আমরাই বোধহয় একমাত্র জাতি, যারা মুক্তির সংগ্রামের জলজ্যান্ত ইতিহাসকে চোখের সামনে রেখে পক্ষপাত দুষ্ট ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করে চলেছি।


রমা চৌধুরী লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। প্রথম প্রথম একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। বিনিময়ে সম্মানীর বদলে পত্রিকার ৫০টি কপি পেতেন। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তাঁর জীবন-জীবিকা। পরে নিজেই নিজের লেখা বই প্রকাশ করে বই ফেরি করতে শুরু করেন। বই বিক্রি হলে খেতেন, না হলে অনাহারে-অর্ধাহারে কাটতো তাঁর দিন! একজন মুক্তিযোদ্ধ, একজন লেখিকা, একজন প্রধান শিক্ষিকা, একজন প্রাক্তন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্য এমএ, একজন সর্বহারা বীরাঙ্গনা, বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের একটা জীবন্ত গ্রন্থের এমন মানবেতর জীবনের লজ্জা কি রমা চৌধুরীর নিজের! নাকি গোটা জাতির? এ লজ্জার দায় কি আমারও কম? এই প্রশ্নগুলো আজ সকাল থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে!

বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের এই জিবন্ত গ্রন্থ বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরীর জীবন ঘড়ির কাটা গতরাতের শেষ প্রহরে চিরকালের জন্য থেমে গেছে। মৃত্যু মানুষের অলঙ্ঘনীয় বিধান। তাকে আটকানোর সাধ্য মানুষের নেই। প্রাণের প্রগৈতিহাসিক নিয়মে রমা চৌধুরীও চলে গেছেন, তার জন্য বিশেষ আনুষ্ঠানিক শোক আমরা দেখাবো, কিন্তু আমার আক্ষেপটা তাঁর মৃত্যুতে নয়। ইতিহাসের এমন একটি জীবন্ত দলিল আমরা সঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পারিনি।

একদিকে মুক্তির সংগ্রামের বিকৃত ইতিহাস প্রজন্মের কাছে পরিবেশন করে আমরা জাতির অস্তিত্বকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের জিবন্ত ইতিহাসগুলো অনাদরে অবহেলায় এভাবে কালের গর্বে বিলীন হয়ে যাচ্ছে শুধু রাষ্ট্রীয় উদাসিনতার কারণে। আমরাই বোধহয় একমাত্র জাতি, যারা মুক্তির সংগ্রামের জলজ্যান্ত ইতিহাসকে চোখের সামনে রেখে পক্ষপাত দুষ্ট ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করে চলেছি।

আমরা কি জানি শহীদ আজাদের মা যিনি স্বাধীনতার পর চৌদ্দ বৎসর জীবনকালে মুখে ভাত তুলেননি, নির্যাতিত ছেলের শেষ ইচ্ছের ভাত খাওয়াতে পারেননি বলে? আমরা মুল্য দিতে পারিনি শহীদ জননী জাহানীরা ইমান, ফেরদৌসী প্রিয়ভাসিনীর। আমরা কি জানি বীরঙ্গনা রমা চৌধুরী ৭১ থেকে আজ পর্যন্ত পায়ে জুতো পরেননি, শুধু এদেশের মাটিতে ত্রিশ লক্ষ শহিদ ঘুমিয়ে আছে বলে? আমরা কি খবর রেখেছি, ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর রমা চৌধুরী খালি পায়ে হেটে হেটে নিজের রচিত বই বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে? আমরা জানি না, যে দিন তাঁর বই বিক্রি হয় সেদিন তিনি ভাত খান, যেদিন বিক্রি হয় না সেদিন অভুক্ত থাকেন এই একাত্তরের জননী খ্যাত বীরঙ্গনা!

বলা হয়ে থাকে দক্ষিন চট্টগ্রামের প্রথম স্নাতক নারী রমা চৌধুরী। একাত্তরে রাজাকার-আলবদর হায়েনাদের সহযোগিতায় পাক মিলিটারিদের হাতে ধর্ষিত রমা চৌধিরীর জীবন এক নির্মম বেদনার উপাখ্যান। বীরঙ্গনা রমা চৌধুরী একাত্তরে ধর্ষিত হয়েছিলেন একবার, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে এই বীরঙ্গনা সামাজিক ধর্ষনের শিকার হয়েছেন বহুবার। রমা চৌধুরীদের জন্য কি স্বাধীন দেশের মাটি পুষ্পশয্যা ছিলো? না ছিলো না। ধর্ষিতা অপবাদ নিয়ে রমা চৌধুরী হারিয়েছেন বেঁচে থাকার সব অবলম্বন। প্রতিনিয়তই হয়েছেন সামাজিক নিগ্রহের শিকার। সর্বস্ব হারা এই বীরঙ্গনা একাত্তর পরবর্তী সময়ে অর্ধউন্মাদিনী হয়ে জীবন কাটিয়েছেন। কিন্তু প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্না নারী এই রমা চৌধুরী কারো অনুগ্রহ গ্রহন করেননি।

আজ গর্বের সাথে আমরা বলি “আমরা বাঙালি, আমরা স্বাধীন জাতি, শোসনের ইতিহাসের শৃঙ্খল ভেঙে আমরা বিশ্বের দরবারে একটা উপেনিবেশিক কলোনিকে স্বাধীন সর্বভোম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি”, কিন্তু, যাঁদের সম্ভ্রমের দামে এই অর্জন আমরা কি তাঁদের খবর রেখেছি? চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ সময় জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষনে থাকা বীরঙ্গনা রমা চৌধুরী অভিমানের অষ্টদহনের তপ্ত নি:শ্বাস কাল রাতে চিরতরে থেমে গেছে। আমাদের এই বাঙালি চেতনা ততক্ষন পর্যন্ত প্রহসনের, যতক্ষন না আমরা শ্মশানের পাষানসয্যায় শায়িত বীরঙ্গনা রমা চৌধুরীদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হই!

শহীদ আজাদের মা সাফিয়া, শহীদ জননী জাহানারা ইমান, ফেরদৌসী প্রিয়ভাসিনীর মতো রমা চৌধুরীও মহাকালে ডাকে সারা দিয়ে চলে গেছেন। কালের অতল গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বাঙালির চিরশত্রু পাক পান্ডা আর রাজাকার আলবদরদের নির্মম নির্যাতনের শিকার ইতিহাসের জলজ্যন্ত দলিল। জিবীত রমা চৌধুরী তাঁর ন্যায্য কখনোই পায়নি জাতির কাছে, অন্তত মৃত রমা চৌধুরীর স্মৃতিগুলো সংরক্ষনের জন্য হলেও রাষ্ট্র যেন কার্পণ্য প্রদর্শন না করে। আর প্রার্থনা করি, পরমেশ্বর যেন এই চির বঞ্চিতা নারীর পরকালীন জীবনে সমৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করেন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

63 + = 66