সুবলের চোখ এবং পরবর্তী ঘটনা : পর্ব-১

গতবছর ৩-দিনের একটা ভাষা বিষয়ক সেমিনারে শ্রীলংকার Sri Jayewardenepura ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. পিকে বন্দেরপাঠকের সাথে পরিচয় হয় আমার সেমিনার কক্ষে। সেমিনারের অবসরে বিকেলে হোটেল লনে পরিচয় করান উনি ওনার ছোটবোন ডা. করুনা শিবানীর সঙ্গে। ডা: করুনা National Eye Hospital of Sri Lanka-তে চক্ষু বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। অনেক দেশ ভ্রমণ করে এবার বাংলাদেশে যেতে চান তিনি, তাই ভাই অধ্যাপক ড. পিকে বন্দের ফোন করে ডেকে এনেছেন বোনকে একজন বাংলাদেশির সাথে পরিচয় করাতে, যাতে বাংলাদেশ সম্পর্কে তথ্যাদি জানা তথা ঢাকাতে গেলে কোন হেলপ নিতে পারেন তিনি আমার থেকে। গল্পচ্ছলে অনেক কথা হলো ভাই অধ্যাপক ড. পিকে এবং বোন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা: করুনা শিবানীর সাথে! রাতে ৩ জনে ডিনার করলাম একসাথে! কথাচ্ছলে আমার চোখের একটু সমস্যার কথা জানালে এক ফাঁকে তার হাসপাতালে যেতে বললেন আমাকে,যাতে চোখটি চেক করে দেখতে পারেন তিনি!
:
সেমিনার শেষ হলে পরদিন সকালে উপস্থিত হলাম ডা: করুনা শিবানীর চক্ষু হাসপাতালে। তিনি ঘুরিয়ে দেখালেন কর্নিয়াকক্ষসহ হাসপাতালের অনেক অদেখা জিনিসপত্র। কথা প্রসঙ্গে জানালেন, শ্রীলংকার ৮০% মানুষ তাদের চোখ ডোনেট করে যায় মরার আগে। তাই এখানের হাসপাতালগুলোতে কর্নিয়ার কখনো অভাব হয়না বরং মাঝে মধ্যে তারা তা রপ্তানি করে বিশেষ দেশে। ডা: করুনা শিবানীকে বললাম – “ডাক্তার আপনি বাংলাদেশে গেলে সেখানে আমার এক কৈশোরিক বন্ধুকে দেখাবো আপনাকে! যে এখন একজন সাধারণ জেলে কিন্তু ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়তো আমার সাথে। তার একটা চোখ নষ্ট করে দিয়েছি আমি। বাংলাদেশে বেশ কজন ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু কর্নিয়ার অভাবে তার চোখ ঠিক করতে পারিনি। নিজের হাতে এক বন্ধুর একটা চোখ কেটে ফেলেছি বলে এক মানসিক অন্তর্দ্বন্ধে ভুগছি প্রায় ৩০-বছর। আপনি কি আমাকে একটা কর্নিয়া দিতে পারেন? যা লাগিয়ে বন্ধুর চোখটা ভাল করতে পারি আমি? ডা: করুনা শিবানী জানতে চাইলো পুরো বিষয়টি যাতে হেলপ করতে পারে তিনি আমাকে। তাই ফিরে গেলাম জীবন পাতার ইতিহাস বইর পুরনো পাতা উল্টে অন্তত ত্রিশ বছর আগের আমার স্কুল তথা গ্রামীণ জীবনে!
:
ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় আমরা বন্ধুরা স্কুল ছুটির পরপরই বেরিয়ে পড়তাম নানাবিধ কাজ কারবারে। যার মধ্যে কাজের চেয়ে অকাজ ছিল বেশি। গাঁয়ের সকল বিল-ঝিল, নদী নৌকো, বন বাদার সব ছিল আমাদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। এর মধ্যে শেয়ালের গর্ত থেকে শেয়াাল শাবক টেনে বের করা থেকে শুরু করে, গোসাপ ধরে তার চামড়া দিয়ে “খঞ্জুরা” নামক বাদ্যযত্র বানিয়ে তা বাজানো কোন কিছু্ই বাদ যেতনা! এমনকি নদী যখন প্রচুর জলগম্ন হতো, তখন ইঁদুরের চোখ না ফোটা বাচ্চা দিয়ে শখানেক ছড়া বড়শি ফেলে হরেক রকম মাছ ধরতাম আমরা! অগ্রহায়ণ মাসে আমাদের গাঁয়ের বিল তথা মাঠ ভরে যেত সোনালী ধানে। এতো ধান কাটার মজুর পাওয়া যেতনা তখন ঐ চরাঞ্চলে। তাই ধান কাটার মৌসুমে হাতিয়া, নোয়াখালি, ভোলা প্রভৃতি চরাঞ্চল থেকে অনেক কিষাণ হাতে কাস্তে আর মাথায় কাঁথা-বালিশের বোচকা নিয়ে হাঁটের দিনে দাঁড়িয়ে থাকতো বাজার সংলগ্ন সাঁকোর গোড়াঁয়। ধনী কৃষকরা তাদের একক বা দলবদ্ধভাবে নিয়ে যেতো নিজের বাড়ি। ৩-বেলা খেতো তারা ধনী কৃষকের ঘরে আর রাতে বহিরাগত এ কিষাণরা ঘুমাতো বাইরের “কাচারি ঘরে, পরিত্যক্তি কোন ঘরে, বিলে সাময়িক নির্মিত টংঘরে কিংবা মসজিদের এক কোণে”। সারাদিন ধান কাটতো তারা জমির মালিকের সাথে। বিকেলে বা সন্ধ্যার পর হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে শুরু করতো তারা ধান মাড়াইয়ের কাজ। তাদের প্রণোদনা দিতে কেউবা সারিন্দা আর খঞ্জুরা বাজিয়ে নানাবিধ গান গাইতো! চলতো গভীর রাত পর্যন্ত। এভাবে সব ধান তোলা শেষ হওয়ার পর প্রতিজন বহিরাগত কিষাণ ৭/৮ মন ধান নিয়ে ফিরে যেতো তার নিজ আবাসে। কেউ কেউ ধান বিক্রি করে টাকা নিয়ে যেত নিজের সাথে।
:
আমরা যারা স্কুলে পড়তাম তারা প্রায় সবাই ছিল কৃষক আর জেলেদের সন্তান। সুতরাং কৃষি আর জেলে জীবনের সাথে ছিল আমাদের গভীর সম্পর্ক। অগ্রহায়ণ মাসে ধান কাটা মৌসুমে স্কুল ছুটির পর আমরা প্রায়ই আনন্দচ্ছ্বলে নেমে পড়তাম ধান কাটতে বহিরাগত কিষাণদের সাথে। আমাদের বন্ধুদের মাঝে প্রতিযোগিতা হতো কে কত অল্প সময়ে বেশি ধান কেটে জড়ো করতে পারে। সাঁতার, গাছেচড়া, মাছধরা প্রভৃতি নানাবিধ কাজে আমার খ্যাতি থাকলেও, দুটো কাজে আমি খুব ফ্লপি ছিলাম। একটা হচ্ছে লাঙল দিয়ে জমিতে চাষ করতে পারা এবং অন্যটি ধান কাটা। আমার অন্য বন্ধুরা যখন স্কুল ছুটির পর বাবার পক্ষে নিজ জমিতে চাষ দিতো গরু দিয়ে, আমি তখন অসহায়ের মত তা দাঁড়িয়ে দেখতাম। একবার নিজের পারদর্শিতা দেখাতে আমাদের নিজস্ব মাইনে করা রাখাল থেকে লাঙল কেড়ে নিয়ে জমি চষা প্রাকটিস করতে গিয়ে গরুর পায়ে লাগিয়ে দেই লাঙলের ধারালো ‘ঈষ’। মাস খানেক ভুগতে হয়েছিল গরুটিকে। সেই থেকে নিষিদ্ধ হলাম আামি লাঙল ধরা থেকে। মা কড়া নির্দেশ দিয়েছিল আমাদের ৩-রাখালকে, যেন কখনো আমাকে ধরতে না দেয় লাঙল জোয়াল। তাই বন্ধুরা যখন চৈত্র মাসের ধুলোওড়া বিলে গরুর দৌঁড় প্রতিযোগিতায় উঠে বসতো মইতে, আমি তখন দাঁড়িয়ে কেবল নিজের চুল ছিঁড়তাম!
[এর পরের পর্ব আগামিকাল]
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 3 = 11