দেখে এলাম জন্মের ইতিহাস

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নবনির্মিত স্থাপত্যশৈলীর সুদৃশ্য ভবনটির দ্বিতীয় তলায় উঠতেই আমাদের চোখে পড়ল ছাদের সঙ্গে টানানো মাঝারি আকারের একটি যুদ্ধবিমান। নাম ‘হকার হান্টার’। আসন একটাই, চালকের। ভেতরে প্রস্তুত থাকত কামান, মিসাইল ও বোমা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই হকার হান্টার যুদ্ধবিমানটি পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য ত্রাস হয়ে উঠেছিল। ভারতীয় বিমানবাহিনীর এই যুদ্ধবিমান দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বেশ কিছু ঘাঁটি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে এটি। একাত্তরের স্মৃতিবিজড়িত সেই নিদর্শন ঠাঁই পেয়েছে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নবনির্মিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলায় উঠতেই বিশাল করিডোরে দেখা মিলল শিখা চির অমস্নানের। চারপাশে পানি আর মাঝখানে শহীদের স্মৃতি নিয়ে জ্বলছে শিখা। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নির্মিত হয়েছে এই শিখা চির অমস্নানের। শুধু যুদ্ধবিমান নয়, শিখা চির অমস্নান নয়; বাঙালির গৌরবের অনন্য সব স্মৃতির সম্ভারে সেজেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।
গত ৯ জুন ফ্রেন্ডস ফোরামের ঢাকার বন্ধুরা জন্মের ইতিহাস জানতে আগারগাঁওয়ের নবনির্মিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরির্দশনে গিয়ে এসব দৃশ্য দেখে কিছুক্ষণের জন্য যেন ফিরে গেলাম ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনে। তারপরে আমরা সিঁড়ি বেয়ে তিন তলায় উঠতেই দেখি এক নম্বর গ্যালারি। গ্যালারিটির নাম ‘আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংগ্রাম’। এখানে দেখা গেল প্রাচীন বঙ্গের মানচিত্র, পোড়ামাটির শিল্প, টেরাকোটা ও নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন। ছবিসহ নানা নিদর্শনের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপট। ধাপে ধাপে এই গ্যালারিতে উঠে এসেছে সত্তরের সাধারণ নির্বাচনের সময় পর্যন্ত নানা স্মারক। তবে তড়িঘড়ি করে উদ্বোধন করার কারণে এই গ্যালারি অনেক স্মারকের বিবরণ দেয়া হয়নি, যা খুব দুঃখজনক আশা করি অচিরেই তা সংযুক্ত করা হবে ।
তারপরে আমরা দ্বিতীয় গ্যালারির দিকে গেলাম যার নাম ‘আমাদের অধিকার, আমাদের ত্যাগ’। এখানে ঢুকতেই চোখে পড়ল বঙ্গবন্ধুর বিশাল আকৃতির আলোকচিত্র। সেটি ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের। পাশেই পর্দায় দেখানো হচ্ছে ভাষণটির ভিডিও চিত্র। তার সামনেই ছোট্ট কাচের বাক্সে রাখা ওই দিন সন্ধ্যায় সংবাদমাধ্যমে পাঠানো আওয়ামী লীগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও ভাষণের রেকর্ড। এরপরে আমরা কালো টানেলের মধ্যে প্রবেশ করলাম, আমাদের মনে হলো যেন আমরা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে ফিরে গেলাম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার নানা নিদর্শন ফুটে উঠেছে আলোকচিত্রে ও ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে ।
চতুর্থ গ্যালারি নাম ‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’। মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত নানা নিদর্শন দেখানো হয়েছে এখানে। একাত্তরের রণাঙ্গনে এক গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা বিলোনিয়া যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধারা প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে নিয়েছিলেন ভিন্নধর্মী রণকৌশল। বিলোনিয়া যুদ্ধের এই কৌশল ‘স্যান্ড মডেল’ নামে পরিচিত। বিলোনিয়া যুদ্ধের সেই রণকৌশল মডেল একটি কাচের টেবিলে সাজানো রয়েছে। এই গ্যালারির একটি বিশেষ অংশে তুলে ধরা হবে বাংলার নারীদের ওপর পাকিস্তানি হায়েনাদের বর্বরতা আর নির্যাতনের চিত্র।
আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে খুব বেশি ফোকাস করি যার কারণে তরুণদের অনেকই মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগের কথা জানে না। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আমাদের সেই জন্মের ইতিহাস জানার অন্যতম উপলক্ষ তৈরি করে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিদর্শনে ফ্রেন্ডস ফোরামের বন্ধুদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন লেখক তরুণ রাসেল, কবি পলিয়ার ওয়াহিদ, মং শৈ শৈ, প্রত্যয় নাফাক, সাদমান সাঈদ, মামুন মিয়া, রাবি্ব মোল্লা, সাই সাই প্রু ও ত্বরিকুল ইসলাম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 4