স্পিনোজার অবসর এবং মৃত্যু

সমাজ থেকে বহিষ্কারাদেশের ঘোষণা বেশ সাহসিকতার সাথেই গ্রহণ করে স্পিনোজা বললেন কোনকিছুই আমাকে বাধ্য করতে পারে না। আমি কোন অপরাধ করিনি। কিন্তু স্পিনোজার বিদ্রোহ ছিল অন্ধকারে তীব্র আলোর ঝলকানি। তবে সত্য হলো এটাই সদ্য কিশোর উত্তীর্ণ সিনেগগের প্রিয় ছাত্র স্পিনোজা নিজেকে খুঁজে পেলেন তিক্ত আর নির্দয়ভাবে একা। একাকীত্বের মত যন্ত্রণা আর কিছু নেই এবং ক্ষেত্র বিশেষে ইহুদি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াটা অনেক বেশি হৃদয়বিদারক। স্পিনোজা ইতিমধ্যেই তার অতীত ধর্ম বিশ্বাস হারানোর যন্ত্রণায় জর্জরিত। একজন মানুষকে আপন ভুবন এবং মানসিক জগত থেকে শিকড়ছাড়া করা বড় ধরণের শল্য চিকিৎসার মত। মনের ভিতর গভীর ক্ষত জন্ম নেয়। স্পিনোজা জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করলেন। গ্রহণ করলেন আরেকটি ধর্মীয় বিশ্বাস যেখানে মানুষেরা একটুখানি উষ্ণতার জন্য গবাদিপালের মত একত্রে দলবেঁধে বসত করে। পরিবার এবং জাতিগোষ্ঠী থেকে বিচ্যুত হয়ে স্পিনোজার ধর্মান্তর সম্ভবত দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। সে কিন্তু ধর্মান্তরিত হয়েও খ্রিষ্টানদের কোন গোত্রে যোগ দিলেন না এবং তার জীবনটা একাকী কাটিয়ে দিলেন। স্পিনোজার বাবা যিনি একসময়ে সন্তানের হিব্রু শিক্ষায় শ্রেষ্ঠত্ব দেখতে উদগ্রীব থাকতেন সেই তিনি সন্তানকে দূরে ঠেলে দিলেন, তার বোন উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যতসামান্য সম্পত্তি জাল দলিল করার চেষ্টা করে, তার অতীত বন্ধুরা তাকে দিনের পর দিন এড়িয়ে চলতে লাগল। আশ্চর্যের কিছুই নেই স্পিনোজার মাঝে তখন সামান্য রসবোধ অবশিষ্ট ছিল এবং আশ্চর্যের কিছুই নেই তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই keepers of the law চিন্তা করে সামাজিক তিক্ততা ভেঙে বেরিয়ে এলেন।

যারা অলৌকিক ঘটনার পিছনের কারণ খুঁজতে চান এবং দার্শনিক হিসেবে প্রকৃতির কার্যকারণ বুঝতে চেষ্টা করেন এবং নির্বোধের মত বিস্ময়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন না তারা অতি দ্রুতই প্রকৃতির রহস্য বুঝতে পেরে প্রচলিত প্রথাবিরোধী হয়ে পড়েন এবং তার মধ্যে ধর্মের প্রতি অনীহা চলে আসে। যারা প্রকৃতির রহস্য জানেন বলে দাবী করেন সাধারণ মানুষ তাদেরকে ঈশ্বর এবং প্রকৃতির ব্যাখ্যাকারী হিসেবে সম্মান করেন। প্রথাবিরোধী মানুষেরা জানেন যদি অজ্ঞানতাকে একবার পাশ কাটিয়ে রাখা যায় তাহলে বিস্ময়ের ঘোর কেটে যাবে এবং কর্ত্রিপক্ষের কাছে এটাই একমাত্র সংরক্ষিত উপায়।

সমাজ থেকে বহিষ্কৃত হবার অতি অল্প কিছুদিন পরেই স্পিনোজার জীবনে ঘটে গেল সর্বোচ্চ তিক্ততম অভিজ্ঞতা। একদিন রাত্রে স্পিনোজা রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। একজন উগ্রধার্মিক গুণ্ডা স্পিনোজা প্রদর্শিত দার্শনিক মতবাদকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে খুন করতে উদ্যত হলো। স্পিনোজা দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েও ড্যাগারের কোপ এড়াতে সক্ষম হলেন না, ঘাড়ে আঘাত পেলেন। স্পিনোজা নিশ্চিত হয়ে গেলেন পৃথিবীতে একজন দার্শনিকের বসবাসের জন্য কোন নিরাপদ স্থান নেই। তিনি আমস্টারডাম শহরের বাইরে একটা রাস্তার ধারের একটা বাড়ির ছাদে লোক চক্ষুর অন্তরালে বসবাস করতে লাগলেন। সম্ভবত সেই সময়েই স্পিনোজা তার নাম বারুখ থেকে বেনেডিক্টে পরিবর্তন করে ফেলেন। তার আশ্রয়দাতা পরিবার ছিলেন খ্রিস্ট ধর্মের ক্ষুদ্র মেনোনাইট সম্প্রদায়ভুক্ত, এবং হয়ত সেই কারনেই ধর্মের পাশবিকতা বুঝতে পেরেছিলেন। তারা স্পিনোজার দুঃখ ভারাক্রান্ত বিনয়ী মুখের চেহারাকে পছন্দ করেছিলেন ( যারা জীবনে অনেক দুঃখ, যন্ত্রণা সহ্য করেছেন তারা হয়ত অতি বিনয়ী অথবা ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে।) যখন স্পিনোজা কোন সন্ধ্যায় দৈবাৎ তার ছাদের ছোট্টঘর থেকে বের হয়ে নিচতলায় এসে ধূমপান করতে করতে নিরহঙ্কারভাবে তাদের সাথে কথা বলতেন তখন তারা খুব খুশি হতেন।

লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে আসার পরে স্পিনোজা প্রথম দিকে আমস্টারডামের ভ্যান ডেন এনডে স্কুলের শিশুদের পাঠদান করে জীবিকা অর্জন করতেন। তারপরে কিছুদিন চশমার লেন্স পরিষ্কার করার কাজ করতেন। কারন স্পিনোজার কঠিন এবং দুর্বোধ্য বিষয় নিয়ে কাজ করার প্রবল আগ্রহ ছিল। ইহুদি সম্প্রদায়ে বসবাস করার সময়ে স্পিনোজা চশমার কারবার শিখেছিলেন। হিব্রুশাস্ত্র অধ্যয়ন কালে প্রতিটি শিক্ষার্থীকেই কিছু হস্তশিল্পের দক্ষতা অর্জন করতে হয়। শুধু ধর্ম শাস্ত্র এবং নীতি শিক্ষা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের জীবিকার ব্যবস্থা করতে পারে না। এই কারনেই ইহুদি ধর্মগুরু গামালিয়েল বলেছেন, “ কাজ আমাদেরকে সৎ এবং ধার্মিক মানুষ করে তোলে। যখন কোন প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মানুষ কর্মে নিযুক্ত হতে ব্যর্থ হয় তখনই সে খারাপ মানুষে পরিণত হয়”।

পাঁচ বছর পরে ১৬৬০ সালে স্পিনোজার আশ্রয়দাতার পরিবার লাইডেনের কাছে রাইন্সবার্গে স্থানান্তরিত হলেন। স্পিনোজাও তাদের সাথে স্থানান্তরিত হলেন। তার আশ্রয়দাতা পরিবারের যে বাড়িতে স্পিনোজা থাকতেন সেই বাড়ি এখনো সংরক্ষিত আছে এবং রাস্তা বহন করছে এই মহান দার্শনিকের নাম। এই পাঁচ বছর স্পিনোজা নিতান্ত সরল জীবন যাপন আর দার্শনিক চিন্তায় কাটিয়েছেন। দীর্ঘদিন স্পিনোজা একনাগাড়ে দুই তিন দিন ঘর থেকে বের হতেন না, কারো সাথে দেখা পর্যন্ত করতেন না। খাবার খেতেন যৎসামান্য যা খাদ্য তার জন্য তার চিলেকোঠার ছোট্টঘরে দেয়া হতো সেটা খেয়েই কাটিয়ে দিতেন। চশমার লেন্সের আতশ কাঁচ ঘষামাজা পরিষ্কারের কাজ করে তার জীবিকা ভালোই চলে যাচ্ছিল। কিন্তু স্পিনোজা কখনো গ্রাসাচ্ছদনের অতিরিক্ত অর্থ আয়ের চিন্তা করতেন না। তিনি সার্থক মানুষ হওয়ার জন্য ভালবেসেছিলেন প্রজ্ঞা। সমাজ বিচ্ছিন্নবাসের সময়ে “দ্য লাইফ অফ স্পিনোজা”জীবনী গ্রন্থের লেখক জোহান্স কোলেরাস নিয়মিত স্পিনোজার খোঁজখবর নিতেন। তিনি স্পিনোজাকে কাছ থেকে দেখেছিলেন। স্পিনোজার জীবনী গ্রন্থে তিনি লিখেছিলেন, “স্পিনোজা প্রতি তিনমাস অন্তর তার খরচের হিসাব নিকাশ দেখতেন এবং বছর শেষে খরচ যেন বেশি কম না হয়ে যায় সেটা খেয়াল রাখতেন। স্পিনোজা মাঝে মাঝে আশ্রিত বাড়ির মানুষদের বলতেন, “স্পিনোজা হলেন সেই কুণ্ডলী পাকানো সাপ যার লেজ হলো তার নিজের মুখে এবং বছর শেষে তার সঞ্চয় বলে কিছুই নেই।” কিন্তু, স্পিনোজা তার সাধারণ জীবন নিয়ে ভীষণ সুখী মানুষ। কেউ একজন স্পিনোজাকে উপদেশ দিয়েছিলেন, বাস্তব কার্যকারণের থেকে ধর্মীয় উপদেশের উপর অধিক ভরসা রাখতে। স্পিনোজা উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি একটা সময়ে অপ্রাকৃতিক ফল খুঁজতে ব্যস্ত ছিলাম এবং অপ্রাকৃতিক ফলের সন্ধান পেয়েছিলাম প্রাকৃতিক বোধের মাধ্যমে। জ্ঞানার্জনের এই যাত্রায় আমি সুখী, এবং আমি কখনো দীর্ঘস্বাস বা দুঃখে সময় অতিবাহিত করিনি। আমার সময় কেটেছে শান্তি, নিরবতায় এবং আনন্দে। একজন মহর্ষি মানুষ একবার বলেছিলেন, “যদি নেপোলিওয়নের স্পিনোজার মত প্রজ্ঞা থাকত তাহলে তিনিও ছাদের চিলেকোঠায় থাকতেন আর চারটা বই লিখে যেতেন”।
জোহান্স কোলেরাসের বর্ণনানুসারে আমরা দেখতে পাই স্পিনোজা ছিলেন মাঝারি গড়নের একজন মানুষ। তার মুখের আদল খুব সুন্দর, কিছুটা শ্যামল বর্ণের স্পিনোজার ঘন কালো কোঁকড়ানো চুল আর দীর্ঘ ভ্রমরকালো ভ্রুযুগল দেখে যেকেউ সহজেই বুঝতে পারতো তার পর্তুগীজ বংশোদ্ভূত ইহুদি পরিচয়। পোশাকে আশাকে তিনি ছিলেন ভীষণ রকম অসচেতন এবং অপরিপাটি। একজন প্রান্তিক নাগরিকের তুলনায় তার পরিধেয় মোটেও মূল্যবান কিছু ছিল না। একবার নেদারল্যান্ডের খুব প্রভাবশালী কাউন্সিলর স্পিনোজার সাথে দেখা করতে এলেন। তখন স্পিনোজার পরনে ছিল খুব নোংরা, অগোছালো রাতের পোশাক। সেই কাউন্সিলর স্পিনোজার পোশাক দেখে ছি ছি করতে লাগলেন এবং পোশাক বদলে তার সাথে দেখা করার কথা বললেন। স্পিনোজা তার উত্তরে বলেছিলেন, একজন মানুষের সুন্দর পোশাক থাকলেই সে উন্নত মানুষ হয়ে যায় না। তিনি আরও বললেন, শুধু ছোট আর মূল্যহীন বস্তুর জন্যই মূল্যবান প্যাকেটের প্রয়োজন পড়ে। স্পিনোজারপোশাকসংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় ঋষিসুলভ ছিল না। তিনি লিখেছেন, এলোমেলো বা অপরিচ্ছন্ন পোশাক কিংবা বাহন আমাদেরকে তপস্বীতে পরিণত করে না। কিন্তু অযত্ন আর অবহেলায় আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব দুর্বল আত্মপরিচয়ের সাক্ষ্য দেয় এবং সেই মানুষের মধ্যে সেখানে প্রজ্ঞা বসবাস করতে পারে না। বিশৃঙ্খলা এবং অবিন্যস্ত অবস্থার ভিতর দিয়ে বিজ্ঞানকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

রাইন্সবার্গে পাঁচ বছরের অবস্থানকালে স্পিনোজা “On the Improvement of the Intellect” (De Intellectus Emendatione) এবং “Ethics Geometrically Demonstrated” ( Ethica More Geometrico Demonstrata) দুইটি খণ্ডিত প্রবন্ধ লিখেছিলেন। প্রবন্ধ দুটি শেষ করলেন ১৬৬৫ সালের দিকে কিন্তু দশ বছরেও স্পিনোজা প্রকাশনার ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখান নি। ১৬৬৮ সালে প্রকাশের উদ্যোগ নিলে স্পিনোজা এবং অ্যাড্রিয়ান কয়েরবাগ নামের আরও একজন লেখকের দশ বছরের জেল হয়। ১৮ মাস সাজা খাটার পরে জেলখানাতেই কয়েরবাগ’র মৃত্যু ঘটে। এরপরে ১৬৭৫ সালে স্পিনোজা আমস্টারডামে পাড়ি জমান, মনে তার বড় আশা এখানে হয়ত তিনি তার দীর্ঘদিনের চিন্তার ফসল সাহিত্যকর্ম হিসেবে প্রকাশ করতে পারবেন। এই সময়ে একটা গুজব ছড়িয়ে পড়েছিলে যে, স্পিনোজা তার বন্ধু ওল্ডেনবার্গকে নাকি চিঠি লিখেছিলেন, “শিঘ্রই আমি এমন একটা বই প্রকাশ করতে যাচ্ছি, যেখানে প্রমাণ করতে চেয়েছি ঈশ্বর বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব কিছু নেই”। অনেকেই গুজবকে সত্যি মনে করে কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করে দিল। কিছু ধর্মতাত্ত্বিকেরা জড়ো হয়ে গেলেন ধর্ম রক্ষার্থে, সম্ভবত গুজব তৈরিতে তাদেরও প্রচ্ছন্ন কারসাজি ছিল। তারা রাণীর দরবারে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্পিনোজার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে দিলেন। বিশ্বাসভাজন বন্ধুদের মাধ্যমে স্পিনোজা নিশ্চিত হলেন, রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে এবং তার জন্য সর্বত্র ওঁতপেতে বসে আছে ধর্মতাত্ত্বিকেরা। স্পিনোজা বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিলেন, যদি কোনদিন সামনে সুদিন আসে সেদিনের অপেক্ষায়।

১৬৭৭ সালে কেবল মৃত্যুর পরেই প্রকাশিত হলো স্পিনোজার এথিকস বইটি, সেই সাথে রাজনীতির উপর একটি অসমাপ্ত প্রবন্ধ (Tractatus Politicus) এবং (Treatise on the Rainbow) নামে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ। এই সবগুলো সৃষ্টিকর্মই ছিল তৎকালীন ১৭ শতকে ইউরোপের দর্শন এবং বিজ্ঞান চর্চার সর্বজনীন ব্যবহৃত ল্যাটিন ভাষায় লিখিত। ভ্যান ভ্লটেন ১৮৫২ সালে খুঁজে পেলেন ডাচ ভাষায় লেখা স্পিনোজার “God and Man” শিরোনামে একটি ছোট্ট প্রবন্ধ। এটি ছিল মূলত এথিকস লেখার প্রাথমিক খসড়া। স্পিনোজার জীবদ্দশায় ১৬৬৩ সালে নিজের একটা গ্রন্থ তিনি প্রকাশ করতে পেরেছিলেন বইটির নাম হলো “The Principles of the Cartesian Philosophy (১৬৬৩)”। অবশ্য ১৬৭০ সালে তিনি বেনামে ধর্ম এবং রাষ্ট্র নিয়ে “A Treatise on Religion and the State” (Tractatus Theologico Politicus) প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। The Principles of the Cartesian Philosophy বইটি প্রকাশের সাথে সাথে রোমান ক্যাথলিক চার্চ কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত বইয়ের তালিকার মধ্যে ঢুকে গেল। নাগরিক সমাজ বইটির বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দিলো। অবশ্য বইটির শিরোনাম এবং প্রচ্ছদের পাতা পরিবর্তন করে চিকিৎসা প্রবন্ধ বা ঐতিহাসিক বর্ণনামুলক বইয়ের ছদ্মবেশে গোপনে গোপনে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না। স্পিনোজার বইকে প্রত্যাখান করার জন্য অসংখ্য বই লেখা হতে লাগল। বলা হয়ে থাকে স্পিনোজা হলেন পৃথিবীর এযাবৎকালের অন্যতম সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তারকারী নিধার্মিক ব্যক্তিত্ব। জোহান্স কোলেরাস জীবনীগ্রন্থে লিখেছিলেন, অসীম রত্নের মূল্য কখনো ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। ধর্মানুভূতিতে আঘাত প্রাপ্ত অনেক মানুষ স্পিনোজাকে চিঠি লিখতেন যেন স্পিনোজা সংশোধন হয়ে যান, তার যেন সুমতি ফিরে আসে এই আশায়। স্পিনোজার এককালের ছাত্র, পরবর্তীকালে খ্রিস্টান ধর্মের ক্যাথলিক সম্প্রদায়ে ধর্মান্তরিত আলবার্ট বার্গ, স্পিনোজাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। স্পিনোজা কী ধরণের চিঠি পেতেন তার ভালো একটা উদাহরণ হতে পারে এই চিঠিটা:

“আপনার মনে হচ্ছে আপনি সত্য দর্শনের দর্শন পেয়ে গেছেন। কীভাবে আপনি বুঝতে পারলেন আপনার দর্শনই পৃথিবীর এযাবৎকালের অর্জিত দর্শনের থেকে সেরা? কিভাবে নিশ্চিত হলেন অতীতে যা শেখা হয়েছে, বর্তমানে যে শেখা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে যা শেখা হবে তার থেকেও উৎকৃষ্ট? ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা আমরা কেউই বলতে পারি না। আপনি কি প্রাচীন এবং আধুনিক সব দার্শনিকজ্ঞান পঠন পাঠন পরীক্ষা করে দেখেছেন? ইউরোপ, ভারত এবং যেখানে যেখানে দর্শন চর্চা করা হয় সবই যথাযথভাবে দেখেছেন? কিভাবে নিশ্চিত হলেন আপনি সঠিক জ্ঞানের সন্ধান পেয়েছেন? আপনার কী দুঃসাহস আপনি সমস্ত পূর্বপুরুষ, মনোনীত পুরুষ, তাদের সাথীগণ, এত এত শহীদ, চিকিৎসক, মানব হিতৈষী, গির্জার পাপ মোচনকারী সবার উপরে নিজের অবস্থান সৃষ্টি করতে চান! হে! দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ এবং পৃথিবীর একটা প্রাণী মাত্র!! একদিন ছাই হয়ে যাবেন অথবা পরিণত হবেন পোকার খাদ্যে। কোন সাহসে আপনি অনন্ত প্রজ্ঞাকে অভূতপূর্ব প্রশ্নের মুখোমুখি জর্জরিত করতে পারেন? এই হাঙ্গামা মোকাবিলা করার ভিত্তি কোথায় পান? আপনি পাগল, আপনি শোচনীয় এবং ভয়াবহ, শাস্ত্রে আছে আপনি অভিশপ্ত। কী ভীষণ শয়তানের মত অহংকার আপনার! ক্যাথলিক চার্চ ঘোষিত মানুষের চিন্তাতীত রহস্যকে আপনি বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন”।
সেই চিঠির উত্তরে স্পিনোজা লিখেছিলেনঃ

“আপনি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি ধরেই নিয়েছেন অবশেষে পেয়েগেছেন সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মের সন্ধান অথবা মহান শিক্ষক এবং তাদেরকে বিশ্বাস করার জন্য মুখিয়ে আছেন। কিন্তু কীভাবে আপনি নিশ্চিত হলেন এযাবতকালে যারা ধর্ম শিক্ষা দিয়েছেন, বর্তমানে যারা ধর্মশিক্ষা দিচ্ছেন এবং ভবিষ্যতে যারা ধর্মশিক্ষা দেবেন তাদের মধ্যে আপনার মনোনীত শিক্ষকই শ্রেষ্ঠ শিক্ষক? আপনি কি প্রাচীন এবং আধুনিক ধর্মমত যেগুলো এখানে শিক্ষা দেয়া হয় এবং ভারতে অথবা সারা পৃথিবীতে তার সবগুলো পরীক্ষা করে দেখেছেন? এবং সেসব ধর্মগুলো কি আপনি যথাযথভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে দেখেছিলেন? কীভাবে আপনি নিশ্চিত হলেন, আপনি যে ধর্মমতটি পছন্দ করেছেন সেটাই সর্বশ্রেষ্ঠ?”

আপাতত ভদ্র অমায়িক দার্শনিক স্পিনোজা সময়ের প্রয়োজনে ঠিকই কঠোরতা অবলম্বন করতে পারেন। স্পিনোজাকে লেখা সব চিঠিই এরকম অমার্জিত বা অস্বস্তিকর ছিল না। কিছু চিঠি তিনি পেতেন পরিশীলিত সংস্কৃতিসম্পন্ন এবং সমাজের উঁচুস্তরের প্রতিষ্ঠিত মানুষদের কাছ থেকে। তাদের মধ্যে প্রধানভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ইংল্যান্ডের নবগঠিত রয়্যাল সোসাইটির সেক্রেটারি হেনরি ওল্ডেনবার্গ, জার্মানির তরুন বিজ্ঞানী এবং মহৎপ্রাণ ভন চির্নহাস, ডাচ বিজ্ঞানী হিউজেনস, দার্শনিক লিবনিৎজ, যিনি স্পিনোজার সাথে ১৬৭৬ সালে দেখা করেছিলেন। স্পিনোজাকে চিঠি লিখেছিলেন হেগের বিখ্যাত চিকিৎসক লুইস মেয়ার এবং আমস্টারডামের ধনী ব্যবসায়ী সিমোন ডি ভ্রাইস। সিমোন ডি ভ্রাইস স্পিনোজাকে এতই পছন্দ করেছিলেন যে তিনি স্পিনোজাকে অনুরোধ করেন ১০০০ ডলার উপহার হিসেবে গ্রহণ করতে। স্পিনোজা সবিনয়ে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং কিছুদিন পরে যখন সিমোন ডি ভ্রাইস তার সম্পদের উইল করেন তখন তিনি তার সমুদয় সম্পত্তি স্পিনোজাকে দান করে দিতে চেয়েছিলেন। স্পিনোজা সিমোন ডি ভ্রাইসকে অনুরোধ করেন সম্পত্তি যদি দিতেই হয় তাহলে যেন স্পিনোজার বদলে তার ভাইকে দেয়া হয়। যখন ব্যবসায়ী সিমোন ডি ভ্রাইস মারা গেলেন তখন দেখা গেল তার দানপত্রে লেখা আছে সম্পত্তির প্রাপ্ত আয় থেকে স্পিনোজাকে প্রতি বছর ২৫০ ডলার বৃত্তি প্রদান করতে হয়। “প্রকৃতি নিজেই আশুতোষ, এবং অল্পেই যদি সন্তুষ্ট থাকে, তবে আমিও প্রকৃতির মত আশুতোষ” এই যুক্তি দেখিয়ে স্পিনোজা এবারও তার বরাদ্দ বৃত্তিকে প্রত্যাখ্যান করতে চাইলেন। কিন্তু সবার অনুরোধে তিনি শেষপর্যন্ত বছরে ১৫০ ডলার গ্রহণ করতে রাজি হন। স্পিনোজার আরেক বন্ধু ডাচ সরকারের ম্যাজিস্ট্রেট জ্যান ডি উইট সরকারের পক্ষ থেকে বছরে ৫০ ডলার বৃত্তির ব্যবস্থা করে দেন। সর্বোপরি স্পিনোজার পরের বইটি ফ্রান্সের মহান সম্রাট চতুর্দশ লুই’কে উৎসর্গ করার শর্তে সম্রাট স্পিনোজাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশাল অংকের টাকা অবসরভাতা হিসেবে প্রদান করার ঘোষণা দেন। কিন্তু স্পিনোজা সবিনয়ে ফ্রান্সের সম্রাটের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

স্পিনোজার বন্ধু এবং বন্ধুস্থানীয় শুভার্থীদেরকে খুশি করতে স্পিনোজা ১৬৬৫ সালে হল্যান্ডের হেগ শহরের উপকণ্ঠে ভুরবার্গ শহরে স্থানান্তরিত হলেন এবং সেখানে পাঁচ বছর থাকার পর ১৬৭০ সালে হেগ শহরে চলে আসেন। হেগ শহরে বসবাসের পরবর্তী বছরগুলোতে জ্যান ডি উইটের সাথে স্পিনোজার ঘনিষ্ট বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জ্যান ডি উইট এবং তার ভাই উন্মত্ত জনতার হাতে হেগের রাস্তায় নিহত হন এবং ধারণা করা হয় ১৬৭২ সালে ফ্রান্সের কাছে নেদারল্যান্ড বাহিনীর পরাজয়ের পিছনে জ্যান ডি উইটের হাত থাকতে পারে সন্দেহে উন্মত্ত জনতা উইট ভাতৃদ্বয়কে হত্যা করে। এতবড় দুঃসংবাদ শুনে স্পিনোজা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং যে নিরাপত্তা বাহিনী জ্যান ডি উইটের সুরক্ষায় নিয়োজিত ছিল তারাই তাকে আক্রমণের পুরোভাগে নেতৃত্ব দেয়। কিছুক্ষনের মধ্যেই এন্থনি অপরাধের ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান এবং জনসম্মুখে বলেন এখানেই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। খুব বেশী দেরি হলো না আগ্রাসী ফরাসী বাহিনীর প্রধান প্রিন্স ডি কোনডে স্পিনোজাকে তার সদরদপ্তরে নিমন্ত্রণ করেন। সামরিকবাহিনীর নিরাপত্তায় স্পিনোজা যুবরাজের দপ্তরে এলেন এবং ফান্স সরকারের পক্ষ থেকে তার জন্য রাজকীয় অবসর ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে যুবরাজের সাথে থাকা স্পিনোজার অনুরাগীদের সাথে স্পিনোজার সাক্ষাৎ হয়। স্পিনোজা, যিনি জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে মনেপ্রাণে একজন ‘সুশীল ইউরোপিয়ান’ এবং অবাক হওয়ার কিছু নেই যদি তিনি নির্দিষ্ট গণ্ডী পেরিয়ে যুবরাজ কোনডের সদরদপ্তরে যান। তিনি যখন হেগে ফিরে এলেন তখন ফ্রান্সে তার সাথে যুবরাজ ডি কোনডে’র সাক্ষাৎ নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ল, সাধারণ মানুষ চাপাক্রোধে কানাঘুষা করতে লাগল। স্পিনোজার আশ্রয়দাতা ভ্যান ডেন স্পাইক তার বাড়িতে আক্রমণ হতে পারে ভেবে ভয় পেয়ে গেলেন, কিন্তু স্পিনোজা তাকে শান্ত করেন। তিনি আশ্রয়দাতে বুঝিয়ে বলেন, “সন্দেহভাজন বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে যদি সাধারণ মানুষ আপনাকে লাঞ্ছনা করার সামান্যতম মনোভাবও ব্যক্ত করে এবং যদি তারা একত্রে জড়ো হয়ে আপনার বাড়ির সামনে হাঙ্গামা করে তবে সবার সামনে উপস্থিত হয়ে আমি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করব তাতে আমার অবস্থা যদি হতভাগ্য জ্যান ডি উইট’র মত হয় তবুও আমি পিছপা হবো না।” কিন্তু যখন ক্রোধান্বিত জনতা জানতে পারল স্পিনোজা নিতান্তই একজন দার্শনিক এবং তার থেকে ক্ষতির কোন আশঙ্কা নেই তখন জনতার ক্রোধ আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে গেল।

এরকম একটা ঘটনার পর চিরাচরিতভাবে যেমন হয় মানুষ সাধারণত মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায় কিন্তু স্পিনোজার ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটেনি। কারণ স্পিনোজার বহুমুখী অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা ছিল এবং তার সমাজের প্রভাবশালী ও সমমনা বন্ধু ছিল এবং জীবন মৃত্যুর প্রশ্নে এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি তাদের সান্নিধ্য এবং সুবিধা গ্রহণ করেছিলেন। সমাজ থেকে বহিষ্কৃত এবং সিনেগগ কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা আরোপ সত্ত্বেও স্পিনোজা তার চিন্তায় আর কর্মে অটল ছিলেন। তার সমসাময়িক মনীষীদের মত তার কাছেও ১৬৭৩ সালে হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের পদ অলঙ্কৃত করার লোভনীয় প্রস্তাব এসেছিল। তাকে যথাযথ সৌজন্যতা এবং দর্শন চর্চার সর্বোচ্চ স্বাধীনতা প্রদানের প্রস্তাব দেয়া হয়। হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ থেকে তাকে নিশ্চয়তা দেয়া হয় যে রাষ্ট্রীয় ধর্ম প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গে কখনো স্পিনোজাকে অপব্যবহার করা হবে না। স্পিনোজা তার স্বভাবসুলভ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবের উত্তরে স্পিনোজা লিখলেনঃ

সম্মানিত মহৎপ্রাণঃ যদি কখনো আমার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন অনুষদের অধ্যাপকের দায়িত্ব গ্রহণ করার ইচ্ছা থাকত তবে আপনার মাধ্যমে মহান প্রশান্ত যুবরাজ প্যালাটিনের প্রস্তাবিত অধ্যাপকের মত সম্মানিত পদের প্রস্তাব গ্রহণ করে কৃতজ্ঞতা বহুলাংশে বাড়িয়ে নিতাম। প্রস্তাবে উল্লেখিত দর্শন চর্চার সর্বোচ্চ স্বাধীনতার সুযোগ দেখে আমার চোখ বিস্ফারিত হয়েছে। কিন্তু আমি জানি না ঠিক কতবড় গণ্ডীর মধ্যে আমার দর্শন চর্চার স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ হবে। সুতরাং রাষ্ট্রের মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম এবং সমাজের মুল্যবোধের মধ্যে আমার নাক গলানোর কিছুই নাই। সুতরাং দেখুন সম্মানিত মহৎপ্রাণ, বর্তমানে আমি যে অবস্থায় আছি খুব ভালো আছি, জাগতিক কোন সম্মানিত উঁচু পদে আসীন হওয়ার ইচ্ছা আমার নাই। যে শান্তির নিরবতা আমি ভালবেসে উপভোগ করি সেটা অন্যকোন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হলে নিশ্চিত করা সম্ভব নয় এবং সে জন্য অবশ্যই হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মত সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের পেশাকে বৃত্তি হিসেবে গ্রহণ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখা উচিৎ।

অবশেষে ১৬৭৭ সালে এলো সমাপ্তির সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। স্পিনোজার বয়স এখন মাত্র চুয়াল্লিশ বছর কিন্তু তার বন্ধুরা হয়ত বুঝতে পেরেছিলেন স্পিনোজার হাতে হয়ত বেশী সময় নাই। বংশগতভাবে পাওয়া ক্ষয়রোগ তাকে মরণ কামড় বসিয়ে দিলো। তুলনামূলকভাবে ছোট্ট খুপড়ি কামরায় যেখানে স্পিনোজা বাস করতেন আর কাঁচের লেন্স ঘষে যাপিত জীবনে ধূলিধূসর পরিবেশে থাকার সময় কোনদিন দেখা হয় নি কী অনর্থ ঘটে যাচ্ছে অলক্ষ্যে। ধীরে ধীরে তার শ্বাসকষ্টের যন্ত্রণা বেড়েই চলেছে। বছরের পর বছরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তার নাজুক ফুসফুস ক্ষয়রোগে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। শেষের আগে এসে স্পিনোজা যেন নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ করার চেষ্টা করলেন এবং তার জীবদ্দশায় যে বই প্রকাশ করার ইচ্ছা করেননি সেই বইটা হয়ত তার মৃত্যুর পর হারিয়ে বা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় তিনি কিছুটা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি তার বইয়ের পাণ্ডুলিপি টেবিলের ড্রয়ারে তালা বন্ধ করে যার বাড়িতে আশ্রয়ে ছিলেন তার কাছে চাবি দিলেন এবং তাকে বললেন যখন মৃত্যু আসবে তখন যেন চাবিসহ টেবিলটা আমস্টারডামের প্রকাশক জ্যান রিউভার্টজ’র কাছে হস্তান্তর করা হয়।

১৬৭৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রবিবার তার আশ্রয়দাতা পরিবার জিজ্ঞেস করলেন স্পিনোজার স্বাস্থ্যের অবস্থা। স্পিনোজা সন্তোষজনক উত্তর দিলেন যে তিনি ভালো আছেন। স্পিনোজা সুস্থ্য আছেন নিশ্চয়তা পেয়ে আশ্রয়দাতা পরিবার গীর্জায় গেলেন রবিবারের সাপ্তাহিক প্রার্থনায় অংশগ্রহণ করতে। শুধু ড. মেয়ার রয়ে গেলেন একাকী স্পিনোজার সাথে। যখন তারা গীর্জা থেকে ফিরে এলেন তখন দেখতে পেলেন মৃত স্পিনোজা শুয়ে আছেন তার বন্ধুর কোলে। শোকের আবহ নেমে এলো স্পিনোজার মৃত্যুতে। সাধারণ মানুষ তাকে ভালোবেসেছিল তার বিনয় আর ভদ্রতার জন্য এবং সম্মান দিয়ে ছিল তার প্রজ্ঞাকে। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দার্শনিক, রাজপ্রতিনিধি এলেন দলে দলে স্পিনোজার অন্তিম শয্যায় চির বিদায় জানাতে এবং বিভিন্ন শ্রেণী, ধর্মবিশ্বাসের মানুষ জড়ো হয়েছিল তার সমাধিতে। স্পিনোজার মৃত্যুতে ফ্রেডরিখ নিটসে তার বইয়ের কোথাও লিখেছিলেন শেষ খ্রিস্টান মরে গেল যিশুর ক্রসের উপর এবং তারপর তিনি স্পিনোজাকে ভুলে গেলেন কিন্তু তার অন্তরে রয়ে গেলেন চিরস্থায়ী।

[ উইল ডুরান্টের ‘স্টোরি অফ ফিলোসফি’ বইয়ের স্পিনোজা অধ্যায়ের ধারাবাহিক অনুবাদ। আজ প্রকাশিত হলো “স্পিনোজার অবসর এবং মৃত্যু” ]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “স্পিনোজার অবসর এবং মৃত্যু

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 85 = 88