ওপারে আমার মায়ের বাড়ি ….

টাকী সফরঃ
দর্শনীয় স্থান হিসেবে টাকীর নামডাক শুনেছি
বহুবার, কিন্তু তা যে একেবারে বাংলাদেশ বর্ডার লাগোয়া তা জানতাম না। দিনটা ছিল মেঘলা, রোদ্দুর মশায়ের কোন খবর নেই । হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি, একটুপর অাবার শান্ত-ভদ্র প্রকৃতি। বেড়ানোর জন্য কিংবা বেরোনোর জন্য এমন প্রকৃতি খুবই যুৎসই৷ যুৎসই দিনেই বেরিয়েছি বলে মনকে বাহবা দিলাম । (যদিও বারবার বৃষ্টিতে হালকা স্নান সারতে হয়েছে বারংবার!) অলসতা করে ছাতা না নিয়ে বেরোনোর কারণে নিজেকে বোকা বলে মনেমনে বকে দিলাম ভালোমতো।

শুরুতে গেলাম টাকী পৌরসভার গেস্ট হাউসে। গেস্ট হাউস এবং চারপাশের প্রকৃতি দারুণ সুন্দর।

গেস্ট হাউসে লান্চ সারলাম সর্ষে ইলিশ দিয়ে (কোন নিরামিষ নেই, তাই নিরামিষভোজীর তকমা খোয়াতে হল! অাবার ইলিশের কথা শুনেও ঈমানে ঝাঁকুনি লেগেছে!!)
খাবার এবং সার্ভিসের মান খুবই ভালো। ওয়েটারের অাচরণও খুব ভালো।
ওয়েটারকে কোথায় কোথায় ঘুরতে যাওয়া যেতে পারে প্রশ্ন করলে তিনি খুবই সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বললেন। গেস্ট হাউসের দু’পাশই সম্মুখপাশ, একপাশ মেইন রোডের দিকে , অারেকপাশ নদীর দিকে। উভয়দিকেই প্রবেশপথ অাছে। দেখলে উভয়পাশকেই সম্মুখ মনে হবে।

ইন্জিনভ্যান তথা ভটভটি ঠিক করলাম।
দু’ঘন্টায় অামাদেরকে দেখাবে গোলপাতার বন, রাজা শংকরের বাড়ি, কালীমন্দির ও তিন নদীর মোহনা। অবশ্য সময় দু’ঘন্টার বেশিই লেগেছে, তাই ভাড়াও বাড়িয়ে দিয়েছি, চালক খুশি খুব। নদীর মোহনা ধরেই চলেছে ভ্যান।
গোলপাতার জঙ্গলে হাঁটুজল, তবুও জল মাড়ালাম। ভিজলো পা দু’খানি।
ভটভটি চালক হয়ে উঠলো অামাদের গাইড । কোথাও বলার মত থাকলে বলতে থাকে হড়হড় করে। চালক জয়দেবের বাড়ি টাকীতেই। যাওয়ার পথে তার বাড়ির রাস্তা দেখাতে ভুল করল না। পথিমধ্যে ‘ছোট হুজুরের’ বাড়ি দেখালেন ।
বড় হুজুর এবং ছোট হুজুর খুব কামেল মানুষ, তারা যা বলতেন তাই-ই হয়ে যেত – জয়দেব বাবুর বিশ্বাস!
ছোট হুজুরের মাজার গোলপাতার বনে যাওয়ার পথেই। ছোট হুজুরের নাম রুহুল কুদ্দুস, তার বড়ভাই ছিল বড় হুজুর । বড় হজুর থাকতো বসিরহাটে, অার ছোট হুজুর চলে এসেছিল সৈদপুর, টাকীতে। (হিন্দু ধর্মাবলম্বী, কিন্তু কি অগাধ বিশ্বাস হুজুরের প্রতি!)
হুজুরের বংশধররা পীরগিরি ধরে রেখেছে। মসজিদ, মাদ্রাসা, ওয়াজমাহফিল, ওরস দিয়ে চলছে তাদের পেটপুজো। শতশত বিঘা জমি এখনো অাছে হুজুরের সন্তানদের।

টাকী পড়েছে উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায়। টাকীর সব পর্যটন স্পট মূলত ইছামতী কেন্দ্রিক। ☁ মেঘলা দিনে, এই বর্ষার মরসুমে ইছামতী ফুলে ফেঁপে উঠেছে। হয়েছে পুরোপুরি স্বাস্থ্যবতী ও রূপবতী। গোলপাতার বনে ঢুকলাম, একেবারেই নদীতীরবর্তী। এটা ইছামতী নদী, এটা বাংলাদেশের নদী । বাংলাদেশে থাকতেও এর নাম পড়েছি ও শুনেছি। পানি বেশ ঘোলা।
গোলপাতার জঙ্গল থেকে বেরিয়ে চায়ের দোকান থেকে চা খেয়ে নিলাম তিনজন (ভ্যানচালক সহ।)
হঠাৎ চোখে পড়লো গাঢ় সবুজের রাজত্ব, ছোট ছোট জলাধার, তার পাড়ে ছোট বড় গাছ।
জানতে পারলাম, এ নদীর ওপারে যে অারো এক চিলতে সবুজ দেখা যায়, এপারের মতই প্রকৃতি দেখা যায় – ওটাই বাংলাদেশ!
অামি একাই গেলাম, কাদা থাকার কারণে বন্ধু যায়নি। অামি নদীর একেবারে কাছে গিয়ে জলে পা একটু ভেজালাম, একটু ঢেউ তুললাম জলে। অামার সন্চারিত ঢেউ হয়তো ওপারে গিয়ে পৌঁছেনি, কিন্তু অামি এতেই সন্তুষ্ট। অন্তত ঢেউ তো তুলেছি। এই যে লিখছি, ভিডিও করছি, কথা বলছি, এর ঢেউ কি বাংলাদেশে যাচ্ছে?
লোকেরা তো বলছে, যাচ্ছে। লোকেরা তো বলছে, বাঙ্গালি অাবার জেগে উঠছে। তরবারির ধর্ম লোকেরা ছুড়ে ফেলছে।
ওপারে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ।
জল ঘোলা হলেও টলটলে।
এই ঘোলাজলের ওপারে বাংলাদেশ, ওখানে বাস করে অামার মা, ওখানে বাস করে ছোট্ট এক টুকটুকি, যে এখনও ঘুমের ঘোরে অাব্বু বলে ডেকে ওঠে । ওখানে বাস করে টুকটুকির ভাইয়া, যে এক মুহুর্তের জন্য ও তার বাবাকে ভুলতে পারছে না। ইছামতীর পারে গিয়ে গভীর নিশ্বাস নিলাম, সামান্য দূরত্ব, অথচ কত যোজন যোজন ফারাক দুটি দেশের। সৌদির তৈরি শানানো তরবারি এবং ছুরিগুলো চিকচিক করছে ওপারে। তরবারি গুলো রাজনীতির ইন্ধন, ব্যবসায়ীর বন্ধন। অামি ওপার গেলেই তরবারি গুলো তৎপর হয়ে উঠবে। হাজারো তরবারি অপেক্ষা করছে অামার জন্য৷ অামাকে হত্যা করলে তরবারির বাহকেরা নাকি স্বর্গে যেতে পারবে!
এ কেমন স্বর্গ যেখানে যেতে হলে মানুষ হত্যা করতে হয়? এ কেমন স্বর্গ যেখানে যেতে হলে সন্তানকে মায়ের থেকে, পিতাকে সন্তান থেকে, ভাইকে ভাই থেকে পৃথক করতে হয়?
বুকভরা নিশ্বাস নিলাম অাবারো, ওপারে অামার মায়ের দেশ, ওপারে থাকে অামার সন্তানেরা। অামাকে দেশে ফেরাতে চায় সৌদিঅারবের তরবারির এজেন্টরা, কিন্তু এটা ভালোবাসার কারণে নয়, এটা সৌদি শরিয়ার প্রয়োগ করার জন্যে। এটা স্বর্গে গমন নিশ্চিত করার জন্যে।
সৌদিঅারবের ঈশ্বরের নাম অাল্লাহ, অাল্লাহর পছন্দ রক্ত, খুব পছন্দ।
অাল্লাহ যাদের রক্ত পছন্দ করেন তাদের নাম কাফের। পৃথিবীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদী, শিখ, জৈন, পারসিক, বাহাই, কুর্দি সবার নাম কাফের । নাস্তিকদের নাম কাফের। কাফেররা নাকি পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট, তাই কাফেরদেরকে হত্যা করলে খুশি হয় মুসলমানের অাল্লাহ।
সব কাফেরের রক্ত অাল্লাহ নামক ঈশ্বরের পছন্দ।
অাল্লাহর অনুসারী যারা তাদের রক্তও অাল্লাহর পছন্দ, তবে এখানে পছন্দের তরিকা ভিন্ন – শিয়াদের দেশের অাল্লাহর পছন্দ সুন্নির রক্ত, অার সুন্নিদের দেশের অাল্লাহর পছন্দ শিয়াদের রক্ত, রক্ত ছাড়া অাল্লাহর অাল্লাহগিরি পূর্ণতা পায় না, রক্ত ছাড়া অাল্লাহর ক্ষমতার প্রদর্শন হয়না। অাল্লাহ মহা ক্ষমতাধর, মহা পরাক্রমশালী। ক্ষমতা প্রকাশ পায় রক্তে, ক্ষমতা বিকাশ হয় রক্তে।

অামি ফিরে এসেছি ঘরে, কিন্তু মনটা পড়ে রইল সেই ইছামতীর তীরে। যেখানে গিয়ে অামি অনুভব করার চেষ্টা করেছি মাকে, যেখানে অামি অনুভব করার চেষ্টা করেছি অামার সন্তানদের।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =