পরিচয়েই যেন আপনি একটা ভালো ছাপ রাখতে পারেন আপনার পরিচিতের সাথে। আপনি বলিষ্ঠভাবে হেঁটে যান। এটা বোঝায় যে আপনার পরিবেশের আপনার পুরোপুরি নিয়ণ্ত্রণে রয়েছে। কারো কোনো কিছুতে ভীত নন আপনি। এটা খুবই আকর্ষনীয়। আপনাকে ধীরে সুস্থে সুনিয়ণ্ত্রিত ভাবে হাটতে হবে। বিভিন্নি মুভিতে দেখে থাকবেন নায়ক যখন আসে তখন ধীরে-সুস্থে আসে। তার চোখ থাকে সামনে এবং মুখে এমন অভিব্যক্তি থাকে যেন সবকিছু তার নিয়ণ্ত্রণে রয়েছে। আপনিও এমনভাবে দৃষ্টি সামনে রেখে, মোবাইলের দিকে না তাকিয়ে, মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে, দৃঢ়চিত্তে, ধীর লয়ে হাটুন, কোনো তাড়াহুড়া না করে, কোনো কিছু পরোয়া না করে। পারলে চোখা চোখি হলে একটু করে মাথা ঝাকি দিন বা মুচকি করে হাসুন। প্রথম প্রথম হয়ত বিব্রতকর লাগবে। কিন্তু পরে যখন স্বাভাবিক হবেন দেখবেন আত্মবিশ্বাসে টগবগ করছেন আপনি। এটা দারুন আকর্ষনীয় করে তুলবে আপনাকে।

তৃতীয়ত, দেহভঙ্গি। যে ব্যক্তি সর্বদা জুবুথুবু বা কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তার থেকে অনাকর্ষনীয় আর কিছু হতে পারেনা। আপনার কাঁধকে সোজা করুন। মুখকে সামনের দিকে রাখুন এবং মেরুদণ্ডকে সোজা রাখুন। একটা ভালো উপায় হতে পারে, মনেকরুন আপনার মাথার উপর দিয়ে একটা দড়ি বাঁধা আছে আর আপনার বন্ধু এটা ধরে আপনার ঘাড় আর মেরুদণ্ড ধরে টানছে। পাশাপাশি আপনার কুঁজো হয়ে দাঁড়ানো অভ্যাস বাদ দিতে হবে। পারলে নিয়মিত ব্যায়াম করে পিঠের এবং কাঁধের মাংসপেশি শক্তিশালী করতে হবে।

চতুর্থত, আপনার পায়ের অবস্থানের প্রতি মনোযোগি হোন। কারো সাথে কথা বলার সময় আপনার পায়ের অবস্থান আপনার মনোভাবের অনেক কিছুই নির্দেশ করতে পারে। আপনি যদি কোনো মেয়ের সাথে প্রথমবারে মত রাস্তায় কথা বলতে থাকেন এবং আপনার পায়ের পাতা দুটো সরাসরি তার দিকে নির্দেশ করা থাকে তবে সে মনে করতে পারে আপনি তার দিকে বেশী ঝুঁকে পড়েছেন। এতে সে বিরক্ত হতে পারে। তাই আপনার পায়ের পাতার অবস্থানের প্রতি মনোযোগি হোন। আপনি যদি প্রথমবারের মত কোনো মেয়ের সাথে কথা বলেন তো সবথেকে ভালো হয় আপনার পায়ের পাতা ৪৫ ডিগ্রি কোণ করে রাখুন তার থেকে। যেন মনেহয় আপনি যে কোন মুহূর্তে চলে যেতে প্রস্তুত। পরে পরিচয় গভীর হলে তার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে দেখতে পারেন। সে যদি একটু পিছেয়ে যায় তাহলে আপনার করনীয়তো আপনি বুঝতেই পারবেন। কিন্তু যদি সে স্বাভাবিক থাকে বা আপনার দিকে একটু এগিয়ে আসে তো বুঝতেই পারছেন সে আপনার প্রতি আগ্রহী।

পঞ্চমত, বেশী হাত-পা ছোড়াছুড়ি করবেন না। যদি আপনি আপনার সকল কথায় হাত-পা নাড়া-চাড়া বা ছোড়াছুড়ি করেন, সহজ কথায় জোকারের মত আচরণ করেন তো আপনাকে আকর্ষনীয়র দলে ফেলা যাবেনা। মজাদার হয়ত, কিন্তু আকর্ষনীয় না। সবসময় তড়িঘড়ির মধ্যে থাকবেন না। বুকভরে শ্বাস নিন এবং ধীরে-সুস্থে চলাফেরা করুন। ধ্যান এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে আপনার মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে। আপনি বারে বারে নিজেকে শোনান যে আপনি ভালো আছেন, আপনা কাউকে আকর্ষণ করার দরকার নেই, আপনি সুখে আছেন, আপনি যা তাই যথেষ্ঠ। যতক্ষণ না পর্যন্ত নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছেন ততক্ষণ পর্যন্ত নিজেকে শুনাতে থাকেন। এতে আপনার মধ্যে সুখী মনোভাব জাগ্রত হবে এবং আপনার শারীরিক ভাষায়ও তা প্রকাশ পাবে।

আপনাদের অনেকেরই মনেহতে পারে, “ভাই, এতকিছু ভাবনা চিন্তা করার কি আছে? তার থেকে যেমন আছি তেমন থাকাই ভালো না?” আমি বলিকি জীবনের সবসময়ই আমরা যেমন আছি তেমন থাকতে চাইলেও পারিনা। ধরুন আপনি কোনো অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে যাবেন, বা কোনো ক্লাসে ক্লাস নিতে যাবেন। আপনার সে যোগ্যতাও আছে। কিন্তু আপনি ঘাড় কুঁজো করে বিদ্ধস্ত ভঙ্গিতে যাচ্ছেন বা বলার সময় কন্ঠস্বর কাপছে বা আপনার উচ্চারণ স্পষ্ট না বা আপনি শুধু কাগজের দিকে চেয়ে চেয়ে পড়ে গেলেন, শ্রোতার দিকে তাকালেন না।। এতে আপনার কেমন লাগবে? আপনার ক্লাস বা বক্তৃতা কি কেউ উপভোগ করবে? নাকি আপনি হাসির পাত্রে পরিণত হবেন? তাই বলি, শারীরিক ভাষার অবশ্যই দরকার আছে আমাদের জীবনে। এবং এর সঠিক প্রয়োগই আমাদেরকে করে তুলবে আকর্ষনীয় আর সফল।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 82 = 83