ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন বিল্লাল দাস থেকে দাস মালিক


ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হযরত বিল্লালকে নিয়ে ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে দুবাইতে একটি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রে ‘বিল্লাল: অ্যা নিউ ব্রিড অফ হিরো (Bilal: A New Breed of Hero)’ নির্মিত হয়েছে। এই সিনেমাতে হযরত আবু বকর সিদ্দিকীকেও অ্যানিমেশন করে চিত্রিত করা হয়েছে। ইসলামের প্রথম সাড়ির ব্যক্তিদের ছবি আঁকা ভাস্কর্য নির্মাণ ইসলামী বিশ্বে প্রায় নিষিদ্ধ হলেও সম্প্রীতি তাদের নিয়ে সিনেমা কার্টুন নির্মাণ শুরু হওয়াকে ইসলামের রক্ষণশীলতা থেকে বেরিয়ে আসার কোন ইঙ্গিত নয়। এমনকি একদিন হযরত মুহাম্মদ চরিত্রে কেউ অভিনয় করলেও সেটা ইসলামী বিশ্বের উদারতা হিসেবে দেখার কোন সুযোগ নেই। এরকম চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বিরুদ্ধে কোন মুফতি আল্লামার বিরোধ লাগা ছাড়া বড় কোন প্রগতিশীল মুভমেন্ট এখানে নেই। কারণ এরকম চলচ্চিত্র নির্মাতারা সপ্তম শতাব্দীর এক বর্বরতম দর্শনকে আজকের যুগের মানুষের কাছে গ্রহণীয় করে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা করছে।

বিলাল বিন রাবাহ আল-হাবশি পূর্ব আফ্রিকার আবিসিনিয়ার একজন কালো মানুষ। ছোটবেলায় ডাকাত দল তাকে ও তার বোনকে লুট করে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়। তাদের কিনে নেন আরবের ধনী ব্যবসায়ী উমাইয়া বিন খালাফ। দাসদের জীবন মোটেই সুখকর নয়। কাজেই বিল্লালের জীবন সুখকর ছিলো না। তার বয়স যখন ৩০ তখন সে হযরত মুহাম্মদের ধর্ম গ্রহণ করে। এটা করায় তার মালিক চটে গিয়ে তাকে কঠিন সাজা দেয়। বিল্লালকে সাজা দেয়ার কথা শুনে হযরত মুহাম্মদ আবু বকরকে বিল্লালকে কিনে নিতে বলেন। আবু বকর কথা মত বিল্লালকে কিনে নিয়ে মুক্ত করে দেন। সিনেমা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বারাজুন এন্টারটেইনমেন্ট ও প্রযোজক আইমান জামালের আসল উদ্দেশ্য এইখানেই দেখানো যে ইসলাম দাস থেকে মুক্ত করে মানুষকে মুক্তি দিয়েছিলো। আমাদেরকে বুঝানো হচ্ছে সপ্তম শতাব্দীতে ইসলাম আসার আগে পৃথিবী বর্বর অন্ধকাচ্ছন্ন ছিলো। ইসলামই দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়েছিলো। আজকে যখন আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিপরীতে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জঙ্গি আন্দোলন চলছে তখন এরকম অ্যানিমেশন ফ্লিমে ইসলামকে সপ্তম শতাব্দীতে মানুষের মক্তির আন্দোলন বলে পরিচয় করার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগসাজগ রয়েছে। আজকের যুগে যখন অন্যান্য ধর্ম একটা প্রগতিশীর আন্দোলনের মাধ্যমে পরাজিত হয়ে রাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত হয়ে ধর্মালয়ের চার দেয়ালে বন্দি হয়েছে তখন ইসলাম ধর্মকে মানবতার সমাধান, মুক্তির সনদ বলে দাবী করে সপ্তম শতাব্দীর একটি সাম্রাজ্যবাদী ফ্যাসিস্ট ধর্ম আন্দোলনকে আজকের যুগের এগিয়ে নিয়ে যাবার এটা একটা ধান্দা। ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক প্রগতিশীল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এটি একটি চক্রান্ত।

হযরত বিল্লাল দাস থেকে মুক্ত হয়ে ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হয়েছিলেন। ছিলেন দাস অথচ ইসলাম গ্রহণ করে সমান কাতারে এসে গিয়েছিলেন আবু বকর ওসমানদের সঙ্গে। এটাই বলার চেষ্টা করা হয়েছে ফ্লিমটিতে। অথচ ইসলাম দাস প্রথা বিলোপ করেনি। ইসলামের মহান সব সাহাবীদেরই দাসদাসী ছিলো। ইসলাম বাড়ির দাসীর সঙ্গে গৃহকর্তার অবাধ সেক্সকে অনুমোদন করেছে যার জন্য মালিককে দাসীকে বিয়ে করার কোন প্রয়োজন নেই। ইসলামী ইতিহাস যদি আমরা দেখি তাহলে দেখব, মদিনার আশেপাশে ইহুদী বসতিগুলোতে হামলা করে ইহুদী সক্ষম পুরুষদের হত্যা করে তাদের নারীদের মুসলমানরা গণিমতের মাল হিসেবে যৌনদাসী করে রেখে দিচ্ছে। এইসব যৌনদাসী ও তাদের শিশুদের পরে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। হযরত বিল্লাল ইসলাম গ্রহণ না করলে তাকে কেউ কিনে এনে মুক্ত করে দিতো না। সে মুসলমান হয়েছিলো বিধায় সে স্বাধীন মানুষ হয়েছিলো। পক্ষান্তরে সেই সপ্তম শতাব্দীতে মদিনাতে যারা ইহুদী ছিলো তাদের ভাগ্যে নেমে এসেছিলো মৃত্যু। নারী ও শিশুদের কপালে লেখা হয়ে গিয়েছিলো দাস জীবন। অর্থ্যাৎ ইসলামের আগমনে কেবল মাত্র একটা নতুন শক্তির আর্ভিভাব ঘটেছিলো যে কিনা শত শত ছোট বিল্লালদের দাস বানিয়ে রেখেছিলো। তাদের অপরাধ ছিলো তারা কেউ ইসলামে বিশ্বাসী ছিলো না। তারা সকলেই ইহুদী নয়ত আরব পৌত্তলিক বাবা-মার সন্তান। অর্থ্যাৎ বিল্লাল ডাকাত দলের হাতে পরে দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে আরবে চালান হয়ে গিয়েছিলো। আর ইসলামের হাতে পরে বনু কুরাইজা, বনু নাযির গোত্রের অগুণতি ইহুদী নারী শিশুরা দাস হয়ে গিয়েছিলো…। ইসলাম তাহলে কেমন করে মানুষের মুক্তির জন্য এসেছিলো বলা যাবে?

নিজে দাস জীবন কাটিয়েও হযরত বিল্লাল কিন্তু নিষ্ঠুরতা করতে কম যাননি। এটা হয়ত তার উপর চলা অতিতে অন্যায়গুলোর একটা পৈশাচিক প্রতিশোধ বলা চলে। খায়বার আক্রমন চলাকালে বিল্লাল চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দেন। খায়বারের ইহুদী গ্রামে হামলা শেষে ইহুদী নারীদের যখন নবী নিজ হাতে তার সাহাবীদের মধ্যে ভাগ করে দিচ্ছিলেন তখন একজন এসে বললেন, ইয়া রসূল্লাহ, আপনি অমুককে ইহুদী সর্দারের স্ত্রীকে দিয়েছে যা আসলে সন্মানের দিক দিয়ে আপনার পাপ্য। তখন মুহাম্মদ সেই ইহুদীর স্ত্রীকে তার সামনে আনতে আদেশ করেন। হযরত বিল্লাল সেই হতভাগী ইহুদী সর্দারের স্ত্রী সাফিয়া ও তার বোনকে টেনে হিছড়ে আনতে থাকেন তাদেরই মৃত বাবা ভাই ও স্বামীদের নিথর দেহের সামনে দিয়ে। এই নির্মমতা দেখে সাফিয়ার সেই বোন চিৎকার করে বিলাপ করতে থাকলে হযরত মুহাম্মদ চিৎকার করে বলে উঠেন, এই ডাইনিটাকে আমার সামনে থেকে দূরে নিয়ে যাও…। [দেখুন সীরাতুন নবী, ইবনে হিশাম, খায়বার অধ্যায়]

এরকম নিষ্ঠুরতা করতে বিল্লালের বাধেনি যিনি নিজে এক সময় দাস ছিলেন। সে আসলে নিজের উপর ঘটা অন্যায়ের প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। এমন একটি চরিত্র কেমন করে হিরো হয়? যুদ্ধ, হামলা, দাস, যৌনদাসী ছাড়া সপ্তম শতাব্দীতে ইসলাম এমন কি নতুন বার্তা নিয়ে এসেছিলো? একেশ্বরবাদ ইহুদী খ্রিস্টান ধর্মসহ আরো অন্যান্য ধর্মের মাধ্যমে তখন প্রতিষ্ঠিত ছিলো। ইসলাম তো দাস প্রথান বাতিল করেনি। বরং এটার পুরো সুবিধা গ্রহণ করেছে। ইসলাম পূর্বে আমরা দেখি নারীরা স্বাধীন ছিলো। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হযরত খাদিজার জীবন। কিন্তু ইসলাম এসে নারীকে পুরষের অধিন করে দিলো। তার স্বাধীন জীবনকে পুরুষের কাছে স্রেফ সেক্সডল বানিয়ে দিলো। অথচ নানা রকমভাবে একটা প্রচার চালু আছে সপ্তম শতাব্দীতে ইসলাম এক নতুন বারতা নিয়ে এসেছিলো মানুষের কাছে। এই অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রটি সেই অপপ্রচারের একটি অংশ মাত্র…।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + = 19