এ সরকারের আয়ু কি শেষ হয়ে আসছে?


এই ছাত্রদের আন্দোলন শান্ত করা হয়ত খুব সহজসাধ্য ছিল। এক মাফিয়া মন্ত্রীকে পদত্যাগের নির্দেশ দিলে সেই মাফিয়ার আর যাই হোক, হাসিনার বিরুদ্ধে কাজ করবার শক্তি থাকবার কথা না। পরিবহণ শ্রমিকরা গন্ডগোল করলে তা ঠান্ডা করবার মত কৌশল আর শক্তি দুটাই প্রশাসনের ছিল ও আছে। কিন্তু জানি না কেন, প্রধানমন্ত্রী একদম অস্ট্রিচ পাখির মত চোখমুখমাথা বুজে এই মাফিয়াদের মন্ত্রী এমপি পদে বহাল তবিয়তে রাখছেন। উনার অজানা থাকবার কথা নয়, এই শাহজাহান খান, শামীম ওসমান কিংবা বদিরা কেমন লোক। এক পদ্মাসেতুর টাকা কেবল ব্যাংকিং সেক্টর থেকেই হাওয়া হয়ে গেছে। বছরের পর বছর প্রশ্ন ফাঁস হয়েও স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ে দুজন ব্যর্থ মন্ত্রীদের একজন রাবিশ, ননসেন্স, বাস্টার্ড বলে যাচ্ছেন, আরেকজন আউলা হাসি দিচ্ছেন। এত গুরুত্বপুর্ণ পদে কিংবা সরকারের এত খাতির পাওয়ার পিছনে তাদের যোগ্যতা কী?

ছাত্ররা আশ্বাসে ভরসা পায়নি, অনেককিছু ভেবে তাও তো ঠিকই মনে হচ্ছে। আশ্বাস দেবার পর মন্ত্রীরা নিজেই ধরা খেয়েছেন, পুলিশ ধরা খেয়েছে। আশ্বাস প্রদানের পর যারা বাস্তবায়ন করবে, তারাই তো বদলায়নি। বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তবে কতটুকু? উল্টো নতুন আইনে তাদের হাতে আরও টাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। আগে লাইসেন্সের জন্য হাজার টাকার মামলার জায়গায় এখন লাখ টাকা জরিমানা হবে। আগে ২০০-৫০০ তে ছুটে যেতো, এখন ১০-২০ হাজারে ছুটবার চান্স বেশি যাদের থাকবে না। আমার এইদেশের পুলিশ ফোর্সের উপর ভরসার চিন্তা করতেও ভয় লাগে। সামান্য ব্যতিক্রম মঙ্গলেও আছে, মাটির তলে ওখানে নাকি পানির সন্ধান মিলেছে। সামান্য কয়জন সৎ পুলিশ, এইদেশের পুলিশের বর্তমান ইমেজকে আকাশে তুলে দেয় না। এক ভালোমানুষ প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ পুরো আওয়ামী লীগ নয়।


খুব বেশিদিন আগে না, গতবছরের এই সময়ে হবে হয়ত। আমার এক ফ্রেন্ড কেন জানি চরম হতাশার সুরে বলল, “দেশটা একদম পইচা গেছে। বাপ মা দেশে থাকে, এছাড়া দেশে থাকার কোনো কারণ নাই।” আমি তখনও এটাসেটা বলে প্রমাণ করতে চাইলাম, দেশটা দেশই আছে। হতাশ হবার কিছু নাই।

নতুন প্রজন্ম শ্লোগানে অশ্লীল শব্দ লেখে, তাদের নিয়ে হতাশ হয়ে হায় হায় করা শুরু করব? নাহ, এরা স্কুলে যৌনশিক্ষা পাওয়া জেনারেশন। ইন্টারনেটে নানা সাইট ব্রাউজ করতে গেলে হুট করে চলে আসা নগ্ন মেয়েছেলের সঙ্গমরত অবস্থার পপ-আপ দেখা জেনারেশন। আমাদের ছোটবেলায় টিভিতে মিনিস্কার্ট পরা নায়িকাদের নাচের সময় বাপ মা সামনে আসলে চ্যানেল দ্রুত চেঞ্জ করতাম। এখন পত্রিকায় পাতাতেও কি বিকিনির ছবি আসে না? মুভি তো মুভি, নরমাল সিরিয়ালে ঢালাও কিসটীস চলে, ফাকিউ ফাকিউ, ফাক, চুদির্ভাই টাইপ ডায়লগ চলে, লিটোনের ফ্লাটের ব্র্যান্ডিং চলে, আর মুখে আনলেই দোষ? যা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়ে ওদের চোখের সামনে থেকে সরানোর চিন্তাও আসছে না, মুখে আসলেই জাত গেল রব কেন উঠবে?

ছোটবেলায় গোপনে আন্টিদের এক আড্ডায় আরেক আন্টির আলাপ শুনে ফেলি। মনে আছে উনি বলছিলেন, “এমন ভাব করে, মনে হয় জামাইয়ের সামনেও কাপড় খুলে না।” তখন বুঝি নাই এই ডায়লগের মাহাত্ম্য কী, আর জামাইয়ের সামনে কাপড় খুলত হবে কেন। যাইহোক, এখন যখন বুঝি আসল মানে কী, এটাও মনে হয় যে অনেকের অবস্থা এখন সেরকম। পরিবর্তন মেনে নেয়াও উদার মনের পরিচায়ক।

প্রতি প্রজন্মের কাছে তাদের পরের প্রজন্ম বেয়াদব। আমার বাপ চাচাদের কাছে আমরা যেমন ছিলাম, আমার দাদা নানাদের কাছে আমার মামা চাচারা হয়ত তেমনই ছিলেন, বেয়াদব বখে যাওয়া প্রজন্ম। কিন্তু প্রতিটা প্রজন্ম তাদের মত করেই পারফেক্ট। আমি এখনো নতুন প্রজন্ম নিয়ে হতাশ না। তবে আমরা যারা একটু বড় এবং যারা বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে, এই রেঞ্জের মানুষগুলোর কোথাও বড় রকমের সমস্যা রয়ে গেছে। সেসব অনেক কথা।

এই পিচ্চিবাচ্চাদের্র আন্দোলন সফল হোক বা না হোক, অসুস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি একটা আঘাত করে গেছে ইতিমধ্যে। যা পাকিস্তান আমলের নানা আন্দোলন অথবা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ের থেকে কম না। এই আন্দোলনের সবচে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যারা সবচে ছোট, যাদের এখন বড়দের থেকে শেখার সময়, তাদের আদর্শ মেনে সামনে চলবার কথা, সেই বড়দের তারা একটা গাইডলাইন দিয়ে গেছে কিভাবে সব চলা উচিত।

দেশ এখন এমন একটা অবস্থায়, যেখানে মানুষের কাছে যোগ্য বিকল্প নাই। বিএনপি জামাত নিয়ে মানুষ এখন সেভাবে ভাবে না। আওয়ামী লীগের একটা সমর্থক শ্রেণি আছে, যারা বাচলেও আওয়ামী, মরলেও আওয়ামী। অন্তত এই আন্দোলনটা সেই স্থির ও অটুট সমর্থকগোষ্ঠিকেও দুর্বল করবে।

আমরা যখন এই বাচ্চাদের বয়সী ছিলাম, তখন আমরা শিবিরকে ভয় পেতাম। রগ কাঁটা নামের একটা ভয়াবহ কাজ তারা করত। তাদের বলয়ে একবার কেউ ঢুকে গেলে সেখান থেকে বের হওয়া সহজ ছিল না। আর্থিকভাবে তারা ছিল ব্যাপক শক্তিশালী। ৭১ সালে যেমন দেশের প্রায় ১০% মানুষ এদের সমর্থক ছিল, এখনও তেমনই আছে। বিএনপি আওয়ামী লীগের জনসমর্থন বাড়ে কমে, কিন্তু এদের কমিউনিটি আগে যা ছিল, এখনো তেমন আছে। আওয়ামী আমলে এদের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে গেছে, সরাসরি অনেককিছু করবার ক্ষমতা কমে গেছে, এটাই একমাত্র ভালো দিক। বিএনপি নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষকের দল হিসেবে দাবী করে। জেঃ জিয়া পরে যাই করে থাকুক না কেন, মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। জামাতের সাথে রাজনৈতিক জোট করতে তাদের চক্ষুলজ্জাও তো কাজ করা উচিত ছিল। কেবলমাত্র জামাতের সাথে সম্পর্কের কারণে তাদের অন্তত সিকি শতাব্দি বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে কারো বিবেচনার বাইরে রাখা উচিত।

বিএনপি জামাতের কথাও বাদ। এই আন্দোলনের পর মনে হচ্ছে নতুন প্রজন্মের কাছে আওয়ামী লীগের অতীত যাই হোক না কেন, ছাত্রলীগ শিবিরের মত ভীতিকর বলে বিবেচিত হবে। আওয়ামী লীগ একটা প্রজন্মকে নিজহাতে এন্টি আওয়ামী প্রজন্ম বানানোর জন্য প্রায় সবকিছুই করে ফেলেছে এক ছাত্রলীগের মাধ্যমে। অথচ তাদের নানা সন্ত্রাসী কার্যক্রম, মারপিট, চাদাবাজি এসব নিয়ন্ত্রণ করলে ময়দান আরও ভালো থাকতো। যাদের হাতে ক্ষমতা থাকে, তাদের হতে হয় বিনয়ী। এই ছাত্র আন্দোলন কেবলমাত্র শিশুদের আন্দোলন বলেই ব্যাপক জনসমর্থন পাচ্ছে, আমার কাছে তেমনও মনে হচ্ছে না। এই জনসমর্থনের কারণ সরকারের স্বৈরাচারী আচরণ, গোয়ার্তুমি আর নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে একটা চেপে থাকা ক্ষোভের প্রকাশ।

তবুও এই ছাত্রদের আন্দোলন শান্ত করা হয়ত খুব সহজসাধ্য ছিল। এক মাফিয়া মন্ত্রীকে পদত্যাগের নির্দেশ দিলে সেই মাফিয়ার আর যাই হোক, হাসিনার বিরুদ্ধে কাজ করবার শক্তি থাকবার কথা না। পরিবহণ শ্রমিকরা গন্ডগোল করলে তা ঠান্ডা করবার মত কৌশল আর শক্তি দুটাই প্রশাসনের ছিল ও আছে। কিন্তু জানি না কেন, প্রধানমন্ত্রী একদম অস্ট্রিচ পাখির মত চোখমুখমাথা বুজে এই মাফিয়াদের মন্ত্রী এমপি পদে বহাল তবিয়তে রাখছেন। উনার অজানা থাকবার কথা নয়, এই শাহজাহান খান, শামীম ওসমান কিংবা বদিরা কেমন লোক। এক পদ্মাসেতুর টাকা কেবল ব্যাংকিং সেক্টর থেকেই হাওয়া হয়ে গেছে। বছরের পর বছর প্রশ্ন ফাঁস হয়েও স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ে দুজন ব্যর্থ মন্ত্রীদের একজন রাবিশ, ননসেন্স, বাস্টার্ড বলে যাচ্ছেন, আরেকজন আউলা হাসি দিচ্ছেন। এত গুরুত্বপুর্ণ পদে কিংবা সরকারের এত খাতির পাওয়ার পিছনে তাদের যোগ্যতা কী?

ছাত্ররা আশ্বাসে ভরসা পায়নি, অনেককিছু ভেবে তাও তো ঠিকই মনে হচ্ছে। আশ্বাস দেবার পর মন্ত্রীরা নিজেই ধরা খেয়েছেন, পুলিশ ধরা খেয়েছে। আশ্বাস প্রদানের পর যারা বাস্তবায়ন করবে, তারাই তো বদলায়নি। বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তবে কতটুকু? উল্টো নতুন আইনে তাদের হাতে আরও টাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। আগে লাইসেন্সের জন্য হাজার টাকার মামলার জায়গায় এখন লাখ টাকা জরিমানা হবে। আগে ২০০-৫০০ তে ছুটে যেতো, এখন ১০-২০ হাজারে ছুটবার চান্স বেশি যাদের থাকবে না। আমার এইদেশের পুলিশ ফোর্সের উপর ভরসার চিন্তা করতেও ভয় লাগে। সামান্য ব্যতিক্রম মঙ্গলেও আছে, মাটির তলে ওখানে নাকি পানির সন্ধান মিলেছে। সামান্য কয়জন সৎ পুলিশ, এইদেশের পুলিশের বর্তমান ইমেজকে আকাশে তুলে দেয় না। এক ভালোমানুষ প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ পুরো আওয়ামী লীগ নয়।

আজকের নিউজফিড দেখে অবস্থার তেমন উন্নতি হয়েছে বলে মনে হয় না। এভাবে দেশ চলতে পারে না। বাচ্চাদের কাজ ট্রাফিক কন্ট্রোল নয়। কিন্তু ইতিমধ্যে সেটা তারা দেখিয়ে গেছে। এ সময় সবচেয়ে ভালো সমাধান কিছু বদ মন্ত্রী ও নেতাকে সরানো। শাহজাহান খানকে সরানো শাসক দলের জন্য খুবই ভালো পদক্ষেপ হবে বলে মনে হচ্ছে। যদিও আজকের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এই আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে চলে যাচ্ছে। একের পর এক ভুলের মাসুল সরকারকে অবশ্যই দিতে হবে। ছাত্রলীগকে অন্তত বছরখানেক হাইবারনেশনে পাঠানো গেলে দলের ভাবমূর্তির জন্য সেটা ভাল হতো। আর রাতারাতি ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কেবল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য রাস্তায় কয়েকটা ব্রিগেড রোটেশনের ভিত্তিতে ডেপ্লয় করা যেতে পারতো, সাথে কয়েক কোম্পানী সেনা বিআরটিএ-এর কার্যক্রম তদারকির জন্যও। সামান্য আশা করতে পারতাম, লাইসেন্সবিহীন চালকের সংখ্যা প্রায় নাই হবে আর ফিটনেসবিহীন গাড়ি ৬ মাসের মধ্যে সেভাবে আর দেখা যাবে না। সেনা ইউনিট বেশি সময় জনতার মাঝে রাখা উচিত না। তাদের স্বাভাবিক শৃংখলা ভেঙে যায়, দুর্নীতি, অনিয়মের মূলধারার সাথে পরিচিত হতে শুরু করে।

আজকে বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা নিউজে বাংলাদেশ চলে এসেছে দেখলাম, এই নিউজে আশাটা গর্বের কিছু নেই। জাতির জন্যও নেই, সরকারী দলের জন্যও নেই। সেখানে লেখা হচ্ছে, বলা হচ্ছে, “বাংলাদেশের ট্রাফিক ব্যবস্থা, অরাজক, লাগামছাড়া”, “স্কুল ছাত্রছাত্রীদের উপর হামলা করেছে শাসক দলীর ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা।”

এতকিছু লিখলাম, তবু মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল শোধরাবার সব সুযোগ হয়ত শেষ হয়ে আসছে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়, কিংবা কেয়ারটেকার গভঃ এর সময়ের আন্দোলনের যুগে একটা সময় এই বিভ্রমে সে সরকারগুলো ছিল যে, সবকিছুতে তাদের ফার্ম কন্ট্রোল আছে। সে বিভ্রম দ্রুত মিলিয়ে যায়। এই সরকারের আয়ু সম্ভবত ফুরিয়ে আসছে…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

96 − 88 =