আমদানীর জন্য তেলের পাইপলাইন এবং ভারতকে বন্দর ব্যবহার করতে দেয়া প্রসঙ্গে

?resize=640%2C361&ssl=1″ width=”500″ />
ভারত থেকে তেল আমদানির পাইপলাইন নিয়ে নিউজ পড়তে পড়তে শুরুতেই মাথায় আসলো, ভারতের তো নিজের মাটির নিচেইতেল নাই। তারা নিজেরাই পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল আমদানী করে। চুক্তি মোতাবেক শিলিগুড়ির যে রিফাইনারী থেকে তেল আসবে, তাতে অশোধিতি তেল নিতে ভারত নিজের বন্দর থেকে যে দূরত্ব পার করে পাঠায়, সেটা চট্টগ্রাম থেকে নর্থ বেঙ্গলে অপরিশোধিত তেল নেয়ার চেয়ে কম হবার কথা না। তাহলে নিজের জন্য আরেকটা রিফাইনারী না করে কেন এই পাইপলাইন আর তাতে লাভটাই আসলে কতটুকু হবে? নিজের রিফাইনারী করা মানে দেশের ভিতর বিনিয়োগ, হাজারখানেক মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান সহ আরও অনেককিছু। সরকার দেশের মানুষের জন্য স্থায়ী কিছু করবার কথা ভাববে না?

?resize=640%2C361&ssl=1″ width=”500″ />
বাঙালির সেন্স অফ হিউমার ভাল, বেশ ভাল। বাংলাদেশের ধনী গরীব নির্বিশেষে কথায় কথায় মজা নেয়ার অভ্যাস মজ্জাগত। কিছুদিন আগে নাটক দেখতে দেখতে একটা নাটকের টাইটেল খেয়াল করলাম, “একপায়ে জুতা তোমার অন্য পা খালি”। নরম একটা গানের লিরিকের মানিজ্জত ডুবাইছে, কিন্তু নামকরণটা মজার। একপায়ে নূপুর পরে আরেক পা খালি থাকতে পারলে জুতা দিয়ে তা সম্ভব হবে না কেন?

গতকাল রাতে একজন বললো, “ভাই, ভারতকে বন্দর ব্যবহার আর পাইপলাইন নিয়ে একটা লেখা দেন।” আমি বললাম, “জানিই না কি হইছে। বেশ কিছুদিন নিউজ ফলো করি না।” এরপর নিউজলিংক দিলে হালকাপাতলা চোখ বুলাইলাম। আসল সিদ্ধান্ত বা চুক্তি যেহেতু দুইটা হইছে, একটা পাইপলাইন নিয়ে, আরেকটা সেভেন সিস্টার্সের জন্য বন্দর ব্যবহার করতে দেয়া নিয়ে, তাই শুরুতেই ওই নাটকের টাইটেলটা মনে আসলো। ব্যাপারটাকে আসলে মনে হইল ওই রকম, একপায়ে জুতা আমার অন্য পা খালি।

ভারত থেকে তেল আমদানির পাইপলাইন নিয়ে নিউজ পড়তে পড়তে শুরুতেই মাথায় আসলো, ভারতের তো নিজের মাটির নিচেইতেল নাই। তারা নিজেরাই পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল আমদানী করে। চুক্তি মোতাবেক শিলিগুড়ির যে রিফাইনারী থেকে তেল আসবে, তাতে অশোধিতি তেল নিতে ভারত নিজের বন্দর থেকে যে দূরত্ব পার করে পাঠায়, সেটা চট্টগ্রাম থেকে নর্থ বেঙ্গলে অপরিশোধিত তেল নেয়ার চেয়ে কম হবার কথা না। তাহলে নিজের জন্য আরেকটা রিফাইনারী না করে কেন এই পাইপলাইন আর তাতে লাভটাই আসলে কতটুকু হবে? নিজের রিফাইনারী করা মানে দেশের ভিতর বিনিয়োগ, হাজারখানেক মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান সহ আরও অনেককিছু। সরকার দেশের মানুষের জন্য স্থায়ী কিছু করবার কথা ভাববে না?

ভারত নিজের বন্দর থেকে শিলিগুড়ী পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা রিফাইন করে বাংলাদেশে বিক্রি করে লাভ করতে পারলে বাংলাদেশের পক্ষে কি সেটা সম্ভব ছিল না? আমাদের দেশের জনসংখ্যাও কিন্তু কম না, প্রায় ১৮ কোটি। এরমাঝে সরকারী হিসেবে বছরে সাশ্রয় হবে ১০-১২ কোটি টাকা। কিন্তু তার আগেই যে ১২৫ কিলোমিটার পাইপলাইন আর জায়গায় জায়গায় টার্মিনাল নির্মানের জন্য অনেক জমি লাগবে, সেগুলোর দাম নাই? পাইপলাইন নির্মানের খরচ নাই? ১৫ বছরে যদি ১৫০ কোটি টাকা লাভ হয়, তারচেয়ে তো বিনিয়োগ বেশি হয়ে যাবে।

সবচেয়ে ভালো হতো দেশের চাহিদা সম্পূর্ণ মেটাতে পারে, এমন আরেকটা রিফাইনারী করা। এখন লাগে ৩০ লাখ মেট্রিকটন ডিজেল, ইস্টার্ন রিফাইনারীতে শোধন করা যায় ১৫ লাখ মেট্রিকটন। বাকিটা আমদানী করতে হয় শোধিত অবস্থায়। নিজস্ব চাহিদা থাকলে তেল শোধনাগার যেকোনো দেশের জন্য চোখ বন্ধ করে একটা অর্থ সাশ্রয়কারী প্রজেক্ট হয়। নিজের কাজটা নিজের দেশে হলে হাজার হাজার মানুষের কাজের সুযোগ হইত, নিজেদের স্থাঈ অবকাঠামো হইত আর যে প্রিমিয়াম ভারতকে দিতে হবে কিংবা এখন যাতায়াতে যে খরচ বেশি হয়, তাও একটা সময় উঠে আসতো। আমাদের রিফাইনারী থেকেও তেলের পাইপলাইন করা যেতো, যেটা হয়ত ১৩০ কিলোমিটারের না হয়ে পদ্মা পার করতে ২০০ কিলোমিটারের হইত। দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক সাশ্রয়, স্থায়ী সমাধান আর আত্মনির্ভরশীলতার কথা ভাবলে এই বিনিয়োগ অযৌক্তিক বিনিয়োগ হইত না।

আরেকটা সিদ্ধান্ত নাকি হইছে আমাদের বন্দর ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে ব্যবহার করতে দেয়ার ব্যাপারে। আমার মনে হয়, যে পদক্ষেপ মানুষের উপকারে আসে, তা নিয়ে ধানাইপানাইয়ের মানে নাই। ভারত আমাদের প্রতিবেশী আর রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বিবেচনায় মিত্র রাষ্ট্র। তাদের একটা অংশের মানুষ অন্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক অনুন্নত। প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানীতে তাদের বহুগুণ বেশি অর্থ আর সময় লাগে। আমাদের দিয়ে যদি তাদের উপকার হয়, তাহলে তো সেটা ভালোই। একটা রাষ্ট্র আরেকটা রাষ্ট্রের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখে, নানা ব্যাপারে অযাচিত ঝামেলা পাকায় না, যদি তাদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের ব্যাপার থাকে। আমাদের দেশের একশ্রেণির মানুষ নেপাল আর ভুটানের আমাদের বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে আপত্তি জানাবে না, কিন্তু ভারতের বেলায় দেখাবে। এটা যৌক্তিক না। ল্যান্ডলকড অঞ্চল যদি থাকে, তাহলে সেখানকার মানুষ সারাজীবন বন্ধু, কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অসহযোগিতার জন্য সুবিধাটকু পাবে না?

বন্দর ব্যবহার করতে দিলে আমাদের রাস্তাঘাট খারাপ হয়ে যাবে, বন্দরে চাপ পড়বে, সার্বঔমত্ব মাটিতে গড়াগড়ি খাবে, এসব বাজে কথা। ভারতীয় জাহাজ যদি বন্দরে ভিড়ে, তাহলে তারা চার্জ দিবে, অন্যান্য করের ব্যাপার থাকে। ভারতীয় পরিবহণ যান আমাদের সড়োক, সেতু এসব ব্যবহার করতে টোল দিবে। এসবের হার নির্ধারণে আমরা যেন আর্থিকভাবে ক্ষতির শিকার না হয়ে বরং লাভজনক অবস্থানে থাকি সেটা সঠিকভাবে নির্ধারণ করলেই হয়।

বর্তমান পৃথিবীতে শত্রু রাষ্ট্রের সাথেও ব্যবিসায়িক সম্পর্ক থাকে। নানাভাবে মানুষে মানুষে যোগাযোগ থাকে। সময়ের সাথে সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়ে বিশ্ব হয়ে গেছে ছোট জায়গা। তবে কাচামা পরিবহন সহ নানা কাজে সড়ক, সমুদ্রপথ আর রেলপথে সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও সুবিধাজনক। রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক যদি ভালো থাকে, তাহলে শুধু নিজেদের মধ্যে নয়, এক দেশ হয়ে আরেকটা দেশের সাথেও যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকা উচিত। আদিকালেও সিল্করুট ছিল, এই উপমহাদেশে ছিল গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড। তখনও রাজ্যে রাজ্যে জাতিতে জাতিতে ভাগ ছিল। এখন কেবল আন্তর্জাতিক বাউন্ডারী সেন্টিমিটারের হিসেবে নির্ধারিত আর সুরক্ষিত বলে মানুষের সুবিধার জন্য মানুষের সাথে যোগাযোগ, তাদের সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির পথ রুদ্ধ করে রাখা কোনো কাজের কথা না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

27 + = 30