বিষাক্ত রাজনীতি:- পঞ্চদশ পর্ব-

মানব মনন বড় বিচিত্র, মানবের চিন্তা চেতনায় কত স্বপ্ন পুনর্গঠনের খেলা প্রতিনিয়ত চলতে থাকে তার সঠিক অন্বেষণ করা বড়ই দুরূহ! প্রসঙ্গিক ভাবেই এই প্রশ্নটি এসে যায় প্রায় ত্রিশ শতাংশ মুসলমান জনগোষ্ঠী সমৃদ্ধ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির মত চরম দক্ষিণাপন্থী দল কখনও কি শাসন ক্ষমতা লাভ করতে পারবে? এর উত্তর অন্বেষণ করতে হলে আমাদের ইতিহাসের দীপ্তিশিখায় বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা কি? বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা এক কথায় ভয়াবহ! একদিকে যখন চরম বেকারত্ব, দুনীর্তি, সামাজিক শৃঙ্খলার চরম অবনতি, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঘনঘটা, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলিকে অপ্রাসঙ্গিক করে রাখার ভয়ংকর প্রচেষ্টা, শাসকদলের ক্রমবর্ধমান পেশিশক্তির আস্ফালন, মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীদের চাটুকারিতা এক কথায় পশ্চিমবঙ্গে অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে!

আর সেই সঙ্গে মমতা ব্যানার্জি সরকারের এই মোল্লাতোষণ নীতির ফলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে নেমে এসেছে তা এ থেকেই বোঝা যায় বর্তমান দিনে পশ্চিমবঙ্গ জামাত ও জঙ্গিদের এক নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ ‘আহমেদ হাসান ইমরানের’ প্রকাশিত ‘কলম’ পত্রিকাটি প্রকাশ্যে জামাতের পক্ষে লেখে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা করে। সুকৌশলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে কথা বলে ও কুখ্যাত রাজাকার- দেলোয়ার হোসেন সাইদি, মতিউর রহমান নিজামী, কাদের মোল্লা, গোলাম আজম প্রমুখকে সমর্থন করে। এই পত্রিকা হিজাব ও বোরখার কথা বলে এবং এরদোগানকে সমর্থন করে। এই পত্রিকা বিশ্বজুড়ে খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে প্রচ্ছন্নে সমর্থন যোগায় এবং শরিয়তি আইন প্রণয়নের পক্ষে কথা বলে। তাহলে বুঝতে পারছেন কি ভয়ংকর এই দৈনিক পত্রিকা? মমতা ব্যানার্জি প্রকাশ্যে জামাতের জনসভায় গিয়ে ভাষণ দেন। সেখানে আবার নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপির বিরুদ্ধে কথা বলেন। অভিযোগ করেন বিজেপি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে এবং উনি সংখ্যালঘুদের পাশে আছেন। একটা মানুষ কতটা ক্ষমতালোভী ও নির্লজ্জ হলে এমন কথা বলতে পারে?

এই সরকারের প্রচ্ছন্ন মদতে জঙ্গিরা এখানে ঘাঁটি গেঁড়ে বসে আছে তার জ্বলন্ত নিদর্শন ‘খাঁগড়াগড় বিস্ফোরণ কান্ড’ এই কান্ডে যখন বাংলাদেশি জঙ্গি সংগঠন জেএমবি এর সদস্যরা বোমা বানাতে গিয়ে নিহত হয় তখন কেন্দ্রীয় এজেন্সি এনআইএ আসার আগেই রাজ্য পুলিশ দিয়ে সমস্ত বোমা নষ্ট করে দেওয়া হয় যাতে কোন প্রমাণ না থাকে। আবার কিছুদিন আগে এই কলকাতা শহর থেকেই বেশকিছু জঙ্গিকে পুলিশ গ্রেফতার করে যাদের নীল নকশা ছিল এদেশে আশ্রিত বাংলাদেশি মুক্তচিন্তকদের হত্যা করা ও দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠিত করা। চোখের সামনে দেখছি এই ‘কলম’ এর মত পত্রিকা পড়ে আমাদের পরিচিত সমাজব্যবস্থা কত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে! যে পশ্চিমবঙ্গের কোন দিন হিজাব, বোরখার অস্তিত্ব ছিল না সেখানে এখন এর ব্যাপক প্রসার শুরু হয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মন অনেক বেশি কট্টর হয়েছে এরা এখন ইসলামি খিলাফতের স্বপ্ন দেখে। জামায়াতের ডালপালা এখন গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে তাহলে বুঝতে পারছেন আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা কি হবে? মমতা ব্যানার্জি ভাবছে এই ভাবে মুসলিম ভোট ধরে রাখা যাবে এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা যাবে। কিন্তু দিদিমণি এটা ভুলে যাবেন না দুধ দিয়ে কাল সাপ পুষতে নেই! ইসলামি মতবাদ অনুযায়ী মূর্তি পূজা শির্ক অর্থাৎ খুব ভয়ংকর গোনা তাই দুদিন পর এই জামাতিরাই মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে আন্দোলন করবে তখন আপনি কি করবেন? সাধের কালিঘাটের কালীমন্দির থাকবে তো?

অনেকে বলবেন একটু বেশি চিন্তা করা হয়ে যাচ্ছে না তো; তাদের উদ্দেশ্যে বলি বরং খুব কম বলা হয়ে যাচ্ছে। এই পশ্চিমবঙ্গে গতকয়েক বছরে দুর্গাপুজোর মাইক বাজানো নিয়ে ছোটখাটো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে যা এই অমেরুদণ্ডী মিডিয়া বকলমে চেপে গেছে। আবার মহরমের জন্য দুর্গাপূজা বিসর্জন পিছিয়ে দেওয়া এগুলি মমতা ব্যানার্জি সরকারের নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িক তোষণ নীতির বর্হিপ্রকাশ। ‘RSS বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের’ মত কিছু হিন্দুত্ববাদী কট্টরপন্থী দল মাঝে মাঝে প্রচার করে পশ্চিমবঙ্গকে বাঁচাতে হবে, না হলে তা বাংলাদেশ হতে আর বেশি বাকি নেই। প্রকৃত পক্ষে পশ্চিমবঙ্গের যা অবস্থা তাতে এই অভিযোগের যথেষ্ট সারবত্তা আছে বরং বলা ভালো পশ্চিমবঙ্গকে না বাঁচাতে পারলে পশ্চিমবঙ্গ পাকিস্তানে রূপান্তরিত হতে বেশি দিন সময় লাগবে না। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে ও বেশি খারাপ।

কারণ- বাংলাদেশে ধর্মান্ধতা যেমন বেশি মুক্তচিন্তার মানুষ ও বেশি তাই বাংলাদেশে এই মৌলবাদী শক্তি বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারেনি। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবী উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের এরা ইসলামের বিন্দুবিসর্গ ও বোঝে না তাই মৌলবাদী ইসলামের এখানে অবাধ প্রবেশাধিকার। এই বুদ্ধিজীবীরা সংখ্যালঘু সমর্থনের নাম করে দেখা যায় শরিয়তি আইন এর ও সমর্থন করে। কোন এক প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী বলেছিলেন- ‘মুসলমানদের নিজের আইন প্রণয়নের অধিকার আছে তাই শরিয়তি আইন ওদের স্বার্থে প্রণয়ন করা যেতেই পারে’। কতবড় মূর্খ ও নির্বোধ হলে এই সমস্ত কথা বলা যায়! আমাদের স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবীরা এটা বোঝে না শরিয়তি আইন হলে অন্য কোন ধর্মের মানুষেরই প্রার্থনার অধিকার থাকবে না; সেখানে আল্লার আইনই শেষ কথা এবং অন্য ধর্মের মানুষদের জিম্মি করে রাখা হয়। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ- সৌদি আরবের মত দেশগুলি যেখানে ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রার্থনা করার অধিকার পর্যন্ত নেই। ইসলাম এই কারণেই সকল ধর্মের থেকে আলাদা। কারণ- ইসলাম অন্য কোন ধর্মের স্বাধীন অস্তিত্ব স্বীকার করে না অথচ সাধারণ মুসলমান ও এই সমস্ত ভন্ড বুদ্ধিজীবীরা ভাবে ইসলাম শান্তির কথা বলে।

একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে- সাধারণ মুসলমানরা কোরানের সূরা বাকরার 256 নম্বর আয়াত দেখিয়ে বলতে চাই ইসলাম কত শান্তির ধর্ম। এখানে বলা হয়েছে- “দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নাই” (2:256)। সত্যিই ইসলাম কি মহান শান্তির ধর্ম আসুন সকলে ইসলামের ছায়াতলে আসি! আবার এই কোরানের অন্য আয়াতে আল্লা বিধর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন-“অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুসরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দি কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাক, কিন্তু তারা যদি তওবা করে, নামাজ আদায় করে, তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু” (সূরা তওবার 5 নম্বর আয়াত বা 9:5)।

তাহলে কি বুঝতে পারছেন এই আয়াতে ইসলাম না কবুল করলে আল্লা হত্যার নির্দেশ দিচ্ছেন! এখন নিজের বিবেককে প্রশ্ন করুন কোন সৃষ্টিকর্তা কি কখনও এত নিষ্ঠুর হতে পারে? সৃষ্টিকর্তা কি কারোর প্রাণ নিলে খুশি হতে পারে? এখন কোন কোন মুমিন ভাই এসে বলবেন এগুলি যুদ্ধের আয়াত, আগের আয়াত দেখুন, পরের আয়াত দেখুন ইত্যাদি বলে জায়েজ করার চেষ্টা করবেন। তাহলে প্রশ্ন হল এগুলি যদি সেই সময়ের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে আয়াত হয় তাহলে বর্তমানে এই আয়াত গুলির, কি প্রাসঙ্গিকতা আছে? তাহলে কেন বলেন কোরান আল্লার বাণী? আসলে সুস্থ মস্তিষ্ক দিয়ে পড়লে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় মোহাম্মদ আল্লার নামে এগুলি প্রচার করেছে। যেখানে শক্তি কম ছিল সেখানে কিছু কিছু শান্তির কথা বলেছে অন্য জায়গায় হিংস্রতার কথা বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কোরানের বেশিরভাগই এই রকম হিংস্র আয়াতে পরিপূর্ণ। তাহলে বুঝতে পারছেন কি কেন আইএস মানুষের মুন্ডু কাঁটে? তারা কি সহি মুসলিম নয়? এখন জামাতি মতাদর্শের অবাধ প্রবেশাধিকার মানে জঙ্গিবাদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র! তাই আগামীদিনে পশ্চিমবঙ্গের কি অবস্থা হতে চলেছে তা সহজেই অনুমান করা যায়!

চলবে…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

42 + = 48