শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর অকাল প্রয়াণঃ জঙ্গি-জেহাদি থেকে সাধারণ বাঙালি মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিক্রিয়ার উল্লম্ফন

(১)

দেশে বিদেশে তারকাদের স্বাভাবিক মৃত্যু কিংবা অকাল মৃত্যুতে তাঁর আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব থেকে সহকর্মীদের মধ্যে যে প্রিয়জন হারানোর কষ্ট, বেদনা-শোকাচ্ছন্ন অবস্থা প্রত্যক্ষ করা যায় তেমনি দেখা যায় দেশের সাধারণ জনগণ থেকে তাঁর অনুরাগী-ভক্তদেরকেও তা সমানভাবে বেদনাহত করে। প্রাত্যহিক নানা কাজের ভিড়ে কিছু সময়ের জন্য হলেও তা তাদেরকে শোকাবহ করে রাখে। তারাও ভারাক্রান্ত হোন। আজকের সোস্যাল মিডিয়ার এই চরম উৎকর্ষের সময়ে বেশিরভাগেই তাদের মতো করে তাদের অব্যক্ত কথাগুলি, তাদের মোহাচ্ছন্নতা, শ্রদ্ধা-ভালোবাসা অকপটে লেখে জানান দিতে পারছেন। মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে আমাদের দেশেও তা চালু আছে। বেশ ভালোভাবেই চালু আছে। কিন্তু এর পাশাপাশি বিরাট একটি বিপরীত চিত্রও জারি আছে। যা আমরা এদ্দিন দেখেও না দেখার ভান করে গিয়েছি। এড়িয়ে গিয়েছি কিংবা অনেকেই দেখিনি। কী সেটা? এরা ঘৃণাজীবী। দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো ব্যক্তি থেকে দেশের তারকা, কিংবদন্তীদের মৃত্যু হলে এই ঘৃণাজীবীরা অত্যন্ত কদর্য, অশ্লীল-নোংরাভাবে যাচ্ছেতাই বলেকয়ে গালাগাল করে তাঁদেরকে তোলোধোনো করে। এরা আজ গড় সব্বাইকেই ধর্মের ফতোয়া দিয়ে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিচ্ছে!

(২)

কেনো পাড়লাম এই প্রসঙ্গ ? কারণ অনেকেই নানাভাবে এই মৃত্যু পরবর্তী ধর্মীয় ফতোয়াবাজদের ফতোয়ার মতো স্পর্শকাতর প্রসঙ্গটি তাদের মতো করে লেখেছেন। যার যার মতো করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। সেটিই আসলে হওয়া উচিৎ। বাংলা ব্যান্ডের লেজেন্ডারি শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু’র অকাল প্রয়াণেও আমরা দেখলাম সেই ঘৃণাজীবী ধর্মবাদীরা ভয়াবহ রকমের ঘৃণা ছড়াচ্ছে। ভয়ানক মিথ্যেচার করে যাচ্ছে। যাচ্ছেতাই ভাবে তাদের নিজেদের ফেসবুক ওয়ালে তো বটেই তেমনি নানাজনের ওয়াল থেকে দেশের জাতীয় নানান গণমাধ্যমগুলির ফেসবুক পেজ, অনেক জনপ্রিয় নিউজ পোর্টাল এমনকি ইউটিউবের নানান চ্যানেলেও এরা দলে দলে হাজির হয়ে যাচ্ছেতাই ভাবে ফতোয়া দিয়ে ভয়াবহ আক্রমণ করে যাচ্ছে। শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুকে ফাসেকটাসেক বলে নগদে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিচ্ছে। ক’বছর আগেও এদের বেশিরভাগকে সহজেই চেনা যেতো। কারণ এরা তখন সংখ্যায় কম না হলেও তাদের কথাবার্তায়, আচার-আচরণে খুব সহজে চেনার নানান উপায় ছিলো। সবচেয়ে বড় কথা এরা গড়ে বেশিরভাগই ছিলো মাদ্রাসা শিক্ষার গড় ফল। এখন আর সেরকম ভাবার কোনো উপায় নেই। সহজে চেনারও পথ নেই। এরা সবাই মিলেমিশে এখন সার্বজনীন হয়ে ওঠেছে। কে যে কোনটা তা চেনা সত্যি সত্যি মুশকিল। কে যে কার পরিপূরক বুঝা কষ্টসাধ্য। জিহাদি, মুমিন-মুল্লাদের তো একটু চেপে ধরলে, পরখ করলেই চেনা যায়। সে এই অনলাইনে আরও সহজ। বিশেষ করে অনলাইনে এদের চলাচল, গতিবিধি কিছুটা লক্ষ্য রাখলেই বুঝা যায়। না বুঝার মতো অসাধ্য কিছু নেই। কিন্তু এই যে গড় হয়ে ওঠা ‘সার্বজনীন শ্রেণি’টি তাদেরকে সহজেই চেনাটা আজ আর খুব সহজ কম্ম নয়। দেশের প্রেক্ষিতে বলতে গেলে বলা যায় মোটা দাগে আমাদের দেশের চেনাজানা প্রতিষ্ঠিত এরকম তারকা ব্যক্তিত্বের স্বাভাবিক কিংবা অকাল মৃত্যুতে এদের হামলে পড়া দেখলে তখন সেটা আরো ভালোভাবে বুঝা যায়। এর আগে খুব বেশি বুঝার সাধ্য নেই। আর যদি ভিন ধর্মের, ভিন্ন মতের, সংশয়ী ও নাস্তিকদের স্বাভাবিক কিংবা অস্বাভাবিক মৃত্যু (যদিও নাস্তিকদের স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার রাষ্ট্র দিতে পারে নি বরং কুপিয়ে মারার হুকুম জারি রেখেছে!) হয় তাহলে তো এদের উল্লাসের সীমা পরিসীমা ছাড়িয়ে যায়। যেনো ইদোৎসব! গতোকাল থেকে আজ অবধি শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর সব ধরণের নিউজের ফেসবুক লিংকের নিচের কমেন্টের দিকে তাকালে সেটি পরিষ্কার বুঝা যায়।

(৩)

এটা স্বীকার করে নিতে হবে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ পরবর্তী ‘শাপলাচত্বর ধারার’ রাজনীতির ফল আজ ভালোভাবেই ফুলেফেঁপে তা আজ মহীরুহ হয়ে ওঠেছে। শেকড় গেঁড়ে ডালপালা তো অনেক আগেই গজিয়েছিল। এখন সেই গাছ থেকে ফুল-ফল দেওয়া শুরু হয়েছে। দেশে ধারাবাহিক ব্লগার হত্যা, জঙ্গি হামলার নেপথ্যের এক দু’জন মাঠ পর্যায় জঙ্গি কর্মীকে বিনা বিচারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনি দিয়ে হত্যা করা ছাড়া এই মাদ্রাসা-উপজাত থেকে গড় সার্বিক শ্রেণির বাড়বাড়ন্তে রোধকল্পে আমাদের শাসক শ্রেণি তথা এই রাষ্ট্র কার্যত আইনি বাধ্যবাধকতা, সামাজিক প্রচার-প্রচারণা থেকে জনসচেতনা-গণপ্রচারণা কিছুই করেনি। সরকার যে উদাসীন তা না। বরং তাদের ক্ষমতার স্বার্থেই এদেরকে পেলেপুষে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। বিবেক-মনুষ্যত্ব মুক্ত লেখালেখি যারা আগে করতেন বা এখনও নানা কৌশলে বা যতোটা পারেন নিজে নিজেই সেন্সর করে করেন তাঁদেরকে দমাতে, তাঁদের লেখালেখি বন্ধ করতে, তাঁদেরকে গলায় ফাঁস পরানোর জন্য সাতান্ন ধারা থেকে নয়া নানান কালাকানুন জারি রেখেছে। তাঁদেরকে জেল-জরিমানা করা থেকে দেশ ছাড়া করে নানান হয়রানির মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত দৌড়ের ওপর রেখেছে। বিপরীতে দেখুন এদেরকে, এই কোটি কোটি মাদ্রাসা-উপজাত মর্দে মুজাহিদদের বেড়ে ওঠতে, সহায়তা করতে যা যা করার তাই তাই করে যাচ্ছে। করছে। আজ এই এরা দেশের তাবৎ শিল্পী-সাহিত্যিক-রাজনীতিবিদদের চুন থেকে পান খসলেই কাউকেই বাদ দিচ্ছে না। একদম কষে দু’ঘা লাগাচ্ছে। অন্যদিকে দেশে উন্মুক্ত নাটক, নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে কনসার্ট এসব আয়োজন করতে আয়োজকদের নানান হ্যাপা পোহাতে হচ্ছে। এসব ভেবেও যারা অনুষ্ঠান আয়োজন করবেন বলে মনস্থির করেন তারা অনুষ্ঠানের অনুমতি পেতে নানান কাঠখড় পোহাতে পোহাতে চক্ষু ছানাবাড়া হয়। প্রাসঙ্গিক হিসেবে বলি, সাম্প্রতিক সরকারি আয়োজন হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরকারের কথিত ‘উন্নয়ন মেলায়’ গান করতে গিয়ে দেশের প্রবীণ শিল্পী চিশতি বাউলকে এই মুল্লা-জিহাদিরা সেই অনুষ্ঠান ভেঙ্গেচুরে পণ্ড করে তাঁকে হাতেনাতে ধরে নিয়ে গিয়ে মারধোর করা থেকে দেশের সবগুলো মিডিয়ার সামনে এরা তাঁকে তওবা করিয়ে আবার ইসলামে দীক্ষিত করেছে! এসব মিলিয়ে দেখলে পরে দেখা যায় দেশে গান, নাটক সিনেমা সাহিত্য, লেখালেখি তথা মুক্তবাক সার্বিকভাবে সার্বজনীন সংস্কৃতি এক ধরণের কার্যত বন্ধ হওয়ার পথেই। সে যেমন সরকারি তরফে ঘোষণা দিয়ে, আইন করে বন্ধ করেছে তেমনি অঘোষিতভাবে এই জঙ্গি জিহাদি মুল্লা শ্রেণি দিয়ে হত্যা-কল্লাকাটা, মারধোর করা থেকে ভাঙচুর করা, বাড়িঘরে আগুন লাগানো এসবের মধ্যে দিয়ে ভয়-আতঙ্ক জারি রেখে সব বন্ধ করে দিচ্ছে। এবার এর বিপরীত দিকে চেয়ে দেখুন, দেখবেন দেশে লাখে লাখে মাদ্রাসা-মসজিদ তো আছেই দেশে নতুন করে মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ার হিড়িক ওঠা থেকে দেশে ইসলামি জলসা, ওয়াজ-মাহফিল, খানকা-মিলাদ এসব সার্বজনীন উৎসব হয়ে ওঠেছে। দেশের আনাচেকানাচে পাড়ায়-মহল্লায়, ফেসবুক-ইউটিউবে সর্বত্র সারা বছরই তা মহাসমারোহে চলছে! বেশুমার। বিরামহীন। এই চিত্র এখন খুব স্বাভাবিক। বরং অস্বাভাবিক হলো গান-নাটক-সিনেমা, লেখালেখি! এরা দেশের এই বিরলপ্রজ প্রতিভাদের বেঁচে থাকাকালীনও শান্তিতে থাকতে দেয় নি। আর এখন মৃত্যুর পরেও ফতোয়া দিয়ে আঙুল তোলে তেড়ে যাচ্ছে। পারলে তো লাশটাই আটকে দেয়, এমন দশা!

(৪)

কারও মৃত্যুতেই উল্লাস করতে হয় না। মৃত্যু অমোঘ। মৃত্যু সার্বজনীন চিরন্তন সত্য জেনেও এই বিশেষ ধর্মের ধর্মজাত ঘৃণ্য এই মর্দে মুজাহিদ জনতার উল্লাস দেখলে স্পষ্ট পরিষ্কার হয় যে, এদের শক্তির মূল উৎস কী! দেশের প্রচলিত আইন, দেশের রাষ্ট্র প্রধানের নতজানু অবস্থান সর্বোপরি এই মর্দে-মুজাহিদ শ্রেণিগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রের স্পষ্ট দুর্বলতা, পক্ষালম্বন দেখলে এটা বুঝতে কষ্ট হয়না যে এদের খুঁটি স্বয়ং রাষ্ট্র। ছাগল নাচে খুঁটির জোরে। আজ রাষ্ট্রই এদের অন্নদাতা। আশ্রয়দাতা। রাষ্ট্রই এদের সুরক্ষা দিয়ে হেফাজত করছে। বুকে আগলে রাখছে। এখন শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা গোনার পালা। দিন-তারিখ ধরে ধরে নির্মম অপেক্ষার পালা যে, রাষ্ট্রের প্রধান কর্তাব্যক্তিদের স্বাভাবিক(!) মৃত্যুর পরে এই পালিত শ্রেণির কোটি কোটি মর্দে-মুজাহিদ, জিহাদি মুল্লা-জঙ্গি শ্রেণির লোকজন তাঁকে/তাঁদেরকে ধর্মের দোহাই দিয়ে, ধর্মীয় ফতোয়ার বস্তায় মুড়ে কীভাবে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে। ইতিহাস কথা কয়… আর পাতিহাস সেই ইতিহাসে খলবল-খ্যাঁক খ্যাঁক করে বিষ্ঠা ত্যাগ করে! এখন শুধু অপেক্ষার ক্ষণ গণনামাত্র!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 22 = 32