বোহেমিয়ান

রাস্তার দুপাশে শিমুল গাছ থেকে সব পাতা ঝরে পড়েছে। নিচ থেকে শাখা প্রশাখা ভেদ করে খোলা আকাশ দেখা যাচ্ছে। নিচে এবং উপরে লাল শিমুল ফুলের সমাহার। আকাশের মাঝে যেন রঙিন রঙ মিশেছে। রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে বাইরে তাকালেই যেন ঝলসে যাওয়া আগুন মনে হয় সবকিছুকে। বসন্তের ঝলসানো আগুন। কাউনিয়া রেল জংশন থেকে যখন ট্রেনকে রংপুর শহরের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় তখন এই সারি সারি শিমুল গাছ দেখা যায়। রূপন্তী সে ট্রেনেই বাড়ি ফিরছে। রূপন্তীর বাড়ি বদরগঞ্জে কিন্তু বাবা-মা রংপুরেই থাকেন বাবা শহরে চাকরি করেন বলে। রূপন্তী একাই। অর কোন ভাইবোন নেই। রংপুর রূপন্তীকে এখনও টানে। বাবা-মা কে দেখতে পরীক্ষার পরপরই চলে আসতে হবে এ যেন তার নিয়ম। তবে এবার আসতে দুদিন দেরি হয়েছে তারপরেও।
ইউনিভার্সিটির বিতর্ক দলে আছে রূপন্তী। জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির ন্যাশনাল ফেস্টে অংশ নিতে এই দুদিন চলে গেলো। রংপুরের প্রতি আকর্ষন থাকলেও এই দুদিন সেটিকে কোনরকমে বেধে রেখেছিলেন। শেষ করেই পরদিন সকালে সোজা স্টেশন। টিকেট অনলাইনে কাটা ছিলো আগেই তাই কোন সমস্যাই হয় নি। ট্রেনে কাউনিয়া পার হতেই কয়েকবার ফোন করেছে মা।
-মা, তুই কতদূর?
-কাউনিয়া ছেড়েছি মা, আর দশ মিনিট লাগবে রংপুর
তিন বছর আগে হাড়হিম শীতের সকালে আসা হয়েছিলো ঢাকায়। চারদিকের আর্দ্রতা যেন অস্বস্তিকর ছিলো। ধূলিকণা মেশা শিশির যেন ভেসে বেড়াচ্ছিলো আকাশে। যন্ত্রের প্রভাবে ঢাকার বায়ুতে উষ্ণতা বিরাজ করে। সে উষ্ণতা শীতের তোপ বুঝতে দেয় না কিন্তু তবুও যেন বেমানান প্রকৃতি। সকালে ঢাকার তাপমাত্রা উপভোগ্য কিন্তু গাবতলী থেকে সদরঘাট যেতেই ……উফ!অস্বস্তিকর। আড়াই ঘন্টার যানজট। সেই অভ্যস্ততা  তিন বছর ধরে বয়ে চলেছে রূপন্তী। এখন যে মুঠোফোনটি ব্যাবহার করে সেখানে আজ থেকে তিন বছর আগের রূপন্তীকে দেখলে অন্য রকম লাগবে। কিছুটা হ্যাংলা আর লিকলিকে দেখতে। এখন সেরকম না। গালটা কিছুটা মাংসে ভরে গেছে, গলার স্বর টা বিতর্ক করতে করতে খানিকটা চড়ে গেছে। রূপন্তীর মা মেয়েকে দেখে তারপরেও বলে,
‘আমার মেয়েটা শুকিয়ে যাচ্ছে মনে হয়’
রূপন্তী জানে এসব মায়ের দৃষ্টির মাধুর্য্যতা। মায়া মহিমার আধিখ্যেতা। তাই মাকে থামিয়ে দেয়, ‘না মা, কি যে বলো না তুমি। দেখো তো আমার আগের ছবি। এই দেখো। আমি কোথায় শুকিয়েছি?’
ওর মা ওকে দেখে যাই বলুক প্রকৃতই সে এখন বড় হয়েছে। নীলের আবরণে ওকে যেন আরো মাধুর্য্যময়ী মনে হয়। সৌধের মতো প্রগাঢ়ত্ব ওর বাহ্যিক আচ্ছাদনে ভর করে, আব্রুতে বিশেষত্ব ফুটে উঠে যেন চরম দায়িত্ববান কোন অপ্সরী। গৌড়ীয় বর্ণের প্রানোচ্ছলতা যেন মর্মে মর্মে দাগ কাটে, যেন ইচ্ছে করে দেবীকে ছুঁয়ে দেখি!   
খোলাহাটি ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে পড়ার সময়ের একটি ছবি মায়ের ঘরের দেয়ালে টানানো আছে। একটি মাত্র মেয়ে; মা তাই ওকে ছাড়া কিছু ভাবতেই পারে না। দেয়ালের ছবিটা বলে দিচ্ছে, সেদিনকার ছোট্ট রূপন্তী আজ কত বড় হয়েছে। ছবিটা সম্ভবত ক্লাস নাইনের। এরপর অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। খোলাহাটি ক্যান্টনমেন্টের বন্ধু বান্ধবীরা অনেকে হারিয়ে গেছে। কে কোথায় আছে তার খুব অল্পই এখন জানাশোনার মধ্যে আছে। তবে হ্যা, ফেসবুক এরকম দূরত্ব কিছুটা ঘুচিয়েছে। তবে সেটাও আনুষ্ঠানিক সামাজিকতাই এখন। খুব ঘনিষ্ঠ না হলে কারো সঙ্গেই যেন যোগাযোগ হয়ে উঠে না। কিন্তু জাহিনের সঙ্গে এতো সহজেই যোগাযোগটা বিচ্ছিন্ন হবার কথা নয়। রূপন্তীর এখনো ওকে মনে পরে। হালকা শ্মশ্রমণ্ডিত একটি ছেলে। লম্বা গড়নের। পাশ থেকে কেউ একবার শুরু না করে দিলে কখনোই ওকে কথা বলানো যায় না আবার কথা বলা শুরু করলে যেন ও থামে না। মানে অন্তর্মূখিতা আর বহির্ভূখিতার মিশ্রণ। সেই ক্লাস নাইনে ক্লাসে জাহিন এবং রূপন্তীর কথা হয়েছিলো। স্বাধীনতা দিবসের মার্চপাস্টের প্রাক্টিসে ওর সঙ্গে ভালোমতো জানাশোনা। রূপন্তীই প্রথম ওকে ডেকেছিলো,
-এ্যাই ছেলে আমাদের প্রাক্টিস কখন জানো?
-হুম, ১২ টা
এরপর স্বাধীনতা দিবসের মার্চপাস্ট, অনুষ্ঠান শেষে সবাই তখন ফিরছিলো। জাহিন সেদিন সাহস দেখিয়ে বলেছিলো,
আমি জানি তুমি তোমার মায়ের সঙ্গে কাচারিপাড়ায় থাকো। আমিও ওই পাশের পাড়ায় থাকি।
-তো?
-তো! তো কিছু না।
জাহিন ইতস্তত বোধ করছিলো। কিন্তু রূপন্তীর হাসিটা সুন্দর। ওর হাসিটা ওকে ব্যাতিক্রম করেছিলো। জাহিনের ইতস্তততা ভেঙ্গে দিয়েছিলো ঐ হাসিটাই।
রূপন্তী বলল, ‘হুম, চলো তাহলে যাই। আমিও ওদিকে যাব’
সেই জাহিন এখনো রূপন্তীকে ব্যাতিব্যাস্ত করে। জাহিন যেন ওকে বিমুগ্ধ কর, ওকে উদ্বেলিত করে। চারদিকের সব কিছুকে তুমুল ঝাপটা দিয়ে যায় এখনো। ওর একেকটি ফোনকলের প্রত্যাশায় একেকটি রাত যেন পরম আহ্লাদে অপেক্ষা করে। রূপন্তি জানে, ওর যতটা আহবান ঠিক তার থেকে ঢের বেশী আহবান রূপন্তীকে নিয়ে লালন করে জাহিন।
জাহিনের সিনেমা দেখার ঝোঁকটা দিনকে দিন থেকে বেড়েই চলছিলো। মাঝে মাঝে ভিডিওগ্রাফি করতে সে খুব পটু। জাহিনের কাছে স্মার্টফোনের কাজ শুধু ভিডিওগ্রাফি করা। হলিউড থ্রিলার দেখতে বসলে ওর দিন শেষ হয়ে যায়। তবে এখন আর অতটা দেখে না থ্রিলার। জাহিন এখন টেস্ট বদলিয়েছে। হলিউডি থ্রিলার বা হরর জন’রা এখন ওর রীতিমতো বিরক্ত লাগে। এখন হলিউডকে ও বলে ‘এসব এক্সেস এ্যাকশন, ইমোশন’।
দেশি সিনেমা নিয়ে এখনো ওর তেমন আগ্রহ তৈরি হয় নি। বলিউডের ক্লাসিক্যাল রোমান্টিক সিনেমাগুলো ওর জন্য আরামদায়ক অনুভূতি দেয়। রূপন্তিকে ভাবতে ওসব বেশ জমজমাট। এটা ওর অজান্তেই ওর মধ্যে আলোড়ন তৈরি করে। ওর বয়স্ ওকে এরকম করে ভাবায়,বোঝায়। 

রূপন্তী জগন্নাথ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাবার কিছুদিনের মধ্যে রংপুরে দেখা হয়েছিলো জাহিন এবং রূপন্তীর।। একটি অন্যরকম আকর্ষন জন্মেছিলো আজ থেকে কয়েক বছর আগে। দীর্ঘ সময়জুড়ে সে আকর্ষন যেন ভরাট  হয়েছে। ভেতরকার অদ্ভুত এক মোহ যেন ক্রমাগত বৃত্ত পূরণ করে যাচ্ছে। একেকটি অনুভূতির বৃত্ত যেন ভরিয়ে রাখছে দুজনকে। এই বন্ধন যেন রোমাঞ্চের থেকেও উন্মাদনার। হৃদস্পন্দন, শিরায় শিরায় বুদ হয়ে থাকার জন্যে যেন আরেকটু ‘প্রয়োজন’ বেড়ে উঠে। অস্মিতা, রূপন্তির বন্ধু। ও সবচেয়ে ভালো অভিধাটি দিয়েছিলো, ‘তোদের সবই যেন কুসুম কুসুম চলছে’।
সত্যিই তাই। মৃদুমন্দ অনুভূতির বালখিল্যতা রূপন্তীর আবহকে বহুযোজিত করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
হলুদ টিশার্ট আর নীল রঙ যেন মিশে গেছে। কনিষ্ঠাকে জাহিনের পঞ্চপাণ্ডব বন্দী করে নিয়েছে। বৃন্দাবনের শোক যেন মুহুর্তকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে দূর থেকে দূরে।
-তুমি ফিরবে কবে আবার?
-ফিরব কেন?
-তাহলে?
-তাহলে কিচ্ছু না। তুমি এসো ঢাকা। আসবে?
-যাব।
-কবে?
জাহিনের উত্তরটুকু তোলা রয়েছিলো। এক সপ্তাহ পরে একটি হলুদ রঙের খামে অবন্তিকে চিঠি পাঠিয়েছিলো অবন্তীকে দিয়ে। রূপন্তী তখনো রংপুরে। ডাকবিভাগের এরকম খামে চিঠি চালাচালি এখন অন্তত ব্যাক্তিগত ভাববিনিময়ে ব্যাবহার হয় না। আশ্চর্যের ছিলো সে কারনেই। তবে ডাকের সিল-টিল কিচ্ছু নেই। অবন্তিই বাহক।  চিঠিতে লেখা।

প্রিয় রূপ,
তুমি মন খারাপ করবে কিনা জানি না। আমি ফোনেই তোমাকে বলতে পারতাম সবকিছু। কিন্তু আমি জানি আমি তা পারব না। তাই তোমাকে চিঠীটা দিলাম। আমি আগামী পরসু চীন চলে এসেছি। এখানে ফুডান ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং করবো। তুমি মন খারাপ করিও না। আমি আসতে চাই নি। বাবা আমাকে পাঠিয়েছে। বাবা  এপ্লাই করেছে,ভর্তি করিয়েছে। আমি না করতে পারি নি। আর হ্যা, তুমি থাকিও আমি আসবো আমি আগামি সপ্তাহেই তোমাকে ফোন করব। ফেসবুকেও কথা হবে।

জাহিন

 

জাহিন সাংহাই ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গেছে। বাবা চেয়েছিলো ছেলেটা বাইরেই যাক। জাহিনের পক্ষে বাবাকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয় নি। রূপন্তির অনেক খারাপ লেগেছিলো কিন্তু মেনে নিয়েছে সব। একে এতো কঠিন কোনকিছু ও ভাবেই নি। শুধু প্রত্যাশা ছিলো, বলে গেলেও তো পারতো। এখন লক্ষীবাজারে থাকে রূপন্তী। কে জি গুপ্ত লেনের একটি আধা পুরান বাড়িতে থাকে। তবে বাড়িটার আভিজাত্য আছে বেশ। সাতচল্লিশে দেশ ছেড়ে যাওয়া হিদু পরিবারের বাড়ি। এখন তাদের স্বজনরাই থাকে বাড়িটাতে। জগন্নাথ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর থেকে এখানেই থাকছে।
…………..

জাহিনের সময়গুলো এখনো ইউটিউবে মুভি দেখেই কাটে। এখন সিনেমা যেন ওর বেঁচে থাকার উপাদান। ভিনদেশে সময়কে ওর অসহ্য হয়ে উঠে নি এই মুভির কারনেই। হলিউড থ্রিলার, বলিউডের ক্ল্যাসিক রোমান্টিক ফিল্ম পাশ কাটিয়ে  জাহিন আলফ্রেড হিচকক, রোমান পোলনাস্কি, সত্যজিত,ঋত্বিক, জ্যা লুক গদার দেখা শুরু করেছে। হিচকক দেখে ও বুঝে ফেলেছে থ্রিলার বুঝি একেই বলে। ফিল্মের বনেদি ভাষা ওর মাথায় গেথে যাচ্ছিলো সেসময়ে। উপমহাদেশের অফট্রাক অলটারনেটিভ ফিল্মগুলো দেখে ওর এখন বোধ্যতা এসেছে যে, ফিল্মের গল্প বুঝি এমনো হয়। নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকির অভিনয় দেখে জাহিন রূপন্তীকে বলেছে, আমি যদি ফিল্ম বানাই নওয়াজুদ্দিন কে কাস্ট করবো, বুসচো?
রূপন্তি তখন বুঝেছিলো ছেলেটার সঙ্গী এখন ফিল্ম। ওর থেকেও বড় সঙ্গী অথবা সমান মাপের সঙ্গী। রূপন্তী ঠাট্টাচ্ছলে বলেছিলো, আর হিরোইন কাকে নিবে? আমাকে?
জাহিন হো হো হো করে হেসে উঠেছিলো।
রূপন্তীর অনার্স শেষ হতে না হতেই জাহিন চলে এসেছিলো। ওর গ্রাজুয়েশন ৪ মাস আগেই শেষ হয়েছিলো। কোর্স শেষ হবার পর আর দেরি করে নি জাহিন। দেশে আসার একদিন পরই জাহিন আর রূপন্তীর দেখা হয়েছিলো শাহবাগে। সে অপূর্ব মাহেন্দ্রক্ষন যেন দুজনকে ছুয়ে গিয়েছিলো। রঙ মিয়ান্তির তৃপ্তির মতো ভেতরগত স্ফূরন যেন টলে পরছিলো রূপন্তীর। ৪ বছরের দীর্ঘ বিভাজন রেখার পরিসমাপ্তি যেন সেদিনের ঈষৎ রুদ্র দিনকে উচ্ছ্বাসে প্লাবিত করেছিলো। সেদিনই দিনাজপুরে গিয়ে কয়েকদিন থেকে আর দেরি করে নি জাহিন। ঢাকা চলে এসেছিলো। বাংলাদেশে এসে জাহিনের মাথায় সেই সিনেমার ভূত চেপে বসেছিলো। দেশে এসে সিনেমাটোগ্রাফি কোর্স,ফটোগ্রাফি কোর্স,এডিটিং কোর্সে একসাথে ভর্তি হয়েছে। নাসরুল্লাহ রাসুর এসিস্ট্যান্ট হিসাবে তিনমাসের মধ্যেই যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের সিনেমেটিক ডিগ্রেডেশন ওকে যন্ত্রনা দিচ্ছে তখন রীতিমতো। নাসরুল্লাহ রাসু সেমি কমার্সিয়াল ধাচের সিনেমায় এখন বেশ নামডাক কামিয়েছে। ফিল্মের আর্টিস্টিক ভ্যালু আর কমার্শিয়ালিজমের কম্বিনেশনে সে অনন্য জায়গা করে নিচ্ছে বাংলা সিনেমায়। লোকজন,সিনেবোদ্ধারা তাই বলছে এখন। জাহিনও সে দর্শনের অনুসারী মনে হয়।
সিনেমা আর রূপন্তীর মধ্যকার দ্বৈরথ এখন চলছে। রূপন্তীর মাস্টার্স ততদিনে শেষ হয়েছে।
আমি না সিনেমা?
-দুটোই
-দেখো, তুমি আমার কথা ভেবেছো?
-ভাবি এবং এখনো ভাবছি
-তাহলে?
-তাহলে তুমি তুমিই, অপরিবর্তনীয় এবং আমার জন্য অপরিহার্য
-আমার কিন্তু মাস্টার্স শেষ
জাহিন রূপন্তীকে সত্যিই ভালবাসে। আসন্ন দগ্ধ ক্ষত যেন অবিরাম হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলো। দুটি স্বত্বার সেতুবন্ধন যেন খুজে পাচ্ছিলো না জাহিন। চোখের সামনে এসে উচ্ছ্বল হাসি দিচ্ছিলো রূপন্তী। আর, পাশের কাল্পনিক সেলুলয়েডে ভেসে আসছিলো একেকটি কাট শট, ক্লোজ শট। এক্সট্রিম ক্লোজ আপ, ওভার দ্যা শোল্ডার। এডিটিং প্যানেলে বসে নাসরুল্লাহ রাসু পিঠে হাত দিয়ে বলছিলো, জাহিন, ‘জাম্প কাটের এপ্লাই কজালি করতে হবে। অহেতুক কেটে দিলেই হয় না জাম্প কাট’। 
নাসরুল্লাহ রাসু এডিটিং প্যানেলে জাহিনের অমনোযোগ আবিষ্কার করে। ।‘কি ভাবো। শোন কিছু ব্যাপার বুঝতে হবে, এই যে দেখো তুমি একটা এস্টাব্লিশ শট নিয়েছো। ইটস ট্র্যাডিশনাল। ইউ শুড বি থিংক এনাদার ওয়ান। ঠিক এরকমই করত হবে যেমন পূর্বে হয়েছে- না এমন নয়। ভেঙ্গে ফেলো, চুরমার করো। ভাংতেই হবে। আর্ট ইজ ব্রেক,ব্রেক ইজ আর্ট। আর্ট ক্যান্ট সাপোর্ট ট্র্যাডিশন’।
রূপন্তী এই ট্র্যাডিশনের বাইরে নন। রূপন্তীর নিজে জানেন না সে ট্যাডিশনাল কি না। অবচেতনে এক অপূর্ব আকাঙ্খা দিনে দিনে বেড়ে উঠেছে। ওর একেকটি স্পর্শ যেন ওর কাছে পরম আবির্ভাব হয়ে যায় রীতিমতো। ওর সঙ্গে বসবাস তো প্রত্যাশার ব্যাতিক্রম কিছু নয়। রূপন্তী ভাবে জাহিন কি তবে অনেক উচ্চাভিলাষী হয়ে গেছে! ওর কি কোন পরিবর্তন হয়েছে। আমাকে কি ওর জন্য মনে করে ও। রূপন্তী জাহিনকে বলে,
-যা আমি ভবেছিলাম তা কি তুমিও ভাবো নি?
-হ্যা, ভেবেছি।
-তুমি বাইরে গেলে আমাকে বলে কিন্তু যাও নি। এখন কি তবে সেভাবেই চলে যাবে?
-আমাকে কি করতে হবে?
-তুমি কিছু করবে না? মানে আমি বলছি তুমি কি এভাবেই কাটাবে?
-আমি কি কিছু করছি না?
-সে তুমি নিজেই জানো তুমি কি করছো?
-আচ্ছা তুমি কি আমার প্যাশনটাকে দেখতে পাও না?
-ওসব ফালতু কথা বলিও না তো
-রূপন্তী তুমি আমার অধিকার যদি আমি তোমার অধিকার হই। তুমি যা অলছো সে কথা অধিকারের না চাপিয়ে দেয়ার। তোমার বাধ্যবাধকতা আমার উপরে চলে আসছে।  এটা কি উচিৎ? তুমি আসিও, আমি থাকবো তো। বসবাস করবো।
-উফ! জাহিন,কিভাবে?
-আমি যেভাবে যা করছি তাকে সম্মান করো,দয়া করে। তুমি বা তোমার চারপাশ যা চায় তাকে আমি সম্মান করি। কিন্তু আমি অন্য কিছু করতে চাই যা তোমার চারপাশের কাছে অচেনা।
-তুমি এমন কিছু করতে চাচ্ছো যা অবস্তুগত মোহ এবং বলতে দ্বিধা নেই অবস্তুগত লোভও
-তুমি ভুল। তুমি আমার লোভ বা মোহ নও, নও তো? যদি না হয় তবে উত্তর তুমি ভেবে নিও
………………

 কেরানিগঞ্জ থেকে মাওয়া যাবার পথে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাউজিং সোসাইটিতে এখন রূপন্তী স্বামীসহ বসবাস করেন। রূপন্তী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক হিসাবে জয়েন করেছেন। বিয়েও করেছেন। রূপন্তির স্বামীও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ৫ বছরে চারদিকটা আরেক দফা বদলে গেছে। রূপন্তী নিজেও এখন অন্যরকম। ছোট্ট মেয়ে আর স্বামী মিলে এখন পুরোদস্তুর সুখী। মানে নির্ঝঞ্ছাট। অন্য কোন ক্লেশ,অন্য কোন যাতনা, অন্য কোন অনিশ্চয়তা এখন ওদের ছোঁয় না। রূপন্তীর বাবা মাও এখন প্রায় বেশিরভাগ সময় ওদের সাথেই থাকে। কিন্তু যে মানুষকে এখনো হৃদয়ে পোষন করে আছেন, যে অনুভূতি এখনো প্রাত্যহিকতায় চাপা পোরে গেছে সেসব কিছু ফুরিয়ে যায় না যে সহজে তা বুঝতে পারে রূপন্তী। জাহিনের নির্মিত সিনেমা মুক্তি পেয়েছে ইউটিউবে। মুক্তির প্রথম দিনটাতেই জাহিনের একটি কথা খুব মনে পড়ছে রূপন্তীর।
সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে খুব শীতের একটি সকালে দুজন বসেছিলো। হিম বরফ যেন গ্রাস করছিলো সবখানে। গরম চা খেতে খেতে হাতটা চেপে ধরেছিলেন ভীষনভাবে। চোখ দুটো সেদিন শীতে মনে হয় লাল হয় নি। একটি নির্ভরতা খুজতে ওর চোখ যেন ভিন্ন দৃষ্টির আবেদন ঢেলে দিয়েছিলো। অবন্তীর গালে চা’য়ের উত্তাপ স্পর্শ করিয়ে দিয়েছিলো নরম পরশে। বাঁ পাশের বাহুর পুরো পরিভাগে তাড়িত হচ্ছিলো রূপন্তী। ঢলে পড়ছিলো নিজের অনিয়ন্ত্রনে। রূপন্তীর ওরকম উষ্ণতার স্পর্শটা এখনো মনে পড়ে। আন্দোলিত হয়ে যায় এখনো। তবে যে কথাটি রূপন্তীকে সারাদিন ভাবাচ্ছিলো,
“রূপন্তী, আমার সিনেমা যেদিন মুক্তি পাবে সেদিন তুমি আর আমি রংপুরের কোন সিনেমা হলে দেখতে যাব”
অতীব সাধারন সে অভিব্যাক্তিটি সেদিন স্পর্শ করে নি অতটা রূপন্তীকে কিন্তু আজ করছে। আজ ওর চোখ দুটো ছলছল করছে। ওর ছোট্ট মেয়েটি ওকে জড়িয়ে ছিলো। রূপন্তী আনমনে কিন্তু স্বচ্ছ সচেতন অনুভূতি বসবাস করছিলো যেন সারাটা দিন। সেদিন যেমন করে চেয়েছিলো জাহিন আজ তেমন করে হয়তো হয় নি। এখন সিনেমা ইউটিউবে মুক্তি পাচ্ছে। সিনেমা হলে মুক্তি পাবার প্রবণতা এখন কমেই গেছে। কিন্তু রূপন্তী ভেবেছে জাহিনের সিনেমা ‘সিনেমা হলে’ বসেই দেখবে।
বলাকা সিনেমা হলে স্ক্রিমিং চলতে চলতে রূপন্তী জাহিনকেই ভেবেছে। রাত দশটায় একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন জাহিন।
-বেঙ্গলি সিনে ল্যাংগুয়েজ এখন কি বেশি ইন্টেলচুয়াল নয়?
-সিনেমা আসলে পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশে এখন মাত্র সিনেমার ভাষা তৈরি হয়েছে। আমার সিনেমাতে আমি যা দেখিয়েছি সেটা আসলে আমাদের প্রতিবেশিরা আগেই দেখিয়ে ফেলেছে। আমরাই বরং আমাদের ভিউয়ার তৈরি করতে পারি নি। আমাদের আজকের দিনে যে ল্যাংগুয়েজ তৈরি হবাঁর ধারা তৈরি হয়েছে তা আগেই দরকার ছিলো। দ্বিতীয়ত এই সিনেমা আমার এক্সপেরিমেন্ট।
-ইউটিুব স্ক্রিমিং প্লাটফর্ম হিসাবে কেমন?
-এই পরিবর্তনটা জরুরী এবং অবশ্যম্ভাবী ছিল।        

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

35 − 34 =