মুক্তিযুদ্ধ, ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:- প্রথম পর্ব-

পৃথিবীর ইতিহাসে যে দিনগুলি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে তার অন্যতম হল 1971 সালের 16 ই ডিসেম্বর। কারণ এইদিন এক শোষিত, নিষ্পেষিত জনপদ নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগ ও সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জন করেছিল কাঙ্খিত স্বাধীনতা! ঐতিহাসিক আঙ্গিকে দেখলে বলা যায় প্রায় তিরিশ লক্ষ মানুষের রক্ত ও দুই লক্ষের অধিক নারীর সম্ভ্রম ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় এই কাঙ্খিত স্বাধীনতা! এখন প্রশ্ন হল হঠাৎ এই স্বাধীনতার দাবি উঠল কেন? নতুন প্রজন্ম এই ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষ অবগত নয় তাই তাদের স্বার্থে সেই প্রেক্ষাপট ফিরে দেখা। প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ধর্মের ভিত্তিতে 1947 সালের 15 ই আগস্ট ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান রূপে দুই স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ধর্মের ভিত্তিতে এই দেশভাগ কখনোই কাঙ্খিত ছিল না কিন্তু কি আর করা যায় ভারতবাসী চিরকাল ধর্মভীরু, তাই ধর্মের বিষাক্ত ছোবলে হাজার হাজার বছরের ভাতৃত্ববোধ ত্যাগ করে রক্তের বিনিময়ে দেশভাগের গরলসুধা পান করে অর্জিত হয় এই কাঙ্খিত স্বাধীনতা!

বলাই বাহুল্য অধুনা মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশ তখন পরিচিত ছিল পূর্ব পাকিস্তান রূপে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ভেবেছিল নতুন দেশে তারা মর্যাদার সঙ্গে জীবন নির্ধারণ করবেন। কিন্তু সময় বড়ই নিষ্ঠুর পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানকে তার উপনিবেশের অধিক কিছু মনে করত না। আসলে কৃষ্ণকায়, খর্বাকৃতি, বাংলাভাষীদের পশ্চিম পাকিস্তানিরা মনে প্রাণে ঘৃণা করত। তারা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে শাসন ক্ষমতা লাভের অযোগ্য মনে করত। অথচ ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই দেশে মুসলিম মুসলিম ভাই ভাই হওয়ারই কথা ছিল কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখি? পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাকে অস্বীকার করে, তাদের মতে উর্দুই হল প্রকৃত রাষ্ট্রভাষা। আসলে সাচ্চা মুসলমান হতে গেলে উর্দুকেই করতে হবে ভবিতব্য। আর পশ্চিম পাকিস্তানিদের এই দমন পীড়নের বিরুদ্ধে শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। এভাবে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের ক্ষোভ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

এরই চরম বর্হিপ্রকাশ ঘটে 1970 সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হওয়া পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এই নির্বাচনে অভূতপূর্ব ফলাফল প্রকাশিত হয়, পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি মোট 138 টি আসনের মধ্যে 81 টি আসন নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে; অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ মোট 162 টি আসনের মধ্যে 160 টি আসন জয় লাভ করে। তাই সংখ্যার বিচারে সমগ্র পাকিস্তানের মোট 300 টি আসনের মধ্যে 160 টি আসন আওয়ামী লীগ জয় লাভ করে। তাই সংখ্যার বিচারে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগের শাসন ক্ষমতালাভ ন্যায়সঙ্গত ছিল কিন্তু ভুট্টো মুজিবকে ক্ষমতা প্রদানে সম্মত ছিল না। ভুট্টোর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান জরুরি অবস্থা জারি করেন ও পাক সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানিরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।

এই সময় পূর্ব পাকিস্তানের সর্বোচ্চ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে 7 ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন- “আমরা তাদের ভাতে মারবো, আমরা তাদের পানিতে মারব। রক্ত দিয়েছি আরও দেব এই বাংলাকে স্বাধীন করেই ছাড়ব! তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ো! এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম! জয় বাংলা!” এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ সর্বতোভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর ফলে রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়। 1971 সালের 26 শে মার্চ, পাক সেনাবাহিনী মুজিবকে গ্রেফতারের আগের মুহূর্তে তিনি ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন। এই মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘ নয় মাস চলে। এই মুক্তিযুদ্ধের প্রতিক্রিয়া হয় খুবই ভয়ংকর।

এক কোটির অধিক, কোন কোন সূত্র মতে দুই কোটির ও অধিক মানুষ নিজের প্রাণ বাঁচাতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি এই সময় কতটা ভয়াবহ ছিল তার বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু কথা বলি- আমার বাবার মুখে শোনা, আমার এক বড় কাকা (চাচা) কর্মসূত্রে পূর্ব পাকিস্তানে থাকতেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মূহুর্তেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজকাররা বাংলাভাষীদের অবর্ণনীয় ভাবে হত্যা করতে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনী সাধারণ মানুষকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি চালাতো যাতে গুলির খরচ কম হয়। আমার এই কাকাকেও এইরকম লাইনে দাঁড় করানো হয় কিন্তু কাকা ভারতীয় হওয়ার সুবাদে খুব ভালো হিন্দি বলতে পারতেন। তখন এক পাকিস্তানি সেনা প্রশ্ন করেন – ‘আপ কাহাকে রহনে বালে হ্যাঁ?’ কাকা প্রত্যুত্তর দেয় ‘লাহোর কি রহনে বালা হ্যাঁ’। তখন সেনা অফিসার বলেন- ‘লাহোর জানে কি বিমান ওহ্যা হ্যাঁ আপ উধার যায় য়ে’ একথা বলে লাইন থেকে কাকাকে বের করে দেয় এবং আমার কাকার চোখের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সমস্ত মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। কাকা কোন ক্রমে পাকিস্তানি সেনার নজর এড়িয়ে পাশের জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করে এরপর রুদ্ধশ্বাসে দৌড়তে থাকে। সে দৌড়ের যেন কোন শেষ নেই, রাত দিন শুধু দৌড়। পথে নদী নালা জঙ্গল পেরিয়ে আসে। সেখানে দেখেন শুধু মানুষের সারি সারি মৃতদেহ গুলিকে কুকুর শেয়াল ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে! কোথাও দেখা যায় শেয়াল কুকুরেরা ছোট্ট শিশুর মাথা কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে, কল্পনা করুন কি নিদারুণ দৃশ্য! শেষে অতিকষ্টে ভারতীয় সীমান্তে এসে পৌঁছান। এরপর কাকার ভাষায় ‘কোনক্রমে প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি’।

পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের এই নরসংহারের ঘটনা সর্বতোভাবে চেপে যায়। এই ঘটনা প্রথম বিশ্বের সম্মুখে আসে অ্যান্থানি ম্যাসকেরানাসের সৌজন্যে। এই সাংবাদিককে পাকিস্তানি সেনা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে যায়, তাদের উদ্দেশ্যে ছিল পাকিস্তানি সেনা পূর্ব পাকিস্তানে কত ভালো করছে তা দেখানো। কিন্তু ম্যাসকেরানাস সেখানে হাড় হিম করা যে ঘটনাগুলি দেখেন, তাতে তাঁর অন্তরত্মা নড়ে যায়! তিনি চুপিসারে এক প্রতিবেদন লিখে ব্রিটেনের বিখ্যাত সংবাদপত্র The Sunday Times এ পাঠান। 1971 সালের 13 ই জুন The Sunday Times এ প্রতিবেদনটি ছাপা হয়- ‘GENOCIDE’ শিরোনামে, সেখানে আরো লেখা হয় “Bangladesh war: The article that changed history”. এই প্রতিবেদনটি যখন বিশ্বের দরবারে আসে তখন বিশ্ববাসী কেঁপে ওঠে। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের ইহুদি নিধন যজ্ঞের পর বিশ্বের ইতিহাসে সর্বাধিক বর্বর ও নৃশংস হত্যাকান্ড বাংলাদেশে সংগঠিত হচ্ছিল! অথচ বিশ্ববাসীর এ সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিলো না। বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিশালী দেশ এই ঘটনাটি দেখে বিশেষ প্রতিক্রিয়া না দেখালে ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেন।

আসলে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ আমার কাকার মত সৌভাগ্যবান ছিলেন না! পাকসেনা ও রাজাকার বাহিনী মানুষকে ধরে ধরে গণহত্যা ও গণধর্ষণ চালিয়ে যেতে থাকে। প্রাণ বাঁচাতে এক কোটির অধিক মানুষ ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করে। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের ভরণপোষণ তৎকালীন স্বল্পউন্নত ভারতের অর্থনীতির পক্ষে বেশ কঠিন ছিল। তবুও ভারত তার নৈতিক কর্তব্য পালনে কখনও পিছপা হয়নি। স্বভাবতই পূর্ব পাকিস্তানের এই সমস্যা ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে উদ্বিগ্ন করতে বাধ্য করে। ইন্দিরা গান্ধী বাঙালী জনগোষ্ঠীর উপর ঘটে চলা এই গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রচার করেন এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানের কুকীর্তি তুলে ধরেন। যদিও এর ফলে আন্তর্জাতিক বিশ্বে বিশেষ প্রভাব পড়েনি সকলে এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এড়িয়ে যেতে চাই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের বন্ধুত্ব ছিল সর্বজনবিদিত। মার্কিন সামরিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ সহযোগি ছিল। পাকিস্তানের বিদেশনীতি প্রথম থেকেই মার্কিন ঘেঁষা। তাই তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবিষয়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে চান নি। বরং নিক্সন চীনের সহায়তায় ভারতে সৈন্য প্রেরণের মাধ্যমে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিতে চেয়েছিলেন। আসলে ভারতের বিরুদ্ধে চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের গোপন বোঝাপড়া ছিল। তাই ভারতের পক্ষে এই শক্তি আঁতাত ভেদ করে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সহায়তা করা ছিল ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ! তবে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী একটি বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন এই গণহত্যা কোন ভাবেই চলতে দেওয়া যাবে না, তার জন্য যা করার তিনি সব করতে রাজি ছিলেন। শ্রীমতি গান্ধীর এই পর্বত প্রমাণ অটল বিশ্বাস ও প্রয়োজনে সুপার পাওয়ার আমেরিকার বিরুদ্ধে ও লড়াই করার সৎসাহস ভারতকে লড়াইয়ের ময়দানে অনেকাংশে এগিয়ে রাখে।

পূর্ব পাকিস্তানের এই সমস্যা আর পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় ছিল না কারণ প্রায় এক থেকে দুই কোটির অধিক মানুষ শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করে যা ভারতের অর্থনীতির উপর চাপ সৃষ্টি করে তাই শ্রীমতি গান্ধী এই লড়াইয়ের দ্রুত পরিসমাপ্তি চান। তাঁর মনে শরণার্থীদের প্রতি সহানুভূতি ছিল তিনি নিজে শরণার্থী শিবিরে গিয়ে কাজকর্ম নিরীক্ষণ করতেন এবং তাদের আস্বস্ত করে 1971 সালের মে মাসে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বলেন- “আপনারা অন্যায় ও অত্যাচার থেকে বাঁচতে আমাদের দেশে এসেছেন কিন্তু অন্যায় ও অত্যাচার থেকে মুক্তি তখনই সম্ভব যখন সেখানে থেকে তার বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব। আমাদের দেশ গরীব ঠিকই কিন্তু কোন সমস্যা হলে সদা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। এইজন্য আমার পক্ষে যা সম্ভব সমস্ত কিছুই আপনাদের জন্য করব”। এরই সঙ্গে 1971 সালের 24 শে মে লোকসভায় শ্রীমতী গান্ধী বলেন- “ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কখনো হস্তক্ষেপ করেনি, যদিও পাকিস্তান তা বেশ কয়েক বার করেছে। আজ যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বলা হচ্ছে তা ভারতের ও অভ্যন্তরীণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এইজন্য আমরা পাকিস্তানকে বলতে চাই অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে যা ঘটানো হচ্ছে তা তৎক্ষণাৎ বন্ধ করা হোক। এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সুস্থিতির জন্য ও উদ্বেগজনক। পাকিস্তানকে এই নরসংহার চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়”!

পরিস্থিতি ক্রমশ ভারতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। তাই শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এই বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। সেই উদ্দেশ্যে 1971 সালের 25 শে এপ্রিল ইন্দিরা গান্ধী ক্যাবিনেটের বিশেষ মিটিং ডাকেন। এই মিটিংয়ে আর এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিত্বকে ডাকা হয় তিনি ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর স্থল সেনাপ্রধান- জেনারেল শ্যাম মানিকশও। তিনি মানিকশওকে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেন বস্তুত ইন্দিরা গান্ধীর ইচ্ছা ছিল এক মুহূর্ত ও অপেক্ষা না করে পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ। মানিকশও এতে রাজি হননি, তিনি বলেন ভারত এখন যুদ্ধের জন্য তৈরী নয় তাই সময় প্রয়োজন। অন্যদিকে চীনের আক্রমণ ও আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ও সম্ভাবনা ছিল। সেইসঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানে বর্ষা আগত হওয়ার ফলে এই সময় যুদ্ধ হলে ভারতের পরাজয়ের সমূহ সম্ভাবনা বর্তমান। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যুদ্ধ হবে ঠিকই কিন্তু সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হবে, ততদিন ভারতীয় সেনাবাহিনী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সমর্থন আদায় করবেন।

এখানে এক মজাদার ঘটনা উল্লেখ্য ইন্দিরা গান্ধী মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে পূর্ব পাকিস্তানের বিষয়ে হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানান কিন্তু নিক্সন মিত্র দেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কিছু করতে রাজি ছিলেন না। ইন্দিরা গান্ধী এই নিয়ে নিক্সনের প্রতি যারপরনাই ক্ষুব্ধ ছিলেন তিনি নিক্সনকে বার্তা দিতে চেয়েছিলেন এবং সেই সুযোগও ইন্দিরার কাছে এসে পড়ে। ঘটনাটি ঘটেছিল এইরকম মার্কিন রাষ্ট্রিয় সুরক্ষা সচিব হেনরি কিসিঞ্জার ভারতে আসেন। 1971 সালের 8 ই জুলাই হেনরি কিসিঞ্জার কে ইন্দিরা গান্ধী প্রাতরাশের জন্য আমন্ত্রণ জানান, সেই একই সময় ইন্দিরা গান্ধী জেনারেল মানিকশওকে আমন্ত্রণ জানান কিন্তু মানিকশওকে ইন্দিরা বলেন আপনি অবশ্যই আর্মির পোশাকে আসবেন। বিষয়টি মানিকশওর কাছে বিস্ময়কর মনে হয়, প্রাতরাতের আমন্ত্রণে কেন আর্মি পোশাক পরে যেতে হবে এটা তিনি বুঝে উঠতে পারিন নি! যথা সময়ে মানিকশও আর্মি পোশাকে উপস্থিত হন এবং প্রাতরাশ শুরু হয়।

ইন্দিরা কিসিঞ্জারকে অনুরোধ করেন আমেরিকা পূর্ব পাকিস্তানের বিষয়ে কিছু করুক। কিসিঞ্জার নিজের অপারগতা প্রকাশ করেন। এর প্রত্যুত্তরে শ্রীমতি গান্ধী বলেন- “আমেরিকা কিছু না করলে যেটা আমি চাই না সেটা করতে বাধ্য হব”! কিসিঞ্জার তখন বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেন আপনি কি বলতে চান? তখন ইন্দিরা মানিকশওকে দেখিয়ে বলেন- “আমেরিকা যদি কিছু না করে তাহলে এনাকে বলব কিছু করতে”। আর ইন্দিরার এই কথায় কিসিঞ্জার ও মানিকশও ইন্দিরার উদ্ভাবনী চেতনা দেখে অবাক হন। মানিকশও বুঝতে পারেন কেন ইন্দিরা তাকে প্রাতরাশে সেনা পোশাক পরে আসতে বলেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী প্রক্ষান্তরে আমেরিকাকে এই বার্তা দেয় ভারত কি করতে চলেছে। জনশ্রুতি আছে এই সময় আমেরিকা ভারতকে হুমকি দিয়ে বলে আমাদের জঙ্গি জাহাজ বঙ্গোপসাগরে প্রেরণ করা হবে, প্রত্যুত্তরে ইন্দিরা গান্ধী বলেন- ‘বঙ্গোপসাগরের জল মার্কিন সৈন্যের রক্তে লাল হয়ে গেলে ভারত দায়ী থাকবে না’। ইন্দিরা গান্ধীর এই শৌর্য ও বীরোচিত নেতৃত্বকে সন্মান জানিয়ে তৎকালীন বিরোধী নেতা আটল বিহারী বাজপেয়ী ইন্দিরা গান্ধীকে দেবী দূর্গার সঙ্গে তুলনা করেন! এটা ও ধীরে ধীরে সুস্পষ্ট হতে থাকে যুদ্ধ যে কোন দিন শুরু হতে পারে!

চলবে…

তথ্যসূত্র:-
1. উইকিপিডিয়া।
2. এবিপি নিউজ।
3. The Times of India.
4. Times Now News.
5. The Sunday Times.
6. History of Pakistan.
7. মনোরমা ইয়ারবুক।
8. আজতক।
9. ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত অন্যান্য তথ্যসূত্র।

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

53 − = 45