নাস্তিক্যবাদের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোন ধর্মকে ছোট করা নয় (৮ম পর্ব)

বাংলাদেশে মৌলবাদের জন্ম ও বিকাশের ইতিহাস এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

১৯৭১ সালে মৌলবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে প্রায় ৩০ লক্ষ প্রাণ ও ২ লক্ষ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাকিস্তান নামক একটি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে জাতীয়তাবাদের আন্দোলন করে জন্ম হয়েছে আমাদের এই মাতৃভুমি বাংলাদেশের। শুরুতে বাংলাদেশের সংবিধানে তাই ধর্ম নিরাপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র যোগ করা হয়। সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দরিদ্র দেশের জন্য এই চারটি আদর্শ অনুসরণ করে একটি রাষ্ট্র গঠন করা যে কতটা কঠিন কাজ তা বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি অংশ খুব ভালোভাবেই জানতেন। কারণ পার্শবর্তি দেশ ভারত তখন প্রায় ২৫ বছরের স্বাধীনতাতেও ততটা সাফল্য দেখাতে পারেনি, এমনকি ইউরোপ, আমেরিকার ইতিহাস দেখলেও দেখা যাবে সেসকল দেশগুলো জ্ঞান বিজ্ঞানে চর্চা এবং শিক্ষার মান অনেক আধুনিক হবার পরেই এসব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলো, যেখানে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য যে ভান্ডার ছিলো একেবারেই শুন্য। এই সময়ে সঙ্গত কারণেই তৎকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যথাযথ ভাবে রাষ্ট্র গঠনে তার প্রয়োগ করতে পারবে কিনা সেটাও সকলের জানা ছিলো। ফলাফল হলো রাজনৈতিক নেত্রিত্ব এসব উপলব্ধি করতে ব্যার্থ হলো। এতে করে যা হলো তা হচ্ছে স্বল্প শিক্ষিত একটি জনগোষ্ঠি এই বাঙ্গালী জাতি তাদের এই বৃহৎ অর্জনের সঠিক তাৎপর্য বুঝতে ব্যার্থ হলো।

এই সময়ে বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্র গঠনের স্বার্থে অনেকটা বাধ্য হয়েই ধর্মনিরাপেক্ষ এই বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষাকেই স্বীকৃতি দেওয়া শুরু করেছিলো। তখন বাঙ্গালী জাতির হৃদয়ে যে কাচাঁ ক্ষত তাতে সদ্য স্বাধীন দেশের প্রতিটি নাগরিকই জানতেই স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধীতাকারীদের ৯০% এর বেশি এই মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকরাই ছিলো। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর সাথে তারাই কাধে কাধ মিলিয়ে আন্দোলনকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে। এই বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনিতে তিনি বেশ কয়েকবার উল্লেখ করেছেন এই মাদ্রাসা ছাত্র ও শিক্ষকদের বিভিন্ন সভা সেমিনারে তিনি এই কথা অত্যান্ত দুঃখের সাথে তাদেরকে বলেছেন। এরপরে যা হবার সেটাই হয়েছিলো, বাংলাদেশ সরকার সৃষ্টি করলেন ইসলামী ফাউন্ডেশন নামের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। শুরুতে ইসলামিক ফাইন্ডেশন কিছুটা সদ্য যোগ হওয়া সংবিধানের আদর্শ গুলো অনুসরণ করলেও পরবর্তি কয়েক বছরের মধ্যেই তা পরিনত হয়েছিলো ধর্মীয় মৌলবাদীদের উন্নতম একটি ঘঁটিতে যা বর্তমান সময়ের মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই অস্বীকার করতে পারেনা। মাত্র ৪ বছরের মধ্যেই তার প্রথম পরিবর্তন লক্ষ করেছিলো বাঙ্গালী জাতি ১৯৭৫ সালে। কারণ ১৯৭৫ সালের আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক কোন রাজনৈতিক দল ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার স্বাধীনতা পায়নি। একটি রাষ্ট্রের নীতিমালাতে যখন ধর্মনিরপেক্ষতা উন্নতম হয়ে থাকে তখন সেই রাষ্ট্রে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়ে থাকে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট এক ভয়াবহ হত্যাকান্ডের মাধ্যমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরে যারা ক্ষমতায় এসেছিলেন তারা এই ধর্মীয় অনুভুতি নিয়ে বাংলাদেশের জনগনের সামনে হাজির হলো এবং ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন যোগাতে সবার আগেই সেই অপকর্মের বৈধতা দিয়ে দিলো। এরপরেই জনগনের সামনে ইসলামের ঝান্ডা হাতে মাথায় কালো টুপি পরে হাজির হয়েছিলেন মোস্তাক, যার প্রতিবিপ্লবে একপ্রকারের সুবিধাভোগী ক্ষমতাসীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ধর্মনিরাপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র তুলে দিলেন। শুরু হলো বাংলাদেশের এক নতুন অধ্যায়। আধুনিক শিক্ষা এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রচার এবং প্রসারের অভাবে বাংলাদেশের নাগরিকরা তখন এমন একটি অপকর্মের বিরুদ্ধে কোন কথা বলেছিলেন কিনা আমার জানা নেই। সঙ্গত কারনেই তখন নৃতাত্বিক বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের পরিচয় বাদ হয়ে চলে আসলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। সেই সাথে অর্থনৈতিক নীতিমালায় নিয়ে আসলেন পুজিবাদী বিকাশ যা তৎকালীন বাংলাদেশের সঠিক উন্নয়ন কৌশলকে ব্যাহত করেছিলো। সেই ১৯৪৭ সালে পশ্চিমপাকিস্তানে দাঙ্গা সৃষ্টিকারী ধর্মীয় রাজনৈতিক দল জামাতে ইসলাম সহ আরো কয়েকটি ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার অনুমোদন দেওয়া হলো। এই সময়ে বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমার পরেও যেসমস্ত যুদ্ধাপরাধীরা বিচারের অপেক্ষায় ছিলো তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হলো।

এরপরেই জামাতে ইসলামের যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমকে দেশে ফিরিয়ে এনে তাকে রাজনীতিতে স্থান দেওয়া হলো। শুরু হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভুল প্রমাণ করে আবারও পাকিস্তানের মতো ইসলামী প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র হিসাবে গঠন করার জোর চেষ্টা। এই কাজে এসব ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণাকে তীব্র থেকে তীব্রতর করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম মোড়ল দেশ গুলো থেকে আর্থিক সাহায্য আসতে থাকলো বিশেষ করে সৌদিআরব থেকে। সৌদিআরব যার ফলাফল স্বরুপ আজ বাংলাদেশিদের অর্জন করা অর্থ হাতিয়ে নিতে পারছে হজ্ব্ব ব্যাবসার মাধ্যমে। জনগনের ধর্মীয় রাজনীতিকে স্বীকৃতি দিয়ে জনগনের সমর্থনের জন্য সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান তার যেকোন বক্তব্য শুরু করার আগেই প্রাকশ্যে বলা শুরু করলেন “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম”। তৎকালীন বাংলাদেশের প্রতিটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল পুর্ণদমে শুরু করলে রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যাবহার করা। এরপরেই জিয়াউর রমানের হত্যাকান্ড ঘটে। এবার স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষমতায় জিয়াউর রহমান এর হত্যাকান্ডের পরে আসে আরেকটি তুলনাহীন চরিত্রের শাসক হোসেন মুহাম্মদ এরশাদ, যিনি ক্ষমতায় এসেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যাবহারের মাত্রা দীগুন করে দিলেন কারণ তার একটিই উদ্দেশ্য ছিলো, আর তা হচ্ছে তার যত অপকর্ম আছে তার সবটাকেই বৈধতা দিতে হবে।

হোসেন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় এসে যে কাজটি করলেন তা ছিলো সম্পুর্ণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থী। এরশাদ বাংলাদেশের সংবিধানে যোগ করে দিলেন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম যা বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ একটি স্বপ্নের বাংলাদেশ গঠনের বিরুদ্ধে তার ষোল কলা পুর্ণ করে তৈরি করা হলো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র। এখানে ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্র তৈরি করার থেকে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে রুপান্তর করা হলো কথাটি ভালো মানায়। যে কারনেই আমি মনে করি বাংলাদেশের মৌলবাদের উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে পুর্ণ ধারনা পেতে হলে শুধু বাংলাদেশের ইতিহাস নয় সবার আগে আমাদের সেই ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের গঠন থেকে শুরু করে সমস্ত ইতিহাস পড়া উচিৎ। তাহলেই জানা এবং বোঝা সম্ভব কেনো আজকের দিনে এই ২০১৮ সালে এসেও ধর্মীও মৌলবাদীদের প্রধান আক্রমনের বিষবস্ত থাকে শুধু মাত্র বাঙালী সাংস্কৃতিতে। কেনো আজ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জাতীয় সঙ্গীতের বিরোধীতা করে, কেনো আজ ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণ করা বন্ধ করতে বলে এবং শহীদ মিনার ভাঙ্গচুর করে, কেনো আজ তারা বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখের বিরোধীতা করে থাকে। বর্তমানে বৃহৎ অনলাইন প্লাটফর্ম ফেসবুকের কল্যানে এই প্রজন্ম অনেক আধুনিক সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের যারা মুক্তভাবে এসব বিষয় চিন্তা করতে পচ্ছন্দ করে এসব ধর্মীয় গোড়ামী আর কুসংস্কারের বিরোধিতা করে, নাস্তিক্যবাদের চর্চা করে তাদের কাছ থেকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই জাতীয় তথ্য লুকিয়ে রাখতে চায়। তাই আমার মতে ইতিহাস থেকে ধর্মীয় মৌলবাদীদের সুত্রপাত নিয়ে কথা বলাটাই বেশি জরুরী। কারণ নাস্তিক্যবাদের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোন ধর্মকে ছোট করা নয়। ৯ম পর্বে বাংলাদেশে মৌলবাদের বিকাশের আরো কিছু মজার তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করবো।

চলবে……

৯ম পর্বের লিংক

-মৃত কালপুরুষ
২৪/১০/২০১৮

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “নাস্তিক্যবাদের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোন ধর্মকে ছোট করা নয় (৮ম পর্ব)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1