এক ডাক্তার ও তার সংসার !

?_nc_cat=0&oh=8ecd4d580a5b6ae648ee57024fc0840e&oe=5C11367F” width=”500″ />
দক্ষিণ ভারতের এক ডাক্তার যে তার করিৎকর্মা স্ত্রীকে খুবই সম্মান করে একজন “নারী” হিসেবে। পৃথিবীর সব স্বামীরা যদি এমনটা সম্মান করতো তাদের স্ত্রীদের! তাহলে হয়তো এতো খুনোখুনি, ঝগড়াবিবাদ মামলা মোকদ্দমা বিবাহ বিচ্ছেদ হতোনা এ সমাজে। এক নজরে চোখ বুলাই ঐ নাম না জানা ডাক্তারের লেখাতে!
:
ঘুম থেকে উঠে তরতাজা হয়ে রান্নাঘরের বাইরে বসেছি। আজকের কাগজটা এখনো আসেনি। পুরনোটাই আবার দেখছি। রোজকার অভ্যেস। চোখের কোন দিয়ে দেখি তিনি রান্নাঘরে টুকিটাকি কাজকর্ম্ম করছেন। কয়েকটা চেনা আওয়াজে বুঝলাম চা প্রায় তৈরী।
:
চা খেতে খেতে ভাবছিলাম কি অসামান্য দক্ষতায় গিন্নিরা সংসারটাকে সামলে রাখছেন। রান্নাঘর থেকেই শুরু করি।
:
তাকের মধ্যে সারি সারি শিশি-বোতল এবং কৌটো। সব বিভিন্ন আয়তন এবং আকৃতির। দেখলে মনে হবে আয়ুর্বেদ ডাক্তারের চেম্বার। তাদের গায়ে হরেক রকমের লেবেল- হরলিকস, ওটস, নেসকাফে, ভিনিগার, পতঞ্জলী এই সব। হরলিকসের কৌটোয় আছে চা-পাতা, নেসকাফেতে আছে গোলমরিচের গুঁড়ো, বিস্কুট আছে গ্ল্যাক্সোর টিনে। লেবেলের সঙ্গে ভিতরে রাখা বস্তুর কোনো মিল নেই। আমি কয়েকবার চা করতে গিয়ে খুব ঝামেলায় পড়েছি – চিনি খুঁজে পাইনি। যাও বা চা বানাতে পারলাম, বিস্কুট ভেবে যে কৌটোটা খুললাম সেটাতে দেখি তেজপাতা। গিন্নী যখন রান্না করে তখন ভাবি কি করে সব মনে রাখে! অসামান্য দক্ষতায় এক হাতে ডালের ঘনত্ব মাপতে মাপতে অন্য হাতে উপরের তাক থেকে সম্বর মশলার কৌটোটা পেড়ে ফেলে, না তাকিয়েই। অসাধারণ ইনভেন্ট্রি ম্যানেজমেন্ট!!
:
তার সঙ্গে তাকের পিছন দিকে ডাঁই করে রাখা গুচ্ছ গুচ্ছ প্লাস্টিকের কৌটো – যে গুলো বিভিন্ন সময়ে খাবারের দোকান বা মিষ্টির দোকান থেকে এসেছে। একটাও নাকি ফেলা যাবেনা। কেন ফেলা যাবেনা সে প্রশ্নও করলে উত্তর পাই, “জাষ্ট ইন কেস”। কৌটোগুলো একটার মধ্যে একটা ঢোকানো, জায়গা বাঁচানোর জন্য। ঢাকনাগুলো পাশে দাঁড় করানো। ফলে একটা কৌটোয় কিছু রাখতে হলে তার সঠিক ঢাকনা খুঁজে বের করা একটা বিশাল সমস্যা।
:
আমাকে বলল ফ্রীজের থেকে কিছু একটা বের করে দেবার জন্য। ফ্রীজ খুলে আমি হতভম্ব। প্রথমে সারি সারি বাটি, একটা উপরে একটা, তার উপরে আর একটা কোনরকমে ব্যালান্স করে রাখা আছে – প্রত্যেক তাকেই। তাদের পিছনে রাখা আছে বিভিন্ন ধরনের বস্তু – কোনোটা একদিনের পুরোনো, কোনোটা আবার তিন মাসের। কিচ্ছু ফেলা যাবে না- সব নাকি কাজের। আমাকে যেটা বের করে দিতে বলেছিল সেটা আমি খুঁজে পাইনি বা পেলেও বের করতে পারতাম না।
:
“তোমাদের দ্বারা কিস্যু হবে না। দেখি সর” বলে এক হাতে দুটো বাটি বের করে অন্য হাত দিয়ে টুক করে জিনিষটা বের করে আনল। অসাধারন দক্ষতা!
:
যেহেতু আমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না তাই সোফায় গিয়ে বসলাম। গিন্নি রান্নাঘর থেকে একটা বারান্দায় গিয়ে একটা কাপড়ের ঝাড়ন নিয়ে শো-কেস, পিয়ানো, জানালার গ্রিলগুলো ঝাড়তে লাগল।
:
“কাজের লোক তো করবেই, তুমি আর কষ্ট করছ কেন?”, জিজ্ঞেস করলাম।

“যা ফাঁকি মারে, ধুলো পড়েই থাকে”। উত্তর পাওয়া গেল।

“তো বল ভাল করে পরিষ্কার করতে”।

“বাবাঃ, বললেই তো উনার মুখ ভার। দুদিন কামাই করে দেবে”। অকাট্য যুক্তি।
:
ইতোমধ্যে দুধওয়ালা এসে মাসিক হিসেব পেশ করল। আমি হিসেব মিটিয়ে দেওয়ার জন্য টাকা আনতে গেছি। ফিরে এসে দেখি গিন্নি দুধের হিসেবের মধ্যে এমাসের তিনটে দিন যে দুধ নেওয়া হয়নি সেটা দুধওয়ালাকে বলে হিসেব পালটে দিতে বলছে। এরই মধ্যে দুধ এবং জলের অনুপাত যে ঠিক থাকছে না সেটাও বলা হয়ে গেছে। আমি মনে মনে ভাবলাম, বাপরে ল্যাক্টোমিটার ছাড়া, শুধু চোখ দিয়ে দেখেই দুধের ঘনত্ব মেপে দিল!! হয়তো সত্যি, নাহলে ব্যাটা দুধওয়ালা দেঁতো হাসবে কেন? এইজন্যই গিন্নিরা পারফেক্ট কেমিষ্ট-ও বটে।
:
“ভাগ্যিস আমি ছিলাম, না হলে তো তুমি হিসেব না মিলিয়েই যা ও লিখেছে তাই দিয়ে দিতে”, দুধওয়ালা চলে যাবার পর বলল গিন্নি।
সত্যিই কি তাই? কে জানে?
:
কাজের মাসী ঢুকে পড়েছে বাড়িতে। এবারে শুরু হবে মহাসংগ্রাম। যার পরিণতি, একপক্ষের ঘোষনা, “বৌদি, আমি আর তোমার বাড়িতে কাজ করতে পারবো না। তুমি লোক দেখে নাও”।
:
পরেরদিন সকালে দরজা খুললে দেখি সেই একই কাজের মাসী। কি দারুণ পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট। কোনো বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্কুলেও এই পারদর্শিতা শেখানো সম্ভব নয়।
:
ইতিমধ্যে মালিও এসে পড়েছে। গিন্নি এবার কৃষিবিদ্যার পারদর্শিতা দেখিয়ে কোন টবটা ছাদে রৌদ্রে যাবে আর কোন গাছে কোন সার দিতে হবে তা নিয়ে মালিকে একপ্রস্থ নির্দেশ দিতে লেগে গেল।
:
পনেরো কুড়ি মিনিট পড়েই আমার ডাক পড়ল, রান্নাঘরে।

“লাস্ট কবে একোয়াগার্ডের ফিল্টার পাল্টানো হয়েছে?”

“কবে আর, চার-পাঁচ মাস আগেই”।

“হতেই পারে না। জলে প্রচুর আয়রন আছে। দেখ তো লাস্ট বিলটা”। আমি জলটা একটু টেষ্ট করলাম। আমি কোনো তফাৎ বুঝতে পারলাম না।
:
বিলটা খুঁজে বের করে দেখি ছ-মাস হয়ে গেছে। অর্থাৎ, ফিল্টার পাল্টানোর সময় পেরিয়ে গেছে।
:
সংসারের দৈনন্দিন কাজে আমার ভুমিকা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে চলেছে। এছাড়া, ছেলে দুটোর পছন্দ অপছন্দ মেনে তাদেরকে সমাজের উপযোগী করে তোলা, তাদের পড়াশুনায় সাহায্য করা (আমি পড়ালে ওরা ফেল করত, নিঘ্যাত), এসব তো আছেই।
:
সবশেষে, গিন্নির অর্থনৈতিক পারদর্শিতার কথা না বললে এই লেখা সম্পুর্ণ হবে না। মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে সংসারের সমস্ত খরচ পরিকল্পিত বাজেটের বাইরে না যেতে দেওয়ার যে আন্তরিক প্রচেষ্টা করে তাতে প্রত্যেক মাসেই রাজকোষের ঘাটতি এড়ানো যায়।
:
বিষ্ময়কর, তাইনা? এত যোগ্যতা নিয়ে, প্রতিদিন সকাল ছ’টা থেকে এগারোটা ডিউটি করে, ২৪ x ৭ অন-কল-এ থাকা সত্বেও ভারতীয় গিন্নিদের মুখের হাসিটি সবসময়েই অমলিন। আমরা শুধু হাউস ওয়াইফ থেকে নতুন নাম “হোমমেকার” করে দিয়েছি। উনারা তাতেও খুশি।
:
আমার রসায়নবিদ্যা, কৃষিবিদ্যা, খাদ্যবিদ্যা, পাণীয়বিদ্যা ইত্যাদি এবং আরও অনেক বিদ্যায় ঘাটতি আছে! যেটা পুরণ করার জন্য গিন্নির প্রতি বিশ্বাসী থাকাটা অবশ্যকর্তব্য – জীবনধারণের জন্যও! এবং এমনটাই হওয়া উচিত স্বামী স্ত্রীর সম্মানবোধ নিয়ে বেঁচে থাকাতে!

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of