স্মৃতিতে ভারত ভ্রমণঃ শিখ ড্রাইভার ও দুজন কাশ্মীরী


ভারতীয় কাশ্মীরের মানুষজন সম্ভবত পাকিস্তানকেও সেভাবে পছন্দ করে না। তবে তাদের সাধারণ মানুষ বাংলাদেশকে ভীষণ পছন্দ করে। নানা সময়ে সেটার প্রমাণ পাই। দেখতে সুন্দর, অমায়িক এ মানুষগুলো বাংলাদেশী শুনলে আলাদা খাতির করে। কারণটা ঠিক জানি না। আগ্রাতে এক কাশ্মীরী ছেলের সাথে পরিচয় হয়, বাংলাদেশী শুনবার পর তার আচরণ একদম পালটে যায়। সে আমাকে টুরিস্ট মৌসুমে কাশ্মীর বেড়াতে যাবার দাওয়াত দেয়। ঠিকানা, ফোন নাম্বার দিএ জানায় যে তখন তারা কাশ্মীর ফিরে যায়। আমি যেন অবশ্যই যাই আর অন্য কোথাও না গিয়ে তাদের বাড়িতে উঠি। সে আমাকে দেখাবে কাশ্মীর কেমন।


২০১১ এর শেষের দিকে হবে, তখন ইন্ডিয়াতে ছিলাম। মাসখানেকের ছুটিতে ভাবলাম একটা ট্যুর দেই, পুরা উত্তর ভারত। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল নাকি কী যেন বলে, সেসব সহ। মেইনলি ট্রেন জার্নির প্ল্যান করি যেখানে যেখানে সম্ভব। চেন্নাই থেকে দিল্লী ট্রেন, দিল্লী থেকে সিমলা মানালি বাস, দিল্লী থেকে জয়পুর ট্রেন, জয়পুর থেকে আগ্রা ট্রেন, আগ্রা থেকে আজমীর বাস, এভাবে। কাশ্মীর ছাড়া সবই বাস ট্রেনে। ট্রেনে গেলে আরামছে এলাকা দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। আর তাদের ট্রেনের খানাদানা অসাধারণ। টিকিট কেনার সময় মেনু সিলেক্ট করে দিতে হয়। ভেজ, ননভেজ দুটা থেকে। আমি জন্ম থেকেই বিশুদ্ধ মাংসাশী প্রাণি।

রাজধানী এক্সপ্রেসে চেন্নাই থেকে দিল্লী দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ। পুরো একদিনের বেশি লেগে যায়। এসি ওয়ান টায়ার, টু টায়ার, থ্রি টায়ার, নরমাল স্লিপার, এভাবে নানা ক্লাস থাকে। এসি ওয়ান টায়ারে আরামে যাওয়ার প্ল্যান নেই। ট্রেনে সেই সাত সকাল থেকে খাবার দেয়া শুরু হয়, খাবার দেয়া চলতেই থাকে রাত পর্যন্ত, একের পর এক। সব খাওয়া সম্ভব হয় না। আরেকটা ভাল ব্যাপার হচ্ছে ভাষার দূরত্ব থাকলেও সমবয়সী কিংবা আগ্রহী কারো না কারো সাথে খাতির হয়েই যায়, গল্প চলতে থাকে। প্রতিবার চা কফি দেয়ার পর সেটা হাতে নিয়ে বিড়ি টানতে দরজার ওদিকে বার কয়েক যেতেই কিছু আড্ডাবাজের সাথে খাতির হয়ে গেল। একদম অচেনা মানুষের সাথে নানা কথাবার্তা চালানো, নিজেদের আর তাদের অনেক গল্প শোনা, নিজেদের দেশের গল্প করা একরকম লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স। সেসব অন্য গল্প।

সেবার দিল্লী নেমে হোটেলে যাবার জন্য ট্যাক্সি নেই। দিল্লীতে ট্যাক্সি ড্রাইভারদের বিশাল অংশ মনে হয় পাঞ্জাবী। সেদিন যে ট্যাক্সিতে উঠি, তার ড্রাইভারও একজন পাঞ্জাবী শিখ। ট্যাক্সি চলতে থাকবার সাথে সাথে ছেড়ে দেয় গান, “সুবাহ হোনে না দে, সাথ খোনে না দে, এক দুসরে কো হাম সোনে না দে…” প্রায় বছরখানেক টিভি সেভাবে দেখা হতো না। এটা শুনে ভাললাগলো, মজাদার সুর। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এটা কি মিকার (মিকা সিং) গাওয়া?” ড্রাইভার বললো, “হি ইজ আওয়ার ল্যাড” বা এমনকিছু। এই শিখ ট্যাক্সি ড্রাইভারগুলোর স্মার্টনেস আমাদের দেশের কর্পোরেট ছেলেপেলের চেয়ে সম্ভবত বেশি। আর দাড়ি পাগড়ী থাকবার পরেও সে ছিল মারাত্মক সুদর্শন। পরনে ছিল মুজিব কোট টাইপের কিছু একটা। মনে হচ্ছিল সুটেড বুটেড হয়ে ট্যাক্সি চালাচ্ছে। কথায় কথায় বলি, “তোমরা আর পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরা তো একই রেসের।” সে আমাকে উত্তর দিলো, “একই রেসের, কিন্তু আমরা এক না।” জ্যামট্যাম সহ হোটেলের পথে প্রায় একঘন্টার জার্নির পুরোটা সময় গল্প করতে করতে যাই। একটা সময় কথায় কথায় শিখদের স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা আসে, কাশ্মীর ইস্যু আসে। সে আমাকে বলে, “প্রতিটা অঞ্চলের মানুষ কিভাবে থাকবে সেটা তাদের নিজের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। কিন্তু তুমি পাকিস্তানের কথা বলবে না। ভারত যদি কাশ্মীরকে স্বাধীনতা দেয়ও, পাকিস্তান কখনো দেবে না।” এ সময় সে একটা উদাহরণ দেয়, যদিও একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারের জন্য এসব নিয়ে জানাশোনা থাকাটা অবাক লাগে। আমি তার শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করিনি। তবে শেখা যায় যে কারো কাছ থেকেই। সে আমাকে বলে, “তুমি দেখ, ওরা নায়েক সাইফ আলিকে হিলাল-এ-কাশ্মীর খেতাব দেয়, আর গেজেট করে বলে দিয়েছে হিলাল-এ-কাশ্মীর আর নিশান-এ-হায়দার একই জিনিস। ওরা যতই আজাদ কাশ্মীর, গণভোটের কথা বলুক না কেন, কাশ্মীরকে তাদের থেকে কখনো আলাদা হতে দেবে না। ইন্টিগ্রেট করবার জন্য যা করবার সব করে রেখেছে।” ভেবে দেখলাম, সেটাই তো। জাতিসংঘ রেজোলুশন অনুসারে পাকিস্তান সেনাপ্রত্যাহারের পর কাশ্মীরে গণভোট হবার কথা ছিল, যাতে ভারত পাকিস্তান সম্মতি জানায়। কিন্তু কখনোই সেটা হয়নি। গণভোটও হয়নি কখনো। আর তারা যে নির্লজ্জ সেটা কারগিল ওয়ার থেকে বোঝা যায়। পাকিস্তান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বলে আসছিল যে কারগিলের নানা পয়েন্ট জঙ্গীরা দখল করেছে, তবে তারা ছিল পাকিস্তানের রেগুলার ট্রুপসের অংশ। নর্দান লাইট ইনফ্যান্টির সেনারা শীতকালের বিরুপ আবহাওয়ায় যখন নিজেদের পোস্ট ছেড়ে যায়, তখন সেগুলোতে গিয়ে আস্তানা বানায়। একদম শুরুর দিকে কিংবা পরে যখন একদম পরিচয়পত্র, পাকিস্তান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরীতে বানানো অস্ত্র, গোলাবারুদ সহ ধরা পড়ে, তখন সরাসরি তা অস্বীকার করে। এমনকি নিজের দেশের সেনাদের মৃতদেহ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। আর তাদের এ অপারেশন ছিল সরকারপ্রধানকে না জানিয়ে সেনাবাহিনীর নিজস্ব পরিকল্পনা, যা পরবর্তীতে ফোনালাপে আড়ি পেতে ইন্ডিয়ানরা সুস্পষ্ট প্রমাণ দেয়। এর মানে এই না যে ভারতের কাশ্মীর দখল করে থাকা ন্যায়সংগত। কিন্তু কাশ্মীরের জনগণ কিভাবে থাকবে, তা নিজেদের ইচ্ছানুসারে না হয়ে দুই শত্রুভাবাপন্ন দেশের মর্জিমাফিক হচ্ছে, এতে পাকিস্তানের দায় বহুগুণ বেশি।

ভারতীয় কাশ্মীরের মানুষজন সম্ভবত পাকিস্তানকেও সেভাবে পছন্দ করে না। তবে তাদের সাধারণ মানুষ বাংলাদেশকে ভীষণ পছন্দ করে। নানা সময়ে সেটার প্রমাণ পাই। দেখতে সুন্দর, অমায়িক এ মানুষগুলো বাংলাদেশী শুনলে আলাদা খাতির করে। কারণটা ঠিক জানি না। আগ্রাতে এক কাশ্মীরী ছেলের সাথে পরিচয় হয়, বাংলাদেশী শুনবার পর তার আচরণ একদম পালটে যায়। সে আমাকে টুরিস্ট মৌসুমে কাশ্মীর বেড়াতে যাবার দাওয়াত দেয়। ঠিকানা, ফোন নাম্বার দিএ জানায় যে তখন তারা কাশ্মীর ফিরে যায়। আমি যেন অবশ্যই যাই আর অন্য কোথাও না গিয়ে তাদের বাড়িতে উঠি। সে আমাকে দেখাবে কাশ্মীর কেমন।

এভাবে দিল্লীর একটা সরকারী হস্তশিল্প সংস্থার প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র থেকে দুটা লেদার জ্যাকেট কিনি, একটা আমার আর আরেকটা আমার ভাইয়ের জন্য। সেখানে সবকিছুই ছিল ফিক্সড প্রাইসের।আসলে সেখানকার জিনিসপত্রের বেশিরভাগই ছিল কাশ্মীরের নানা হস্তশিল্প, সৌখিন জিনিসপত্র, কার্পেট, শোপিস আর অবশ্যই জেনুইন কাশ্মীরী শাল। সারা ভারতেই এখন কাশ্মীরী শাল বানানোর কারখানা আছে, তবে কাশ্মীরী শাল সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। যাইহোক, আমাদের স্বভাবে আছে দামাদামির চেষ্টা চালানো। আমি জিজ্ঞেস করলাম কোনো ডিসকাউন্ট হবে নাকি। বলল যে সবই নির্দিষ্টমূল্যে কিনতে হবে। দাম দেখে আর কেনার সাহস পাচ্ছিলাম না। সেই আউটলেটের ইনচার্জ ছিলেন এক মধ্যবয়সী কাশ্মীরী ভদ্রলোক। কিভাবে যেন উনি চলে আসেন, আর কথায় কথায় কথা বাড়তে থাকে। যখন উনি শুনলেন আমি বাংলাদেশের, তখন উনারো আচরণ বদলে গেল। জানালেন যে উনার ভাস্তি কিংবা এমন কেউ বাংলাদেশের কোনো এক মেডিকেলে পড়ে। তার থেকে বাংলাদেশের কথা জানে, বাংলাদেশীদের তারা ভালবাসে। কি কিনবো জানতে চাইলো বলার পর জ্যাকেটগুলোর কথা বললাম, জানালাম, বাজেটের বাইরে। উনি তখন বললেন, স্টোর ইনচার্জ হিসেবে উনি নিজের জন্য কিনতে পারেন। সর্বোচ্চ কমিশন উনি আমাকে দিয়ে দিচ্ছেন। আমি ২২ হাজার রুপির জায়গায় ১৪ হাজার রুপীতে দুটা জ্যাকেট হস্তগত করলাম। এই লোকটার আধপাকা চুল গোঁফ আর ভরাট কন্ঠের কথা আমার আজীবন মনে থাকবে।

পৃথিবীতে এতএত জাতি-ধর্ম-বর্ণ, জাতি ধর্ম বর্ণের নামেই বেশিরভাগ ঝামেলা, ক্যাচাল, সহিংসতা। অথচ যত মানুষের সাথে পরিচয়ের সুযোগ হয়েছে, মনে হয়েছে, সব মানুষের কোরটা প্রায় একই। অন্তত যখন একটা মানবশিশু জন্ম নেয়, তাকে অন্য এক জাতি বা বর্ণের শিশুর সাথে আলাদা করবার সুযোগ থাকে না। আর ধর্ম আসে অনেক পরে, ধর্ম তো তখন এমনিতেই থাকে না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

19 − = 12