একুশের চেতনা বনাম রাষ্ট্রযন্ত্র

ভাষা মানুষের সাংস্কৃতিক বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই সভ্যতার ক্রমবিকাশে ভাষাকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। মানুষের জন্ম ও বিকাশের সঙ্গে তার মাতৃভাষার প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে। শোক-ক্ষোভ-আনন্দ-উচ্ছ¡লতায় মানুষের সব অনুভূতির সত্যিকার প্রকাশ ঘটে তার মাতৃভাষাতেই।তাই বলা হয়ে থাকে কোন জাতিকে যদি ধ্বংস করতে চাও তাহলে প্রথমেই তার ভাষার ওপর আঘাত হানতে হবে। তার ধারাবাহিকতায় পাকিস্থানী শাসকগোষ্ঠী আমাদের ভাষার ওপর আঘাত করে। কিন্তু একুশের ভাষা আন্দোলনের বাংলাদেশী শাসকগোষ্ঠীর বয়ান মোটেও আমাদের জন্য গৌরবের নয় বরং নানাভাবে লজ্জাজনক বটে। আমাদের পাঠ্যপুস্তুক ও বিভিন্ন গল্পের বইয়ে পৃথিবীর প্রথম ও একমাত্র ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী জাতি হিসাবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। যা ভাষার জন্য আত্মত্যাগের মহিমায় ভাস্বর এই জাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে প্রকারন্তরে প্রশ্নবিদ্ধ করে, বাংলাভাষী সংগ্রামী জাতি হিসেবে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত লজ্জিত করে। আসুন একটু ইতিহাসের পাতা হতে ঘুরে আসি….
আসাম প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানার রণকেলী গ্রামের আবদুর হামিদ চৌধুরী (সোনা মিয়া) ১৯২২ সালে গোলাপগঞ্জ থানার মাইঝভাগ গ্রামে মগফুর আলীর বাড়িতে সংঘটিত ছিন্ন কোরান মামলার আসামি দারোগার শাস্তি সম্পর্কে জানতে চেয়ে বাংলা ভাষায় প্রশ্ন করেন। জবাবে পরিষদের জুডিসিয়াল মেম্বার বলেন, বাংলা ভাষায় প্রশ্ন করলে এর উত্তর দেয়ার বিধান আইনে নেই। তখন সিলেটের সব সদস্য রুখে দাঁড়ান। তারা দাবি জানান, মাতৃভাষায় কথা বলা মানুষের জন্মগত অধিকার। আসাম সরকার ১৯২৭ সালে বাংলা ভাষাকে পরিষদের ভাষা হিসেবে যুক্ত করেন। পরবর্তীতে আসামের বরাক উপত্যকার আসাম সরকারের অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা করার ঘোষণা দেয়। তার প্রতিবাদে ১৯৬১ সালের ১৯ মে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ১১ জন বিপ্লবী। আসামে ১৯ মে ভাষা দিবস পালন করা হয়। এ বরাক উপত্যকাতেই বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার জন্য ১৯৯৬ সালে শহীদ হন সুদেষ্ণা সিংহ। তাছাড়াও ১৮ শতকে বুলগেরীয়দের ভাষা আন্দোলন অন্যতম। বুলগেরীয় জনগণ তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে বুলগেরীয় ভাষার রাষ্ট্রীয় অধিকার আদায়ের সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল। ভাষার জন্য এরকম আরো সংগ্রাম ও ইতিহাসের খোঁজ পাওয়া যায় সময়ের প্রতিটি স্তরে।
প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে বাংলাদেশের বাঙালিরাই একমাত্র জাতি নয় যারা আপন মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়েছে এবং বুকের রক্ত ঝরিয়েছে।
২০০০ সালে দুনিয়ার ১৮৮টি দেশ ২১ ফেব্রæয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে মনোযোগ তৈরি হয়েছে দুনিয়ার সবার মাতৃভাষাকে স্বীকৃতি ও গুরুত্ব দেয়ার। কিন্তু বাংলাদেশে এ বিষয়ে এখনো কার্যকরী রাষ্ট্রীয় মনোযোগ তৈরি হয়নি। বাংলাদেশে বসবাস করা বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী ৪৭টি ভাষায় কথা বলে তার বিপরীতে বাংলাদেশের সব জনগণের রাষ্ট্রের সংবিধান কেবল বাংলা ভাষাকেই রাষ্ট্রের একমাত্র সাংবিধানিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।এতে আদিবাসীরা বঞ্চিত হচ্ছে তাদের মাতৃভাষায় পড়াশোনা থেকে। রাষ্ট্রের এ আচরণে চরম নিরাপত্তাহীনতা এবং বিলুপ্তির পথে এ সকল ভাষাগুলো। এটি একুশের মহান ভাষা আন্দোলনের মনস্তত্তে¡র সঙ্গে সম্পূর্ণই বেমানান। তাই দেশের সব আদিবাসীদের মাতৃভাষাকে স্বীকৃতি দিতে হবে।

তথ্যসূত্র :
বাংলাদেশে কি সব জাতির সকল ভাষা সমান স্বীকৃতি ও মর্যাদা পাবে?
পাভেল পার্থ
আসামের বাংলা ভাষা আন্দোলন, উইকিপিডিয়া

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 2 =