হাবিলদারের সফরনামা – ১

অাসাম সফর, অভিজ্ঞতা ও অর্জন

১ম দিন –
রাত নয়টার ট্রেনে কলকাতা স্টেশন থেকে গরিব রথ ট্রেনে চড়েছি। বিকাল ৩ঃ৩৫ এ অাসামের কোন একটি জাংশনে নামলে একজন প্রিয় মানুষ অামাকে রিসিভ করেছে। প্রিয় মানুষটি টগবগে এক যুবক। একজন এক্স মুসলিম।
এক নিভৃত গ্রামে অামার প্রিয় মানুষের বাড়ি। বাড়িতে পৌঁছে গোসল করে হালকা নাস্তা ও তাঁর রাতে ডিনার করলাম।
ইতিপূর্বে মুক্তমনাদের মাঝে চাউর হয়েছে
– মাসুদ ভাই এসেছে!
নিরাপত্তাজনিত কারণে জানানোর চৌহদ্দি ছিল সীমিত।
ট্রেন থেকে যখন নেমেছি তখন বিকেল তিনটা।
রেলস্টেশনটা দারুণ সুন্দর । একপাশে পাহাড় এবং সবুজের দারুণ মিতালি, অারেকপাশে বাজার এবং রাস্তাঘাট। সেদিন অাসামের সব পরিবহনে ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। ২৪ ঘন্টার ধর্মঘট। লোয়ার অাসামের লোকেরা অালাদা কমতাপুর রাজ্য চায়, তারা অাসাম রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়৷ অাপার এবং লোয়ার অাসামের মধ্যে সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগত পার্থক্য প্রকট।

২য় দিন
গ্রামের বাজার, মাটির রাস্তা ও দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ দেখতে বেরোলাম। অটোতে বাজারে যাওয়ার প্রস্তাব করা হল, অামি নারাজি জানালাম। প্রায় তিন কিলোমিটার হেঁটেই গিয়েছি বাজারে। অাইয়ুব ভাইকে বললাম, অাপনি যথেষ্ট ইয়াংম্যান, হাঁটায় অাপত্তি নেই তো?
তিনি বললেন, না অাপত্তি নেই।
শুরু হলো ফসলের মাঠ, প্রজাপতি, পাখি, জলাশয় দেখতে দেখতে হাঁটা। রাতে ফেরার পথের দৃশ্য অারো চমৎকার – রাস্তার দু’ধারে জোনাকির মেলা বসেছে যেন! অন্ধকার গ্রামীণ পথ, অামি হেঁটে চলেছি, জীবনানন্দের কবিতাখানিও অাওড়াতে লাগলাম। হাজার বছর ধরে অামি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে……
অাইয়ুব ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, জীবনানন্দকে চেনেন? হ্যা জবাব অাসলো। অাসামিজ হলেও বাংলা সাহিত্য
সম্পর্কে তার ভালো ধারণা অাছে।
রবিঠাকুরের একটি বই অামাকে গিফট করেছে তার লাইব্রেরি থেকে।

৩য় দিন
ডাক্তার এম.অাই. অাহমেদ একজন অাসামিজ এক্স মুসলিম। তিনি অামার অাগমনের খবর পেলেন। খবর পেয়ে
রোগী দেখা শেষ করেই নিজের মারুতি গাড়ি ড্রাইভ করে চলে এলেন দেখা করতে। অাসামের নামকরা একজন ডাক্তার এবং লেখক অাসছেন অামার সাথে দেখা করতে, খুব ভালো লাগার অনুভূতি হলো।
দুই ঘন্টার ড্রাইভ শেষে প্রায় নব্বই কিলোমিটার পথ পেরিয়ে অজপাড়াগায়ে চলে এলেন ডাক্তার সাহেব। সাথে অারো দুজন। গ্রামের কাদাময় রাস্তায় গাড়ি নেয়া সম্ভব না বিধায় অামরাই চলে এলাম স্থানীয় বাজারে। ডাক্তার সাহেব অামাকে পেয়ে এবং দেখে অভিভূত, অামি তার কথায় এবং জ্ঞান দেখে অভিভূত।
ধর্ম ছেড়ে মানুষ হলে মানুষ সত্যিই অসাধারণ মানুষ হয়, তা সবসময়ই অনুভব করি। ডাক্তার সাহেবের সাথে একজন সংশয়ী মুসলিম ছিলেন, ইসলাম সঠিক না ভুল তা নিয়ে তিনি দ্বিধান্বিত। অামাকে বেশ কিছু প্রশ্ন করলেন, অামিও উত্তর দিলাম৷ অবশেষে তিনি ইসলামের অসারতা সম্পর্কে নিশ্চিত হলেন। ডাক্তার সাহেব তার বাড়িতে দাওয়াত দিলেন, সময়ের অভাবে যাওয়া হয়নি। ভবিষ্যতে যাওয়ার ওয়াদা করলাম।
মুক্তমনা, বদ্ধমনা এবং বাংলাদেশের পরিস্থিতি ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে অামার কাছে জানতে চাইলেন উপস্থিত সবাই। অামিও বললাম। সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশী মুক্তচিন্তকদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করার কথাও বললাম। সবাই খুব মন দিয়ে শুনলো অামার কথা।

( চলবে )

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

83 − 78 =