কপিরাইট বিষয়ক কতিপয় কথকতা

জীবনকে যাপন করা একটা আর্ট। সৃষ্টিশীল মানুষ দু’ধরনের সম্পদ নিয়ে শিল্পিত জীবন যাপন করে; প্রথমতঃ বস্তুগত সম্পদ- জায়গা-জমি, গাড়ি-বাড়ি, টাকা-পয়সা, ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা ইত্যাদি ও নানা রকম প্রাত্যহিক ব্যবহার্য দ্রব্যাদি এবং দ্বিতীয়তঃ মেধাসম্পদ বা Intellectual Property.এর আওতায় আছে- সাহিত্যকর্ম, নাট্যকর্ম, শিল্পকর্ম, সঙ্গীতকর্ম, অডিও-ভিডিওকর্ম, চলচ্চিত্রকর্ম, ফটোগ্রাফি, ভাস্কর্যকর্ম, সম্প্রচারকর্ম,সফটওয়্যার,রেকর্ডকর্ম, ই-মেইল, ওয়েব-সাইট, বেতার ও টেলিভিশন সমপ্রচারকর্ম ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন- বস্তুগত সম্পদ পড়ে ‘নির্মাণ’ পর্বে, অন্যদিকে সৃষ্টিশীল মানুষের মেধার নতুন নতুন আবিষ্কার হলো-‘সৃষ্টি’।আর WIPO বলছে Intellectual Property refers to creations of mind : Inventions, literary and artistic works, and symbols, names, images, and designs used in commerce.

মানুষের বস্তুগত সম্পদ যেমন মালিক বৈ অন্য কেউ প্রকৃত মালিকের অনুমতি বা মূল্য পরিশোধ ছাড়া ভোগ বা ব্যবহার করতে পারে না, মেধাসম্পদের ক্ষেত্রেও সে বিধান সমানভাবে প্রযোজ্য। অথচ বস’গত সম্পদের রক্ষায় সারা পৃথিবীর মানুষ ও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ যতটা সচেতন ও কর্তব্য পরায়ন, মেধাসম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে ঠিক যেন তার বিপরীত, বিশেষ করে এশীয় প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোতে। মেধাসম্পদের রক্ষা ও এর ব্যবস্হপনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যে শব্দটি সংশ্লিষ্ট তা হচ্ছে COPYRIGHT বা কর্মের অধিকার । সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত WIPO Asia- Pacific Regional Forum on Copyright and Related Rights শীর্ষক সম্মেলনে উপস্হাপিত এক প্রবন্ধে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত বিবর্তনের ফলে কপিরাইট বর্তমানে কি অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে সে সম্পর্কে ইঙ্গিত করা হয়েছে এভাবে – ‘While it might be perceived as trivial, it is still a true statement that copyright and related rights have always been linked to technological developments, with copyright owning its emergence to the development of the printing press around 1450 and with related rights coming about as a consequence of the development of recording methods for sound and moving images in the nineteenth century. Those links have increased with the explosive technological developments in the twentieth and continued even stronger into the present twenty first century. They can be observed, for example, in the way the Berne Convention for the Protection of Literary and Artistic Works (the Berne Convention) was revised several times during the twentieth century, taking into account the development of radio, film, television, etc., and after the latest revision in Stockholm and Paris in 1967 and 1971, how discussions at WIPO (often in collaboration with the United Nations Education, Science and Cultural Organization (UNESCO) dealt with phenomena such as reprography (Photocopying), home taping, cable and satellite television, storage and creation of works by means of computer technology and the protection of computer programs’

ইংরেজি COPYRIGHT শব্দটির মধ্যেই এর অনর্-নিহিত অর্থটি লুকিয়ে আছে। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে গত একশ বছর ধরে সর্বাধিত ব্যবহৃত AT Dev- এর অভিধানে ভূক্তিটির অর্থ করা হয়েছে নিম্নরূপ : Copyright [কপিরাইট] N গ্রন্থাকার-স্বত্ব; গ্রন্থাদির স্বত্ব; লেখ-স্বত্ব; exclusive legal right to an original work for a certain number of years :- a. গ্রন্থাকার-স্বত্ব বা লেখ-স্বত্ব দ্বারা রক্ষিত; protected by copyright (a copyright book).আবার আমরা যদি COPY I RIGHT এভাবে শব্দটি বিশ্লিষ্ট করে অর্থ বিশ্লেষণ করি তা হলে এর অর্থ দাঁড়ায় -Copy করার অধিকার । । অর্থাৎ সকল ধরনের সৃষ্টিশীল কর্মই (যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে) কর্মের স্রষ্টা বা রচয়িতার অনুমতি ছাড়া কপি করা বা পুনরুৎপাদন করা, তা বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিগত, যে পর্যায়েই হোক না কেন, তা কপিরাইট ধারণা, আন-র্জাতিক আইন, আন-র্জাতিক চুক্তি, দেশিয় আইন, নৈতিকতা ও ইতিবাচকবোধের চরম পরিপন্থী। Its object is to protect the writer and artist from the unlawful reproduction of his material. It is concerned only with the copying of physical material and not with the reproduction of ideas and it does not give a monopoly to any particular form of words or design

এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কেন এই মুহূর্তে কপিরাইটকে এতোটা গুরুত্ব দিচ্ছি? কপিরাইটের সঙ্গে সভ্য মানুষের সম্পর্কই বা কি? এ প্রশ্নের উত্তরে সংক্ষেপে যে কথাটি বলবো তা হচ্ছে-কপিরাইট আমাদের জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিকাশের অন্যতম Tool বা কৌশল।অন্য কথায় একবিংশ শতাব্দীর সকল সৃষ্টিশীল মানুষের গুরুত্বপূর্ণ এক অধিকার। এ অধিকার লঙ্ঘনের কারণে সকল সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডই বার বার হোঁচট খেতে বাধ্য। জাপানি কপিরাইট বিশেষজ্ঞ তামোতসু হোজুমি মনে করেন- ‘সাংস্কৃতিক কর্মসমূহ সরাসরি মানুষের মনে ও হৃদয়ে আবেদন সৃষ্টি করে। তাই এই পরিভাষা দিয়ে সাহিত্যের সকল রূপ, যেমন উপন্যাস, কবিতা, হস্তলেখ (Script), এবং সেই সঙ্গে কোন কর্মের অভিব্যক্তির দৃশ্যমান ও শ্রুত রূপ যেমন চিত্রকর্ম, সংগীত ও চলচ্চিত্র এবং জটিল বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফলকেও বোঝানো হয়ে থাকে। মানুষের চিন্তা অথবা অনুভূতির সৃজনশীল প্রকাশকেও সাংস্কৃতিক কর্ম বলা হয়। এ ধরনের অভিব্যক্তি অন্যান্য মানুষের চিন্তাভাবনা ও আবেগকে প্রভাবিত করে। আপনি কি কখনো কোন সাহিত্য পাঠ করে, একটি চমৎকার চিত্রকর্ম অবলোকন করে, একটি সংগীত শুনে বা চলচ্চিত্র দেখে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে প্রবেশ করেননি?

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য আহারের দরকার। মনের ও শরীরের রক্ষণাবেক্ষণ জন্য খাদ্য অত্যন- জরুরি। আহার আমাদের পুষ্টি জোগায় এবং বাঁচিয়ে রাখে। কিন’ আমরা স্তন্যপায়ী প্রাণী। আমাদের শুধু দেহের পুষ্টি সাধনই যথেষ্ট নয়, আমাদের মন ও হৃদয়ের পুষ্টিরও প্রয়োজন আছে। যদি আপনি সাংস্কৃতিক কর্মকে আমাদের আবেগ ও বুদ্ধিবৃত্তির জন্য আহারের সঙ্গে তুলনা করেন তবে সহজেই সাংস্কৃতিক কর্মের সংজ্ঞা উপলব্ধি করতে পারবেন। এমন একটি জগতের কথা ভাবুন যেখানে আমাদের আত্মার সাংস্কৃতিক কর্মের অসি-ত্ব নেই। উপন্যাস, কবিতা, সংগীত অথবা চিত্রকর্মহীন একটি পৃথিবীর কথা ভাবুন। আমাদের হৃদয়কে সমৃদ্ধ করে যে সব সাংস্কৃতিক কর্ম তা মানব ইতিহাসে আমাদের জন্য এক মূল্যবান ঐতিহ্য।

কপিরাইট সংক্রান- কর্মকাণ্ড সব সময় একাধিক পক্ষ সংশ্লিষ্ট। সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রধানত- লেখক, প্রকাশক ও পাঠক, সঙ্গীতের ক্ষেত্রে- গীতিকার, সুরকার, গায়ক, যন্ত্রী ও সংগীত কর্মের প্রকাশক বা উৎপাদক, চলচ্চিত্রের কাহিনীকার Script writer, প্রযোজক, পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক, সহশিল্পীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এমনিভাবে সৃষ্টিশীল প্রতিটি-কর্মপরিসরে অসংখ্য মানুষ সম্পৃক্ত হয়ে থাকেন। যন্ত্র ও প্রযুক্তির যত উৎকর্ষ হচ্ছে, বিশেষ করে কম্পিউটার-ডিজিটাল বিশ্ব এ যুগে কার সৃষ্টিকর্ম কিভাবে চৌর্যবৃত্তির ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে তা সব সময় ঠিকভাবে অনুসরণ করাও সম্ভব নয়। বিশেষ করে বর্তমান ইন্টারনেট যুগে ঘরে বসেই আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কর্মের উপাদান বা উৎস হাতে পেয়ে যাচ্ছি।

অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সেই সৃষ্টিশীল কর্মের রচয়িতা বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁর যথাযথ Royalty থেকে। কেবল জীবিত রচয়িতাই নন, সারা পৃথিবীতেই জীবিত রচয়িতা এবং তার মৃত্যুর পর সেই রচয়িতার বৈধ উত্তরাধিকারীগণের দেশ ভেদে পঞ্চাশ থেকে সত্তর বছর ধরে সৃষ্টিকর্মের রয়্যালটি পেয়ে থাকার কথা। বাংলাদেশী আইনে একজন রচয়িতার মৃত্যুর পর ষাট বছর পর্যন- এই অধিকার বলবৎ থাকে। অথচ বাংলাদেশ আন-র্জাতিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়া স্বত্বেও, দেশে কপিরাইট আইন, ২০০০ (২০০৫ সংশোধিত) বলবৎ থাকার পরও আমাদের সৃষ্টিশীল মানুষেরা প্রতিনিয়ত প্রতারিত বা বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের আইনানুগ অধিকার থেকে, প্রকৃত পাওনা থেকে। এ ক্ষেত্রে স্রষ্টা, উৎপাদক ও ভোক্তা সকল পক্ষেরই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে সৃষ্টিশীল কর্মের রচয়িতাগণও তাঁদের কর্মসমূহ সংরক্ষণ বা আইনানুগ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার বিষয়ে চরম উদাসীন। ঢাকার কপিরাইট অফিসের রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখা গেছে এ অফিসের কার্যক্রম ষাটের দশকে শুরু হলেও স্বাধীনতা-উত্তর কাল থেকে ১৫ ডিসেম্বর, ২০০৯ তারিখ পর্যন্ত- রেজিস্ট্রেশনকৃত কর্মের সংখ্যা সর্বমোট ৯৮২১ টি (রেকর্ডকর্ম- ৪৮২টি, শিল্পকর্ম- ৬০৮৬টি এবং সাহিত্যকর্ম- ৩২৫৩টি)। পৃথিবীর অনেক দেশের কপিরাইট আইনের মতো আমাদের আইনেও (কপিরাইট আইন, ২০০০ এর ৪১ নং ধারায় ) কপিরাইট সমিতি (Copyright Society) গঠন ও নিবন্ধন করার বিধান রয়েছে। অথচ এদেশে কপিরাইট অফিস স্হাপনে বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি হলেও এখন পর্যন- সাহিত্য, সঙ্গীত বা অন্য কোন সৃষ্টিশীল কর্মের স্বত্ত্বাধিকারীদের স্বার্থ, জনস্বার্থ বা জনগণের সুবিধা হতে পারে এমন কোন সমিতির অসি-ত্ব বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সমিতি থাকলে সৃষ্টিশীল মানুষেরা একত্রিত হতে পারতেন। অনেকাংশে বন্ধ হতো প্রতারণামূলক কার্যক্রম। সারা পৃথিবী জুড়েই এ জাতীয় সমিতি বা Society মেধাবী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের কর্মস্পৃহাকে অধিকতর বেগবান করে চলেছে।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশের প্রায় সকল শিক্ষিত মানুষই একটি শব্দের সঙ্গে বহুল পরিচিত। এটি ইংরেজি শব্দ- PIRACY যার আভিধানিক অর্থ- গ্রন্থাদির স্বত্ব লঙ্ঘন। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে PIRACY শব্দের অর্থমান বহুগুণ সমপ্রসারিত। ফলে, এখন পাইরেসি কেবল গ্রন্থ’স্বত্ব লঙ্ঘনকেই বোঝায় না, যে কোন অনুমোদনবিহীন সৃষ্টিকর্মের উৎপাদনই পাইরেসি। বলতে দ্বিধা নেই, গ্রন’ (বিশেষ করে বিদেশি), দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্র, সংগীত ও কম্পিউটার সফটওয়্যার ইত্যাদি সবগুলো বাজারের প্রায় পুরোটাই পাইরেসিকারদের দৃশ্য ও অদৃশ্য কালো জালে বন্দি। অনেক শিক্ষিত মানুষও পার্থক্য বোঝেন না আসল-নকলের। কেউ কেউ সুধীন্দ্রনাথ দত্তের উদ্ভ্রান্ত- উটপাখির মতো সস্তার লোভে কেবলই ছুটছেন পাইরেসি পণ্যের হাটে। অভিভাবকরা সন্তানদের জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করছেন। অনেক সামর্থবান ব্যক্তিও তাদের সন্তানদের হাতে তুলে দিচ্ছেন পাইরেটেড বই। অথচ রঙিন বিদেশি বইয়ের জায়গায় পাইরেটেড কপি পড়ে আমাদের প্রকৌশল ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী সন্তানেরা বারংবার প্রতারিত হচ্ছে, বঞ্চিত হচ্ছে Global Knowledge থেকে; পিছিয়ে পড়ছে প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের প্রতিযোগিতায়। পাইরেসির কারণে কর্মের রচয়িতা বঞ্চিত হচ্ছেন রয়্যালটি থেকে, পাঠক বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত জ্ঞান থেকে আর সরকার হারাচ্ছে তার রাজস্ব। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক (Music) শিল্পের অবস্হাও তথৈবচ। সারা দেশের বইয়ের বাজারও ডুবতে বসেছে পাইরেসির সমুদ্রে।

কপিরাইট অফিস, ঢাকার প্রাক্তন রেজিস্ট্রার এম এ শাহ মাহমুদুল হাসান বাংলাদেশে কপিরাইট ও কপিরাইট আইনের পরিচিতিমূলক এক রচনায় লিখেছেন-‘কপিরাইট হচ্ছে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত মেধাশক্তি সংক্রান্ত কতিপয় অধিকার। সৃজনশীল কর্মসমূহের নির্মাতা/রচয়িতাদের স্বত্বসমূহ সংরক্ষণের বিষয়টি কেবলমাত্র কপিরাইট আইন যথাযথভাবে বাস-বায়নের মাধ্যমেই সম্ভব। সৃজনশীল ব্যক্তিবর্গের মেধাশক্তির সার্বিক উন্নয়নসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের উৎসাহ সৃষ্টি এবং কপিরাইট সংক্রান- পাইরেসি রোধকরণের মাধ্যমে শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়ন সাধনই কপিরাইটের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য’।

কপিরাইট একটি হস্তান্তরযোগ্য বিষয় এবং এর রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক নয়। আন্তর্জাতিক আইনেও কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু সৃজনশীলকর্মের বিষয়ে ভবিষ্যৎ মামলা-মোকদ্দমা এবং মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ এড়ানোর জন্য কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন অত্যন্ত জরুরী। বাংলাদেশে কপিরাইট আইন মোতাবেক কপিরাইট সংক্রান্ত ফটোগ্রাফ, রেকডিং এবং চলচ্চিত্র ফিল্ম ব্যতীত কর্মের মেয়াদ কপিরাইট প্রণেতার মৃত্যুর পর ৬০ বছর থাকে। বাংলাদেশের কপিরাইট সংক্রান- বিষয়াদি কপিরাইট আইন-২০০০ (২০০৫ সালে সংশোধিত) দ্বারা পরিচালিত।

বাংলাদেশ World Intellectual Property Organization (WIPO) এর সদস্যভূক্ত দেশ হিসেবে WIPO পরিচালিত বার্ন কনভেনশন, UNESCO পরিচালিত ইউনির্ভাসেল কপিরাইট কনভেনশন (UCC) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্হার (WTO) সদস্য হওয়ার কারণে এতদসংক্রান্ত TRIPS (Trade Related Aspects of Intellectual Property Rights) চুক্তিসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য চুক্তি কনভেনশনের কপিরাইট সংক্রান্ত সকল শর্ত মেনে চলতে বাধ্য। সারা বিশ্বে আধুনিক প্রযুক্তি উন্নয়নের সাথে সাথে কপিরাইট ব্যবস’পনারও যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। এ কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কপিরাইটের গুরুত্ব অনুধাবন করে আন্তর্জাতিক কপিরাইট আইনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের কপিরাইট আইন- ২০০০ প্রণয়ন করা হয় এবং এ আইনটি যুগোপোযোগী করণের লক্ষে ২০০৫ সালে সংশোধন করা হয়। আইনের যথাযথ প্রয়োগসহ কপিরাইট ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণের লক্ষে কপিরাইট আইনের ১০৩ ধারার বিধানমতে কপিরাইট রুলস-২০০৬ (এস. আর. ও নং ২১৯-আইন/২০০৬) প্রণয়ন করা হয়।

বাংলাদেশে প্রচলিত বর্তমানে কার্যকর কপিরাইট আইনটিও দেশে প্রচলিত অন্য অনেক আইনের মত বৃটিশ ও পাকিস-ানি আইনের রূপান-রিত রূপ। ১৭০৯ সালে ইংল্যান্ডে কপিরাইট আইন প্রথম প্রণিত হয়। ১৯১৪ সালের এক সংশোধনীর মাধ্যমে এ উপমহাদেশকে কপিরাইট আইনের আওতাভূক্ত করা হয়। দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান সরকার ১৯১৪ সালের কপিরাইট আইন বাতিল করে দোসরা জুন ১৯৬২ কপিরাইট অধ্যাদেশ নামে একটি অধ্যাদেশ জারী করে এবং করাচিতে কেন্দ্রীয় কপিরাইট অফিস প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে ঢাকায় একটি আঞ্চলিক কপিরাইট অফিস স্থাপন করা হয়। স্বাধীনতা-উত্তরকালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এক বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশক্রমে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে অনুমোদিত আইনের মাধ্যমে ১৯৬২ সালের অধ্যাদেশের কিছু ধারা সংশোধন করে আঞ্চলিক অফিসকে জাতীয় পর্যায়ের একটি সংযুক্ত দপ্তরের মর্যাদা প্রদান করে। সে সময় এ অফিসটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরবর্তীতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাথে কপিরাইট অফিসকে সংযুক্ত করা হয়। বর্তমানে কপিরাইট অফিস জাতীয় পর্যায়ের একটি আধা-বিচার বিভাগীয় (Quasi-judicial) প্রতিষ্ঠান। উল্লেখ্য, ২০০০ সালে কপিরাইট আইন জারীর পূর্ব পর্যন- অর্থাৎ ১৯৯৯ সাল পর্যন- পাকিস-ানি আমলের (১৯৬২ সালের) সংশোধিত অধ্যাদেশ ও ১৯৬৭ সালের কপিরাইট র”লস-এর আওতায় কাজ করেছে কপিরাইট অফিস, ঢাকা। কপিরাইট আইন যথাযথ বাস-বায়নের লক্ষে সংশ্লিষ্ট Stakeholder-দের নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে গঠিত হয়েছে টাস্কফোর্স। ইতোঃমধ্যে টাস্কফোর্স রাজধানী ঢাকায় কয়েকটি বাজারে হানা দিয়ে বিপুল পরিমাণ পাইরেটেড পণ্য উদ্ধারও করেছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে কপিরাইট বিষয়ক অপরাধসমূহের বিচার নিষ্পন্ন করার লক্ষে কপিরাইট আইনটি মোবাইল কোর্ট অধ্যাদেশ, ২০০৯-এর তফসিলভূক্ত করার জন্য মন্ত্রণালয় পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্হার ও সরকারের পক্ষ থেকে কপিরাইট আইন বাস-বায়ন ও পাইরেসি বন্ধের ইতিবাচক কঠিন চাপ থাকাও সত্ত্বেও বাংলাদেশে কপিরাইট-এর অবস্হা শোচনীয়। স্রষ্টা, উৎপাদক ও পরিবেশকদের কর্মকাণ্ডের অসচ্ছতা, ক্রেতাসাধারণের অসচেতনতা, স্বল্পমূল্যের পণ্যের প্রতি শিক্ষিত ক্রেতার নৈতিকতা-বিবর্জিত আগ্রহ, অসাধু ব্যবসায়ীদের গোপন সিন্ডিকেট, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যগণের ঔদাসীন্য বিষয়টিকে ক্রমেই মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। উল্লেখ্য, আমাদের ‘জাতীয় গ্রন্থনীতি’তেও গ্রন্থজগতের তাস্কর্য নিরোধের জন্য ‘বাংলাদেশে গ্রন’জগতে জ্ঞাত ও অজ্ঞাতসারে গ্রন’-তাস্কর্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক তাস্কর্য রোধ করার জন্য কার্যকর আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা’র কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত- আমরা দৃশ্যমান কাজ খুব একটা এগিয়ে নিতে পারিনি। অন্যের সম্পদ ধার করে বা চুরি করে বেশিদূর এগুনো যায় না। কপিরাইটের সঙ্গে সৃষ্টিশীলতার নিবিড় সখ্য বিদ্যমান। ফলে, সৃষ্টিশীল মেধাসম্পদ যদি কেবলই চুরি হতে থাকে তবে একদিন সেই সৃষ্টিশীল মানুষগুলো হয়তো মুখ ফিরিয়ে নেবেন তাঁর আরাধ্য শিল্প সৃষ্টি থেকে; জীবনানন্দের ভাষায়, ‘সৃষ্টির সিন্ধুর বুকে’ আর কেউ জাগাবে না ঢেউ! অথবা পাড়ি জমাবেন অন্য কোথাও অন্য কোন দেশে; আমরা কেবলই শিকার হব মেধাশূন্যতার। স্হুলবুদ্ধির ভারে আক্রান্ত হবে দেশ! কেবলই পর নির্ভরশীল হয়ে থাকবো আমরা!!

উন্নত বিশ্ব এ বিষয়ে এগিয়েছে অনেক দূর। সমপ্রতি বৃটেন মেধাসম্পদ (Intellectual Property) রক্ষার বিষয়ে House of Lords এ ‘ The Digital Economy Bill ‘ উত্থাপন করেছে। ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় ‘The Digital Economy Bill, which sets out the Government’s plans for safeguarding intellectual property rights and promoting innovation in the internet age, has just been introduced in the House of Lords. While many of the measures have won wide-ranging, cross-party support, others have attracted significant criticism from industry figures and consumers alike. Plans to cut off the internet connections of illegal file sharers have been met with dismay by some organizations, with internet service providers such as Talk Talk and BT supporting court fines for repeat offenders rather than the termination of connections’.

স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পর এই জাতি তার অতীতের সকল সাফল্য-ব্যর্থতাকে অনুভব করেছে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ নামে রূপকল্প তৈরী করেছে। এই রূপকল্প তাকে সন্ধান দিয়েছে তার স্বপ্নের দেশের’। ফলে, এই রুপকল্পকে বাস্তবতার মাটিতে সুদৃঢ় করে দাঁড় করাতে হলে মেধাবী মানুষের অধিকার নিশ্চিত জরুরী। ‘ ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচিতে মেধাকে এতোটা গুরুত্ব দেয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে ডিজিটাল যুগে জাতীয় আয়ের বৃহৎ অংশ বা এক সময়ে প্রায় পুরোটাই আসবে মেধা থেকে। এখনই বহু জাতির জাতীয় আয়ের বড় অংশ মেধাসম্পদ থেকে আসে। উন্নত দেশগুলো এখন এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখনই কোন কোন বেসরকারি কোম্পানীর সকল বা আংশিক আয় মেধাসম্পদ থেকে হয়ে থাকে। অতি সামান্য কয়েক বছরের মাঝে আমরা এই আয়কে আকাশ ছুঁতে দেখবো।’১১ আর তা সম্ভব কেবল কপিরাইট আইন যথাযথ বাস-বায়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে। সকল সন্দেহের চোরাবালি মাড়িয়ে, দ্বিধার দুঃস্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে ২০২১- এর মধ্যে আমরা দারিদ্রমুক্ত, মেধাবী ও সৃজনশীল বাংলাদেশ গড়তে চাই। আর সে জন্য প্রয়োজন সকল মানুষের যৌথ সচেতনতা, নিজ নিজ অবস্হান থেকে প্রগাঢ় অংশগ্রহণ; তাহলেই কেবল সম্ভব ঋদ্ধ, সৃজনশীল ও ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ।
আসুন সেই লক্ষে কাজ করি…

বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ কপিরাইট অফিস, বাংলাদেশ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “কপিরাইট বিষয়ক কতিপয় কথকতা

  1. গুরুত্বপুর্ন একটা বিষয়ে
    গুরুত্বপুর্ন একটা বিষয়ে লিখেছেন। অনেক বড় লেখা। এমনিতেই ভোর হয়ে এসেছে, ঘুম পাচ্ছে। তাই বিশদ আলোচনায় এই মুহুর্তে যাচ্ছি না। শুধু একটা জায়গা নিয়ে আমার মতামত জানিয়ে যাই।

    অথচ রঙিন বিদেশি বইয়ের জায়গায় পাইরেটেড কপি পড়ে আমাদের প্রকৌশল ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী সন্তানেরা বারংবার প্রতারিত হচ্ছে, বঞ্চিত হচ্ছে Global Knowledge থেকে; পিছিয়ে পড়ছে প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের প্রতিযোগিতায়।

    মেডিকেলের টেক্সট বইগুলোর পাইরেটেড কপি নীলক্ষেতে পাওয়া যায়। বইগুলোর প্রায় ৯৯.৯৯% বিদেশী। অরিজিনাল বই যদি কিনতে হতো তাহলে বোধ হয় এই জনমে আর ডাক্তারি পড়ার খায়েশ অপূর্ণই থেকে যেতো। বেআইনি হলেও, এই ক্ষেত্রে নীলক্ষেতের কাছে কৃতজ্ঞ। :দেখুমনা:
    এক একটা অরিজিনাল বইয়ের দাম ২০০০-১০০০০ টাকা। যেটার পাইরেটেড কপি পাওয়া যায় ৩০০-৫০০ টাকায়, এবং রঙিন। বলতে পারেন, অরিজিনাল বই কেনার ক্ষ্যামতা না থাকলে কে কইছিলো আপনারে মেডিকেলে পড়তে- সেক্ষেত্রে কবি নীরব। :আমিকিন্তুচুপচাপ:

    1. আতিক ভাই এর সাথে সহমত ।
      আতিক ভাই এর সাথে সহমত । পাইরেটেড হোক আর যাই হোক , সব শ্রেণীর স্টুডেন্ট দের জন্য এটা জ্ঞান এর তীর্থভূমি ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

61 − 56 =