আত্মবিশ্বাস বিধ্বংসী পাঁচটি কাজ যা আমাদের করা উচিত নয়

মানব চরিত্রের অন্যতম একটা মুকুট হল আত্মবিশ্বাস। আত্মবিশ্বাস আমাদেরকে নিজের প্রতি আস্থাশীল করে তোলে, যেকোন কাজ করতে উৎসাহিত করে, ব্যবসায় ঝুঁকি নিতে অনুপ্রাণিত করে, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বাজন, পরিচিত মহলের কাছে আকর্ষনীয় করে তোলে। একজন আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তি তার জীবন কে পুরোমাত্রায় উপভোগ করে। অপরদিকে আত্মবিশ্বাস হীনতা আমাদেরকে ভীরু করে তোলে। কাজ করতে নিরুৎসাহিত করে। নিজেদের কমফোর্ট জোনের বাইরে বেরোতে, কোন অপরিচিত পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধা দেয়, ব্যক্তিত্বকে নষ্ট করে এবং ফলে হতাশা ভর করে আমাদের জীবনে। আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এমন কিছু কাজ করি যা ধীরে ধীরে আমাদের আত্মবিশ্বাসকে দুর্বল করে নষ্ট করে দেয়। আমরা যদি এই কাজ গুলো করা থেকে সচেতন থাকি তবে আমরা কিন্তু সহজেই আমাদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে পারি। আজ তেমনই কিছু কাজ নিয়ে আলোচনা করব যা আমাদের আত্মবিশ্বাসকে ক্রমাগত শূণ্যের কোঠায় নিয়ে যায়।

১. সবথেকে বেশী আত্মবিশ্বাস নষ্টকারী কাজটি হল সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করা। আমরা প্রায়ই যখন কোন কাজ করতে চাই, তখন কাজটি সঠিক সময়ে করতে চাই। এখন আড়াইটা বাজে তিনটায় করব, তিনটা বাজে সাড়ে তিনটায় করব বা আজ শুক্রবার আজ না কাল শনিবার কাল থেকে শুরু করব বা এরকম চলতে থাকে। যদিও সঠিক সময় আর আসেনা। আসলে আমারা যদি কোন কাজ করতে চাই তবে যখনই মাথায় আসে কাজটি করার তখনই কাজ করার সঠিক সময়। কাজ কখনো ফেলে রাখতে নেই, সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে নেই। অপেক্ষা কখনো শেষ হয়না। জিমে যেতে চান, চাকরির পড়া শুরু করতে চান, ব্যবসা শুরু করতে চান, ইউটিউব চ্যানেল খুলতে চান, কোন বই পড়তে চান, কোন লেখা লিখতে চান তবে যখন মাথায় আসবে তখনই শুরু করা উচিত নয়ত সেটা আর শুরু হবেনা।

২. দ্বিতীয় যে কাজ আমাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে তা হল কোন কাজের পরিণিতি সম্পর্কে অতিরিক্ত চিন্তা করা। আমরা প্রায়সই কোন কাজ করতে গিয়ে বেশী বেশী চিন্তা করি। লোকে কি বলবে, সবাই হাসি-ঠাট্টা করবে, মজা করবে, লাভ-নাকি ক্ষতি হবে, ব্যবসা চলবেনা। এত কিছু চিন্তা করতে করতে আসলে কাজটিই করা হয়ে ওঠেনা। তাই অতিরিক্ত চিন্তা করা বাদ দিন। জিমে যেতে চাইলে বন্ধুরা বা কাজিনরা বা বাবা-মা কি ভাববে কি বলবে চিন্তা করার দরকার নেই। নিয়মিত যেতে পারবেন কিনা ভাবার দরকার নেই। যাওয়া শুরু করলেই দেখবেন নিয়মিত যেতে পারছেন কিনা। যে কাজের কথা ভাবছেন তা শুরু না করলে আপনি সত্যিই জানতে পারবেননা যে কাজটি সফল হত কি হতনা। তাই অতিরিক্ত চিন্তা করা বাদ দিয়ে কাজ করা শুরু করুন।

৩. আত্মপ্রসাদ লাভ করা। এটাও আমাদের আত্মবিশ্বাস নষ্টকারী একটা কাজ। আমরা একদিন কঠোর পরিশ্রম করলেই পরের দিন ভাবি গতকাল তো খুব কাজ করলাম, খুব পড়ালাম আজ নাহয় একটু বিশ্রাম করি। গত এক সপ্তাহ ধরে সকালে উঠেছি আজ নাহয় একটু ঘুমোই বা গত সপ্তাহে তো টানা জিমে গেছি আজ না গেলে কিছু হবেনা। এই আত্মপ্রসাদ আসলে আমাদের অবচেতনে লুকিয়ে থাকা আরামপ্রিয় ব্যক্তিত্বকে জাগিয়ে তোলে। একদিন কাজে ঢিল দিলেন তো আপনার মনে এটা ঢুকে যাবে যে আপনি চাইলেই বিশ্রাম নিতে পারেন। কাজ না করে বিনোদনে ব্যস্ত থাকতে পারেন। আর তাই কাজ করার থেকে বিনোদনে আগ্রহ বেড়ে যাবে। এজন্য আমাদের কখনোই অতিরিক্ত আত্মপ্রসাদ লাভ করা উচিত নয়। যখনই কাজে ফাঁকি দেবার কথা আসবে তখনই চিন্তা করবেন কাজটা না করলে তখন আপনার কেমন অনুভূতি হবে। আপনি একদিন জিমে না গেলে আপনার ওজন কমানো বা গ্রিকগডের বডি পেতে একদিন দেরি হবে, আজ কাজ না করলে মাসে টাকা খানিকটা কম উপার্জন হবে, আজ না পড়লে পরীক্ষায় খারাপ ফল হবে, বাবা-মা রাগারাগি করবে। আপনি নিশ্চই তা চাইবেন না। তাই আত্মপ্রসাদে ভোগা বাদ দিয়ে কাজ শুরু করতে হবে।

৪. আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ আত্মবিশ্বাস বিনাসী কাজ হল সবাইকে হ্যাঁ বলা। আমাদের মন যেহেতু খুব নরম, আমরা সহজে কাউকে না বলতে পারিনা। আমরা শত ব্যস্ত থাকলেও অন্যের জন্য কাজ করতে রাজি হয়ে যাই। যা আমাদের মনস্তাত্বিক চাপ আরো বাড়িয়ে তোলে। তাই মাঝে মাঝে না বলার অভ্যাস করুন। সংসারে শান্তি বজায় রাখতে, পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটানো জন্য মাঝে মধ্যে ওভার টাইমের করতে বললে বসকে না বলুন, নিজের কাজের চাপ বেশী থাকলে সহকর্মীকে বলুন আজ আপনার কাজের চাপ বেশী অন্যদিন আপনি তার কাজটা করবেন। তাই বলে আমি আবার স্বার্থপর হতে বলছিনা। আমি শুধু বলছি যে নিজের উপর বেশী চাপ না নিয়ে মাঝে মাঝে না বলার অভ্যাস করুন।

৫. জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো। এটা আরেটা আত্মবিধ্বংসী কাজ যা আমরা অনেকেই করি। বাস্তব জীবনের অবসাদ ভুলতে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যাই, মাদকে আসক্ত হয়ে যাই। অথবা রিয়েল লাইফের অপ্রাপ্তি ঢাকতে ভার্চুয়াল লাইফের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ি। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে দেখি কতগুলো লাইক পড়ল, কত জন ফলোয়ার হল। এতে হয়ত সাময়িক চিত্ত বিনোদন মেলে, একটু প্রশান্তি মেলে কিন্তু দিন শেষে আপনি আরো হতাশ হয়ে যাবেন। আত্মবিশ্বাস আরো নষ্ট হবে। কারো সাথে কথা বলার, আচরণ করার অবস্থা আর থাকবেনা। তাই জীবনথেকে পালিয়ে না বেড়িয়ে তাকে মোকাবেলা করুন। ফেসবুকের লাইক না গুণে বন্ধুর সাথে ঘুরতে বরোন। সারারাত চ্যাটিং না করে একদিন চায়ের দোকানে বসে চুটিয়ে আড্ডা দিন। ইমোজি ব্যবহার না করে পরিবারের সাথে সময় কাটান। বন্ধুদের সাথে একসাথে হাসুন বা দুঃখের কথা তার সাথে শেয়ার করে একসাথে কাঁদুন। দেখবেন খারাপ লাগা দুর হয়ে যাবেন। সুখ বোধ হবে। আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে।

আত্মবিশ্বাস আমাদের জীবনের চলার পথের রসদ। এটা ফুরিয়ে গেলে জীবন মাঝ পথেই থেমে যাবে। তাই চলুন সবাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে সুখী-সুন্দর জীবন যাপন করি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 1 =