কিংবদন্তীরা এভাবেই আসে আর সবকিছু জয় করে চলে যায়

ভালো ঘরের ছেলেরা গান করে না। আর ব্যান্ড মিউজিক তো একেবারেই না। লম্বা চুলওয়ালা নেশাখোর ছেলেগুলোই একটা প্রজন্মকে নষ্ট করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। মদ, গাঁজা খেয়ে স্টেজে উঠে চিল্লাচিল্লি করলেই গান হয়ে যায় কি করে?

ব্যান্ড মিউজিক নিয়ে অনেক মানুষের ধারণা হুবহু এরকম। তাদের ভাষ্যমতে এই টাইপের গান যারা করে এরা কখনো ভালো মানুষ কিংবা ভালো ছেলে হতে পারে না। তবে আজ কেন আমাদের সুশীল সমাজের সুশীল ব্যক্তিরাও আইয়ুব বাচ্চুর জন্য চোখের জল ফেলছেন?
যখন অঞ্জন দত্ত, কবির সুমন,অনুপম রায় কিংবা রুপম ইসলাম ভিন্ন দেশের মানুষ হয়েও কান্না করছেন তখন বলতেই হয় এদেশের মানুষেরা একজন আইয়ুব বাচ্চুকে চিনতে ভুল করেছে। গতকাল এই সুন্দর পৃথিবীর আলো ত্যাগ করার আগে কয়জন মানুষ আইয়ুব বাচ্চুকে একজন সত্যিকারের মিউজিসিয়ান ভাবতেন সেটা জানতে আমার খুব ইচ্ছে করছে। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটটা একদম ভিন্ন। সবাই একসাথে আইয়ুব বাচ্চুর জন্য আপসোস করছে। লাইনধরে দাঁড়িয়ে আপসোস করছে। দুঃখ একটাই যদি এই আপসোসটা উনি বেঁচে থাকা অবস্থায় দেখে যেতে পারতেন তবে প্রস্থানটা আরামদায়ক হতো।

কোন জিনিস হাতের কাছে থাকলে তার মূল্যায়ন করাটা আমরা এখনো শিখতে পারি নি। একদম পারি নি। যখন মূল্যবান জিনিসটা চিরতরে হারিয়ে যায় তখনই পারি এক বুক আপসোস নিয়ে তাকে বিদায় জানাতে।

আজম খান, লাকি আখন্দ কিংবা আইয়ুব বাচ্চু এরা আর কোনদিন ফিরে আসবে না। পুরো দেশের সকল মানুষ একসাথে চেষ্টা করলেও ফিরিয়ে আনতে পারবে না। আজম খান কিংবা লাকি আখন্দ শেষ বয়সে যেরকম যুদ্ধ করে স্বর্গে পৌঁছেছেন সেটা সবারই জানা। বাচ্চু ভাইয়ের ভাগ্য ভালো তাদের মত এ খারাপ অবস্থায় যেতে হয় নি। হুট করেই চলে গেছেন। তবে তাঁর মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা অভিমানটা আমাদের অনেক বছর ভোগাবে। প্রাপ্য সম্মান এখন দিয়েই বা কি হবে? যার জন্য এখন এত আয়োজন সে এত সময়ে আজম খান আর লাকি আখন্দকে নিয়ে নতুন গান করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

আমাদের চারপাশে কিছু মানুষ ছিলো এবং এখনো আছে যাদের কাজ হলো ভালো কাজে বাঁধার সৃষ্টি করা। এই মানুষগুলোর জন্য দেশের ব্যান্ড মিউজিক এখনো অবহেলিত। এরা নিজেরা তো জীবনে কিছু করতে পারে নি, অযথাই তরুণ প্রজন্মের পেছনে পড়ে থাকে। কিন্তু দিনশেষে এই বাজে আর রাস্তার ছেলে উপাধি পাওয়া সূর্য সন্তানেরা দেখিয়ে দেয় কিভাবে বাঁচার মত বাঁচতে হয়।

৬০০ টাকা নিয়ে ঐদিন নিজ শহর থেকে অন্য শহরে পাড়ি না জমালে অবশ্যই একজন আইয়ুব বাচ্চুকে পাওয়া যেতো না। সমাজের ঐ সুশীল মানুষের কথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ফলেই আজ পুরো দেশের মানুষ তাঁর জন্য চোখের জল ফেলছে। আর আইয়ুব বাচ্চুর যতই সমালোচনা কিংবা গালাগালি করেন না কেন তাঁর জনপ্রিয়তা একটুও কমাতে পারেন নি আর কোনদিন পারবেনও না।
আমার মত হাজার হাজার ছেলে মেয়ে যখন হতাশ হয়ে অন্ধকার রুমে আটকে থাকে তখন সমাজের সুশীল মানুষের জ্ঞানী মার্কা কথাবার্তা এক চিমটে ডিপ্রেশনও কাটাতে পারে না। এই বাজে অবস্থা থেকে ফিরে আসতে সাহায্য করে আইয়ুব বাচ্চুর মত কিংবদন্তীদের গানের গলা আর গিটারই।

অনেকেই হয়তো ভাবছেন রুপালী গিটারটা থেমে গেছে। আসলে কিন্তু তা না। এদেশের তরুণ প্রজন্ম ঠিকই জানে কিভাবে গুরুর দেখানো পথে হেঁটে যেতে হয়। জানে কিভাবে সুশীল ব্যক্তিদের ধারণাটা ভুল প্রমাণ করতে হয়।

বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক আজ যেখানেই আছে তার পেছনে আইয়ুব বাচ্চুর অবদান অনেক। এই মানুষটা নিজের কথা চিন্তা না করে বারবার চেষ্টা করেছে একটাবারের জন্য হলেও এর আসল সৌন্দর্যটা ফুটিয়ে তুলতে। আর পেরেছেন বলেই গিটার প্লেয়িংটা এখন একটা শিল্পের পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।

এটা সত্যি যে এদেশে আর কোন আইয়ুব বাচ্চু আসবে না। কারণ আইয়ুব বাচ্চু যে একজনই। কিন্তু “রুপালী গিটার” “হাসতে দেখো”, “এখন অনেক রাত” “ফেরারী মন”, “চল বদলে যাই”, “মেয়ে” “কষ্ট” “ঘুমন্ত শহরে” এই গানগুলো আরো বহুকাল বেঁচে থাকবে এই পৃথিবীতে। আর তাঁর এই সৃষ্টিগুলোই বাঁচিয়ে রাখবে একজন কিংবদন্তীকে।

সুশীলদের নিয়ে অনেক কথা হলো। এবার আসি একটু বিজ্ঞ লোকেদের ব্যাপারটায়।

আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে হাসাহাসি করা মানুষের অভাব পরশু রাত পর্যন্তও ছিলো না। কিন্তু এখন বড্ড অভাব। আমার এদের জন্য অনেক কষ্ট হয়। কারণ এদের সমালোচনা আইয়ুব বাচ্চুকে একটুও থামাতে পারবে না। যারা দিনের পর দিন মানুষটাকে ট্রল করে গেছে তাদের বলবো পারলে স্টেজে দাঁড়িয়ে এমন গিটার প্লে করার সাহস করে আগে দেখাও পরে সমালোচনা করবে।
আমরা যারা দিনরাত গিলমোর কিংবা স্ল্যাশকে নিয়ে পরে থাকি তাদের বলতেই হয় আইয়ুব বাচ্চু না থাকলে কোনদিন এদের নামটাও জানা হতো না। ছয় তার দিয়ে কি করা সম্ভব এটা কোনদিন মাথায়ও আসতো না। এই দেশে ব্যান্ড মিউজিক প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান যে অপরিসীম।

আইয়ুব বাচ্চু চলে গেলেও ঠিকই রয়ে গেছে তাঁর সকল সৃষ্ট আর জাদু। এই সৃষ্টিগুলো থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আমাদেরকে অনেক অনেক দূরে যেতে হবে। সুশীল সমাজের সুশীল ব্যক্তিদেরকে ব্যান্ড মিউজিকের ব্যাখাটা বুঝিয়ে দিতে হবে। কতদিন অবহেলিত হয়ে থাকবে এই সোনার খনিটা? একদিন ঠিকই পুরো দেশের সকল মানুষ বুঝবে এই খনিতে কতটুকু সোনা আছে।

আমরা স্বর্গে যেতে পারবো না আর এজন্যই গুরু আপনাদের সাথে আর কোনদিন দেখা হওয়ার সুযোগ নেই। জীবনটাকে রাঙিয়ে দেবার জন্য আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো। আজম খান যাদের নিয়ে শুরু করেছিলেন তাঁরা একজন একজন করে নতুন ঠিকানায় পাড়ি জমাচ্ছেন। আমাদেরকে হাল ধরতে হবে। হাল ধরার সময় যে চলে এসেছে। আপনারা যখন ঐ ঠিকানায় “বাংলাদেশ,বাংলাদেশ” বলে চিৎকার করবেন আমরা তখনো এখানে বসে যুদ্ধ করে যাবো বিজয়ের আশায়। তবে একদিন বিজয় ছিনিয়ে আনবোই কথা দিলাম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 47 = 53