গল্প উপন্যাসের ভিটে মাটি মানুষের সন্ধানে-১

বছর তিনেক হলো আমার নিজ গ্রামের সাথে আমার সকল সম্পর্কের হয়েছে জলাঞ্জলি। গ্রামটিতে আমার জন্ম না হলেও জীবনের এগার-বারটি বছর ওখানকার জল-হাওয়ায় আমার শরীর বেড়ে উঠেছে, দুষ্টুমি আর ধুলিখেলা করে সময় কেঁটেছে, ফুটবল-ক্রিকেট খেলতে খেলতে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে। এই তিন বছরে আমার দুটো ক্ষতি হয়েছে। প্রথমত-মাটি ও মানুষের নিবিড় স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়েছি। টিনের চালে শুকনো পাতা গড়িয়ে পড়ার সরসর আওয়াজ, আমগাছ থেকে টিনের চালে শিশির পড়ার মৃদুমধুর শব্দ, সুনসান রাত্রে বটগাছের পাতা থেকে টুপ টুপ করে তলার শুকনো বটের পাতায় শিশির পড়ার শব্দ, মন কেমন করা জ্যোৎস্নারাত আর উত্তরের মাঠ; জোয়ারের বিল, ছয় ঋতুতে বিল আর মাঠের ছয় রকম চেহারা; বিলের জলে নৌকা ভ্রমণ, বৃষ্টিতে ভেজা, ভেজা বিলের শরীরের গন্ধ এবং সেখানকার মানুষ; যাদের কেউ কেউ সত্যি আমাকে ভালবাসতো, হয়তো এখনও বাসে; এইসব মানুষ দেখা, ঘামে ভেজা দেহাতি শরীরের পাশে বসে তাদের একান্ত সুখ-দুঃখের গল্প শোনা; এসব থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি। এই গ্রামটি ছাড়াও পাশের গ্রাম, তার পাশের গ্রাম, আরো অনেক গ্রামের কতো মানুষ দেখেছি, তাদের সম্পর্কে জেনেছি। এদের ভেতর থেকেই খুঁজে পেয়েছি আমার গল্প-উপন্যাসের চরিত্র। আর শুধুই তো গ্রামের মানুষ না, গ্রামে আসতো আরো রকম কতো বিচিত্র মানুষ-সাধুসন্ত, ফেরিওয়ালা, বানরওয়ালা, পাটনী, বৃহন্নলা বাউল-ফকির, ভাড়াটে যাত্রাশিল্পী, অষ্টক গানের দল, কীর্তনের দল, গাজীর গান গাইতে আসা সেই ভরাট কণ্ঠের প্রবীণ মানুষটি, চৈত্রমাসে শিবপূজায় নানান সাজে সেজে আসা মানুষ ইত্যাদি। হ্যাংলার মতো তাকিয়ে দেখেছি এইসব মানুষদের। তখন বুঝিনি এসব কিছু আমার পরবর্তী জীবনের জন্য এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। এখন যখন লিখতে বসি, যখন এইসব চরিত্ররা আমার স্মৃতির ধুলো ফুঁড়ে উঠে আসে, হাতছানি দেয়, তখন এর মূল্য বুঝি। হ্যাঁ, গত তিন বছর আমি এসব থেকে বঞ্চিত হয়েছি এবং ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।
দ্বিতীয়ত, আমার যে ক্ষতিটা হয়েছে তা হলো-আমি গ্রামে গেলেই বাঁশ, কাঠ, পাট, হাতুড়ী-বাটালী এসব নিয়ে বসে যেতাম সখের ভাস্কর্য বানাতে। যতদূর পারতাম করতাম, বাকীটা ঢাকায় নিয়ে এসে অবসরে বসে বানাতাম। একবার তো বাড়িওয়ালা হাঁপাতে হাঁপাতে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে এলো, ‘শব্দ কিসের?’ তিনি ভেবেছেন আমি তার দেয়ালের বারটা বাজাচ্ছি। তারপর আমার বাঁশ-কাঠ দেখে তৃপ্তির হাসি হেসে ফিরে গেলেন! ভাস্কর হওয়া আমার লক্ষ্য নয়। নেহাতই সখের বশে বানানো। ভাল লাগতো তাই বানাতাম। গত তিন বছরে শিকড়চ্যুত হওয়ায় বাঁশ-কাঠের যোগান পাইনি, আর কোনো ভাস্কর্যও বানানো হয়নি আমার। আমার সাধের হাতুড়ী-বাটালী, করাত ইত্যাদিতে মরিচা ধরে গেছে। তবে ইচ্ছেটা মরে যায়নি। ইচ্ছেটাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি বুকের ভেতর। আবার যদি কোনো দিন কোনো গ্রামে আমার নিজের একটা বাড়ি হয়, সেদিন আমি আবার হাতুড়ী-চাটালী হাতে তুলে নেব। করাতে ধার দেব।

সঙ্গত কারণেই আমার এই দ্বিতীয় ক্ষতিটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। আর প্রথম ক্ষতিটা পুষিয়ে নিতে মাঝে মাঝেই এদিক-সেদিক ছুটি। কারেন্ট জাল দিয়ে জলের বুক ছেকে আনার মতো ছেকে আনি আমার গল্পের চরিত্র। তো এই সূত্রে প্রায়ই ঢাকার আশ-পাশের গ্রামগুলোতে যাওয়া হয়। কিন্তু ঢাকার আশ-পাশে আর নিখাদ গ্রাম কোথায়! সাপের মতো লকলকে জিভ নিয়ে নগরায়ন গ্রাস করছে গ্রামগুলো। একবার গিয়ে যেখানে দেখে আসি সবুজ বাঁধাকপির ক্ষেত, পরের বার গিয়ে সেখানে দেখি দাঁড়িয়ে আছে তিনতলা বাড়ি। একবার গিয়ে যেখানে দেখি হলুদ সর্ষেক্ষেত, পরের বার গিয়ে দেখি সেখানে মাটি ফেলছে কোনো রিয়েল এস্টেট কোম্পানী। এভাবেই একের পর এক নীরবে আত্মসমর্পণ করছে ঢাকার আশপাশের গ্রামগুলো।

কয়েকদিন আগেই আমরা তিন বন্ধু ঢাকার পাশের একটি গ্রামে গেলাম। গ্রামটির পাশ ঘেঁষে গেছে তুরাগ নদী। বর্ষার সময় তুরাগের বুক ছাপিয়ে গ্রামটির চারপাশ জলে ভেসে যায়, তখন গ্রামটিকে মনে হয় একটা দ্বীপ। যাতায়াতের একমাত্র বাহন তখন নৌকা। শরতে জল নামতে থাকে। তখন সারা মাঠের জল স্বার্থপরের মতো টেনে নেয় তুরাগ। কিন্তু ঢাকা থেকে ঐ গ্রামটিতে যেতে হলে বার মাসই নৌকায় তুরাগের বুক পেরিয়েই যেতে হয়।

শান বাঁধানো ঘাট দিয়ে উঠতেই বেশ কয়েকটি বড় এবং মাঝারি আকারের বটগাছ। বটগাছের ছায়ায় কয়েকটি দোকান। দোকানের চাঙায় আড্ডা আর চা-সিগারেটে মত্ত প্রবীণ এবং মধ্যবয়সী কিছু মানুষ। স্কুলের মাঠে পা দিতেই দেখি একজন প্রবীণ ছড়ায় ছড়ায় বারোভাজা বিক্রি করছেন। বারোভাজার স্বাদ নিতে নিতে এগোই আর ভাবি, পরবর্তী প্রজন্ম এই মানুষগুলোকে পেতে পারে কেবল বইয়ের পাতায়। কিন্তু বই পড়ার সময় ওরা পাবে তো!

স্কুলের মাঠের পাশেই একটা পুরনো বাড়ি। তার সৌন্ধর্য্য ম্লান করে তাকে ঘিরে ধরেছে কয়েকটি ছোট ছোট টিনের ঘর। জনপদের সরু রাস্তা ধরে এগোই আর লক্ষ্য করি দু-বছরে কতটা পরিবর্তন হয়েছে। দু-বছর আগেও একবার ঘুরে গেছি এই গ্রাম। পরিবর্তনটা সহজেই চোখে ধরা পড়ে। গ্রামটা ঘিঞ্জি হয়ে গেছে। নতুন নতুন বাড়ি ঘর উঠেছে অনেক।

গ্রামটি যে অনেক পুরনো এবং সমৃদ্ধ তার প্রমাণ, কিছু পুরনো বাড়ি আর মন্দির। একশ বিশ বছর আগের মন্দির রয়েছে এখানে, রয়েছে ছোট বড় একাধিক মন্দির এবং মঠ। রয়েছে দৃষ্টিনন্দন কিছু পুরনো দুই-তিনতলা বাড়ি। অযত্ন আর অবহেলায় বাড়িগুলো হতচ্ছাড়া দেখালেও তার ভেতরেই এককালের বনেদীয়ানা জাহির করছে। পুরো গ্রামটি ঘুরে আসার পর একটা পুরোনো তিনতলা বাড়ির সামনের চায়ের দোকানে বসি। চায়ের দোকানে আরো দু-তিনজন লোক বসে চা খাচ্ছে। গল্প করছে। আমরা চায়ে চুমুক দিতে দিতে গ্রামটি সম্পর্কে এটা-সেটা জিজ্ঞাসা করি। চায়ের দোকানদারটি পিছনের তিনতলা বাড়ির কেয়ারটেকার। পরিবার নিয়ে বাড়িটাতে এখন সে-ই থাকে।

গ্রামটিতে এখনও বেশ কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ আছে। কিন্তু আগে এই সংখ্যা আরো বেশি ছিল। এই যে এতোক্ষণ ঘুরে ঘুরে যে পুরোনো বাড়িগুলো দেখলাম, এক সময় তার মালিক ছিল হিন্দুরা। এই ধরনের বাড়ির হাতবদলের ইতিহাস সারা বাংলাদেশেই প্রায় একই রকম। তবু আমি খোঁচাতে থাকি, দোকানদার এবং অন্যরা উগড়ে দিতে থাকে তথ্য। কেবল একজন ছাড়া। এই একজনের কথায় পরে আসবো।
‘এখন যারা এই বাড়িগুলো কিনেছে। নিশ্চয় অনেক দামে কিনেছে?’
এখন যারা এই বাড়িতে বাস করছে, তাদের এই বাড়ি কেনার সামর্থ্য নেই তা আমি ভাল মতোই ল্য করেছি। তাদের শারীরিক গঠন, পোষাক এর কথাবার্তাই প্রমাণ করে তারা অতিশয় দরিদ্র শ্রেণির, দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ।
‘চায়ের দামে।’ দোকানদারের উত্তর।
‘মানে?’
‘চা খাইতে খাইতে জায়গা-জমি লেইখে নিছে। তারপর রাইতের অন্ধকারে গাবতলী নিয়া গাড়িতে তুইলা দিছে। ডর দেহাইছে, ফির‌্যা আইলেই জীবন শ্যাষ।’
চায়ের দোকানদারের নাম লতিফ (ছদ্মনাম)। লতিফের কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তথ্য নিই। এরপর লতিফ চুপচাপ বসে থাকা লোকটিকে দেখিয়ে বলেন, ‘ওনার বাড়ি-জমিও তো লিখ্যা নিচে।’
প্রবীণ মানুষটির দিকে ফিরে তাকাই। পরনে ধুতি, গায়ে গেঞ্জি। গলায় তুলসীর মালা। ইটচাপা ঘাসের মতো মাথায় রুক্ষ্ম চুল। হাতদুটো কোলের ওপর রেখে চুপচাপ বসে আছে। লতিফ যখন আমাদের এতো কথা বলছে, তখনও সে নির্বিকার। একটি কথাও বলেনি। কেবল চলছল চোখে একবার আমাদের দিকে, একবার শূন্যে দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়েছে। চোখে-মুখে কোনো অভিযোগ নেই। কিছু চাওয়ার নেই, কিছু পাওয়ারও নেই। যেন এমনটাই হবার কথা ছিল! এটাই যেন নিয়তি!
‘কে নিয়েছে?’
লতিফ মিরপুরের এক আওয়ামীলীগ সংসদ সদস্যের পরিবার এবং সাভারের আরেক দখলদার পরিবারের নাম বলেন। উভয় দখলবাজ পরিবারই এখন আওয়ামীলীগ করেন। মিরপুরের মোল্লা পরিবার আর সাভারের জং পরিবার। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে আওয়ামীলীগ সংখ্যালঘু বান্ধব একটি রাজনৈতিক দল। তাতে তারা ক্ষমতায় থাক বা না থাক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে তারা সুরক্ষা দেয়। আহারে সুরক্ষার শ্রী!

চুপচাপ নির্লিপ্ত চোখে বসে থাকা এই লোকটির জমি লিখে নিয়ে এক রাতে সপরিবারে গাবতলী নিয়ে বাসে তুলে দিয়েছিল। ক’দিন পরেই আবার ফিরে আসে তারা। পরিবার নিয়ে কোথায় যাবে? কী খাবে? কোথায় থাকবে? হাতে তো টাকা পয়সাও বেশি নেই। তাই ফিরে এসে সংসদ সদস্যের হাতে-পায়ে ধরে নিজ বাড়িতে আগাছার মতো থাকছে। কথা দিয়েছে কোনো ঝামেলা করবে না, কাউকে কিছু বলবে না। তাই সংসদ সদস্য দয়া করে থাকতে দিয়েছে। আহারে দয়াবান মানুষ! মোল্লাবাড়ীর দয়ার সাগর! এতো দয়া বুকের কোনখানটায় ধরে রাখে! কিছুদিন আগেই নাকি সংসদ সদস্যে আবার লোক পাঠিয়ে জানিয়েছে তাদের অন্যত্র চলে যেতে। এতো বড় দুনিয়ায় যাবার জায়গার কী অভাব!

গ্রাম থেকে নামতে নামতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। পাশেই একটি শ্মশান, যাবার ইচ্ছা থাকলেও অন্য দুই সঙ্গীর অনাগ্রহে যাওয়া হলো না। তাছাড়া যেতে হলে প্যান্ট ভাঁজ করে কাদার ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে হবে। অগত্যা আবার নৌকায় উঠলাম। আকাশে তখন গোধূলির আবিরের রঙ। আমার চোখ ঐ শ্মশান ঘাটের দিকে। কী আছে ওখানে দেখা হলো না কিন্তু কেবলই মনে হতে লাগলো-সব হারানো ঐ মানুষটি কি এই শ্মশানের জন্য অপেক্ষায় আছে? নাকি শ্মশানই অপেক্ষায় আছে ঐ মানুষটির! জীবনে তো স্ত্রী-সন্তান ছাড়া ভাল মতো বাঁচার জন্য আর কিছু পায়নি। পৈত্রিক ভিটে, একটি টিনের বাড়ি, জমি যা পেয়েছিল তাও হারিয়েছে। তবে আর কেন বেঁচে থাকা! ডাক এলেই তো জীবনজ্বালা জুড়োয়। নাকি আরো কিছু দুঃখ পাওনা আছে জীবনে! জীবন ছাড়া তো হারাবার আর কিছুই নেই তার!

ঢাকা।
নভেম্বর, ২০১৩

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 52 = 60