“তবে বুঝতে পারছি বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে আছে”


কোটা সংস্কারের দাবী ছিল যৌক্তিক, যৌক্তিকই আছে। আবার কোটা সম্পূর্ণ বাতিলের ঘোষণা ছিল হাস্যকর পদক্ষেপ। একটা মানবিক রাষ্ট্র অনগ্রসরদের প্রতি দায় এড়াতে পারে না। এড়াতে পারে রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে যাদের আত্মত্যাগ ছিল, তাদের অবদান। আবার রাষ্ট্রের কোটা শুধু বিসিএস এর ক্ষেত্রেই না, শিক্ষাক্ষেত্র সহ অন্যান্য সকল গ্রেডের চাকরীতেই বিদ্যমান। আমার জানামতে, একমাত্র সামরিক বাহিনীর অফিসার নিয়োগে কোনো কোটাপ্রথা নাই। আইএসএসবি সম্পূর্ণ কোটামুক্ত। জেলা কোটা, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কোটা, উপজাতি ও নারী কোটা, এসব কিছুই নাই। সামরিক পেশার ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ যোগ্যতাকেই বেজলাইন ধরে নেয়া যুক্তিযুক্ত। সিভিল সার্ভিসে যারা অনগ্রসর, কিংবা যাদের অবদানঅকে সম্মান করা উচিত, তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়ার সুযোগ আছে। তবে সেই সুবিধা যদি অধিকাংশ পদের জন্য বরাদ্দ থাকে, তা রাষ্ট্রকে অধিক যোগ্যদের সেবা থেকে বঞ্চিত করবে।


ফুটবল ওয়ার্ল্ডকাপের কারণে কোটা সংস্কার আন্দোলন আর কোটা সংস্কারে প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরের নানা কাহিনী নিয়ে শোরগোল কম। তবে মাইর যাদের খাওয়ার তারা খেয়েই যাচ্ছে। সামান্য বোধশক্তি যাদের আছে, তাদের কাছে এখন একটা ছাত্র সংগঠন ঘৃণ্য কিছু হয়ে গেছে। তাদের এই আচরণ, কর্মকান্ডের দাগ সার্ফ এক্সেলে মুছবে না। কোনো কারণে তারা যদি ক্ষমতার বলয়ের বাইরে চলে যায়, তখন যে মাইরটা খাবে, তা আন্দাজ করা যায়। খারাপ ব্যাপার হচ্ছে দাগীদের সাথে সাধারণ নিরীহ সমর্থকেরাও খাবে। আর এ ব্যাপার প্রকাশ্যে আসলেও সম্ভবত জনতার মধ্যে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে না। ত্রাস সৃষ্টি করা, মারপিট, অন্যায় আচরণকে তারাই তো এখন ডালভাত বানাচ্ছে। কিছুই যায় না আনপেইড।

আমি যতটা বুঝি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বৈষম্য দূর করা, অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। সশস্ত্র সংগ্রাম ছিল যার সর্বশেষ এবং সে সময়ের বিচারে একমাত্র উপায়। পাকিস্তান আমলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিচারে আমরাই ছিলাম আসল পাকিস্তান। পাকিস্তান প্রস্তাব থেকে শুরু করে অনেককিছুর পিছনে মূল অবদান ছিল বাঙালি মুসলমানদের। একমাত্র অবিভক্ত বাংলাতেই মুসলিম লীগ ক্ষমতায় ছিল। সরল হিসাবে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বসবার কথা ছিল বাঙালিদের। সেটা হয়নি, হতে দেয়া হয়নি আর তার অনিবার্য ও একমাত্র পরিণতি ছিল পাকিস্তান ভেঙে যাওয়া। কোনো রাষ্ট্রে যদি সুশাসন কায়েম থাকে, জনতার মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, তবে সেই রাষ্ট্র হয় শক্তিশালী। পাকিস্তান তার সূচনালগ্ন থেকেই তেমন রাষ্ট্র ছিল না। ইংরেজদের থেকে পশ্চিমাদের নয়া সামন্তবাদের হাতে পড়ে পাকিস্তানের দুই অঙ্গ। হাজার মাইল দূরের দুই ভূখন্ড হাস্যকরভাবে ধর্মের নামে এক পতাকা পায়। তবে সেই পতাকা একটাই থাকতে পারতো যদি দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য না থাকতো।

ভৌগলিকভাবে আলাদা দুইখন্ডের মাঝে বৈষম্য ভয়াল ব্যাপার, সেটা যদি একই ভূখন্ডের মাঝেও চলে, সেটা সেই রাষ্ট্রে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। পৃথিবীর অনেক একীভূত ভূখন্ড এ কারণে ভেঙেও গেছে। জনতার বিশাল অংশ যদি সেই বৈষম্যের শিকার হয়, তা কখনোই শুভ হতে পারে না সে রাষ্ট্রের জন্য। রাষ্ট্র কাঠামো, রাজনৈতিক দল, এসবের মূল উদ্দেশ্যই তো একটা সাম্যবাদী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে কাজ করা।

আমি যতদূর জানি, ৩৭ তম বিসিএস পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে যারা নির্বাচিত হন, তাদের মধ্যে কোটাধারীরা চূড়ান্ত লিখিত পরীক্ষায় ৫৪ নম্বর পেয়েও উত্তীর্ণ হয়েছেন। আর কোটার বাইরে নির্বাচিত হওয়া প্রার্থীর সর্বনিম্ন নম্বর ছিল ৭০ (ভুল তথ্য দিয়ে থাকলে বলবেন)। এই ১৬ মার্কসের ব্যবধান গুণগতভাবে বিশাল। যেমন বিশাল ৫৬% কোটার হিসাবটা। সিভিল সার্ভিস যেকোনো রাষ্ট্রের প্রাণ। এখানে সবচেয়ে যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীদেরই নির্বাচিত হওয়া উচিত। অনেকে বলবেন, প্রিলিমিনারি লিখিত পরীক্ষায় তো সবাইকে পাস করতে হয়। কোটায় যারা আবেদন করেন, তাদেরও করতে হয়। সেটাই তাদের যোগ্যতা। ব্যাপারটা কি তেমন? যতদূর জানি, প্রিলিতে নির্বাচিত হন ১২-১৫ হাজার। এদের তেকে নেয়া হয় দেড় থেকে দুই হাজার। যখন আপনি ৭-৮ জন থেকে একজনকে বাছাই করবেন, তাদের যোগ্যতার অনেক স্তর আসতে পারে।

কোটা সংস্কারের দাবী ছিল যৌক্তিক, যৌক্তিকই আছে। আবার কোটা সম্পূর্ণ বাতিলের ঘোষণা ছিল হাস্যকর পদক্ষেপ। একটা মানবিক রাষ্ট্র অনগ্রসরদের প্রতি দায় এড়াতে পারে না। এড়াতে পারে রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে যাদের আত্মত্যাগ ছিল, তাদের অবদান। আবার রাষ্ট্রের কোটা শুধু বিসিএস এর ক্ষেত্রেই না, শিক্ষাক্ষেত্র সহ অন্যান্য সকল গ্রেডের চাকরীতেই বিদ্যমান। আমার জানামতে, একমাত্র সামরিক বাহিনীর অফিসার নিয়োগে কোনো কোটাপ্রথা নাই। আইএসএসবি সম্পূর্ণ কোটামুক্ত। জেলা কোটা, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কোটা, উপজাতি ও নারী কোটা, এসব কিছুই নাই। সামরিক পেশার ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ যোগ্যতাকেই বেজলাইন ধরে নেয়া যুক্তিযুক্ত। সিভিল সার্ভিসে যারা অনগ্রসর, কিংবা যাদের অবদানঅকে সম্মান করা উচিত, তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়ার সুযোগ আছে। তবে সেই সুবিধা যদি অধিকাংশ পদের জন্য বরাদ্দ থাকে, তা রাষ্ট্রকে অধিক যোগ্যদের সেবা থেকে বঞ্চিত করবে।

গত এক দেড় দশকে এইদেশের রাজনীতি আর যাই প্রডিউস করতে সক্ষম হোক আর না হোক, তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশকে “আই হেইট পলিটিক্স” ট্যাগধারী করে ফেলেছে। এটাও আসলে কোনো ভাল দিক না। তারা আসলে রাজনৈতিক দলগুলো কী করছে, এসব দেখে দেখে বীতশ্রদ্ধ। আন্দোলন করে মূলত তরুণেরা, তারা যদি এমনভাবে বদলায়, তাহলে প্রয়োজনের সময় যৌক্তিক রাজনৈতিক আন্দোলনও দানা বাঁধবে না। চাহিদাগুলো তাদেরকাছে হয়ে যায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক। নিজের গায়ে যখন লাগে, কেবল তখনই তারা সোচ্চার হয়। শিক্ষায় ভ্যাট কিংবা কোটা সংস্কার আন্দোলন অনেকটা ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক আন্দোলনও।

অনলাইন জগতের প্রেক্ষাপটে এই কোটা সংস্কার আন্দোলনে এখন পর্যন্ত প্রাপ্তি নতুন একটা শব্দ, “বিচি”। যাক, শেষপর্যন্ত পুরুষের শরীরের একটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ অনলাইনজগতে হিট হতে পারলো। এতদিন নারীদের স্পর্শকাতর অঙ্গই হিটের তালিকায় ছিল। জনতার বিশাল অংশ এখন নির্বিকারভাবে এই অংগের যথেচ্ছা ব্যবহার করছে। কাকে বলে করছে? উনার পেশা কী? তা আর না বলি, এসব নিয়ে কথা বলা লজ্জাজনক। রাস্তায় ইউ-টার্ন থাকে, সেটা জরুরী। তবে সম্মানিত ভেবে নেয়া অথবা যাদের বিচারবুদ্ধি নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনোপ্রকার সংশয় থাকবার কথা না, তাদের মুখের ভাষার, স্বভাব চরিত্রের ইউ-টার্ন দেখা হতাশাজনক। এ থেকে স্বল্প বুদ্ধিতে বুঝি, উপরের স্তরে উঠতে এখন অন্য যোগ্যতা লাগে। যাদের নিজের বোধবুদ্ধির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নবিদ্ধ, একেওবার একেক কথা বলেন, তারা কিভাবে ছাত্রদের অভিভাবক হিসেবে নিজেদের দাবী করবেন? তাদের উপর বিশ্বাস করা যাবে কোন ভরসা থেকে?

২০৫০ কিংবা ২১০০ সাল পর্যন্ত দেখে যাবার ইচ্ছা ছিল। যত যাই হোক, আমার বিশ্বাস বাংলাদেশের পতাকা তখনও প্রতিভোরে উত্তোলিত হবে। ন্যাচারাল রিসোর্স অতদিনে ফুরিয়ে আসবে। আরবদেশের তেল, আফ্রিকার খনিজের আন্ডার আর ৪০-৫০ বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। পৃথিবী চলবে সৌরশক্তি, আনবিক শক্তি অথবা অন্য কোন শক্তির উৎসের ভরসায়। দেশ আর জাতির উন্নতিতে তখন সবচেয়ে বড় অবদান রাখবে বুদ্ধিমত্তা। সরল হিসাব তাই বলে। স্বাধীনতা সবসময় একটা অসমাপ্ত স্বপ্ন, ধীরে ধীরে তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায় একটা স্বাধীন জাতি। স্বাধীনতার পর আমাদের অর্জন অনেক, ব্যর্থতাও কম না যার দায় আমাদেরই। অনেক অর্জনের পরেও আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার যে অবস্থা এখন, তাকে কোনোক্রমেই আদর্শ বলা যাবে না। ২০,৫০ বা ১০০ বছর পরে এই ব্যবস্থা ঠিকঠাক না হলে আর যাই হোক, আলোকিত প্রজন্ম আমরা পাব না। ১০০ এয়ারগান অনেক গুলি ছুঁড়তে পারে, কিন্তু একটা কামানের সক্ষমতা অনেক অনেক বেশি। আমরা এয়ারগান বানাচ্ছি, কামান তৈরীর দূরদৃষ্টি আমাদের নাই। ১৬ কোটির দেশে গাড়ির যে চাহিদা, আমাদের দেশেই বেশ কয়টা আড়ির কারখানা হওয়া সম্ভব ছিল নিজস্ব চাহিদা মেটাতে, কিন্তু আর কতবছর পর প্রগতির এসেম্বলি লাইনের বাইরে কিছু দেখা যাবে কেউ জানে না। এর পেছনে মূল কারণ কী হতে পারে যদি আরও বহুদিন অবস্থার পরিবর্তন না হয়?

অনেকবছর আগে ব্লগে একটা কমেন্ট আর তার রিপ্লাই পড়েছিলাম। কোটার অসঙ্গতি নিয়ে তখনো নিয়মিত কথা হতো। সেটা ও তার রিপ্লাই তুলে দেই।

কমেন্টকারীঃ
মেধার দরকার আছে তবে পাবলিক সার্ভিসে সুপার মেধাবি খুব একটা প্রয়জন নেই,
কেবল উচ্চ জিপিএ, বিসিএস পরিক্ষার উচ্চ স্কোর কখনোই ভাল মাপকাঠি হতে পারেনা।

লেখকের রিপ্লাইঃ
মেধার দরকার আছে তবে পাবলিক সার্ভিসে সুপার মেধাবি খুব একটা প্রয়জন নেই, আপনার এমন দৃষ্টিভঙ্গির উপর আমার কিছুই বলার নেই। তবে বুজতে পারছি বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে আছে। ধন্যবাদ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 2