ধর্ম এবং অমরত্ব

মোটের উপর আমরা যদ্দুর বুঝতে পারি স্পিনোজার দর্শন ছিল সবকিছুকে ভালবাসা এমনকি যে সমাজ তাকে বহিষ্কৃত করেছিল এবং নিঃসঙ্গ বানিয়েছিল সেই সমাজের জন্যও তার ভালবাসা ছিল অপরিসীম। আবারও বাইবেলের জবের মত স্পিনোজা সমাজের মানুষদেরকে গড়পরতার স্বাভাবিক সাধারণ হিসেবে বিবেচনা করলেন এবং তাদেরকে ন্যায়ের পথে থাকার পরামর্শ দিলেন। ঈশ্বরের মনোনীত জনের মত স্পিনোজার ভাগ্যেও জুটল নির্যাতন ভোগের যন্ত্রণা এবং সর্বত্র একাকী নির্বাসন। সময়ের হাত ধরে পৃথিবী এগিয়ে যাবে নির্মোহ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এবং তার চারপাশের অপরিবর্তনীয় নিয়মের বেড়াজাল শিথিল হয়ে যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের ভিতরের ধর্মের নামে বিভাজন চেতনা বিলীন হয়ে মানুষ পরিণত হবে ভালবাসার প্রিয়ভাজন ব্যক্তিতে। স্পিনোজা তার নিজের মনের প্রবল ইচ্ছাকে প্রকৃতির নিয়মের সাথে এমনভাবে মিশিয়ে ফেললেন যেন পরিণত হলেন প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ যাকে আর আলাদাভাবে চেনার দরকার হয় না। সবচেয়ে মঙ্গল হলো জ্ঞানের সম্মীলন এবং প্রকৃতির সাথে মনকে একাত্ম করা। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের মধ্যে বিভাজন আরোপিত কল্পনামাত্র। আমরা সবাই ঈশ্বরের সুবিশাল মহাজগতের নিয়ম এবং কারণ প্রবাহের ক্ষুদ্র অংশ। আমরা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাদের থেকে বড় কিছুতে মিলিত হতে আমরা বিদ্যুৎগতিতে ছুটে চলছি। আমাদের মন হলো অনন্ত আলোর ঝলকানি। “যতটুকু বুঝতে পারি, আমাদের মন হলো চলমান চিন্তাক্ষেত্র যা অন্যকোন চিন্তাদ্বারা নির্ধারিত বা প্রভাবিত হয় এবং এই চিন্তার সাথে ক্রমাগত একের পর এক অন্য চিন্তা এগিয়ে যেতে থাকে অনন্ত অসীমের দিকে। আর সব চিন্তা মিলেমিশে এক সময়ে সৃষ্টি করে ঈশ্বরের অনন্ত অসীম প্রজ্ঞা।” সর্বেশ্বরবাদের সাথে প্রতিটি স্বত্ত্বার মিলন প্রসঙ্গে প্রাচ্যের দর্শন আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয় এবং শুনতে পাই ওমর খৈয়মের প্রতিধ্বনি, “এক যে স্বত্ত্বা সর্বজনীন সেটা অদ্বিতীয় তাকে কখনো দুই বলবে না।” এবং হিন্দুদের বৈদিক শ্লোকেও আছে “নিজের ভিতরের স্বত্বাকে জানো, একমেবা অদ্বিতীয়ম এবং সর্বভূতে ভগবান; যে স্বপ্নের আকাঙ্ক্ষা তোমাকে সমগ্র থেকে বিচ্যুত করে তাকে পরিত্যাগ করো”। মাঝেমাঝে হেনরি ডেভিড থোরিউ বলেছেন, “যখন আমি অলসভাবে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়তে থাকি ওয়ালডেন পুকুরে, তখন আমি বেঁচে থাকায় ক্ষান্ত দিই এবং নতুন করে জীবন শুরু করতে চাই।”

এরকম সমগ্র বৃহৎ স্বত্ত্বার ক্ষুদ্র অংশ হিসেবে আমরা সবাই অমর। এই ইহজাগতিক নশ্বর শরীর ধ্বংসের মধ্য দিয়ে কখনোই মানুষের মন সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না বরং মন অসীমের অংশ হিসেবে অনন্তে মিশে যায়। মনের যে অংশ অনন্ত সেটাই বুঝতে পারে sub specie eternitatis বা অসীমের ব্যাপ্তি। আমরা যতবেশি বস্তুজগত বুঝতে পারব অসীমের চিন্তা ততবেশি পোক্ত হবে। ঠিক এখানেই স্পিনোজা স্বাভাবিকের থেকেও বেশি দর্শনের পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে যান এবং তার লেখার ভাষার ধরণ থেকে পাঠোদ্ধার করে ব্যাখ্যা করেন যারা তাদের মাঝে সীমাহীন বৈপরীত্য দেখা দেয় এবং বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন অর্থ মনে হয়। কখনো কারো কাছে মনে হয় স্পিনোজা বুঝি জর্জ এলিয়টের মতই অমরত্বের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কথা বলছেন। অন্যত্র মনে হতে পারে তিনি বুঝি আমাদের চিন্তার স্বাভাবিক যুক্তি আর সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলছেন এবং বলছেন আমাদের প্রত্যাশানুযায়ী আবহমান কাল ধরে কীভাবে টিকে আছে আমাদের জীবন। আবার কখনো মনে হয় স্পিনোজা রয়ে গেছেন ব্যক্তি মানুষের অমরত্বের চিন্তায়। হয়ত তার অকাল মৃত্যু মানুষের মনে এই ধারণার জন্ম দিয়েছে যে, মৃত্যু স্পিনোজাকে তার পথে তাকে বিচ্যুত করলেও অনন্তের বিশালতায় তাকে মিলিয়ে দিয়ে স্পিনোজার জন্য মানুষের বুকে অমরতার স্থান করে দেবে। তবু স্পিনোজা মরে গিয়েও জোরালোভাবে অনন্ত এবং অমরত্বের মধ্যে পার্থক্য করে যাচ্ছেন। যদি আমরা সাধারণ মানুষের অভিব্যক্তির দিকে একটু মনোযোগ দিই তাহলে আমরা দেখতে পাবো মানুষেরা তাদের মনের বিশালতা নিয়ে যথেষ্ট সচেতন কিন্তু তারা বিশালতার স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দিহান। তখন মানুষ অনন্ত অসীম মনের উপর কল্পনার প্রলেপ লাগায়, স্মৃতি হাতড়ে বেড়ায় এবং বিশ্বাস করে মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে ইহজাগতিক সবকিছু তারা আবার ফিরে পাবে। এরিস্টটলের মত স্পিনোজা অমরত্বের আলোচনা করলেও স্পিনোজা মানুষের মৃত্যুর পরে স্মৃতি অক্ষুণ্ণ থাকার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। মৃত্দেহে মন বলে কিছুর অস্তিত্ব নেই এবং মানুষ তখন কিছু কল্পনাও করতে পারে না অতীত স্মৃতিও ফিরে পায় না। স্পিনোজা মানুষের মৃত্যুর পরে স্বর্গীয় কোন পুরষ্কার প্রাপ্তিতেও বিশ্বাস করতেন না। “একজন সত্যিকারে ধার্মিক ব্যক্তিও মৃত্যুর পর তার সৎ কৃতকর্ম এবং ঈশ্বর বন্দনার জন্য যদি পুরষ্কার আশা করেন তবে তার জন্য করুণা, কারণ পুরষ্কারের কথা ধর্মালয়ে শোনা কল্প কথা। ঈশ্বর বন্দনা হলো এযাবৎ কালের সর্বশ্রেষ্ট দাসত্ব শৃঙ্খল, একজন ধর্মদাস বিশ্বাস করে ঈশ্বর তাকে শ্রেষ্ট পুরষ্কারে পুরস্কৃত করবেন। বিষয়টা এমন, যদি ধর্মের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে ঈশ্বরের সেবাই না করা গেল তাহলে আর সুখ কোথায় এবং কোথায় তবে চূড়ান্ত মুক্তি?” আশির্বাদ প্রাপ্তি নিয়ে স্পিনোজার এথিকস বইয়ের শেষ প্রস্তাবনা ছিল “আশির্বাদ কোন পুণ্য কাজের পুরষ্কার নয় বরং পুণ্য নিজেই আশির্বাদ।” বোধহয় একইভাবে অমরত্ব কোন স্বচ্ছ চিন্তার পুরষ্কার নয় বরং চিন্তার স্বচ্ছতা নিজেই একটা পুরষ্কার। কারণ কারো চিন্তার স্বচ্ছতা থাকলে সে অতীতের ইতিহাস বর্তমানে দেখতে পায় এবং ভবিষ্যতে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে এবং এভাবেই মানুষ তার নিজের সীমাবদ্ধতা এবং সময়ের সংকীর্ণতা অতিক্রম করতে পারে, একই সাথে সে বুঝতে পারবে প্রতিটি পরিবর্তনের বর্ণালির পিছনে রয়েছে অপরিসীম কার্য কারণ আর তাদের ফলাফল। এমন চিন্তা করতে পারাটাই অমরত্ব কারণ প্রতিটি সত্য একটি করে চিরস্থায়ী নির্ণায়ক বা সূচক। যদি কেউ অনন্ত বিশ্বের কিছু অংশমাত্র অর্জন করতে পারে তাহলে তার উপর অসীমের প্রভাব পড়বে।

এই মহান আশা জাগিয়ে স্পিনোজার এথিকস বইয়ের সমাপ্তি। সচারচার খুব কম দার্শনিক বই এরকম গূঢ় তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছে এবং খুব কম বই এত ব্যাখ্যা বিবৃতির জন্ম দিয়েছে। যদিও স্পিনোজার দার্শনিক তত্ব্র অনেক ক্ষেত্রে জোরালো সাংঘর্ষিক এবং শত্রুভাবাপন্ন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের তার্কিক যুদ্ধক্ষেত্রের জন্ম দিয়েছে। হতে পারে এথিকস বইটির পাঠে অর্জিত অধিবিদ্যা ভুল, এর মনস্তত্ত্ব ত্রুটিপূর্ণ, হতে পারে বইটির আলোচ্য ধর্মতত্ত্ব অসন্তোষজনক এবং দুর্বোধ্য। কিন্তু এই বইয়ের প্রাণ হলো এর বক্তব্য এবং সারবত্তা। এমন কোন মানুষ নেই যে স্পিনোজার এথিকস বইটা পড়লে বইটা সম্পর্কে সমীহ নিয়ে কথা বলবে না। এথিকস বইয়ের উপসংহার অনুচ্ছেদে বইটির মূল বক্তব্য আলোকিত হয়েছে স্পিনোজার স্বভাবসুলভ সরল বাগ্মিতায়।

আমার সব ইচ্ছা দিয়ে আবেগের গণ্ডী অতিক্রম করে আমি মানুষের মনের শক্তি অথবা মনের স্বাধীনতা প্রকাশ করে এথিকস বইটা শেষ করেছি। সেখান থেকে এটা পরিষ্কার যে একজন বিজ্ঞ মানুষ কীভাবে সমস্যা মোকাবেলায় বুক চিতিয়ে সাহসের সাথে এগিয়ে যায় এবং শুধু কাম আর লালসা দ্বারা পরিচালিত একজন অজ্ঞান মানুষের থেকে একজন আলোকিত মানুষ কতটা শক্তিশালী। একজন মূর্খ মানুষ বস্তু জগতের বিবিধ কারণে বিভিন্নভাবে বিচলিত হওয়া ছাড়াও সে কখনো মনের প্রকৃত সন্তুষ্টি উপভোগ করতে পারে না। তদুপরি সে নিজের সম্পর্কে কিছুমাত্র না জেনেই সারা জীবন পার করে দেয়। ঈশ্বর বা বস্তজগতের অন্য যেকোন কিছুর কাছে সে যখন নিজেকে সমর্পন করে তখনই তার জীবনের সমাপ্তি ঘটে। পক্ষান্তরে একজন প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞলোকের ক্ষেত্রে সে আত্মোন্বেষণে জীবন পার করে, সে তার নিজের সম্পর্কে সচেতন, ঈশ্বর এবং সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখে। বিজ্ঞ মানুষ নিজে কখনো অন্যের কারণে পরিণত হয় না এবং সর্বদা নিজের মনের শান্তি উপলব্ধি করতে পারে। যে রাস্তার সন্ধান আমি দিয়ে যাচ্ছি সে রাস্তায় পৌঁছানো অনেক কঠিন এমনকি সেই রাস্তা এখনো অনাবিষ্কৃত। কদাচিৎ যদি কেউ সে পথের সন্ধান পায় তবে লক্ষ্যে পৌঁছানো ততটাই দুরূহ হবে। যদি মুক্তি মানুষের হাতের মুঠোই থাকে এবং কাঙ্ক্ষিত বস্তু পেয়ে যায় কোনোরকম কষ্টভোগ ছাড়াই কিন্তু কেমন হবে যদি বাস্তবিকভাবেই সবাই উপেক্ষা করে সেই অমৃতের লাভের সুযোগ? কিন্তু অসাধারণ অর্জনগুলোই সত্যিই কষ্টসাধ্য এবং দুর্লভ।

[ উইল ডুরান্টের ‘স্টোরি অফ ফিলোসফি’ বইয়ের স্পিনোজা অধ্যায়ের ধারাবাহিক অনুবাদ। আজ প্রকাশিত হলো স্পিনোজার এথিকস বইয়ের “ধর্ম এবং অমরত্ব” অংশটি ]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

28 − 27 =