নাস্তিক্যবাদের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোন ধর্মকে ছোট করা নয় (৯ম পর্ব)

বাংলাদেশে মৌলবাদের জন্ম ও বিকাশের ইতিহাস এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

বাংলাদেশের ক্ষমতায় হোসেন মুহাম্মদ এরশাদ আসার পরেই বাংলাদেশে যে কাজটি সবার আগে করেছিলো তা হচ্ছে তার সমস্ত অপকর্মের ধর্মীও বৈধতা দিতে হবে এই শর্তে বাংলাদেশের মোল্লা রাজনীতিকে একেবারেই লাইসেন্স দিয়ে দিলো। ধর্মনিরাপেক্ষ বাংলাদেশকে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে রুপান্তর করার বৈধতা দিতে বাংলাদেশের সংবিধান পরিবর্তন করে এই এরশাদ রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম যোগ করেছিলো। যে কাজটি ছিলো সম্পুর্ণ ভাবে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের বিপরীতে বাংলাদেশকে ধর্মীও রাষ্ট্রে রুপান্তরের একটি বড় ধাপ। এই এরশাদ এতটায় নির্লজ্জ প্রকৃতির মানুষ ছিলেন যার প্রমাণ পাওয়া যায়, তার বিরুদ্ধে যখন বাংলাদেশের নাগরিকেরা গনআন্দোলন শুরু করলেন তখন মানুষের চোখে ভালো সাজার জন্য সে প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজ আদায় করার জন্য একেক দিন একেকটি মসজিদে গিয়ে উপস্তিত হতেন এবং নামাজ পড়তেন। নামাজ শেষে উপস্থিত জনগনকে বলতেন গতরাতে আল্লাহ আমাকে স্বপ্নে দেখিয়েছেন যে আমি এই মসজিদে নামাজ আদায় করছি তাই আজ আমি আপনাদের সাথে নামাজ আদায় করতে এসেছি। কিন্তু এদিকে দেখা যায় যে এরশাদ আসবে বলে বেশ কিছুদিন ধরেই মসজিদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করছিলো সরকারি লোকজন।

শুধু তাই না প্রকাশ্যে রাষ্ট্রীয় হেলিকপ্টার ব্যাবহার করে এরশাদ বাংলেদেশের যত অশিক্ষিত এবং ভন্ড পীর ছিলো তাদের কাছে গিয়ে ছবক নেওয়া শুরু করেছিলো। এককথায় ধর্মকে ব্যাবহার করে এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে পীরতন্ত্র প্রবেশ করিয়েছিলো। এরপরে যখন এরশাদের পতন ঘটলো তখন তত্বাবধায়ক সরকারের সময় নির্বাচনী প্রচারে জাতীয়তাবাদী দল বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ধর্মকে ব্যাবহার করে বিভ্রান্তি ছড়াতে থাকলো এই বলে যে, বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত স্বাধীনতার পক্ষের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে যদি ভোট দেওয়া হয় তাহলে দেশে আর কোন মসজিদ অবশিষ্ঠ থাকবে না কারণ আওয়ামী লীগ হচ্ছে ভারতের দালাল তারা ইসলাম ধর্মের ধ্বংশ চাই। যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে তাহলে মসজিদে মসজিদে হিন্দুরা উলু দেবে এবং বাংলাদেশ ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিনত হবে, এমন অপপ্রচার শুরু করে বাংলাদেশের জনগনকে বিভ্রান্ত করা হয়। এখানে বলতেই হয় যে তারা এই ভাবে রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যাবহার করে ক্ষমতায় পৌছতে পেরেছিলো এবং ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই তারা ধর্মের ব্যাবহার আরো বাড়িয়ে দিয়েছিলো। প্রতিটি রাষ্ট্রীয় আচার অনুষ্ঠানে ধর্মের ব্যাবহার বাড়তে থাকলে, কোন অনুষ্ঠান শুরুর আগে কোরান থেকে তেলাওয়াত দিয়ে শুরু করা, ভাষণ দেবার আগে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ দিয়ে শুরু করা যেনো একটি অলিখিত বাধ্যতা হয়ে গেলো।

এমন পরিস্থিতিতে দেখা গেলো আওয়ামী লীগও একটা সময় ভোটের রাজনীতির কারণে বা তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিরোধী দলের প্রচারনার জবাবে তাদের রাজনৈতিক বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানেও ধর্মের ব্যাবহার বাড়িয়ে দিলো এবং নিজেদের মধ্যে নানা ভাবে ধার্মিকতা প্রদর্শন করা শুরু করে দিলো। এভাবেই কিন্তু সবাই ধর্মকে ব্যাবহার করতে করতে ধর্মটা বাংলাদেশের মানুষের একদম গভীরে ঢুকতে শুরু করলো। এই সময় বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে নির্বাচনে সীমাহীন কারচুপির মাধ্যমে ও একটি দলীয় সরকারের অধীনে প্রতিটি উপনির্বাচনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুললো। এই সময় আন্দোলন করতে একত্রে সীদ্ধান্ত নিতে হলো আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামকে যখন বিএনপি একতরফা একটি নির্বাচন করলো। নির্বাচনের পরেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হলো এবং এই সময়ে বিএনপির চরম ব্যার্থতার ফলে নতুন করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পট পরিবর্তন হয়ে গেলো। মুক্তিযুদ্ধের পরে ক্ষমতা হারানো স্বাধীনতার পক্ষের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ একটা সুদীর্ঘ সময় পরে আবারও বাংলাদেশের ক্ষমতা ফিরে পেলো।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ফিরে পেলেও তারা বিএনপির বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আন্দোলনে জামায়াত এর সাথে হাত মিলিয়ে কি ভুল করে ছিলো তা এই রাজনৈতিক দলটির নেতৃত্বে থাকা সকলেই বুঝতে পেরেছিলো কিনা বা আজও তারা বোঝে কিনা সেটা বাংলাদেশের জনগনের পক্ষে এখনও বোঝা মুশকিল। আওয়ামী লীগ তৎকালীন সময়ে আন্দোলনের সময় যে অঘোষিত ঐক্য গড়েছিলো এই জামায়াতে ইসলামের সাথে সেটা ছিলো ধর্ম নিরাপেক্ষা রাজনীতির জন্য একটি চরম ক্ষতি তা হয়তো তারা পরবর্তীতে কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পেরেছিলো। এমন একটি ভুল করার পরেও আওয়ামী লীগ যা করলো তা হচ্ছে দেশের রাজনৈতিক আচরনে এমন কিছু পরিবর্তন আনলো যা প্রকারান্তরে একপ্রকারের ধর্মীয় রাজনীতিকেই উৎসাহিত করে। স্বাধীনতার পক্ষের রাজনৈতিক দল হবার পরেও ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ মুক্তিযূদ্ধের চেতনাকে পুনর্বাসনের তেমন কোন উদ্যোগই গ্রহন করলো না বরং তার বিপোরীতের সেই পাকিস্তানি ইসলামী মৌলবাদীদের মতো প্রতিটি ক্ষেত্রেই এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কার্যক্রমে ধর্মের ব্যাবহার আরো বাড়িয়ে দিলো। তারা এই সময়ে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করা শুরু করে দিলো পূর্ণোদ্যমে শুধু তাই নয় জাতীয় সংসদে প্রতিটি সংসদ সদস্যকে টুপি পরে বসার অলিখিত নিয়ম চালু করে ফেললো এবং প্রতিটি বক্তব্যের শুরুতেই সবাইকে জোর গলায় বিসমিল্লাহ বলে শুরু করার জন্য উৎসাহ প্রদান করা শুরু করলো।

বস্তুত এই সময় আওয়ামী লীগের মধ্যেও প্রকাশ পেয়েছিলো ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি যা ছিলো স্বাধীনতার পরিপন্থি, কারণ ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে তারা রাষ্ট্রীয় যে কোন আচার অনুষ্ঠানের আগেই ধর্মীয় সব রীতিনীতি অনুসরণ করা শুরু করেছিলো শুরুতেই বিসমিল্লাহ বলা, কোন কিছুর ভিত্তি প্রস্তর উদ্ধোধন করতে গিয়ে মোনাজাত করা, প্রতিবছর রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের হজ্জ্ব পালন করা সহ নানা ধর্মীও কর্মসূচি পালন করার ফলে দেশের মানুষ অন্যান্য ধর্মীও রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আওয়ামী লীগের পার্থক্য নির্ণয় করতে ব্যার্থ হচ্ছিলো। এই সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর তৈরি স্বাধীনতার পক্ষের ধর্মনিরাপেক্ষা রাজনৈতিক দল মূলত বাংলাদেশে ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতিকেই বৈধতা প্রদান করছিলো। এতো কিছুর পরও এই সরকারের তখন মনেই ছিলো না যে এরশাদ বাংলাদেশের সংবিধান পরিবর্তন করে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম করে রেখেছিলো যা তারা পরিবর্তন করলো না ঠিক বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন যেভাবে পরিচালিত করেছিলো সেভাবেই হতে লাগলো। এতো ধর্ম কর্ম করেও কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে পারলো না এবং সেই সাথে ধর্ম পালন করে যেসব ধর্মীও গোষ্ঠীর মন জয় করতে চেয়েছিলো তাদের মনও জয় করতে ব্যার্থ হলো। এই ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ আওয়ামী লীগকে নেতিবাচকই মনে করতে থাকলো।

চলবে……

-মৃত কালপুরুষ

০৭/১১/২০১৮

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “নাস্তিক্যবাদের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোন ধর্মকে ছোট করা নয় (৯ম পর্ব)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

34 − = 24