গির্জার দেয়ালে রহস্যময় ঝুলন্ত খাঁচার গল্প


আমি আগেই বলেছিলাম আরো কিছু সাম্প্রতিক নবী-রাসূলদের ঘটনাবলী বর্ণনা করব যারা নবী মুহাম্মদ এর মতই ঈশ্বরের কাছ থেকে নির্দেশাবলী প্রাপ্ত হইতেন। তারই ধারাবাহিকতায় আজকে আরো দুইজন এনাবাপটিস্ট নবীর পরিণতির কথা বলব যারা পরপর (একজনের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় জন) জার্মানির Münster গ্রামে মধ্যে নিজেদের নবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তারা বিশ্বাস করতেন যীশুখ্রীষ্ট তাদের এই গ্রামে শিগগিরই নেমে আসবেন। এদের প্রথম জন Jan Matthys এই গ্রামকে নতুন জেরুজালেম হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন (সাল ১৫৩৪)। কেয়ামত হয়ে আসলো, কেয়ামত হয়ে আসলো বলে তাদেরও বিশ্বাস ছিল আমাদের নবীজির মত ই। আমি আগেও অন্য লেখায় বলেছি যে এই জাতীয় ভীতিপ্রদর্শন নবী রাসুলদের জনসমর্থন বাড়ানো র অন্যতম টেকনিক। ইসলাম ধর্মের যেমন ভিন্ন মতের নবী দাবিকারীদেরকে দমন করানো হয়েছিল আবু বক্করের পাঠানো সেনাবাহিনী দ্বারা তেমনি এই দুইজন খ্রিস্টান নবী দাবিকারী ও যথারীতি (খ্রিস্ট ধর্মের মূল ধারার সাথে সাংঘর্ষিক হবার কারণে) প্রিন্স বিশপের সশস্ত্র (৩ থেকে ৭ হাজারের ) সেনাবাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। তবে শুরুতে এই সেনাবাহিনী গ্রামটিকে অবরোধ করে রাখে অনেক মাস। যারা খ্রিস্ট ধর্মের ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহ বোধ করেন তাদের স্বার্থের সংক্ষেপে বলে রাখছি এই ঘটনাটি protestant reformation এরপরের ঘটনা এবং প্রোটেস্ট্যান্ট এর অন্যান্য গ্রুপ গুলিকে চরমপন্থী কার্যকলাপের দিক দিয়ে যদি আপনি আল-কায়েদার সাথে তুলনা করেন তাহলে এনাবাপটিস্ট মুভমেন্টকে আপনাকে আইসিসের সাথে তুলনা করতে হবে। আমি এখন প্রথম নবী Jan Matthys এর নবীগিরি এবং অবরোধ চলাকালীন সময় কালের একটি ঘটনা বলব। এক সন্ধ্যায় গ্রামের ভেতরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে চমৎকার আনন্দ-বিনোদন পূর্ণ পরিবেশ চলছিল । যদিও ঐ গ্রামটি বাইরের দিকে ছিল বিরোধী সৈন্যদের দ্বারা অবরুদ্ধ। তবে ঈশ্বরের আশ্বাস প্রাপ্ত গ্রামবাসীদের মধ্যে আনন্দ উল্লাসের কমতি ছিল না। কারণ তাদের মধ্যে ছিল একজন নবী যে সরাসরি ঈশ্বরের সাথে বিনা তারে কথা বলতে পারতো। বলাবাহুল্য এই রকম অনুষ্ঠানে তাদের সেই নবীর সশরীরে আগমন সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, অনেকটা বর্তমান কালের কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে সুপারস্টার শাহরুখ খানের আগমনের মতোই । সবাইকে হতভম্ব করে দিয়ে Jan Matthys হটাৎ চিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেলেন। সিমটমের বর্ণনা থেকে বুঝা যাচ্ছে এটা সম্পূর্ণ রকম epileptic seizure অনেকটা হুবহু আমাদের নবী মোহাম্মদের যেমনটা হইত। জনপ্রিয় ইতিহাস বর্ণনাকারী ডেন কারলিনের বর্ণনায় “হঠাৎ করে তার চামড়া ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছিল, সে আকাশের দিকে তাকালো, যেন তার চোখ উল্টে যাচ্ছিল। চারপাশে বিয়ের হট্টগোল থেমে যায় কারন সবার দৃষ্টি তখন তার দিকে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সে চেতনা ফিরে পেল এবং সে আকাশের দিকে তাকালো। সে এমন একজনের সাথে কথা বলতেছিল যাকে দেখা যাচ্ছিল না। তারপর সে বলতে লাগলো “না আমার ইচ্ছা না তোমার ইচ্ছা তোমার ইচ্ছাই বাস্তবায়ন করা হবে হে পিতা (হে ঈশ্বর) “। তারপর সে ঢলতে ঢলতে বিয়ের অনুষ্ঠান ত্যাগ করল। সবাই তখন হতভম্ব হয়ে গেল কি এমন নতুন বাণী প্রাপ্ত হয়েছেন এই নবী। ঈশ্বরের কি এমন ইচ্ছা তিনি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন যা তার নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছা না। আমার লেখার এই পর্যায়ে আমি আপনাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে আপনি যে ধর্মেরই আস্তিক বা নাস্তিক হোন না কেন পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ পড়ার পরে এই সিদ্ধান্তে আসবেন অন্তত আর যা ই হোক (Jan Matthys) খুব সম্ভবত ভন্ড নবী ছিল না। এই অর্থে যে সে নিজে আসলেই মনে প্রানে বিশ্বাস করত যে তার ঈশ্বরের সাথে কথা হচ্ছে।। পরবর্তীতে জানা গেল এই নবী ঈশ্বরের কাছ থেকে আদেশ পেয়েছিলেন যে তাকে সেই বছর ইস্টার সানডে অর্থাৎ ইস্টারের রবিবারে গ্রাম থেকে সশস্ত্র অবস্থায় বের হতে হবে সাথে নিয়ে অল্প সংখ্যক ১০/১২ জন প্রহরী সৈন্য এবং ঈশ্বর তাকে আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি একাই প্রিন্স বিশপের বিশাল অবুরুদ্ধকারি সৈন্য বাহিনীকে (৩ থেকে ৭ হাজারের সৈন্য দলকে) পরাজিত করতে সফল হবেন। তিনি তাই করতে ইস্টারের রবিবারে বের হয়ে গেলেন সাথে নিলেন মাত্র ১০ – ১২ জন সৈন্য। এখন একটু ভেবে দেখুন গ্রামবাসী তাকে কতটা বিশ্বাস করত । যে সামান্য সংখ্যক সৈন্য তার সাথে বের হয়ে গেল কয়েক হাজার সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নামে তাদের এই নবীর উপর কতটুকু আস্থা ছিল । অবরুদ্ধ ক্বারী প্রিন্স বিশপ সৈন্যবাহিনী ছোট্ট ১০-১২ জনের বাহিনীকে দেখে প্রথমত অবাক হয়। কিন্তু তারপর কয়েক শত অশ্বারোহী সৈন্য এসে তাদের বিরুদ্ধে মুখোমুখি হয়। বলাবাহুল্য কিছুক্ষণের মধ্যেই কচু কাটা করে ফেলে সবাইকে। সবার মৃত্যু হয় এবং এই নবীর বিচ্ছিন্ন মাথাকে একটা খুঁটির উপর এমন ভাবে গেঁথে রাখা হয় যাতে গ্রামের ভিতর থেকে তা দেখতে পারে । শুধু তাই না গ্রামের প্রধান গেটের উপরে এই নবীর যৌনাঙ্গ পেরেক দিয়ে গেঁথে দেয়। গ্রামের লোকজন সবাই হতাশ হয়ে গিয়েছিল তাদের প্রিয় নবীর এই মর্মান্তিক মৃত্যুর দৃশ্য দেখে । তাদের আশা-ভরসা সবই জলে গেল। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় তাদের আবারো নবী গিরির প্রতি বিশ্বাস ফিরে আসলো। কারণ কিছু সময় পরে অন্য এক ব্যক্তি নিজেকে সত্যিকারের নবী বলে দাবি করেন এবং ঐশ্বরিক বাণী পাওয়া শুরু করেন। তার নাম (John of Leiden) । এই দ্বিতীয় নবী দাবিকারী এক পর্যায়ে ১৬ জন স্ত্রী নিয়েছিলেন নিজের জন্য। বলাবাহুল্য এক্ষেত্রে তিনি স্ত্রীর সংখ্যায় আমাদের নবী মোহাম্মদ কেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। দীর্ঘকাল অবরোধে থাকতে-থাকতে গ্রামের মানুষ অনাহার এবং অপুষ্টিতে ভুগতে থাকে। এক পর্যায়ে অবরোধকারীরা গ্রামটি দখল করে ফেলে। এই দ্বিতীয় নবী দাবিকারী ব্যক্তি (John of Leiden) এবং তার প্রধান সাহাবা দুইজনকে ভয়াবহভাবে টর্চার করে হত্যা করা হয়। তার পর তাদের মৃতদেহ তিনটি লোহার খাঁচার মধ্যে ঢুকিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল গির্জার বাইরের দেয়ালে প্রায় ৫০ বছর ধরে। পরে তাদের দেহাবশেষ সরিয়ে ফেলা হয় – তবে এই খাঁচাগুলো এখনও ৪৮৪ বছর পরেও- তেমনি ঝুলে আছে গির্জার সাথে। গুগলে Münster rebellion দিয়ে সার্চ করলে এই গির্জায় ঝুলন্ত খাঁচাসহ ছবিটি দেখতে পাবেন Wikipedia এর পাতা থেকে ।

নরমপন্থী’র চরমপোস্ট

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

27 − = 23