হাবিলদারের সফরনামা – ২

অাসাম সফর, অভিজ্ঞতা ও অর্জন

৩য় দিনের দুপুরবেলা –
ইন্ডিয়ান অার্মি সদস্য শাহাদাত ভাই এবং রুহুল অামিন, এবং অারো একজন ভাই এলেন, গল্প হলো বেশ খানিকক্ষণ। শাহাদাত ভাই অামার নিজের জীবনের জন্য কিছু করছি কিনা জানতে চাইলেন, অামি বললাম, অামার মানবতার সেবা করা ছাড়া অন্য কোনো ভাবনা নেই। নিজের কোনো চাওয়া পাওয়া নেই।
অামার এ ভাবনার বিরোধিতা করলেন শাহাদাত ভাই।

শান্তিধর্মের কারণে মা, সন্তান, স্ত্রী, শ্বশুর-শাশুড়ি, বন্ধু-স্বজন সবকিছু হারানোর পর নিজের প্রাণটা বাদে অার কিছু হারানোর নেই। কিছু পাওয়ারও নেই ।

৪র্থ দিন –
বাসে চড়ে মানিকপুর হতে বরপেটা রোড যাচ্ছি। ভাড়া জনপ্রতি কুড়ি টাকা । সাথে অাছে অামার ভাই অাইয়ুব অালি শর্মা। রাস্তার দু’পাশের দৃশ্য অসাধারণ সুন্দর।
গুয়াহাটি শহরতলী খুব সুন্দর। অামাদের বাস এখনো গন্তব্যে পৌঁছেনি। বাস চলছে, দু’পাশে অপরূপ পাহাড়ের সবুজ ডানা মেলছে। রাস্তার ডানপাশে পাহাড়, বাঁ পাশে কলকারখানা, বাসাবাড়ি ও দোকানপাট।
ঠিক যেন বাংলার কোন গ্রামীণ জনপদ ধরে যাচ্ছি অামরা।
গুয়াহাটি গেলাম। জালুকবাড়ি নেমে দেখি গুয়াহাটি ইউনিভার্সিটির গেট৷ বন্ধুকে বললাম, ভার্সিটির ভেতর ঘুরতে চাই। তাই হলো, ঘুরলাম। ভার্সিটির বাইরে সুন্দর একটি স্থাপনা, মনে হয় যেন জাদুঘর৷ জানতে চাইলে বন্ধু বললেন, এটা ভূপেন হাজারিকার সমাধি। ভূপেন হাজারিকার নাম শুনে অামি চমকে গেলাম, এত সহজে হাতের নাগালে ভূপেন হাজারিকা! অার দেরি নয়, এখনই ঢুকবো। না….অাশায় গুড়েবালি, বৃহস্পতিবার বন্ধ!
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ভূপেনের সমাধি যদ্দুর দেখা যায় দেখে নিলাম। এরপর গুয়াহাটি ইউনিভার্সিটির ভেতরটা ঘুরে দেখলাম। ভার্সিটির ভেতরটা দারুণ সুন্দর, পুরো প্রেমময় প্রকৃতি। রাস্তার ধারে কৃষ্ণচূড়ার সারি, কিছুদুর পরপর ছোট ছোট পুকুর, বিচিত্র সব পাখিদের কলকাকলিতে মুখর এক অনিন্দ্য প্রকৃতি।
গুয়াহাটির বাংলা এবং ইংরেজি বানান বিভ্রাট বেশ। কখনো লেখা গুয়াহাটি, কখনো গৌহাটি। কখনো Gauhati, অার কখনো Guwahati লেখা হয়। গুয়াহাটি ইউনিভার্সিটির গেইটে লেখা অাছে Gauhati বানান।

৫ম দিন –
কয়েকজন এক্স মুসলিম এলেন, গল্প হলো, অাড্ডা হলো। “মানুষ মানুষের জন্য, গঙ্গা অামার মা, তুই যে অামার পুতুল পুতুল সেই ছোট্ট মেয়ে” ইত্যাদি কালজয়ী গানের শিল্পীর সমাধি দেখতে এলাম, তাঁকে ছুঁয়ে দেখতে এলাম। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাংলা গানের শিল্পীকে দেখতে এলাম – ভূপেন হাজারিকার কাছে এলাম। অাসামিজ ভাইদের বললাম, ভূপেন হাজারিকা বাংলাদেশে অসম্ভব রকম জনপ্রিয়।
সাথে সাইফুল, রুহুল, অাইয়ুব প্রমুখ ভালো মনের মানুষেরা ছিলেন সারাক্ষণ। ভূপেন হাজারিকার সমাধি কমপ্লেক্সে খুব লো ভলিউমে তার মায়াভরা কন্ঠের গান যে কাউকেই মোহাবিষ্ট করে ফেলবে। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল, বৃষ্টিকে অামরা ‘কুছ পরোয়া নেহি’ বলে দিলাম। ভিজলাম, অাবেগপ্রবণ হলাম, ‘মানুষ মানুষের জন্য’ – র শিল্পীকে মনে হয় যেন কাছ থেকে দেখলাম।
এখনো যদি কখনো কাঁদতে মন চায় তখন “তুই যে অামার পুতুল পুতুল সেই ছোট্ট মেয়ে” শুনি অার একাকী কাঁদি।
ভূপেন হাজারিকার কাছে এসে অাবারো মনে পড়লো, “তুই যে অামার পুতুল পুতুল সেই ছোট্ট মেয়ে…..”
চোখ কিছুটা প্লাবিত হল। একজন দেখে ফেলেছেন সেই প্লাবিত চোখ৷
মানুষের প্লাবন, হাহাকার, যন্ত্রনা সবার চোখে পড়ে না। যেমন পড়েনি অামাকে “মুক্তচিন্তার হাবিলদার” এবং নিজেকে “মুক্তচিন্তার ওসি সাহেব” দাবিদার ছোট ভাইটির চোখে। চোখের ভাষা সবাই পড়তে পারে না। সবাই জীবনানন্দ হতে পারে না।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 + = 23