প্রসংগঃ বাংলাদেশে রাজনৈতিক মতবিরোধ, মুক্তচিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সঠিক ইতিহাস


দেশে এখন যেমন নির্বাচিত সরকার, যদিও ক্ষমতাশীল দলের অর্ধেকের বেশি সাংসদ বিনাভোটে নির্বাচিত, কিন্তু নির্বাচিতই তো। আর সেখানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হচ্ছেন দেশের বাকীসব দলের স্বীকৃত স্বৈরাচার, জেঃ হুমু এরশাদ। জেঃ জিয়া ফারুক রশীদের রক্তগংগার সুফল নিয়ে ক্ষমতায় আসেন, আবার ফারুক রশীদ জিয়ার বিরুদ্ধেও ক্যু করলে তাদের দেশে ঢুকবার পথ জিয়াই বন্ধ করে দেন। আবার এই এরশাদ জিয়া হত্যার পর ফারুক রশীদকে দেশে নিয়ে আসেন, এবং এরশাদের মদদে গড়ে ওঠে ফ্রিডম পার্টি। এই ফ্রিডম পার্টি থেকে নির্বাচন করে তারা সংসদেও বসে যান। প্রধানমন্ত্রী যে কেন এসব ইতিহাসও ভুলে যান কে জানে! অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর এখন প্রকৃত শোক অনুভব করেন, এমনটা নিশ্চিতভাবে ধরে নেয়া যায়, তেমন একমাত্র ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী নিজে। বাকিদের কাছে বঙ্গবন্ধু, ১৫-ই আগস্ট, মুক্তিযুদ্ধ, এসব কেবলমাত্র ব্যবসা। নিজেদের অবস্থান সুসংহত করবার উপাদান।


মানুষ কখনো পুরোপুরি মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারে না। মুক্তচিন্তার মানুষ বলে কিছু হয়ত আদৌ হয় না। তাদের চিন্তা অনেক অনেককিছু দিয়ে প্রভাবিত হয়। যে পড়ালেখা করলো না, তার চিন্তাভাবনা অপর মানুষ, সমাজের নানাকিছু, আশেপাশের পরিবেশ এবং নিজের বুদ্ধি যতটুকু, তার সাপেক্ষে চালিত হয়। ক্লাভ ফাইভ পাস একজন তার স্বল্পজ্ঞানে যে সিদ্ধান্ত নেবে, পিএইচডিধারী একজনের চিন্তার সাথে তার আকাশপাতাল তফাত থাকতে পারে। এমনকি সমাজবিজ্ঞানে পিএচডিধারী একজনের সাথে বিজ্ঞানের কোনো শাখায় পিএইচডিধারীর চিন্তাভাবনার প্রভাব থাকবে। প্রভাব থাকবে তার পরিবারের, ধর্মের, শিক্ষা ব্যবস্থা, আবহাওয়া সহ নানাকিছুর। মুক্তমনা বা মুক্তচিন্তক যদি কাউকে বলতেই হয়, তাহলে সে হয়ত এমন কেউ, যে তার মধ্যে আগে থেকে গেঁথে থাকা ধারণাগুলোর মায়া ত্যাগ করতে জানেন। অথবা নানা প্রভাবকের মধ্যে থেকেও নিজের স্বাভাবিক যুক্তিবুদ্ধি তাকে নিজের সাথে প্রতারণা করতে দেয় না। সে নিজের লজিকে যা বলে সত্যই বলে। সত্য কখনো ৯৯% কিংবা ১% এভাবে হয় না। সত্য হয় সম্পূর্ণ সত্য, নাহলে তা সত্য নয়। কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্যের ক্ষেত্রে সত্য আর মিথ্যা হয় মিউচ্যুয়ালি এক্সক্লুসিভ।

আমাদের দেশের মানুষই কেবল না, বিশ্বের নানা অংশের মানুষ স্বভাবগতভাবে নিজে আগে থেকে যা বিশ্বাস করে, সেটাকেই আগে ডিফেন্ড করবার ব্রত নেয়। তাদের যুক্তির ভিত্তি শক্ত না হলেও তাদের বিশ্বাসের ভিত্তি টলানো হয় কঠিনতম কাজ। মানসিকতার এই অযৌক্তিক অটল অবস্থান নানামতের মেরুকরণ আরও চরমে নিয়ে যায়। তখন সামান্যতম বিষয় নিয়েও শুরু হয় রেষারেষি। ঐসবকে ধরে নেয়া হয় এ আমাদের লোক, আর সে তাদের লোক, এসব নির্ণয়ের উপাদান। আমরা যেমন সামান্য শ্লোগান, নিজেদের নাম কী রাখা হচ্ছে, কোনদেশী পোষাক কিনছি, শিক্ষা নিচ্ছি কোন মাধ্যমে, কোন জেলার বাসিন্দা, এসব মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।

যেমন, জয় বাংলা মানে আওয়ামীলীগ, আর বাংলাদেশ জিন্দাবাদ মানে বিএনপি জামাত ইসলামপন্থীদের শ্লোগান। এসব হাস্যকর ব্যাপার। আজকে, এই সময়ে যারা এসব নিয়েও মাতামাতি করে তাদের মানসিকতা, নিজেদের সম্পর্কে, ইতিহাসের নানা ব্যাপার সম্পর্কে জ্ঞান সামান্য। ভাষা, ভূখন্ড, রাষ্ট্র এসব নিজে থেকে অপরাধ করতে পারে না। অপরাধ করে মানুষ। আজকেও যেমন স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধুর প্রথম ভাষণ দেখছিলাম। অসাধারণ এক লজিকাল ভাষণ। উনার মঞ্চের পেছনেই বড় করে লেখা ছিল, জিন্দাবাদ। উনি নিজেও মোবারকবাদ, জিন্দাবাদ এসব বলেছেন। জনতার শ্লোগানে জয় বাংলা আসবার আগে জিন্দাবাদ আগে এসেছিল। এর আগেও বিবিসি আর এপি আর্কাইভের ভিডিওতে দেখি, ১৬-ই ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ শ্লোগান। নিজে যতটা বুঝলাম, তাতে মনে হলো যে স্বাধীনতার পরেও অন্তত শ্লোগান নিয়ে মেরুকরণ ছিল না। তাহলে শুরুটা কোথা থেকে?

আমার ধারণা, ১৫-ই আগস্টের দিন থেকে। ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরংকুশ বিজয় হয়। তবে যতটুকু মনে আছে, মোট ভোটের ২৫-৩০% পায় ইসলামপন্থী কিংবা পশ্চিম পাকিস্তানীপ্রেমী দলগুলো। মানে, সাড়ে সাতকোটি বাঙালির হিসেবে অন্তত দেড় দুই কোটি মানুষ বাঙালি হয়েও বাঙালির স্বাধীকার সংগ্রামকে সমর্থন দেয়নি। আসলে পাকিস্তান তো বানিয়েছিলই অবিভক্ত বাংলার মুসলমানেরা। পুরো ভারতে যতগুলো প্রভিন্স ছিল, তারমধ্যে একমাত্র বেঙ্গল প্রভিন্সেই ক্ষমতায় ছিল মুসলিম লীগ। মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি। যাকে ক্ষমতা থেকে সরায় মীর জাফর আলী খানের বংশধর ইস্কান্দার মির্জা। আমার ৭০-এর ইলেকশনের সময় ভুট্টো সাহেবের পাকিস্তান পিপলস পার্টির সেক্রেটারী ও ভূট্টো সাহেবের প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন একজন বাঙালি, নাম জালালুদ্দিন আবদুর রহিম। শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনার তীব্র বিরোধিতাকারীদের মধ্যে উনিও ছিলেন। ৭২ সালে উনাকে মন্ত্রী বানিয়ে যার পুরস্কার জনাব ভুট্টো উনাকে দেন, আবার জেলেও ভরেন, আবার মুক্তও করেন। চিরকালই আজব ছিল এবং এখনো রয়ে গেছে পাকিস্তানের রাজনীতি। গণতন্ত্রের নামে এখনো সেখানে চলে সামন্তবাদ।

তা যাইহোক, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ায় খুশী হয়নি কিংবা ডানপন্থী ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ছিল, তারা আবার কথা বলবার লাইসেন্স পায়। ৭৫ সাল পর্যন্ত তারা ছিল কিছুটা বেকায়দাতেই। ঐ সময় দেশ ও আওয়ামী লীগের সবচেয়ে ক্ষতি করে জাসদ। জাতির যখন একতার প্রয়োজন ছিল, জাসদ ও গণবাহিনী সহ আরও কিছু দলমিলে দেশকে করে তোলে আরও অরাজক। তবে ৭৫ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ জাসদকে নির্মূল করতে সক্ষম না হলেও পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান সেটা অনেকটা করে দিয়ে যান। জাসদ এখনো অনেকটা নামসর্বস্ব ভন্ডদের দল। সাথে দেশের রাজনীতিতে ধর্ম ঢুকে পরে, যেভাবে পাকিস্তানে রাজনীতি চলে ধর্মের নামে। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু যেভাবে ৬৯ সালের পর থেকে আলাদা ট্রেডমার্ক হয়ে যায়, তারা হয়ত সেটাকেও মুছে দিতে চাইছিল। ‘জয়’ যে আবার শুনতে কিছুটা হিন্দুয়ানি শব্দ। মানুষের মুখের ভাষার শব্দগুলোতেও আমরা ধর্মীয় এলিমেন্ট, জাতিগত এলিমেন্ট খুঁজে পাই। যদিও এসব ধ্বনি, অক্ষরের কোনো জাতধর্ম থাকবার কথা নয়। আওয়ামী লীগের আওয়াম শব্দটা যেমন উর্দু, এটাকেও দলটার ঐতিহ্যের কথা মাথায় রেখে বাঙালিকরণের চিন্তা যেমন অযৌক্তিক হবে।

আমার সবচেয়ে ক্লোজ বন্ধুদের একজন গোপালগঞ্জের। মানে ধরে নিতে হবে সে গুষ্টিসহ আওয়ামী, আসলেও তাই। তবে একদিন কথা কথায় বলছিল, ৭১ এ ওর বাবার আপন চাচা নাকি চাচাতো ভাইয়ের কে যেন রাজাকার ছিল। স্বাধীনতার পর তাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। প্রতিশোধমূলক হত্যা কোনো মানবিক সমাধান নয়। ৭১-এ বিজয়ের পর প্রতিশোধমূলক ঘটনা ঘটেছেও। নৃশংসতার বদলা সেভাবে নৃশংসতা দিয়ে নেয় অনেক জাতির বিজয়ীরা, আমাদের এই ভূখন্ডে সেরকম মাত্রায় হয়নি। তবে চিহ্নিত দেশবিরোধীদের বিরুদ্ধে ক্লিনজিং কিছুটামাত্রায় হলেও দরকার ছিল, অন্তত আইনী প্রসেস অনুসরণ করেই কঠোরতম শাস্তি দেয়া উচিত ছিল অনেক বড় বড় নামেদের যারা দেশের ভিতর ছিল। ৭১ সালে রাজাকার, আলবদর জামাত নেতাদের হিসেব করলে দেখা যায় যে, তাদের মধ্যে বড় বড় নামের কেউ মুক্তিযুদ্ধের পরপর হত্যার শিকার হয়নি, মাফও পেয়ে গিয়েছিল এবং পরে দেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিতও হয়ে যায়। মন্ত্রী, আমলা তো হয়েছেনই, প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীও হয়েছেন। যুদ্ধকালীন সময়ে কোনো পক্ষকে সমর্থন করা সরাসরি অপরাধ বলা যায় না। অপরাধ সেই ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত হলে সেটাই অপরাধ। তবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি টাটকা থাকা অবস্থাতেই যারা বাংলাদেশের জন্মকে সমর্থন করেনি, তাদেরকেই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মাথার দিকে বসানো হয়, তবে তা লজ্জাজনক। কোনো দলই এই লজ্জাজনক কাজের বাইরে নয়। বিএনপি নয়, জাতীয়পার্টির গুরু এরশাদ নন, কিংবা আওয়ামী লীগও একদম নিষ্কলুষ নয়।

দেশে এখন যেমন নির্বাচিত সরকার, যদিও ক্ষমতাশীল দলের অর্ধেকের বেশি সাংসদ বিনাভোটে নির্বাচিত, কিন্তু নির্বাচিতই তো। আর সেখানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হচ্ছেন দেশের বাকীসব দলের স্বীকৃত স্বৈরাচার, জেঃ হুমু এরশাদ। জেঃ জিয়া ফারুক রশীদের রক্তগংগার সুফল নিয়ে ক্ষমতায় আসেন, আবার ফারুক রশীদ জিয়ার বিরুদ্ধেও ক্যু করলে তাদের দেশে ঢুকবার পথ জিয়াই বন্ধ করে দেন। আবার এই এরশাদ জিয়া হত্যার পর ফারুক রশীদকে দেশে নিয়ে আসেন, এবং এরশাদের মদদে গড়ে উঠে ফ্রিডম পার্টি। এই ফ্রিডম পার্টি থেকে নির্বাচন করে তারা সংসদেও বসে যান। প্রধানমন্ত্রী যে কেন এসব ইতিহাসও ভুলে যান কে জানে! অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর এখন প্রকৃত শোক অনুভব করেন, এমনটা নিশ্চিতভাবে ধরে নেয়া যায়, তেমন একমাত্র ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী নিজে। বাকিদের কাছে বঙ্গবন্ধু, ১৫-ই আগস্ট, মুক্তিযুদ্ধ, এসব কেবলমাত্র ব্যবসা। নিজেদের অবস্থান সুসংহত করবার উপাদান।

আজকে অনেকগুলো ভিডিও দেখলাম। যত দেখি বা জানতে চাই, তত বিভ্রান্ত হই। তবে এতদিনে এটা আন্দাজ করতে পারি, কে সত্য বলছেন। মেজর (অবঃ) কামরুল হাসান ভুঁইয়া সহ অনেকের ভিডিও বক্তব্য, নানা কাহিনী শুনেছি, অনেকের সাথে সামনা সামনি বসে কিংবা ফোনে কথা বলেছি। দিনভিত্তিকভাবে লিখেও রেখেছি। রাখতে রাখতে এখন হাজার পৃষ্ঠার পান্ডুলিপি হয়ে গেছে। কিন্তু গত ২-৩ বছর চেষ্টার পরেও স্ক্রিপ্ট ফাইনাল করতে পারছি না। নিজের খটকা লেগেছে, আবার একটা ঘটনাকে যেভাবে সত্যি বলে ভেবে নিয়েছিলাম, সেটাকে এখন মনে হচ্ছে সুনিপুণ মিথ্যা।

বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় যে সাফল্য, তা হচ্ছে উনার অনেক ভুলের পরেও উনার মত করে কেউ বাঙালি জাতিকে কখনো কোনো সময় একতাবদ্ধ করতে পারেননি। ফারুক রশীদদের সাফল্য হচ্ছে দেশে আবার ডানপন্থাকে প্রতিষ্ঠিত করে যাওয়া। তারা বেছে বেছে লোক বসায়। যেমন, এয়ার ভাইস মার্শাল এমজি তোয়াব, মুক্তিযুদ্ধের সময় যিনি বিদেশে অবস্থান করছিলেন। সুযোগ থাকবার পরেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। ৭৫ এর পর তাকে জার্মানী থেকে নিয়ে এসে বিমান বাহিনীর প্রধান বানিয়ে দেয়া হয়। আমি ভাবতাম, বিমান বাহিনীর অসংখ্য অফিসার আর বিমানসেনা হত্যায় হাত হয়ত জেঃ জিয়ার। কিন্তু এখন মনে হয় তাতে এই এমজি তোয়াবেরই হাত ছিল। কোনো ট্রায়াল ছাড়া উনি ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা বিমানবাহিনী অফিসারকে ফায়ারিং স্কোয়াডে নেয়ার নির্দেশ দেন।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অনেক প্রথমসারির নামও ৭৫ সাল থেকে এসে বিতর্কিত হয়ে গেছে। মেজর কামরুল হাসানের মতে যেমন, ৭১ সালে মেজর খালেদ মোশাররফ উনারচোখে ছিলেন দেবতুল্য। কিন্তু ৭৫ সালে উনার অবস্থান নিয়েও মেজর কামরুল হাসানের ভিন্নমত আছে। মেজর ফারুক রশীদ যে স্পেশাল বিমানে করে থাইল্যান্ড চলে যান, তার ব্যবস্থা করে দেন খালেদ মোশাররফ। প্রশ্ন জাগে, “কেন?”

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আসলে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা সম্ভব নয়। একজন যুবক, যার পরিবারের সবাইকে পাকিস্তানীরা মেরে ফেলেছিল, যেমনটা খালেদস ওয়ার নামক ডকুমেন্টারিতে দেখি, তার কাছে যুদ্ধের কারণ যেমন হবে, রাজনৈতিক সচেতনতা ও আদর্শ থেকে যুদ্ধে অংশ নেয়া আরেকজন মুক্তিযোদ্ধার চিন্তাভাবনা একরকম হবে না। আবার মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জানায় নৃশংসতার অনেক রূপ। আবার প্রকৃত মানবের আবেগ খুঁজে পাই, যখন কোনো লেখায়, মেজর কামরুল হাসানকে একজন পাকিস্তানী সেনাকে মরতে দেখে, তার সাথে কথোপকথনের পর বলতে শুনি, “হায়, শত্রু মারতে গিয়ে একজন মানুষ মেরে ফেললাম।” কিংবা সেই ১২-১৩ বছরের বালক, যে লুকিয়ে থেকে একাকী পাকিস্তানী সেনাদের হত্যা করত, কিন্তু এক পাকিস্তানী সহযোদ্ধার লাশ নিতে নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে কাঁধে তুলে পালাতে বারবার ফেরত আসা সৈনিককে হাতের সামনে পেয়েও গুলি না করে চলে যেতে দিয়েছিল। সেটাই তো মানবিকতা, ওই বয়সেই সে ছিল প্রকৃত মানুষ। যদিও সেই শিশুর চোখের সামনে তার দুলাভাইকে গুলি করে তার বোনকে ধর্ষণ করা হয়েছিল।

স্বাধীনতার ৫০ বছর হয়ে যেতে বেশি সময় বাকী নেই। কিন্তু আমাদের দেশের নানা দলমতের মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে বিবেকের সংকট, অসহিষ্ণুতা চরমে। এই অসহিষ্ণুতার কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময়কে সংগ্রাম বললে অনেককে রাজাকার পাকি ট্যাগ দিয়ে দেয়া হবে। আমার আম্মুও তো তাই বলে। আম্মুও বলে, সংগ্রামের সময় এটা হইছিল, ওটা হইছিল। আম্মুর পরিবারের মত রিফিউজির জীবন এই ট্যাগদাতাদের কেউ কাটায়নি। যার বাবাও মুক্তিযোদ্ধা, স্বামীও। কিন্তু অবাক হয়ে দেখি, এখন তারাও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশি গলাবাজি করে, যাদের মুক্তিযুদ্ধে কোনো অবদান নেই, কিংবা সে সময়টা কেমন ছিল তারা সেটা জানে না।

আপনি যদি সংবিধানে ধর্মের এলিমেন্ট ঢুকে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করে, তাহলে হয়ে যাবেন বামাতি, মালাউন, ইসলামবিদ্বেষী। কিংবা প্রশ্ন করেন, জিয়াউর রহমান কেন রাজাকারকে প্রাইম মিনিস্টার বানিয়েছিলেন কিংবা চরমোনাই পীরকে কেন স্বাধীনতা পদক দেয়া হয়েছিল, তাহলে হয়ে যাবেন চেতনাবাদী, মার্কামারা আওয়ামী। বাট ওয়েইট, নতুন প্রজন্ম এমন হবে না। কে কী করেছে, কেমন ছিল। কোন ব্যবস্থা কেমন, এসব তারা জানছে। নানাভাবে তাদের অনেকে বখে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের উজ্জ্বল দিকটাও দেখি, আশাবাদী হই। আপনাদের ম্যানিপুলেশন, জারিজুরি, জোরজবরদস্তির রেট যতটা বাড়বে, তাদের জেগে ওঠার তাগিদও সেভাবে বাড়বে। হিপোক্রিসির অর্থটা তারা পূর্বসূরীদের নানা কাজকর্ম থেকে ইতিমধ্যে জেনে গেছে। যাদের কাছে দল ব্যবসা, দেশ ব্যবসা, মানবিক সম্পর্কগুলোও স্বার্থের খাতিরে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “প্রসংগঃ বাংলাদেশে রাজনৈতিক মতবিরোধ, মুক্তচিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সঠিক ইতিহাস

    1. ওকে, দেখতেছি। একটানে সেভাবে
      ওকে, দেখতেছি। একটানে সেভাবে কিছু না ভেবে লিখি তো, সমস্যা থাকেই। টাইপের সময় তাড়াহুড়ায় সেভাবে বানান দেখি না।

নুর নবী দুলাল শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 7 =