স্পিনোজার প্রভাব

স্পিনোজা কোন অনুগত গোষ্ঠী সৃষ্টি করতে চাননি এবং বাস্তবিক অর্থেও তিনি কোন গোষ্ঠী গঠন করেন নি। তবুও স্পিনোজার মৃত্যুর অব্যবহিত পরের সব দার্শনিক তত্ত্ব তার চিন্তার সাথে সংশ্লিষ্ট এবং তাকে ঘিরেই আবর্তিত। কিন্তু কী অদ্ভুত, তার পরবর্তী প্রজন্ম যথেষ্ট ঘৃণার সাথে তার নাম উচ্চারণ করত। এমনকি ডেভিড হিউম তাকে ‘বীভৎস’ বলে অভিহিত করেছেন। জার্মান দার্শনিক এবং নাট্যকার গটহোল্ড এফ্রাইম লেসিং বলেছিলেন, সাধারণ মানুষ স্পিনোজা সম্পর্কে এমনভাবে কথা বলতো, “যেন স্পিনোজা একজন মৃত কুকুর”।

কিন্তু লেসিং হলেন সেই ব্যক্তি যিনি সমাজে স্পিনোজার খ্যাতি পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কার্ল গুস্তাভ জ্যাকব জ্যাকোবি এবং গটহোল্ড এফ্রাইম লেসিং’র মাঝে ১৭৮০ সালের বহুল আলোচিত আলাপচারিতায় স্পিনোজাকে নিয়ে চলমান সমালোচনার ঝড় জ্যাকোবিকে বিস্মিত করে। বিশেষত লেসিং যখন জ্যাকোবিকে বলেন “তার পরিণত বয়সে তিনি একজন স্পিনোজাপন্থী এবং দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন স্পিনোজাকে বাদ দিয়ে দর্শনের আলোচনা সম্ভব নয়।” স্পিনোজার প্রতি ভালবাসার কারনেই মোজেস মেনডেলসনের সাথে তার বন্ধুত্বের সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। জার্মান ভাষায় লিখিত লেসিং’এর ‘Nathan der Wiese’ বিখ্যাত নাটকে তার মেধার সর্বোচ্চ ঢেলে একজন আদর্শ ইহুদিকে চিত্রি করেন যিনি জীবদ্দশায় একজন ব্যবসায়ী এবং মরে গিয়ে দার্শনিকে পরিণত হয়েছেন। কয়েক বছর পরে জোহান গটফ্রাইড হারডারের লিখিত Einige Gespräche über Spinoza’s System বইটির কারণে উদার ধর্মতাত্ত্বিকদের দৃষ্টি আকর্ষিত হয় স্পিনোজার ‘এথিকস’ বইয়ের দিকে। জার্মান ধর্মতাত্ত্বিক, দার্শনিক এবং বাইবেলের সুপণ্ডিত এবং উদার ধর্মতত্ত্বিক চিন্তাধারার পুরোধা ফ্রেডরিখ শেলেইরমাচার স্পিনোজা সম্পর্কে লিখেছিলেন “স্পিনোজা ছিলেন নিষ্কলুষ এবং সমাজ কর্তৃক বহিষ্কৃত”। পক্ষান্তরে ক্যাথলিক কবি জর্জ ফিলিপ নোভালিস স্পিনোজাকে অভিহিত করেছিলেন ‘ঈশ্বর বিষাক্ত মানুষ’ হিসেবে।

এই সময়ে কার্ল গুস্তাভ জ্যাকব জ্যাকোবি স্পিনোজাকে জার্মান লেখক এবং নন্দনতাত্ত্বিক আলোচক জোহান উল্ফগ্যাং ভন গ্যাটে’র নজরে নিয়ে আসেন। স্পিনোজার ‘এথিকস’ বইটা প্রথমবারের মত পড়েই তিনি স্পিনোজার প্রতি দ্রবীভূত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন ‘এথিকস’ হলো দর্শনের কোষ যার জন্য স্পিনোজার হৃদয় মন গভীরভাবে ধারাবাহিক চিন্তা করে গেছে এবং তার জন্য ইতিপুর্বে তার লেখায় গদ্য এবং পদ্য দ্বারা পরিব্যপ্ত ছিল। এখান থেকেই তিনি পাঠ্য খুঁজে পেয়েছিলেন ‘dass wir entsagen sollen- অর্থাৎ প্রকৃতি আমাদেরকে যতটুকু অধিকার দিয়েছে ততটুকু সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেয়া উচিৎ এবং এটা অংশত স্পিনোজা থেকে উৎসারিত প্রশান্তির বাতাসে নিঃশ্বাস নেয়া আর যেখানে তিনি বেড়ে উঠেছেন Gotz and Werther সাহিত্যের উদ্দাম কল্পনাবিলাসে এবং পরবর্তী জীবন কাটিয়েছেন ধ্রুপদী কায়দায়।

স্পিনোজার চিন্তার উপর ভিত্তি করেই জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট সমসাময়িক জোহান গোটিলেব ফিশতে, ফ্রেডরিখ উইলহেম জোসেফ শেলিং এবং জর্জ হেগেল জ্ঞানান্বেষণের পদ্ধতি এবং ক্ষেত্র গবেষণা করে নিজেদের মত করে স্ব স্ব অবস্থান থেকে সর্বেশ্বরবাদ ধারণায় পৌঁছেছিলেন। সর্বেশ্বরবাদের ধারণা তারা পেয়েছিলেন স্পিনোজার conatus sese preservandi লেখা থেকে। conatus sese preservandi বলতে আত্মসংযমের প্রচেষ্টাকে বোঝানো হয়েছে। পরবর্তীতে ফিশতে ‘আমি জন্মেছিলাম’ আর্থার শোপেনহাওয়ার ‘বেঁচে থাকার নেশা’ ফ্রেডরিখ নিটশে ‘ক্ষমতার লিপ্সা’ এবং ফ্রেঞ্চ দার্শনিক হেনরি বার্গসন ‘বেঁচে থাকার শক্তি’ লিখেছিলেন স্পিনোজার অনুপ্রেরণায়। হেগেল অভিযোগ করেছিলেন স্পিনোজার জ্ঞানের অন্বেষণ পদ্ধতি অনেক বেশী প্রাণহীন কাটখোট্টা। হেগেল বলেন, স্পিনোজা হয়ত ভুলে গিয়েছিলেন প্রকৃতির বিবিধ উপাদানের প্রগতিশীল আচরণ এবং মুগ্ধ হয়ে জপেছিলেন শুধু ঈশ্বর ধারণার সৌম্যকান্তি সৌন্দর্য। তিনি ঈশ্বরের বিধিবিধানকে ‘অত্যাবশ্যকীয় কার্যকারণ’ দ্বারা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হেগেল যথেষ্ট সততার সাথে কোন রকম ভণিতা ছাড়াই বলেছিলেন, “কেউ যদি দার্শনিক হতে চায় তবে তাকে অবশ্যই প্রথমে স্পিনোজাপন্থী হতে হবে।”

ইংল্যান্ডে স্পিনোজার প্রভাব জেগে উঠেছিল বিপ্লবী আন্দোলনের ঢেউয়ের মত বিশাল পরিসরে। তরুন বিদ্রোহী কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ এবং উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ স্পিনোজাকে বলতেন ‘spy-nosa’ ( যেভাবে সরকার নিজের সুবিধার জন্য গোয়ান্দা নজরদারির জন্য গুপ্তচর নিয়োগ করে)। তারা বিপুল উদ্দীপনা ও আগ্রহ নিয়ে রাশান বুদ্ধিজীবীদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা রাশিয়ার জারের বিরুদ্ধে উত্তাল আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে চিত্রায়ন করেছেন। কোলরিজ তার সাহিত্য আলোচনার টেবিল স্পিনোজাপন্থীদের দিয়ে পূর্ণ করেছিলেন এবং ওয়ার্ডসওয়ার্থ এই দার্শনিকের চিন্তাভাবনা তার বিখ্যাত ‘Lines composed a few miles above Tintern Abbey’ কবিতায় রূপ দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

এমনকিছু
যার বসতি হলো অস্তমিত সূর্যের আলো,
এবং পৃথিবীকে আবৃত মহাসাগর এবং এই প্রানময় বাতাস,
উপরে ঐ নীলাকাশ আর জীবিত মানুষের মন;
যাকিছু গতিশীল এবং সত্ত্বা যা আমাদেরকে বাধ্য করে
সব চিন্তাশীল বস্তু আর সব চিন্তার বিষয়,
এবং ধাবিত হয় সবকিছু কেন্দ্রের দিকে।

পার্সি বিশি শেলি তার মূল ‘কুইন ম্যাব’ স্মারক লেখনীতে স্পিনোজার ‘ধর্ম এবং রাষ্ট্র সম্পর্কিত আলোচনা’ প্রবন্ধ হুবহু উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন। শেলি ‘ধর্ম এবং রাষ্ট্র সম্পর্কিত আলোচনা’ প্রবন্ধটি ইংরেজিতে অনুবাদ শুরু করেছিলেন এবং লর্ড বায়রন সেই অনুবাদের মুখবন্ধ লিখে দিতে চেয়েছিলেন। এই মহৎ সৃষ্টিকর্মের কিছু খণ্ডাংশ লেখক সি.এস মিডলটনের হাতে এসে পড়ে। মিডলটন ভেবেছিলেন এই লেখা বুঝি শেলির মৌলিক রচনা এবং তিনি এই লেখাকে “একটা স্কুল বালকের কল্পনা প্রসূত চিন্তার ফলাফল….. যা খুবই উগ্র এবং ছাপানোর জন্য একেবারেই অনুপযুক্ত” হিসেবে অভিহিত করেন। জর্জ এলিয়ট পরিণত বয়সে স্পিনোজার এথিকস বইটা অনুবাদ করেছিলেন যদিও সেটা আর ছাপানোর চেষ্টা করেন নি। কেউ হয়ত অনুমান করতে পারেন হারবার্ট স্পেনসারের ‘অমীমাংসিত ধারণা’ লেখাটির জন্য তিনি স্পিনোজার কাছে ঋণী কারণ দুইটা লেখার মধ্যে গভীর অন্তরঙ্গতা আছে। স্পিনোজার মধ্যেই রয়েছে আধুনিক বিজ্ঞানের পরিপূর্ণতা ঘোষণা দিয়ে বেলফোর্ট বাক্স বলেছিলেন, “বর্তমানে দার্শনিকতা চর্চার ক্ষেত্রে তার মত উন্নত চিন্তার মানুষ পাওয়া যায় না”।

বহু মনীষী স্পিনোজার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, কারণ তার লেখার বিশ্লেষণ বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্ন পথে ধাবিত করে এবং প্রতিবার পাঠেই পাঠক নতুন রত্নের সন্ধান পাবে। সব গভীর এবং পরিপূর্ণ চিন্তা রত্নের মত ভিন্ন চিন্তার মানুষের কাছে ভিন্নভাবে ধরা দেয়। কেউ স্পিনোজাকে বাইবেলের পণ্ডিতদের মত বলেন প্রজ্ঞাময় যেমন “প্রথম যে মানুষ তাকে দেখবে সে হয়ত স্পিনোজাকে যথাযথ জানতে পারবে না, শেষ ব্যক্তিও হয়ত তাকে সম্পুর্ণ জানতে পারবে না। কারণ তার চিন্তার সীমারেখা সমুদ্রের মত বিস্তৃত এবং তার প্রজ্ঞা সমুদ্রের থেকেও গভীরতর।”

স্পিনোজার দ্বিশতবর্ষতম প্রয়ান দিবসে নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে তার প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়। ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য সবশ্রেণির শিক্ষিতজন বিদ্যোৎসাহী মানুষের কাছ থেকে অভুতপূর্ব সাড়া পাওয়া গেল। কোন স্মৃতিস্তম্ভই এত ব্যাপক বিস্তৃত মানুষের ভালবাসায় গড়ে ওঠেনি। ১৮৮২ সালে স্পিনোজার ভাস্কর্য উন্মোচনের সময় ফ্রান্সের হিব্রু ভাষাবিদ জোসেফ আর্নেস্ট রেনান যে ভাষণ দিয়েছিলেন সেটা আমাদের স্পিনোজা অনুচ্ছেদের ইতি টানার জন্য খুব উপযোগী “এই বিনয়ী মিতব্যয়ী মানুষটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় যদি কোন পথচারী একটুখানি অপমান করে যায় তাহলে আমরা তার কাছে ঋণী, তার শাস্তি হওয়া উচিৎ, সব অশিষ্ট মানুষেরই যেমন হয়। স্পিনোজা তার অশিষ্টতা আর অপারগতা দিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন স্বর্গ কী জিনিস। পাথরের স্তম্ভে দাঁড়িয়ে এই মানুষটি সবারদিকে আঙুল তুলে বলবেন, তিনি কেমনভাবে আশির্বাদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সুরুচিসম্পন্ন পথিক এই ভাস্কর্যের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় নিজের হৃদয়ের কাছে নিজেই বলবে, ‘সত্যিকারের ঈশ্বরের দর্শন সম্ভবত এখানেই এসেছিলেন’।”

[ উইল ডুরান্টের ‘স্টোরি অফ ফিলোসফি’ বইয়ের স্পিনোজা অধ্যায়ের ধারাবাহিক অনুবাদ। আজ প্রকাশিত হলো ‘স্পিনোজার প্রভাব’ অংশটি ]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

12 + = 21